ডেঙ্গু, ক্যান্সার ও পলিথিন

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. এমএ হাসনাত

বর্তমান পটভূমিতে আয়েশি জীবনকে সহজ করে তুলছে পলিথিন ও প্লাস্টিকের সহজলভ্য ব্যবহার। আমরা ছোটকালে বাজারে যেতাম পাটের ব্যাগ ও ডুলা নিয়ে। এখন আর সেই দিন নেই। খালি হাতে বাজারে যাই; সঙ্গে নিয়ে আসি পলিথিনভর্তি বাজার। আগে মানুষ কোথাও গেলে দামি বোতল দিয়ে পানি নিয়ে যেত। এখন আর তা লাগে না। কারণ সবখানে প্লাস্টিকের বোতলভর্তি পানি সহজলভ্য। তাহলে একবার ভাবুন তো, ১৬ কোটি মানুষের দেশে প্রতিদিন কী সংখ্যক পলিথিন ব্যাগ আর প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার হচ্ছে! আমাদের দেশে প্রতিদিন কী সংখ্যক পলিব্যাগ আর প্লাস্টিকের বোতল বাজারে আসছে, আর তা আমরা পরিবেশে ফেলছি তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। নেই কেউ এ বিষয় নিয়ে ভাবার। প্রতিদিন আমাদের শহর-বন্দর-গ্রাম সবখানে দেদার পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার হচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীন। এগুলো কেউ রিসাইকেল করে না। সবাই তা নিক্ষেপ করে পরিবেশে নিশ্চিন্তে। কেউ এর পরিণাম নিয়ে ভাবেও না। প্লাস্টিক এমন এক রাসায়নিক পদার্থ, যা পরিবেশে পচতে অথবা কারখানায় পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করতে প্রচুর সময় লাগে। তাই একে 'অপচ্য পদার্থ' হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এগুলো পরিবেশে সহজে পচে না (পচতে ৪০০ বছর লাগে) বলে রয়ে যায় অবিকৃত অবস্থায় দীর্ঘকাল। যুক্তরাজ্যের প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড থম্পসন ২০০৪ সালে গবেষণার মাধ্যমে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলের সাগরের পানিতে প্রচুর প্লাস্টিকের মাইক্রো বর্জ্য খুঁজে পান। যেসব প্লাস্টিক বর্জ্যের আকার ২ মাইক্রোমিটার থেকে ৫ মিমির মধ্যে, সেসব প্লাস্টিক বর্জ্যকে মাইক্রো বর্জ্য বলে। মেসো (মাঝারি) ও ম্যাক্রো (বড়) বর্জ্যকে ভাঙন ও পেষণের মাধ্যমে প্লাস্টিক থেকে মাইক্রো বর্জ্যে পরিণত হয়। অতি ক্ষুদ্র আকারের কারণে এগুলো দ্রুত পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। মাইক্রো বর্জ্যের ক্ষুদ্র আকারের কারণে জলজ জীব এগুলো গ্রহণ করে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, লবণের মধ্যে মাইক্রো প্লাস্টিকের উপস্থিতি আছে। লবণ পাওয়া যায় সাগরের পানি থেকে। সাগরে প্লাস্টিক আসে নদী থেকে। আর নদীতে প্লাস্টিক ফেলি আমরা। মাইক্রো প্লাস্টিকে থাকতে পারে র‌্যাডিকেল, যা সহজেই মানবদেহে তৈরি করতে পারে ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগ। পক্ষান্তরে প্লাস্টিক পদার্থে সাধারণত প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক রঞ্জক মেশানো হয়। এসব রঞ্জক কারসিনজেন (ক্যান্সার সেল তৈরিকারক পদার্থ) হিসেবে কাজ করে ও এন্ডোক্রিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লোরিনযুক্ত প্লাস্টিক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে, যা ভূগর্ভস্থ পানি ও ভূপৃষ্ঠীয় পানির সঙ্গে মিশে যায়। অতঃপর ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠীয় পানি গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তা আমাদের খাদ্যচক্রে ঢুকে পড়ে। আর এভাবেই পানি গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত আমরা ক্ষতিগ্রস্তত হচ্ছি। ২০০৪ সালে এক গবেষণার মাধ্যমে গবেষকরা জানান, সি-গালের পেটে ৩০ খণ্ডের সমপরিমাণ প্লাস্টিক পাওয়া যায়। প্লাস্টিক পদার্থ থেকে সাধারণত বিষাক্ত রাসায়নিক পলিক্লোরিনেটেড বায়োফেনল নির্গত হয়। এই বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ প্রাণিদেহের বিভিন্ন টিস্যুর ক্ষতি করে। পাখি যখন প্লাস্টিক পদার্থ গ্রহণ করে তখন তাদের পেটেও বিষাক্ত রাসায়নিক পলিক্লোরিনেটেড বায়োফেনল নির্গত হয়। এ জন্য তাদের দেহের টিস্যু ধ্বংস হয়। তাদের দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।



