আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে সারাবিশ্বে পরিচিত করতে চেয়েছিলেন শান্তিকামী দেশ হিসেবে। বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেছিলেন তাঁর চির সংগ্রামময় জীবন থেকে নেওয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।
উপরের কার্যকর স্তরটিকে ব্যবচ্ছেদ করলে দুটো উপাদান সামনে চলে আসে। প্রথমটি হলো, কলকাতায় ছাত্র থাকাকালীন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা এবং দ্বিতীয়টি ঠান্ডা লড়াইয়ের হিমশীতল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। প্রথম পরিস্থিতিটি তাকে অনুধাবন করতে সুযোগ দিয়েছিল দেশে দেশে যুদ্ধ-সংঘাত কতখানি মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে, সেটি। আবার ব্রিটিশরা বিদায় নিয়ে পাকিস্তান ও ভারত জন্ম নেওয়ার পরবর্তী সময়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে বাঙালির জন্য একটি শান্তিময় ভাবনা তাকে আকুলিত করেছিল এবং সেই একই সময়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন বিশ্বের মানচিত্রে ঠান্ডা লড়াই।
দ্বিতীয় পরিস্থিতিটি অনেকের মতো করে তাঁর মানসলোকে নাড়া দিয়েছিল এভাবে, বিশ্বে সোভিয়েতের সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ ও প্রভাবকে নিবৃত করতে মার্কিন নেতৃত্বে ন্যাটোর সামরিক জোট এবং সেটিকে প্রতিহত করতে সোভিয়েত নেতৃত্বে ওয়ারশ চুক্তি মুখোমুখি। আর এ থেকে আবারও এক মানবসভ্যতা ধ্বংসকারী সংঘাত হতে পারে।
ন্যাটো ও ওয়ারশ চুক্তিভুক্ত দেশগুলো ছিল পশ্চিম এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাইরে। কিন্তু ও অঞ্চলগুলোকে আপন প্রভাব বলয়ে আনতে দ্রুতই আমেরিকা ১৯৫৪ সালে জন্ম দিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এলাকার দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চুক্তি সংস্থা (ঝড়ঁঃয-ঊধংঃ অংরধ ঞৎবধঃু ঙৎমধহরুধঃরড়হ) বা সিয়াটো (ঝঊঅঞঙ) চুক্তি। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য।
আবার আমেরিকা কলকাঠি নেড়ে ১৯৫৫ সালে তুরস্ক, পাকিস্তান, ইরাক, যুক্তরাজ্য ও ইরান স্বাক্ষরিত 'বাগদাদ চুক্তি'র জন্ম দেয়। পশ্চিমা ধারার এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি পরিচিতি লাভ করে ঈবহঃৎধষ ঞৎবধঃু ঙৎমধহরুধঃরড়হ (ঈঊঘঞঙ) হিসেবে। এর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্প্রসারণ ঠেকানো।
সুতরাং যখন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটল এবং বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের জমিনে পা রাখলেন, তখন তিনি চাননি বাংলাদেশ বিশ্বে চলমান দু'শিবিরের মাঝে অশান্তিতে জড়িয়ে একটি নবীন রাষ্ট্র হিসেবে কারও শত্রুতে পরিণত হোক এবং তার উন্নয়ন যাত্রা ব্যাহত হোক। তাঁর ভাবনায় ছিল, তাঁর ভালোবাসার বাঙালির জীবনমান উন্নত করতে হলে, তাঁকে সে রকম একটি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে হবে, যার সাহায্যে বাংলাদেশ চলমান ঠান্ডা লড়াইয়ের বলয় থেকে দূরে থাকবে এবং সব দেশের কাছ থেকে বন্ধুত্বময় সহযোগিতা লাভ করবে।
