আমাদের সৌভাগ্য যে, ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ আমাদের এই দেশে গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক বিশ্ব-মহানায়ক জন্মগ্রহণ করেন। গোপালগঞ্জ ইতোমধ্যে মহকুমা থেকে উন্নীত হয়ে জেলাতে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার এদেশে আসার আগে অর্থাৎ ১৭৫৭ সালের আগে ভারত উপমহাদেশে বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন জাতি-উপজাতি এখানে বসবাস করতে আসে। তবে একটি বিশেষ বিষয় হলো, যারাই এদেশে আগমন করেন তারাই এদেশটাকে নিজেদের বলে গ্রহণ করে নেন। এ বিষয়ে আমরা বিশেষভাবে মুঘল সম্রাট বাবরের কথাটি মনে করতে পারি। বাবর ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের সমরকন্দের একটি গ্রাম ফারগানার অধিবাসী এবং সেখানকার রাজবংশের মানুষ। অল্প বয়সেই তিনি রাজ্যচ্যুত হন এবং কৈশোর থেকে তিনি তার রাজ্যটি পুনর্দখলের প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু তার উদ্দেশ্য কখনও স্থায়ীভাবে সফল হয়নি। তার সৌভাগ্য ছিল, পারস্যের সম্রাট তাকে তার রাজ্যে আশ্রয় প্রদান করেন। তিনি মুলতান, লাহোর থেকে পূর্ব এবং দক্ষিণে দিল্লি, আগ্রা এবং মধ্যভারতের কতিপয় মুসলমান রাজ্য দখল করেন। তিনি পারস্য থেকে পশ্চিমে ও দক্ষিণে ভারতের সিন্ধু, মুলতান ও পাঞ্জাবে আধিপত্য বিস্তার করে অবশেষে দিল্লি ও আগ্রাতে এসে ভারতেই একটি বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করলেন।
দিল্লিতে তার ভারতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর তিনি তার সব সহকর্মীকে ডেকে একটি দরবার বসালেন। সেখানে তিনি ঘোষণা দিলেন- 'আপনাদের ডেকেছি এ জন্য যে, আমার মনে হয়, ফারগানা রাজ্যে ফিরে যাওয়ার চেষ্ট্বা বাদ দিয়ে আমাদের নতুন ভাবনার প্রয়োজন। আমরা হিন্দুস্তানে একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছি। এটিই হোক আমাদের নতুন দেশ। এই দেশটিকে আমরা সমৃদ্ধ করে তুলব; আর পেছনে তাকাব না।'
মুসলমানরা অবশ্য ভারতবর্ষে সম্রাট বাবরের অনেক আগেই আস্তানা স্থাপন করেন এবং সেটা শুরু হয় ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে এবং এই সাম্রাজ্যটি ক্রমে ক্রমে মুঘল সম্রাট আলমগীর-আওরঙ্গজেবের আমলে ১৬৫৯-১৭০৪ খ্রিষ্টাব্দে হয়ে ওঠে পৃথিবীর সর্বকালের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র। সম্রাট বাবর যে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন ১৫২৬ সালে, সেই সাম্রাজ্যটি ২৩০ বছর পরে ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া নামক একটি কোম্পানি গ্রেট ব্রিটেনের নামে শাসন করে একশ' বছর। এবং পরবর্তী ৯০ বছর লন্ডনের ব্রিটিশ সরকার দেশটির শাসনভার গ্রহণ করে। এই একটি সময়েই ১৯০ বছর ভারতবর্ষ একটি বৈদেশিক শক্তির উপনিবেশে পরিণত হয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা দেখি যে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পর্যন্ত যে শক্তি কোনো দেশকে শাসন করে, তাদের ধর্মই হয় সেই দেশের রাজধর্ম এবং তারা দেশের সব নাগরিককে নিজেদের ধর্মে জোর করে ধর্মান্তরিত করে। এই ঐতিহাসিক ধারা কিন্তু মুসলমানরা কখনও অনুসরণ করেননি। ইসলাম ধর্মের গৌরবযুগের পৃথিবীতে উত্তর বা দক্ষিণ আমেরিকা ছিল না। যেখানেই মুসলমানরা তখন রাজত্ব করে সেই এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা- সর্বত্রই তারা শাসক হিসেবে তাদের ধর্ম প্রচার করেনি। ইসলাম ধর্ম প্রচার করে স্বতন্ত্র একটি গোষ্ঠী, যারা ছিলেন ধর্মপ্রচারক এবং সুফি নেতৃবৃন্দ। সে কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, যেখানে মুসলমানরা রাজত্ব করেছেন সেখানে তারা খুব কম সময়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশেই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায়। এই উপমহাদেশে ৭১২ থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৫০ বছর মুসলমান সাম্রাজ্য বহাল থাকলেও উপমহাদেশে মুসলমানরা একটি সংখ্যালঘিষ্ঠ গোষ্ঠী হিসেবেই অবস্থ্থান করেন।