আমাদের দেশে পথ-মাঠ-ঘাট পলিথিন ও প্লাস্টিকে সয়লাব। ঢাকা শহর প্লাস্টিক বর্জ্যে প্রায় ঢাকা পড়ে যাওয়ার উপক্রম। তাই প্লাস্টিক, পলিথিনে নাকাল হয়ে অনেক সময় এগুলো এক জায়গায় জমা করে খোলা জায়গায় পুড়িয়ে ফেলা হয়। খোলা আকাশের নিচে পলিথিন ও প্লাস্টিক পুড়ে ১২০-১৩০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা উৎপন্ন হয়। এতে কিন্তু পলিথিন বা প্লাস্টিক সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয় না বরং ডাইঅক্সিন জাতীয় এক ধরনের বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি হয়। এগুলোকে বিনষ্ট করতে হলে কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরের তাপমাত্রায় বিশেষ ফার্নেসে পোড়াতে হয়। ডাইঅক্সিন জাতীয় গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ফুসফুস ও ত্বকে ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া পলিথিন পোড়ানোর সময় হাইড্রোজেন সায়ানাইড নামক এক ধরনের বিষাক্ত গ্যাস

সৃষ্টির কারণে দহনকারী ব্যক্তি মৃত্যুর দ্বারে পর্যন্ত পৌঁছে যান। এটা স্পষ্ট, প্লাস্টিক আমাদের জীবনকে সহজ করলেও পরিণামে মানুষসহ জল-স্থল-আকাশের সব প্রাণীকেই আস্তে আস্তে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।

ঢাকার কাছে সবচেয়ে বড় শহর কলকাতা। অথচ সেখানে ঢাকার মতো ডেঙ্গুর প্রকোপ নেই। তার প্রধান কারণ হচ্ছে, ঢাকার যত্রতত্র প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলার কারণে পানি নিস্কাশনের পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ঢাকার অলিগলিতে জমে যাচ্ছে পানি। সেই আবদ্ধ পানিতেই রয়েছে মশাসহ বিভিন্ন জটিল রোগের জীবাণু বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ। উন্নত বিশ্বসহ আশপাশের দেশগুলোও এ বিষয়ে সচেতন। কিন্তু আমাদের যেন কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাদের দেশের পরিবেশ অধিদপ্তর, পরিবেশ মন্ত্রণালয়; কারোরই যেন কিছু করার নেই। চীনের ইয়াংসি নদীর পর সবচেয়ে যে নদী সাগরে প্লাস্টিক ধুয়ে নিয়ে যায় সেটি হলো, পদ্মা-মেঘনার মিলিত স্রোত। সম্প্র্রতি বুড়িগঙ্গা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, এর তলদেশ পুরোপুরি পলিথিন আর প্লাস্টিকের আস্তরণে ভর্তি। ফলে এখানে আস্তে আস্তে তৈরি হচ্ছে মাইক্রো প্লাস্টিকসহ অন্যান্য কেমিক্যাল ও জীবাণু, যা গিয়ে পড়ছে মেঘনা নদীতে। দূষণের কারণে বুড়িগঙ্গা নদীতে শীতকালে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ ৩ মি.গ্রা-লি.র নিচে থাকায় সেখানে মাছসহ কোনো জলজ প্রাণী থাকার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আমরা মেঘনা নদীর মাছ তো খাচ্ছি। এভাবে দূষণ চলতে থাকলে একসময় হয়তো মেঘনা নদীও বিষাক্ত হয়ে যাবে। তখন আমরা কী করব?

কীভাবে প্লাস্টিক-পলিথিন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি জাপানের পলিসি থেকে। জাপানিরা বিশেষ স্থানে প্লাস্টিক দ্রব্য জমা করে এবং তাদের মিউনিসিপ্যালিটি সপ্তাহের বিশেষ দিনে তা সংগ্রহ করে ফার্নেসে পুড়িয়ে ফেলে অথবা রিসাইকেল করে। সেখানে কোনো শপিংমল কোনো ক্রেতাকে ফ্রিতে পলিথিন দেয় না। আলাদা কিনতে হয়। বিক্রয়লব্ধ অর্থ তারা মিউনিসিপ্যালিটির বিশেষ অ্যাকাউন্টে জমা দেয়। মিউনিসিপ্যালিটি সেই অর্থ দিয়েই প্লাস্টিক-পলিথিন রিসাইকেল করে, যেন তা পরিবেশে প্রবেশ করতে না পারে। ইউরোপ-আমেরিকা বিষয়টি মাথায় রেখে জৈব যৌগ মিশিয়ে পচনশীল পলিথিন তৈরি করছে। ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব দ্বারা আধুনিক এসব প্লাস্টিক ও পলিথিন পচে যায়, যা পরিবেশবান্ধব। এভাবে তারা প্লাস্টিক ও পলিথিনের বিষাক্ত প্রভাব কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের মুম্বাই ও পুনে শহরে ৩ মাস যাবৎ জনগণকে বাজারে, শপিং মলে পলিথিন ও প্লাস্টিক জাতীয় সামগ্রী (ব্যাগ, বোতল) ব্যবহার না করার জন্য জনগণকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর পর আইন করে সাধারণ কাজে পলিথিন ও প্লাস্টিক জাতীয় সামগ্রীর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই পরিবেশজনিত এই বিপদ থেকে মুক্তি পেতে আমাদের ইচ্ছা থাকা দরকার। আসুন, আমরা আবার সোনালি দিনগুলোতে ফিরে যাই। পলিথিনের পরিবর্তে আমরা সোনালি আঁশ (পাট) ও কাগজের ব্যাগ ব্যবহার করি, পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনি। নিজে বাসযোগ্য পরিবেশে থাকি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ রেখে যাই।
 
অধ্যাপক, রসায়ন বিভাগ, শাবিপ্রবি
[email protected]