পালিত হচ্ছে মুজিব জন্মশতবর্ষ। এক বছর ধরে পালিত হবে এই জন্মদিন। চারদিক থেকে শিশুরা পাবে শিক্ষার দিক। ওরা বুঝবে বড় হওয়ার জন্য নিজেদেরকে কত চিন্তায় আলোকিত করতে হয়। বাংলাদেশ সরকার এই দিনকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। একটি জন্ম তারিখ লক্ষ শিশুর গড়ে ওঠার প্রতীকী দিন। স্বাধীনতার স্থপতির ত্যাগ, সাহস এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার শিক্ষা নিয়ে বড় হবে শিশুরা। তৈরি হবে দেশের প্রকৃত ইতিহাস জেনে। অঙ্গীকারবদ্ধ হবে সেই ইতিহাস চেতনাকে সঠিকভাবে রক্ষা করার। দেশ, জাতি সংক্রান্ত ভাবনায় জাতির পিতার জন্মদিন এ দেশের শিশুদের বেড়ে ওঠার বিকাশে একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ দিন।
বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রাকৃতিক লীলা সৌন্দর্যের গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায়। গোপালগঞ্জ জেলার এই গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মধুমতি নদী। শৈশব থেকেই এই গ্রামের প্রকৃতি, গ্রামের নিরন্ন হতদরিদ্র মানুষদের তিনি চিনতে শুরু করেছিলেন। স্বদেশকে গৌরবের জায়গায় তুলে আনার সাধনা তিনি পেয়েছিলেন দিগন্তবিথারী প্রকৃতির মহিমায়। বুঝেছিলেন স্বদেশ মানে শুধু ভূখণ্ড নয়, স্বদেশকে গৌরব ও মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরতে হয়। আর দেশের মানুষকে বেঁচে থাকার বড় পরিসর দিতে হয়। তার অধিকার আদায়ের লড়াইকে সমুন্নত রাখতে হয়। মানুষের জীবনে দারিদ্র্য শেষ কথা নয়। মানুষ দরিদ্র হতে পারে, কিন্তু মানবিক মর্যাদার দিক থেকে খাটো হতে পারে না। মানুষকে মানবাধিকার দিতে হবে। তাকে পূর্ণ মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সে জন্য ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রয়োজন। অধিকারভিত্তিক সমাজ দরকার। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সমন্বিত জ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা দরকার। বঙ্গবন্ধু সারাজীবন দেশের মঙ্গল ও কল্যাণের পক্ষে সচেতন ছিলেন।
শৈশব থেকেই তাঁর মানস চেতনায় দুটো জিনিস খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এক. মানুষের প্রতি ভালোবাসা। দুই. অধিকার আদায়ের সচেতনতা। স্কুল থেকে ফেরার পথে তিনি শীতে কাঁপতে থাকা বুড়োকে গায়ের চাদর খুলে দিয়েছিলেন।
বর্ষাকালে গরিব বন্ধুটি ভিজে স্কুলে এসেছিল দেখে নিজের নতুন ছাতাটি বন্ধুকে দিয়ে দিয়েছিলেন। শৈশব থেকে এভাবে নিজস্ব আলোকে মানুষের অবস্থা বুঝতে শিখেছিলেন। মানুষের নূ্যনতম প্রয়োজনকে সম্মান করতে শিখেছিলেন। আজকের বাংলাদেশের শিশুদের এই মানবিক বোধসম্পন্ন হয়ে বড় হয়ে ওঠা খুব জরুরি। তাই মহৎ মানুষের জীবনটিকে সামনে রেখে তাদের নৈতিকবোধে গড়ে তোলা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৪ জানুয়ারি রমনা রেসকোর্সে যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানে উল্লেখ করেছিলেন : বাংলার মানুষ বিশেষ করে ছাত্র এবং তরুণ সম্প্রদায়কে আমাদের ইতিহাস এবং অতীত জানতে হবে। বাংলার যে ছেলে তার অতীত বংশধরদের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে না সে ছেলে সত্যিকারের বাঙালি হতে পারে না। আজও বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস রচিত হয়নি। নতুন করে বাঙালির ইতিহাস রচনা করার জন্য দেশের শিক্ষাবিদদের প্রতি আমি আহ্বান জানাচ্ছি। এই ইতিহাস পাঠ করে যেন বাংলার ভবিষ্যৎ বংশধররা তাদের গৌরবময় অতীতের পরিচয় পেয়ে গর্ব অনুভব করতে পারে এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে পড়তেন তিনি। একবার স্কুল পরিদর্শনে আসেন শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ মন্ত্রী দু'জন পরিদর্শন শেষে চলে যাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু কয়েকজন ছাত্রসহ তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। বলেন, বৃষ্টির সময় স্কুলের হোস্টেলের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। ফলে ছাত্রদের অসুবিধা হয়। পড়াশোনায় ব্যাঘাত হয়। তারা দু'জনই স্কুলছাত্রের সাহসী ভূমিকা দেখে খুশি হন। অধিকার আদায়ের জন্য দৃঢ়চিত্ত হওয়া যে জরুরি তা তিনি সেই বয়সে বুঝেছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই সাহসকে অভিনন্দন জানান। নিজস্ব তহবিল থেকে হোস্টেলের ছাদ মেরামতের প্রয়োজনীয় টাকা দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। দু'জন মানুষই স্কুলের ছাত্রের ব্যক্তিত্ব দেখে মুগ্ধ হন। বুঝতে পারেন যে অধিকার আদায়ের পক্ষে নির্ভীক, সে অনেক দূর যাবে।
১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, 'আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাহারা বিশ্বের সকল জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ নিয়া বাস করিবার জন্য আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন।
আমি জানি, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়িয়া তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আমাদের এই অঙ্গীকারের সহিত শহীদানের বিদেহী আত্মাও মিলিত হইবেন। ইহা বিশেষ আনন্দের ব্যাপার যে, স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সক্রিয় যোদ্ধা সভাপতি থাকাকালেই বাংলাদেশকে এই পরিষদের অন্তর্ভুক্ত করিয়া নেওয়া হইয়াছে।'
তাঁর সাহস, শিক্ষা, জ্ঞানবুদ্ধি, মেধা দিয়ে টুঙ্গিপাড়ার মতো বাংলাদেশের একটি গ্রাম থেকে বিশ্বের সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছেছিলেন, একটি স্বাধীন দেশের স্থপতি এবং জাতির পিতার গৌরব নিয়ে। তাঁর জন্মদিন শিশুদের জন্য জাতীয় শিশু দিবস। এটি শুধু একটি দিন মাত্র নয়। সেই মানুষটিকে জানতে হবে শিশুদেরকে। জানতে হবে কীভাবে তিনি দেশ ও দেশের মানুষকে শৈশব থেকে জানতে শিখেছিলেন।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে শিশুদের অবস্থা নিদারুণভাবে প্রান্তিক। এই সমাজে যে হারে শিশুদের প্রতি অমানবিক নির্যাতন করা হয় তাতে মনে হয় এই সমাজ মনুষ্যত্ব বোধের বাইরে চলে গেছে। মনুষ্যত্ব বোধহীন ব্যক্তিকে কঠোর শাস্তি দিয়ে সমাজকে মানবিক চেতনায় পূর্ণ করতে হবে।
আমাদের দায়িত্ব ঐক্যবদ্ধভাবে শিশুদের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা। যে যে অবস্থানে আছেন সে অবস্থা থেকেই। অতীতে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে বড় অর্জন করেছি। ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় গৌরব। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের মর্যাদার অর্জন। আমরা সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হই। বঙ্গবন্ধু মুক্তির সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে। পৃথিবীর ইতিহাসে তুলনাহীন এই ভাষণ। তার জন্মদিনকে সামনে রেখে দেশের প্রতিটি মানুষকেই অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে বলতে হবে, মানবজাতির সর্বোত্তম যা কিছু দেবার আছে, শিশুরাই তা পাওয়ার যোগ্য। শিশুরা যেন সরকার এবং দেশের মানুষের কাছ থেকে অযত্ন-অবহেলার শিকার না হয়। তাদেরকে গড়ে তোলার দায়িত্ব প্রত্যেক মানুষের। ব্যক্তির অঙ্গীকার শিশুদের পক্ষে কোটি কণ্ঠে উচ্চারিত হোক।
জয়তু ১৭ মার্চ। শিশুদের মাথার ওপর এই দিনটি নীলাকাশ হয়ে বিরাজ করুক।
লেখক
কথাসাহিত্যিক