আমরা যদি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তাঁর উচ্চারিত শব্দধ্বনি আরেকবার শুনি, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'- তাহলে বুঝতে পারি, মুক্তির সংগ্রামের আর স্বাধীনতা সংগ্রামের এ ডাকটি একটি সার্বিক ডাক। ভৌগোলিকভাবে স্বাধীনতা এনে দেওয়ার পরেও তো থেকে যায় অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম। আর সে সংগ্রাম তখনই সফল হতে পারে, যখন একটি নবীন রাষ্ট্র বহির্বিশ্বে কারও সঙ্গে কোনো সংঘাত ব্যাতিরেকেই এগিয়ে যেতে পারে, সক্ষমতা অর্জন করে।
বাংলাদেশ যেন কারও সঙ্গেই শত্রুতায় জড়িয়ে না পড়ে, তার জন্য শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধু প্রচেষ্টা জারি রেখেছিলেন। সে প্রচেষ্টা যেন বিঘ্নিত না হয়, সে কারণে তিনি সংবিধানে সেটির বৈধ রূপরেখা দিয়ে দিয়েছিলেন। তারই প্রকাশ আমরা লক্ষ করি আমাদের সংবিধানে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের দ্রুততম সময়ে তিনি বাঙালি জাতিকে আইনগত অধিকারের ভিত্তি পেতে সংবিধান প্রণয়নে হাত দেন এবং ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সেই পবিত্র দলিলটির কার্যকারিতা শুরু হয়।
সংবিধান প্রণয়নকালে তিনি বলেন, 'শাসনতন্ত্রহীন জাতি নোঙ্গরহীন নৌকার মতো।' তিনি চেয়েছিলেন তার জনতা একটি সঠিক ভিত্তির মাধমে নিজ দেশে অধিকারলাভে এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে একটি আইনগত দিকনির্দেশনা লাভ করুক। ফলে পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি বা মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেন এভাবে, 'সকলের সাথে বন্ধুত্ব। কারো সাথে শত্রুতা নয়।'
পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলো হলো-
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে।
১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।
২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে : 'বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্নিষ্ট অনুরূপ কোনো চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।'
বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত পথেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। তাঁর সুযোগ্য কন্যা, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর পিতার পথেই বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে সম্মান অর্জন করতে শিখিয়েছেন। তাঁরই বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন অগ্রগণ্য শান্তিকামী দেশ।
এটাই উজ্জ্বল, জাতিসংঘ এবং জোটনিরপেক্ষ সংস্থার মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। একটি নবীন এবং সে সময়ে একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হবার আশঙ্কা থেকেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, 'আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব।'
এটাই সত্য, তাঁর গৃহীত পররাষ্ট্রনীতির এ কৌশল তাঁর জীবদ্দশায় পুরোটা কাজে লাগেনি। সেটা ছিল একটি নির্মম বাস্তবতা। তাঁকে ১৯৭৫ সালের আগস্টে নির্মমভাবে হত্যার আগ দিন পর্যন্ত চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশ সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করেনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা চীন কেনইবা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে? কেনইবা পাকিস্তানের সহযোগী সৌদি আরব পাকিস্তানের কথা না শুনে একটি নবীন বাংলাদেশকে বিবেচনা করবে?
