কাশ্মীর কি ভারতের 'পশ্চিম তীর' হবে

 প্রতিবেশী

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. তারেক শামসুর রেহমান

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর কি শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের 'পশ্চিম তীর'-এর মতো পরিস্থিতি বরণ করতে যাচ্ছে? গত ৫ আগস্ট ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদটি বাতিল হওয়ায় জম্মু ও কাশ্মীর যে 'বিশেষ সুবিধা' ভোগ করত, তা আর বহাল নেই। উপরন্তু জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের মর্যাদাও হারিয়েছে। কিন্তু গত ৫ আগস্টের পর দুই সপ্তাহ পার হয়েছে। কিন্তু কাশ্মীরে অশান্তি বেড়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও যেসব খবর পশ্চিমা সংবাদপত্রে ছাপা হচ্ছে, তা মোদি সরকারের জন্য কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনছে না। জম্মু ও কাশ্মীরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, কোনো কোনো পর্যবেক্ষক এর সঙ্গে ফিলিস্তিনের 'ওয়েস্ট ব্যাংক' বা 'পশ্চিম তীর'-এর পরিস্থিতিকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন (ব্লুমবার্গ, ৫ আগস্ট, ফরেন পলিসি. ৮ আগস্ট)। পাঠক মাত্রেই 'পশ্চিম তীর' সম্পর্কে একটি ধারণা পেতে পারেন।

মাত্র ৫৬৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে পশ্চিম ব্যাংক বা পশ্চিম তীর। ইসরায়েল ও জর্ডানের মাঝখানে পশ্চিম তীর অবস্থিত। লোকসংখ্যা মাত্র ৩৪ লাখ। একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এই পশ্চিম তীর ও গাজা এলাকা নিয়ে। গাজা এলাকার আয়তন কম, মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার। গাজা এলাকার দক্ষিণ-পশ্চিমে ১১ কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে মিসরীয় সীমান্ত আর পূর্ব-উত্তরাঞ্চলের ৫১ কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে ইসরায়েলি সীমান্ত। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েলের ছয় দিনের যুদ্ধে পুরো এলাকাটি ইসরায়েল দখল করে নেয়। পরে অসলো চুক্তি অনুযায়ী (১৯৯৩) পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ইতিমধ্যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মাঝে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে (প্রেসিডেন্ট) একটি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হলেও, গাজার নিয়ন্ত্রণভার চলে গেছে চরমপন্থি সংগঠন হামাসের হাতে। গাজায় মাহমুদ আব্বাসের কর্তৃত্ব তেমন একটা নেই বললেই চলে। গাজায় হামাসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এই এলাকা বারবার ইসরায়েলি আগ্রাসনের সম্মুখীন হয়েছে। সর্বশেষ কোরবানির ঈদের সময় জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদেও ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা (১১ আগস্ট)। বলা ভালো, জেরুজালেম নগরী পশ্চিম তীরে অবস্থিত। অসলো চুক্তি অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের ১১ ভাগ এলাকা (যা 'এ' এলাকা নামে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে) ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

২৮ ভাগ এলাকা ('বি' এলাকা), যা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ইসরায়েলের যৌথ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যৌথ নিয়ন্ত্রণে সামরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এর বাইরে রয়েছে 'সি' এলাকা (৬১ ভাগ) পরিপূর্ণভাবে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বোঝাই যায়, নামে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অস্তিত্ব থাকলেও, পশ্চিম তীরে (পূর্ব জেরুজালেমসহ) ইসরায়েলের কর্তৃত্ব ও প্রভাব অনেক বেশি। বিশ্বের ১৬৪টি দেশ পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি কর্তৃত্বকে 'অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকা' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। স্মরণ থাকতে পারে, ইসরায়েল ইতিমধ্যে জেরুজালেমে তাদের রাজধানী স্থানান্তর করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে সেখানে তাদের দূতাবাস স্থানান্তর করেছে, যা বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। পশ্চিম তীরের মানচিত্রের দিকে যদি তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে, 'তথাকথিত একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র' কীভাবে ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল। চারদিক থেকে ঘিরে রয়েছে ইসরায়েল।

২০০৭ সালের পর থেকেই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দু'ভাগে ভাগ হয়ে আছে- ফাতাহ নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিম তীর, মাহমুদ আব্বাস এদের প্রতিনিধি আর হামাস নিয়ন্ত্রণ করে গাজা। এখন কাশ্মীরের পরিস্থিতি আগামীতে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে মোদি-অমিত শাহের এই সিদ্ধান্তের পেছনে ইসরায়েলের একটি ভূমিকা থাকতে পারে! বালাকোটের ঘটনার (জইস-ই-মোহাম্মদের জনৈক আত্মঘাতী বোমারুর হামলায় ৪০ জন ভারতীয় জওয়ানের মৃত্যু) পরপরই মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক লিখেছিলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টিতে ইসরায়েলের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে একটা প্রশ্ন থাকলই যে, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের ব্যাপারে ইসরায়েলের কোনো পরামর্শ মোদি সরকার নিয়েছিল কি-না? যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, জম্মু ও কাশ্মীরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে তিনি রাজ্যের স্ট্যাটাস পুনর্বহাল করবেন। তবে এই সিদ্ধান্ত ভারতের অন্যত্র একটা 'ভুল মেসেজ' পৌঁছে দিতে পারে। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ও ৩৫-এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীর আলাদা মর্যাদা পেত। এ ধরনের বিশেষ সুবিধা (স্থানীয়দের চাকরি-শিক্ষা থেকে সুবিধা, স্থায়ী নাগরিকের মর্যাদা ইত্যাদি) শুধু জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রেই যে প্রযোজ্য ছিল তেমনটি নয়, বেশ কিছু রাজ্য এখনও সাংবিধানিকভাবে এ ধরনের বিশেষ সুবিধা ভোগ করে থাকে।


