জয়শংকর কী বার্তা দিয়ে গেলেন

বাংলাদেশ-ভারত

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. আকমল হোসেন

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শংকর তার মেয়াদের শুরুতে বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। নরেন্দ্র মোদি প্রথম সরকার গঠন করে তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে (প্রয়াত) ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশের ব্যাপারে নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে। অন্যদিকে বিএনপি দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০১ সালে সরকার গঠন করলে অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার তাদের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অব্যাহত রাখার ইচ্ছা জানিয়ে।

ভারতের বিজেপি সরকারের বাংলাদেশ নীতি প্রণয়নে জয়শংকরের অংশগ্রহণ নতুন নয়। ২০১৫ সালে সচিব হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ সফর করেছেন। সে সময় তিনি পররাষ্ট্র নীতিনির্ধারকদের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন। বিজেপির নতুন সরকারে মন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার সঙ্গে গুজরাট থেকে রাজ্যসভায় সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কারণে তার রাজনৈতিক পরিচিতির সূত্রপাত। এখন তিনি নিজেই একজন নীতিনির্ধারক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবেন। একজন পেশাদার কূটনীতিকের মাঠের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একজন রাজনীতিবিদের চিন্তার মিশ্রণ তার দায়িত্বের ভিন্ন গুরুত্ব তুলে ধরবে, আশা করা যায়। পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে তিনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং কূটনীতি ভালোভাবেই অবগত হওয়ায় বর্তমান দায়িত্বে তিনি দক্ষতা দেখাবেন, প্রত্যাশা করা যায়।

বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি তার প্রতিপক্ষ ড. আব্দুল মোমেনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি অক্টোবরে দিল্লি সফর করার জন্য তার কাছে নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেছেন। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনায় যেসব বিষয় আলোচিত হয়েছে, তার প্রায় সবই পুরনো ইস্যু। অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কানেকটিভিটির মতো বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করেছেন। এসবই আগে অনুষ্ঠিত আলোচনার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু পুরনো কোনো সমস্যার সমাধানে কী অগ্রগতি হলো, তা জানা যায়নি। নতুন বিষয় হিসেবে ভারতীয় ঋণচুক্তির আওতায় সমরাস্ত্র কেনা, সমুদ্রে মহীসোপান নিয়ে সমস্যা, এসব আলোচ্যসূচিতে ছিল।

দুই মন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে 'শুভ সূচনা, 'উষ্ণ আলোচনা', 'অনেক বিষয়ে ঐকমত্য' জাতীয় কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। তবে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপারে ভারতের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন এই বলে- বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের জাতীয় স্বার্থে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষকে নিরাপদ, দ্রুত ও স্থায়ী প্রত্যাবাসন করার ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছি। এ ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানরত এ জনগোষ্ঠীর জন্য অধিকতর সাহায্য দেওয়া এবং রাখাইন রাজ্যের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্য ভারতের প্রস্তুতির কথা বলেছেন। বিজেপি সরকারের রোহিঙ্গা সম্পর্কীয় নীতি শুরুতে 'সন্ত্রাসবাদ'ভীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। রোহিঙ্গা জনগণের মৌলিক দাবির ব্যাপারে ভারতের নির্লিপ্ত মনোভাব বাংলাদেশকে হতাশ করলেও ভারত সাহায্য দেওয়ার মধ্যেই তার ভূমিকা সীমাবদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু মিয়ানমারের ব্যাপারে চীন যখন তার পক্ষপাত বদলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে ভূমিকা পালনে এগিয়ে এসেছে, ভারত নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর চীনের প্রভাব বাড়াতে চায়নি বলেই মনে হয়।

এবার ভারত ও বাংলাদেশ অভিন্ন ৫৪টি নদী নিয়ে দু'পক্ষের জন্য লাভজনক হবে এমন এক সমাধানের পক্ষে একমত হয়েছে। নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের জটিলতায় অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সমস্যার নিগূঢ় সংযোগ আছে। স্বাধীনতার পরপরই গঙ্গা নদী নিয়ে যথেষ্ট উত্তাপ ছড়িয়েছিল, যার অবসান হয়েছে ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি করে। অবশ্য সে মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে কয়েক বছরের মধ্যেই। এ ছাড়া আরও যে ৫৩টি নদী আছে, তাদের মধ্যে সাতটি নদী- মনু, মুহুরি, খোয়াই, ফেনী, গোমতী, ধরলা, দুধকুমার নিয়ে বিভিন্ন সময় দু'দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে কোনো ফল ছাড়া। দীর্ঘদিন বিরতির পর এ মাসের প্রথমদিকে দু'দেশের পানিসম্পদ সচিব পর্যায়ে এ নদীগুলোর পানি ভাগাভাগি বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি করা বিষয়ে দু'দেশ চুক্তি করার ব্যাপারে ইচ্ছা জানিয়েও ভারতীয় অসম্মতির কারণে কোনো চুক্তি করতে পারেনি। চুক্তির খসড়া করা হলেও তা স্বাক্ষর করা হয়নি। ভারতের দিক থেকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তি করার ব্যাপারে আশ্বাসের পর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এবারও চুক্তি বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পুরান

কথাই উচ্চারণ করেছেন। অথচ অন্য নদীগুলোর তুলনায় তিস্তার পানি ভাগাভাগির জন্য সমঝোতা করা অনেক সহজ এ অর্থে যে, এ বিষয়ে একটা ফর্মুলা তৈরি করা হয়েছিল।

বিজেপি সরকারের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক এজেন্ডার অন্যতম দিক হচ্ছে, আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা। দীর্ঘকাল ধরে 'অবৈধ বাংলাদেশি' বিষয়টি রাজ্য-রাজনীতিকে সরগরম করে রেখেছে। বাঙালি তথা 'বাংলাদেশি তথা মুসলমান বাঙালি'কে চিহ্নিত করে তাদের বিতাড়ন করার দাবি অনেক দিন ধরেই তোলা হচ্ছে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার এনআরসির যে খসড়া তৈরি করেছে, তা আগামী ৩০ আগস্ট চূড়ান্ত করা হবে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলেছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তাই মনে করেন। অথচ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি দিল্লি সফরে গেলে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এনআরসি বিষয়টি ঊত্থাপন করেছিলেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পক্ষ কী বলেছে, পরিস্কার জানা না গেলেও বৈঠক শেষে দু'পক্ষ কোনো যৌথ বিবৃতি প্রচার করেনি। এটা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ বিষয়টি তার জন্য উদ্বেগজনক বলেই মনে করে। যতক্ষণ পর্যন্ত এনআরসি অনুযায়ী 'অবৈধ' অধিবাসী ইস্যুটি ভারত অভ্যন্তরীণভাবে সমাধান করবে, ততক্ষণ বাংলাদেশের কিছু করার নেই। কিন্তু তাদের চিহ্নিত করে সীমান্ত লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের দিকে যদি ঠেলে দেওয়া হয়, তা গুরুতর ফল বয়ে আনবে। তাই 'অভ্যন্তরীণ' বলে বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়া বন্ধুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়