যা হোক, আমরা যদি শুধু আমাদের দেশটি অর্থাৎ বাংলাদেশের দিকে নজর দিতে চাই তাহলে দেখব যে, এই দেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে জনবসতি শুরু হয়। এই দেশে তখন অস্ট্র্রোলয়েড জনগোষ্ঠী আগমন করে এবং এখানকার দ্রাবিড়, অহম, কাশ্মীরি ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশ্রিত হয় এবং সত্যিকার অর্থেই ভারতবর্ষ হয় একটি বহুজাতিক সংমিশ্রণের দেশ, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Melting pot of various ethnic groups.. এটা কিন্তু অন্যান্য দেশ যেখানে বহুজাতিক সংমিশ্রণে হয়েছে, বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী ব্রিটিশ কর্তৃত্বকালে, তার মতো নয়। ব্রিটিশ কর্তৃত্বকালে ethnic group স্ব্বতন্ত্রভাবে থেকে যায়। কিছু কিছু সংমিশ্রণ অবশ্যই রয়েছে। আমাদের উপমহাদেশের আর একটি বিশেষত্ব হলো যে, আমাদের এই এলাকায়ই সম্ভবত ধান প্রথম আবিস্কৃৃত হয় এবং ধানের চাষই হয় আমাদের জীবন ও রোজগারের উৎস। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে যখন মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপ থেকে আর্যরা সর্বত্র বিস্তৃত হতে থাকল, তখন দেখা গেল যে, আর্যরা চাষকার্যে অত্যন্ত দক্ষ। আমরা এ জন্য দেখি যে, ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় শাসকগোষ্ঠী চাষবাসের উন্নতির জন্য আর্য ও ব্রাহ্মণদের আদর করে ডেকে নিয়ে আসেন। মুসলমানরা সম্ভবত প্রথম জনগোষ্ঠী, যারা মানুষকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তার আগে পেগানদের মূর্তি এবং বিশেষ বিশেষ স্মৃতিস্তম্ভ বিধাতার আসন দখল করেছিল। Peganism  অবশ্য পরবর্তীকালে নিজেদের সংশোধন করে বলতে থাকে যে, এই বিভিন্ন দেবমূর্তিই হলো বিধাতার বিভিন্ন আকারে মানুষের কাছে দর্শন দেবার গৃহীত পদ্ধতি।
আমার প্রবন্ধটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। সুতরাং আমার এখন সেখানে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ মার্চ একটি বিশিষ্ট পরিবারে বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষরা এক সময় এখানকার বড় জমিদার ছিলেন; কিন্তু তার জন্ম হয় একটি উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে। তার পিতা শেখ লুৎফর রহমান মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার ছিলেন। তবে তাদের সম্পদ ছিল জমিজমা। শেখ লুৎফর রহমান ও তার স্ত্রী মোসাম্মৎ সায়েরা খাতুন চার কন্যা ও দুই ছেলের জন্মদান করেন। আমাদের বঙ্গবন্ধু ছিলেন তাদের তৃতীয় সন্তান। তার চেয়ে বড় ছিলেন দুই বোন :মোসাম্মৎ ফাতেমা বেগম ও মোসাম্মৎ আছিয়া বেগম। বঙ্গবন্ধুর পরেই ছিলেন তার একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের; তার পরে ছিলেন আরও দুই বোন মোসাম্মৎ হেলেন এবং মোসাম্মৎ লাইলি। বঙ্গবন্ধুর নামকরণ করেন তার নানা আবুল মজিদ এবং তাকে খোকা বলে ডাকা হতো। বঙ্গবন্ধু প্রথমে মাদারীপুর গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুুলে ভর্তি হন ১৯২৭ সালে। তবে দু-বছর পরেই তার আব্বা তাকে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুুলে ভর্তি করে দেন। সেখান থেকে তিনি গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুুলে ভর্তি হন। এই স্কুুলের তখন ভালো সুনাম ছিল। বঙ্গবন্ধু ৭ বছর বয়সে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হয়ে চার বছর স্কুুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। এ ছাড়া অল্প বয়সেই তিনি চোখের ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং সে জন্য তখন কলকাতায় বিখ্যাত চক্ষুবিশারদ ডা. তোসাদ্দক আহমদের কাছে যান। বেরিবেরি ও চক্ষুরোগের কারণে তার লেখাপড়া তেমন চলেনি এবং তার ছাত্রজীবনের কয়েকটি বছর নষ্ট হয়ে যায়। তবে কৈশোরে বঙ্গবন্ধু অন্য ছাত্রদের মতোই লেখাপাড়া, খেলাধুলা এবং অন্যান্য পাঠ্যপুস্তক-বহির্ভূত ছাত্রদের কার্যক্রমে অংশ নিতেন। অল্প বয়সেই তিনি সংগঠকের ভূমিকা খুব ভালোভাবেই পালন করতে পারতেন এবং কিশোরদের মধ্যে তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। লেখাপড়ায় পেছনে পড়ে যাওয়ায় ১৯৩৮ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি হলেন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ১৯৪২ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং তার পরেই তিনি কলকাতায় চলে যান উচ্চশিক্ষার জন্য ইসলামিয়া কলেজে (এই ইসলামিয়া কলেজ বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ নামে পরিচিত)। তার নেতৃত্বের গুণে তিনি একজন প্রসিদ্ধ ছাত্রনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। তখন তার ভূমিকা ছিল যে, তিনি ছাত্রনেতা ঠিক করে দিতেন, নিজে কোনো পদ গ্রহণ করতেন তাঁর বন্ধুবান্ধব কিন্তু সে-সুযোগ তাকে দিলেন না। তারা তাকে সর্বসম্মতিক্রমে বিনা নির্বাচনে ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করলেন। এবং এই পদটিতে তিনি ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে তিনি স্নাতক হলেন এবং দেশ বিভাগের সময়েই ডিসেম্ব্বর মাসে ঢাকায় চলে এলেন। এখানে এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র হলেন। কিন্তু এই ছাত্রত্ব ছিল মাত্র কয়েক দিনের। ঢাকায় ১৯৪৭ সালের শেষদিকেই পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের কর্মকাণ্ডে পূর্ববাংলায় ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে যায় এবং ১৯৪৮ সালের মার্চে বিষয়টি গুরুতর হয়ে ওঠে। ফজলুর রহমান ছিলেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি সল্ফ্ভ্রান্ত পরিবারের রাজনীতিবিদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালেই রাজনীতিতে পদার্পণ করেন এবং তার আগ্রহ ও কর্মব্যস্ততা তাকে ওকালতি বা সংসার করা থেকে বহুদিন দূরে রাখে। বেশি বয়সে তিনি বিয়ে করেন এবং তার স্ত্রী ছিলেন কলকাতার একটি সল্ফ্ভ্রান্ত বাঙালি পরিবারের উর্দুভাষী নারী।
১৯৪৭ সালের শেষ লগ্নে তিনি পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্তা ও রাষ্ট্র্রভাষা নিয়ে করাচিতে সম্মেলন করেন এবং সেখানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব বিবেচিত হয়। এ কারণে পূর্ববাংলার জনগণ, যারা তখন সংখ্যায় ছিল পাকিস্তানের ৬৩ শতাংশ, তারা বলল যে, বাংলা ভাষা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হিসেবে হবে দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। বঙ্গবন্ধু ঢাকায় নতুন হলেও কলকাতাতে প্রসিদ্ধ ছাত্রনেতা ছিলেন। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের আগেই তার একটি ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন। তিনি তখনই নিশ্চিত হয়ে যান যে, ধর্মের ভিত্তিতে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম এলাকার দুই অংশ নিয়ে একটি রাষ্ট্র্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তখনই তারা পূর্বাঞ্চলে বংসাম (বাংলা ও আসাম) নিয়ে একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা করেন। তাই ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি পূর্ববাংলায় তখনকার অবস্থ্থা বিবেচনা করে একটি ছাত্র প্রতিষ্ঠান 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ' গঠন করেন। তিনি তখনই জানিয়ে দেন, তিনি জাতীয় রাজনীতি করবেন বলে ছাত্রলীগের কোনো পদাধিকারী হবেন না।
১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পরেই শুরু হলো রাষ্ট্র্রভাষা আন্দোলন। মন্ত্র ফজলুর রহমান জানালেন, তিনি উর্দুকে লিংগুয়াফ্রাংকা হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেছেন। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে দেখা গেল যে, গণপরিষদের যে অধিবেশনটি আহ্বান করা হলো, সেখানে নির্ধারণ করা হয়েছে, পার্লামেন্টে শুধু ইংরেজি এবং উর্দুতে কথা বলা যাবে। কুমিল্লার গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রস্তাব করলেন যে, এই বক্তৃতার ভাষার তালিকায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা যোগ করা হোক। এই দাবির সমর্থনেই শুরু হলো রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ১১ মার্চে প্রতিবাদ শোভাযাত্রা থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হলো অনেকের সঙ্গে। এদিকে ক'দিন পরেই ছিল পাকিস্তানের স্রষ্ট্রা ও গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর ঢাকায় প্রথম রাষ্ট্র্রীয় সফর। এই