সহস্র বছরের সেরা বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ ১৭ মার্চ তাঁর শততম জন্মদিন। আমরা যারা ৬৯, ৭০ এবং ৭১-এর বাংলাদেশ দেখেছি, তারা অবশ্যই বলবেন যে, মুক্তিসংগ্রামে একমাত্র অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যারা তাঁকে নিয়ে বিতর্ক করেন, তারা অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী।
বঙ্গবন্ধুকে আমার ব্যক্তিগতভাবে জানার সুযোগ হয়েছিল। আমার বাড়ি গোপালগঞ্জে এবং সেখানেই বেড়ে ওঠা। আমাদের বাসার সামনে যে রাস্তা, তার উল্টোদিকের একটা ঘরে বঙ্গবন্ধু থাকতেন। তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে পাস করে এসেছেন সদ্য। রাজনীতি শুরু করেছেন। তখন কাছাকাছি ছিলাম বলেই হয়তো তাঁর কাছে যাওয়া হতো। বঙ্গবন্ধুরও নিয়মিত আমাদের বাসায় যাতায়াত ছিল। তিনি আমাকে ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত স্নেহ করতেন। শিশুদের প্রতি তাঁর স্নেহপ্রবণ মন ছিল বলেই হয়তো তিনি এমনটা করতেন বলে ধারণা করি।
একটা ঘটনার কথা বলা যাক। সময়টা খুব সম্ভবত ৫৪ সালের নির্বাচনের আগে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভারত থেকে ফিরে এসে আওয়ামী লীগ গঠন করেছেন। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সেই সময় একবার সোহরাওয়ার্দী সাহেব গোপালগঞ্জে আসবেন, তাঁর প্রথম জনসভা আহ্বান করলেন। আমরা তখন স্কুলের ছাত্র। মুসলিম লীগ সরকার ওই দিনই গোপালগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করে; উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগের জনসভা ভণ্ডুল করে দেওয়া। স্কুলে পড়ি বলে হয়তো সবার চেয়ে আমাদের উৎসাহ ও ঔৎসুক্য ছিল সবার চেয়ে বেশি। আমরা সভাস্থলের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছি। আমার স্পষ্ট মনে আছে, শেখ মুজিব তখন ছাত্রদের ডেকে বললেন, 'তোরা ঘোরাঘুরি করিস না। পুলিশে ধরলে অকারণে ঝামেলা হবে। তোরা দূরে দূরে থাক। আর যারা গ্রাম থেকে এসেছে, তোরা শহরের বাইরের অংশে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে থাক। যখন দরকার হবে আমি নির্দেশ দেব। আজ সভা হবে।' বঙ্গবন্ধুর এই কথায় আমাদের উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। আমরা তাঁর নির্দেশমতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম। বিকেল ৩টার পর বঙ্গবন্ধু কলেজের ছাত্রদের মারফত খবর পাঠালেন- সবাই যেন চারজনের একেকটা দল তৈরি করে মধুমতি নদীর পাড়ে চলে আসে।
মধুমতি নদীটি এখন যদিও নেই, মরে গেছে; কিন্তু সেই সময় বেশ উত্তাল ছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো সবাই ধীরে ধীরে নদীর পাড়ে জড়ো হতে লাগল। সবার সঙ্গে আমরা বন্ধুরাও গেলাম। সেখানে গিয়ে এক অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করলাম। দেখি, নদীর পাড়ে ছোট ছোট নৌকা দাঁড়িয়ে। যারাই যাচ্ছে তাদের নৌকায় করে মাঝ-নদীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর মাঝ-নদীতে বিরাট একটি বাঁশের মঞ্চের মতো তৈরি করা হয়েছে। ওই সময় খুলনা থেকে কয়েকশ' বাঁশ একত্র করে মাচা বানিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দূর-দূরান্তে নিয়ে যাওয়া হতো বিক্রির উদ্দেশ্যে। ওই রকমই ৫০ থেকে ৬০টি বাঁশের মাচা সারিবদ্ধভাবে বেঁধে দিয়ে নদীর মধ্যভাগে মঞ্চটি