৩৭১-এ ও ৩৭১-জি অনুচ্ছেদমূলে উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থানীয় জনগোষ্ঠী অনেকটা কাশ্মীরিদের মতো একই ধরনের সুবিধা পায়। পার্বত্য এলাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জমির ওপর, বন ও খনিজসম্পদের ওপর ব্যক্তিগত অধিকার স্বীকৃত। তাদের কোনো কর দিতে হয় না। চাকরির ক্ষেত্রেও রয়েছে অগ্রাধিকার। এই অঞ্চলে সংবিধানের অনেক অনুচ্ছেদ কার্যকর নয়। সেখানে দেশীয় আইন, ঐতিহ্য অনুযায়ী অনেক কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। সম্পত্তি ও জমির হস্তান্তরও নিজস্ব নিয়মে চলে। সংবিধানের ৩৬৮ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে ৩৭১ নম্বর অনুচ্ছেদে ৯টি রাজ্যকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কাশ্মীরের বাইরে মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও অন্ধ্রপ্রদেশ রয়েছে সেই তালিকায়। ৩৭১-জি অনুচ্ছেদে কিংবা ২৪৪-এ অনুচ্ছেদে আসাম বেশ কিছু সুবিধা পেয়ে থাকে। ৩৭১-ডি ও ই অনুচ্ছেদে অন্ধ্রপ্রদেশে শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণসহ কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে রাষ্ট্রপতির হাতে। ৩৭১-এইচ অনুচ্ছেদমতে, অরুণাচল রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত উল্টে দিতে পারেন কেন্দ্র থেকে নিযুক্ত রাজ্যপাল। সুতরাং যেসব অঞ্চল বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে, তাদের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে নাগাল্যান্ড, মিজোরামে বিক্ষোভ হয়েছে এবং স্থানীয় নেতারা কঠোর হুমকি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, জম্মু ও কাশ্মীর দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় অনেক রাজ্যেই এর প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দার্জিলিংয়েও পৃথক রাজ্য গঠনের দাবি প্রকাশ্যে এসেছে। দার্জিলিংয়ের পৃথক রাজ্য গড়ার নেতা গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিমল গুরং আত্মগোপনস্থল থেকে এক বার্তায় দার্জিলিংয়েও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এটা একটা অশনিসংকেত। অন্যান্য রাজ্য থেকেও এ ধরনের দাবি উঠতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন্দ্রের বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার কি শুধু 'মিশন কাশ্মীর' নিয়েই ক্ষান্ত থাকবে? নাকি অন্যান্য অঞ্চলের ব্যাপারে সংবিধানে যে সুযোগ-সুবিধা ও বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তা খর্ব করারও উদ্যোগ নেবে? কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে জন-অসন্তোষ গড়ে উঠছে, তা যদি কেন্দ্র বিবেচনায় নেয়, তাহলে সংবিধানে অন্যান্য ও পশ্চাৎপদ রাজ্যের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থে সংবিধানের রক্ষাকবচগুলো বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। তবে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের ব্যাপারে এই সিদ্ধান্ত মুসলমানবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবসম্পন্ন হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, বরং ধর্মীয়ভাবে তারা খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী।

এটা ঠিক, 'মিশন কাশ্মীর' এনডিএ সরকারকে একটি সংকটে ফেলে দিয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? ভারত অন্য কারও মধ্যস্থতা মানবে না। একমাত্র সমাধান হতে পারে কাশ্মীরি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করা। লাদাখ আলাদা হয়ে গেলেও তা আর জম্মু ও কাশ্মীরের সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হচ্ছে না। একটি 'পশ্চিম তীর' মডেল এখানে কাজ করতে পারে। দুই পতাকার অস্তিত্ব (কাশ্মীরের জন্য আলাদা পতাকা ছিল) আর এখন থাকবে না। 'দিল্লি মডেল' অনুসরণ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী) নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের হাতে থাকতে পারে। বিনিয়োগে উন্মুক্ত হওয়ার স্বার্থে স্থানীয় কাশ্মীরি নাগরিকরা শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে কিছু সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন। তবে কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের সঙ্গে যে কোনো ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা কম। অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তান এত দুর্বল যে, এই দেশটির পক্ষে কোনোক্রমেই যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব না। ফলে 'পশ্চিম তীর' মডেলকে সামনে রেখে জম্মু ও কাশ্মীর প্রশ্নে যদি একটি সমঝোতা হয়, আমি তাতে অবাক হবো না।

অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক
[email protected]