সফরের প্রাক্কালে ছাত্রদের সঙ্গে বিরোধ মোটেই কাম্য মনে না করে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রদের সঙ্গে সমঝোতা স্থাপনে মনোযোগ দিলেন। বন্দি বঙ্গবন্ধুর সম্মতি নিয়ে সমঝোতা হলো এবং বঙ্গবন্ধুও ১৬ মার্চে মুক্তি পেলেন। জিন্নাহর সফরকালে ছাত্রদের সঙ্গে তার আলোচনা মোটেই সুখকর ছিল না। যাই হোক, তার কিছুদিন পরেই বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি আন্দোলনে সমর্থন দিলেন। আন্দোলনের তীব্রতা রুখে দেওয়ার লক্ষ্যেই কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ ২৭ জন ছাত্রকে বহিস্কারও করল। এদের মধ্যে একজন বঙ্গবন্ধু। কিছুদিন পর বিশ্ববিদ্যালয় খুলল এবং কর্তৃপক্ষ বহিস্কৃত ছাত্রদের জানাল যে, যারা এসব আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করার মুচলেকা দেবে তাদের বহিস্কারাদেশ বাতিল করা হবে। এখানে সবাই মুচলেকা দিলেন; কিন্তুবঙ্গবন্ধু বললেন যে, তিনি নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের ন্যায় দাবি সমর্থন করেছেন। তিনি কোনোমতেই মুচলেকা দেবেন না। তাই ১৯৪৮ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক ছিন্ন হয়।
বঙ্গবন্ধু অল্প বয়স থেকেই মানুষের দুঃখ-কষ্টে খুবই ব্যথিত হতেন। মানুষের মধ্যে অসমতা তিনি কোনোমতেই গ্রহণ করতে পারতেন না। এক সময় তার এলাকায় অনেক লোকের অনাহারে দিন কাটাতে হয়। তিনি এটি সহ্য করতে পারলেন না এবং নিজেদের গোলাঘর উন্মুক্ত করে সবাইকে সেখান থেকে ধান নিয়ে যেতে সুযোগ করে দেন। এই চিন্তাধারা থেকেই তিনি সারাটি জীবন মানুষের দুঃখ-কষ্ট বিমোচন এবং মানুষের অসমতা দূরীকরণে নিজেকে নিবেদিত করেন। 'সোনার বাংলা'র স্বপ্ন তখনই তার মনে প্রোথিত হয় এবং পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের (অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ) জন্য তার স্লোগান 'সোনার বাংলা' গড়ে তোলা। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, তিনি সবসময়ই বলতেন, 'আমার আছে মাটি, আর আমার আছে মানুষ। আমার মাটি উর্বরা এবং আমার মানুষ কর্মঠ- এই দুয়ের সংমিশ্রণে এইটিই হবে সোনার বাংলা। আমি সেই সোনার বাংলা গড়ে তুলতে চাই।' বস্তুত আমরা সেই পথেই আছি। অন্তত গত বিশ বছর ধরেই আমরা সেই পথে এগিয়ে যাচ্ছি এবং আমার মনে হয় যে, আরও বছর দুয়েক আমরা সেই পথেই নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে যাব।
আমাদের দেশে কৃষি বিপ্লবের সূচনা হয় গত নব্বইয়ের দশকের পূর্ব লগ্নে এবং এইটিই দ্রুতগতিসম্পন্ন হতে থাকে ১৯৯৬ সাল থেকে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষ্য করা যেতে পারে যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন মোটামুটিভাবে আওয়ামী লীগের শাসনকালের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট। আমার খুব ভালো লাগে মানুষ যখন বলেন যে, বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং আওয়ামী শাসন সমার্থক। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করেই আমরা আমাদের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তি করেছি 'দারিদ্র্য দূরীকরণ'। আমাদের উন্নম্নয়ন কৌশলের মূলমন্ত্র হচ্ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্রমাগত দরিদ্র মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণ এবং এ ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য লক্ষণীয়। ২০১০ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থাসকারী জনসংখ্যা ছিল ৩১ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এটা নেমে হয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশের মতো। একই সঙ্গে অতি দরিদ্রের সংখ্যা এখন মাত্র ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। অবশ্য, আমরা যদি জনসংখ্যা বিচার করি তাহলে দেখব যে, এখনও ৩ কোটি মানুষ দরিদ্র। এত বৃহৎ জনসংখ্যাকে আমাদের দারিদ্র্য থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। তবে সুখের বিষয় হলো যে, আমরা এক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে দক্ষ জাতি।
লেখক
সাবেক অর্থমন্ত্রী
প্রাবন্ধিক