বানানো। সেখানে মাইকেরও ব্যবস্থা করা হয়। মাঝ-নদীর সভাস্থলে সোহরাওয়ার্দী সাহেব ও বঙ্গবন্ধু উপস্থিত হয়ে মাইকে ঘোষণা করলেন- 'পুলিশ ভায়েরা, তোমরা বাড়াবাড়ি করবে না। তোমরা তোমাদের দায়িত্ব পালন কর। নদীর মধ্যে ১৪৪ ধারা কার্যকর হয় না। সুতরাং, এখানে আমরা আইন মেনেই সভা করছি!' উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তখন আর ঝামেলা করল না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বাঁশের মাচাটি জনতায় পূর্ণ হয়ে যায়। নদীর পাড়েও অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। বঙ্গবন্ধু প্রথমে বক্তৃতা দিলেন। যদ্দূর মনে পড়ে, বক্তৃতায় তিনি নূরুল আমিন সরকারের অত্যাচার-অনাচার নিয়ে কিছু কথা বললেন। আরও বললেন, বাঙালি কখনও অত্যাচার মেনে নেয় না। সে জন্য আমার নেতা সোহরাওয়ার্দী সাহেব আওয়ামী লীগ গঠন করেছেন। আওয়াম মানে জনগণ, আর আওয়ামী লীগ মানে জনগণের দল। আমরা সবাইকে সংগঠিত করছি, যাতে এই অত্যাচারের রাজত্ব থেকে সাধারণ মানুষদের মুক্ত করতে পারি। বঙ্গবন্ধু কথা শেষে সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে মাইক দিলেন। তিনি এক ঘণ্টার মতো বক্তৃতা দিলেন। নদীর মাঝে জনসভার মতো ঘটনা আমি আমার দীর্ঘ জীবনে আর কখনও ঘটতে দেখিনি। বঙ্গবন্ধুর সাংগঠনিক ও নেতৃত্বের গুণাবলি ছিল অসাধারণ। অল্প সময়ের ব্যবধানে এতটি বাঁশের মাচা জোগাড় করা সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি তাঁর মেধা আর সাংগঠনিক দূরদর্শিতা কাজে লাগিয়ে এমন অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছিলেন। এর পর বঙ্গবন্ধু ধীরে ধীরে ঢাকামুখী হলেন। ঢাকায় একটা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সময় তাঁর রাজনীতি নিয়েই কাটত। সেই সময়ের বেশিরভাগ তিনি জেলেই কাটিয়েছেন।
শিশুদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যে আত্মার সম্পর্ক ছিল; শিশুদের তিনি অত্যন্ত পছন্দ করতেন এবং ভালোবাসতেন; এ বিষয়ে আলোকপাত না করলেই নয়। ১৯৫৬ সালে কবি সুফিয়া কামাল, ড. আব্দুল্লাহ আল মুতী এবং শিশু সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের নেতৃত্বে কচি-কাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি ১৯৫৭ থেকে ৫৯ সাল পর্যন্ত এই সংগঠনের শিশু আহ্বায়ক ছিলাম। ড. মুতী আমাকে প্রসঙ্গক্রমে বহুবার বলেছেন এবং একটি লেখাতেও তিনি লিখেছেন, ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর শেখ মুজিব তাকে বলতেন, তোরা কিছু একটা কর। বাঙালি আত্মপরিচয় ফিরে পেয়েছে, আমরা উজ্জীবিত হয়েছি। কিন্তু এই আত্ম-আবিস্কার বা আত্মপরিচয়ের কথা পরবর্তী প্রজন্মকে তো জানাতে হবে। আমি রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তোরা যখন সামাজিক কাজ করিস, তোরা কয়েকজন মিলে কিছু একটা করার চেষ্টা কর। ড. মুতী ভাই এই কথা কবি সুফিয়া কামাল খালাম্মাকে জানালেন। কবি সুফিয়া কামাল তখন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইকে ডাকলেন। তারা একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, বঙ্গবন্ধুর কথাটা আসলেই সত্যি। আমরা যারা সামাজিক কাজ করি, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই আত্মপরিচয়ের বার্তাটা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটা আসলে আমাদেরই। তখন তারা