কিন্তু পরবর্তী ধাপে এটাই বাস্তবতা যে, তাঁর নির্দেশিত পথেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এগিয়েছে। সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চেয়েছিলেন বলেই তিনি ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধুর আলজেরিয়া সফর ছিল নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্মেলনেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়তে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এই সম্মেলন শেষে ঘোষণাপত্রে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলো তাদের সমর্থন দেয়।
বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেন, 'আমি শুরুতেই জাতীয়তাবাদী মুক্তি আন্দোলনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের যেসব গণমানুষ শহীদ হয়েছে তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম আজও অব্যাহত ভিয়েতনাম, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, নামিবিয়া, গিনি বিসাউসহ লাতিন আমেরিকা ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। তাই একটি বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়তে আমাদের সবাইকে এক হয়ে শোষিতের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।'
পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর বিদায়ী ভাষণেও বঙ্গবন্ধু বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, 'উপমহাদেশকে শান্তিপূর্ণ রাখতে হলে, যে কোনো সমস্যার মানবিক সমাধান খুঁজতে হবে। একটি সমৃদ্ধ বিশ্বের জন্য আমাদের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। আমি আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই এখানে এক হওয়ার জন্য। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সদস্য দেশগুলোর পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার প্রত্যয় দেশগুলোর সামাজিক সমৃদ্ধি আনতে পারে।'
তাঁর গৃহীত পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায়, ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুসলিম দেশগুলোর জোট ওআইসির সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন এবং বাংলাদেশকে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য করেছিলেন। বিস্ময়কর যে, সে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় লাহোরে। তা সত্ত্বেও তিনি লাহোরে গিয়ে ওআইসি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এখানে উল্লেখ না করলেই নয় যে, বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তায় সে সময়ে পাকিস্তান বাধ্য হয় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে। বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দেন যে, পাকিস্তান আগে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে তিনি লাহোর যেতে পারেন না, যাবেন না। প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর ওআইসিভুক্ত দেশগুলো থেকেও প্রচণ্ড চাপ পড়ে। ভুট্টো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর কয়েকজন ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে তাদের প্লেনে করেই লাহোর নিয়ে যান।
সেখানে তিনি বলেন, 'আমি বলতে চাই, সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। আমরা এই উপমহাদেশে এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যুগপৎ অবদান রাখার পথ উন্মুক্ত করেছি।'
দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর আহ্বান ছিল অকৃত্রিম। তাই তাঁর এ সফলতায় তাঁকে জুলিও কুরি শান্তি পদকে ভূষিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক জোট নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ এবং শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের নীতির ফলে বাংলাদেশ বিশ্বসভায় একটি ন্যায়ানুগ দেশের মর্যাদা লাভ করে। সবার প্রতি বন্ধুত্বের ভিত্তিতে বৈদেশিক নীতি ঘোষণা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, 'পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তি যে অর্থ ব্যয় করে মানুষ মারার অস্ত্র তৈরি করছে, সেই অর্থ গরিব দেশগুলোকে সাহায্য দিলে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে।' সেই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্সিয়াল কমিটির সভায় বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলন এবং বিশ্ব শান্তির সপক্ষে বঙ্গবন্ধুর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রদানের জন্য শান্তি পরিষদের মহাসচিব রমেশ চন্দ্র প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। পৃথিবীর ১৪০টি দেশের শান্তি পরিষদের ২০০ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে 'জুলিও কুরি' শান্তি পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
শান্তি পরিষদের ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৩ সালের মে মাসে এশিয়ান পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি কনফারেন্স অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিশ্ব শান্তি পরিষদ ঢাকায় দু'দিনব্যাপী এক সম্মেলনের আয়োজন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বিশ্ব শান্তি পরিষদের শাখাগুলোর বহু প্রতিনিধি এই সভায় যোগ দেন। এসব প্রতিনিধি ছাড়াও আপসো, পিএলও, এএমসি সোয়াপো ইত্যাদি সংস্থার অনেক প্রতিনিধি উপস্থিত হয়েছিলেন। অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন ২৩ মে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের উত্তর প্লাজায় উন্মুক্ত চত্বরে সুসজ্জিত প্যান্ডেলে বিশ্ব শান্তি পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের বিশাল সমাবেশে বিশ্ব শান্তি পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশ চন্দ্র বঙ্গবন্ধুকে 'জুলিও কুরি' শান্তি পদক প্রদান করেন। এরপর তিনি বলেন, 'শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।'
সে ধ্বনিটি এখনও চলমান। এ বছর তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতেও তিনি সারাবিশ্বে মানবিক মুক্তির স্বপ্নে বিভোর মানুষের আর নানা জাতির আশার দিশা। আজও তিনি বিশ্বে শোষিত মানুষের বন্ধু।
লেখক

কবি
কথাসাহিত্যিক