একটা শিশু সংগঠন করার কথা ভাবলেন। দাদাভাই তখন ইত্তেফাক পত্রিকার শিশুদের বিভাগ কচি-কাঁচার আসরের দায়িত্বে ছিলেন। সাপ্তাহিক ওই আয়োজনটি তিনি সম্পাদনা করতেন। তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হলো 'কচি-কাঁচার মেলা' নামে একটা সংগঠন গড়ে তোলার। এই তিনজনের উদ্যোগে 'কচি-কাঁচার মেলা' প্রতিষ্ঠিত হলো। এবং এই সংগঠনের পেছনে সমর্থন জোগালেন কবি জসীম উদ্‌দীন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ড. কুদরাত-এ-খুদা, অধ্যাপক অজিত গুহসহ অনেকে।
মনে পড়ে, ১৯৬০ সালে সারাদেশ থেকে 'কচি-কাঁচার মেলা'র হাজারখানেক কিশোর ভাই-বোনকে নিয়ে ঢাকার প্রেসক্লাবে তাঁবু টাঙিয়ে আনন্দ মেলা নামে একটা শিক্ষা শিবির করলাম। সেই শিক্ষা শিবিরে হঠাৎ দেখি শেখ মুজিব তাঁর দলবল নিয়ে হাজির। তখন কবি সুফিয়া কামালের মেয়ে সুলতানা কামালের নেতৃত্বে ছোটদের একটি দল প্রেসক্লাবের গেট থেকে শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা জানিয়ে স্যালুট দিয়ে ভেতরে নিয়ে এলো। ছোটরা তখন তাঁকে অনুরোধ করল, আপনার সঙ্গীদের ভেতরে আনবেন না। বঙ্গবন্ধু হাসতে হাসতে তাদের বললেন, এই, তোরা বাইরে থাক। ওরা আমাকে গ্রহণ করেছে; তোদের গ্রহণ করবে না। 'কচি-কাঁচার মেলা'র একটা বিশেষ টুপি আছে; প্যারেডের সময় ব্যবহার করা হয়। ভেতরে এসে তিনি সেটা মাথায় পরে নিয়ে ছোটদের বললেন, আজ দেখব তোরা কী কী করিস! বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যস্ত একজন মানুষ সেদিন ছোটদের সঙ্গে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় কাটিয়েছিলেন। ওদের কাজ-কর্ম দেখলেন; ছোট বাচ্চাদের কোলে নিয়ে আদর করলেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, শিশু-কিশোরদের সঙ্গে থেকে তিনি বেশ আনন্দ পাচ্ছিলেন।
আরেকটি স্মৃতির কথা বলি। স্বাধীনতার পর তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ১৯৭৪ সালের প্রথমদিকের ঘটনা। আমরা আরেকটি আনন্দ মেলার আয়োজন করেছিলাম সে বছর। সারাদেশ থেকে অনেক শিশু-কিশোর এসেছে ঢাকায়। বঙ্গবন্ধু তখন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইকে ফোন করে বললেন, কাগজে দেখলাম, আপনারা অনুষ্ঠান করছেন। ছেলে-মেয়েরা আসছে, কিন্তু আমি তো খুবই ব্যস্ত, কী করে যে আসব! আপনি যদি ওদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে নিয়ে আমার এখানে আসেন, খুশি হবো। বঙ্গবন্ধু তখন মিন্টো রোডের প্রেসিডেন্ট হাউস, যা তখন গণভবন নামে পরিচিত ছিল, সেখানে দাপ্তরিক কাজ করতেন। দাদাভাই বঙ্গবন্ধুর কথামতো, সকাল বেলা আড়াইশ' থেকে তিনশ' ছেলেমেয়ে নিয়ে সেখানে যান। বঙ্গবন্ধু তাঁর কক্ষ থেকে বের হয়ে এলেন। বাইরে সারিবদ্ধভাবে বাচ্চারা দাঁড়িয়ে। তিনি তখন টুপি মাথায় দিয়ে একটু উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের সালাম গ্রহণ করলেন। তিনি উপস্থিত শিশু-কিশোরদের সম্বোধন করে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করলেন। তিনি বলেছিলেন, 'কচি-কাঁচার মেলা' আমারও খুব প্রিয়। তোমরা এসেছো, তাই আমি আনন্দিত। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ছোটদের কিছু উপদেশ দিলেন। আজ ভাবতে অবাক লাগে, তিনি সেদিন একটি রাজনৈতিক কথাও বলেন নাই। বরং ছোটদের একজন আপন অভিভাবকের মতোই লেখাপড়ার করা, বাবা-মায়ের কথা শোনা ইত্যাদি উপদেশ দিলেন। বক্তৃতা শেষে তিনি বাচ্চাদের কাছে গিয়ে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেছিলেন। সেটাই ছিল 'কচি-কাঁচার মেলা'র সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর শেষ সাক্ষাৎ।
তবে ৭৪ সালেই আমার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আরেকবার সাক্ষাতের সুযোগ হয়। দিনটি ছিল ১৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে। ভাবলাম, 'কচি-কাঁচার মেলা'র পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুকে গিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে আসি। সকাল বেলায়ই সঙ্গে কিছু ফুল নিয়ে চলে গেলাম। ভেতরে খবর জানানোর পর আমাকে তিনি ডেকে পাঠালেন। আমাকে দেখে বললেন, কি রে, এত ভোরে এসেছিস কেন! আমি বললাম, জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছি। আজ তো আপনার জন্মদিন। পাশে বসতে বলে আমার কাঁধে একটা হাত রেখে আদর করে বললেন, 'আমার আবার জন্মদিন কিসের রে! আমার জন্মও মানুষের জন্য, আমার মৃত্যুও মানুষের জন্য। আমি কেক-টেক কেটে জন্মদিন পালন করি না।' এ কথা মুখে বললেও, আমার দেওয়া ফুল সাদরে গ্রহণ করে যত্ন করে রাখলেন। সেটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ। ৭৫ সালের পর সে সময়ের ক্ষমতাসীনরা যখন ' বঙ্গবন্ধু' নামটাই উচ্চারণ করা বন্ধ করে দিয়েছিল, তখনও আমরা 'কচি-কাঁচার মেলা'র পক্ষ থেকে খুব গোপনে প্রতি বছর ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন করতাম। এমনকি ১৫ আগস্টেও আমরা তাঁকে স্মরণ করে শোক দিবস পালন করেছি। ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর, সে বছর 'কচি-কাঁচার মেলা'র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ করেছিলাম। তিনি আমাদের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। এবং আমাদের শিশু-কিশোর ভাইবোনদের দাবির প্রেক্ষিতে ১৭ মার্চকে পরবর্তী সময়ে 'জাতীয় শিশু দিবস' হিসেবে ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর যে নীতি, ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণির বিভেদ থাকবে না মানুষের মাঝে। এভাবে বৈষম্যহীন একটা সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে; এটা 'কচি-কাঁচার মেলা'র একটা অঙ্গীকার। আরেকটি কথা তিনি বলতেন, ছোটরা যদি মানুষ হয়। কারণ মানুষ হিসেবে জন্ম নিলেই তো আর মানুষ হয় না। পাকিস্তানের ওই বর্বররাও একদিন শিশু ছিল, কিন্তু ওরা তো মানুষ হলো না। ওরা তো পশু হলো। স্বাধীনতার পর তিনি প্রায়ই বলতেন, আমাদের শিশু-কিশোররা যেন লেখাপড়া শেখে, সংস্কৃতি চর্চা করে। তোরা ওদের মানুষ বানাবি। বঙ্গবন্ধুর সেই কথাগুলোই আমাদের 'কচি-কাঁচার মেলা'র চালিকাশক্তি। মূলকথা হলো- বঙ্গবন্ধুর নীতি বাস্তবায়ন। আমরা ছোটদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নীতি, আদর্শ গেঁথে দিয়েছি। তিনি একটা কথা বিশেষভাবে বলতেন, 'তোরা বাঙালি হ।' এই সংগঠনের মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঙালি হতে শেখার কাজই করছি।
সবশেষে, বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক নীতিমালা নিয়ে দু'একটি কথা বলতেই হয়। বঙ্গবন্ধু বলতেন, আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন কেন হলাম? বৈষম্যের কারণে। পূর্ব পাকিস্তান আয় করে, আর ব্যয় করে পশ্চিম পাকিস্তান। আমাদের লোকজন তাদের থেকে বেশি, কিন্তু সরকারি কোনো দপ্তরে বাঙালিদের সুযোগ দেওয়া হয় না। এই বৈষম্যের কারণেই আমরা স্বাধীন হয়েছি। তিনি বলতেন, তোরা মনে রাখবি- দেশের মধ্যে যেন কোনো বৈষম্য না হয়। বৈষম্য এমন একটা বীজ, যা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, হিংসা তৈরি করে এবং মানুষকে ধ্বংস করে। ১৯৭২ সালে সংবিধান পাস হওয়ার পর তাঁর বিখ্যাত সেই বক্তৃতায় অর্থনীতি সম্বন্ধে যা বলেছিলেন; সেখান থেকে কিছু উল্লেখ করা আবশ্যক মনে করি। তিনি বলেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে মানুষে মানুষে বিভেদ থাকবে না; আয়বৈষম্য থাকবে না এবং অঞ্চলে অঞ্চলে উন্নয়ন বৈষম্য থাকবে না। ভেবে অবাক হই, বঙ্গবন্ধু অর্থনীতিবিদ ছিলেন না। কিন্তু অর্থনীতির ভাষায় এই কথা এর চেয়ে সুন্দর করে বোধ হয় বলা যায় না। আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতি চিন্তার এটাই হলো মূলকথা। তিনি তাঁর চিন্তার বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। অর্থনীতিবিদরা মানুষের আয়ের বৈষম্য নিরূপণ করে থাকেন 'জিনি সহগ' দ্বারা। জিনি সহগ যদি দশমিক তিনের আশেপাশে থাকে তবে বুঝতে হবে, বৈষম্য খুব স্বাভাবিক পর্যায়ে আছে। আর সেটা যদি দশমিক চারের আশেপাশে হয়, তখন বোঝা যায়, বৈষম্য বেড়েছে কিন্তু তা সহনীয়। আর জিনি সহগ যদি দশমিক পাঁচ হয়, তবে তা উচ্চমাত্রার অসহনীয় বৈষম্যেরই নিদর্শন। ৭৪ সালে আমাদের জিনি সহগ ছিল দশমিক তিন দুই। অর্থাৎ বৈষম্য খুব স্বাভাবিক পর্যায়েই ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের জিনি সহগ এসে দাঁড়িয়েছে দশমিক পাঁচে। যার মানে হলো, উচ্চমাত্রার বৈষম্য বিরাজমান আমাদের সমাজে। একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে গত কয়েক বছরে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ফলে যে অর্থ জমা হয়েছে, তা ৫ শতাংশ লোকের হাতে। অর্থাৎ, ৯৫ শতাংশ লোকের উন্নয়ন হয়নি। দারিদ্র্য হয়তো কমেছে, কিন্তু বৈষম্য অনেক বেড়ে গেছে, যা বঙ্গবন্ধুর নীতিমালার সম্পূর্ণ বিরোধী। তিনি সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠায় সমাজতন্ত্রের একটা নিজস্ব ব্যাখা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কমিউনিজমে রাষ্ট্রের সম্পদ শুধু রাষ্ট্রের হাতেই থাকে; রাষ্ট্র সেটা অন্যকে ব্যবহার করতে দেয়। কিন্তু আমার সমাজতন্ত্রে সম্পদ থাকবে তিন হাতে। রাষ্ট্রের হাতে কিছু থাকবে, সমবায়ের মাধ্যমে অনেকের হাতে কিছু থাকবে এবং ব্যক্তিগতভাবে- এই তিন হাতে থাকবে সম্পদ। বঙ্গবন্ধুর এই চিন্তাকে আধুনিক বিশ্বে বলা হয় কল্যাণ অর্থনীতি বা আধুনিক সমাজতন্ত্র। বর্তমানে ইউরোপের প্রথম সারির উন্নত কয়েকটি দেশকে কল্যাণ অর্থনীতির দেশ বলা হয়। ইউরোপ যদি এই চিন্তা বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে আমরা কেন পারছি না? বঙ্গবন্ধু তো এমনটি ভেবেছিলেন প্রায় ৩০ বছর আগেই।
মুজিব জন্মশতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে একটা কথাই বলতে চাই। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশটি আমরা স্বাধীন করেছি, সেই দেশটি তখনই সার্থক ও সফল হবে, যদি আমরা তাঁর বৈষম্যহীন সুন্দর সমাজের নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারি।
লেখক
অর্থনীতিবিদ
প্রাবন্ধিক