ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, জনসম্পৃক্ত রাজনীতি

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার মতো রাজনীতিতেও জোয়ার-ভাটা আছে। জোয়ারের সময় তুমুল জোয়ারে যেমন উত্তাল থাকে সমুদ্র, রাজনীতিতেও জোয়ারের সময় উত্তাল হয়ে ওঠে মাঠ, ময়দান ও মিডিয়া। আর ভাটার সময় রাজনীতিও সমুদ্রের মতো অচল, উত্তাপহীন, গর্জনহীন ও মনমরা। এটা হচ্ছে দলীয় রাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতির হালহকিকত। কেননা এ দেশের বেশিরভাগ মানুষ রাজনীতি বলতে দলীয় রাজনীতি, জাতীয় রাজনীতি ও আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির রাজনীতিকেই বোঝেন। পাবলিক পরিসরে জনগণ ওবায়দুল কাদের বনাম মির্জা ফখরুলের মধ্যকার বাগ্‌যুদ্ধ, স্যাটায়ার-আঘাট, মিডিয়াবাজি এবং উত্তেজনার ব্যারোমিটার দিয়ে এ দেশের রাজনীতির ভাব কী- মন্দা নাকি চাঙ্গা, সেটার মাপজোখ করেন। ফলে আমিও জনপরিসরে রাজনৈতিক উত্তাপ মাপার ব্যারোমিটারের পারদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন কী চাঙ্গাভাব কিংবা মন্দাভাব চলছে, সেটাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি।

রাজনীতি আমার তুমুল আগ্রহ, মনোযোগ ও উত্তেজনার জায়গা। ফলে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে আমি রাজনীতির গতিপ্রকৃতি, গতিপ্রবাহ, বিবর্তন ও বিস্তারকে পর্যবেক্ষণ করছি একজন গবেষকের জায়গা থেকে। তবে সেটা মাঠের গ্যালারিতে বসে, একেবারেই দর্শকের জায়গা থেকে নয়; আবার মাঠের মধ্যে খেলোয়াড়ের ভূমিকায়ও নয়। বরঞ্চ একজন পেশাদার গবেষক হিসেবে রাজনীতির বিদ্যমান, বিরাজমান ও বিস্তারমান ডিটেইলসগুলো উপলব্ধির চেষ্টা করি গভীর মনোযোগের সঙ্গে এবং বিশ্নেষণের চেষ্টা করি ক্রিটিক্যাল ও ওয়ার্ল্ডভিউর তাত্ত্বিক এবং অভিজ্ঞতালব্ধ কাঠামোর ভেতর দিয়ে। ফলে রাজনীতির হাওয়া-বাতাস অনুসরণ করা, বাতাসের 'হাওয়া' উপলব্ধির চেষ্টা ও হাওয়া-বাতাসের নানা ডাইনামিকস উপলব্ধির চেষ্টা ও বিশ্নেষণ একটা সিরিয়াস আনন্দের কাজ বটে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের রাজনীতির হাওয়া-বাতাস অত্যন্ত ইউনিক। আমার এ একাগ্রতা এবং মনোযোগের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন চলছে চরম মন্দাভাব। এ মন্দাভাবের অনেক কারণ রয়েছে; কিন্তু প্রধান কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমকালীন কর্মকাণ্ড।

আওয়ামী লীগের সক্রিয়তা :স্বৈরাচারবিরোধী উত্তাল রাজনৈতিক আন্দোলনের হাত ধরে ১৯৯০ সালে যখন এরশাদ সরকারের পতন ঘটে, তারপর থেকেই বাংলাদেশ দীর্ঘ সামরিক শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৯১ সাল থেকে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় না আসতে পারার কারণে এবং ২০০১ সালের বিএনপি-জামায়াত জোটের কাছে ক্ষমতা হারানোর পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, নানা জেল-জুলুম সহ্য করে ও মাঠি কামড়ে রাস্তায় পড়েছিলেন; কিন্তু কখনোই রাজনীতির মাঠ ছাড়েননি। যার ফলে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ থেকে ২০০৮-এ আওয়ামী লীগ আরও অনেক পরিণত, অনেক পরিপক্ষ, অনেক পোড়-খাওয়া এবং অধিকতর প্রজ্ঞাসম্পন্ন। ফলে আওয়ামী লীগ গত প্রায় ১১ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতাসীন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও দেশের সর্বত্র ক্রমবর্ধমান দৃশ্যমান উন্নয়ন, মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি, নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, মানব উন্নয়ন সূচকের ঊর্ধ্বগতি ও রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রভৃতি মিলিয়ে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক মাঠ গরম করতে না দিতে আওয়ামী লীগকে অতি সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। বেহুদা বকবকানি, রাজনৈতিক কথাবাজি, সন্ধ্যায় টিভি-মাইক্রোফোনের সামনে পল্টনি ভাষণ, পার্টি অফিসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নামে মিডিয়ায় প্রেসনোট বিলানো প্রভৃতি সনাতন রাজনৈতিক কৌশলের বাইরে আওয়ামী লীগকে দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার নানা কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বহুমুখী সামাজিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দেওয়ার একটা প্রবণতা। ফলে একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্র পরিচালনা ও অন্যান্য সামাজিক কাজে অতি সক্রিয়তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠের নিরবচ্ছিন্ন মন্দাভাবের একটি অন্যতম প্রধান কারণ। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যু, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, জঙ্গি নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, অপরাধ দমন (ডিআইজি মিজান ও ডিআইজি [প্রিজন] পার্থ বণিক) এবং ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্প আরও গতিশীল করা প্রভৃতি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের ব্যস্ততা, বাংলাদেশের দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনীতির মাঠে যে মন্দাভাব তার পেছনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে নিঃসন্দেহে। তাছাড়া সম্প্রতি আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক বক্তব্যেও এক ধরনের পরিমিতিবোধ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা রাজনৈতিক মাঠ ঠাণ্ডা রাখার আরেক ধরনের কৌশলও হতে পারে।



বিএনপির খালেদাকেন্দ্রিকতা :বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির মন্দাভাবের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, বিএনপির নন-ইস্যুভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। বাংলাদেশের একটি অন্যতম রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ১৯৯১, বিতর্কিত ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। ফলে বিএনপিরও একটি জনভিত্তি আছে, এটা নিন্দুকরাও স্বীকার করবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি জনগণের সামনে কোনো ইস্যুই একটি সত্যিকার রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে হাজির করতে পারেনি। সত্যিকার অর্থে বিএনপি এখন বাংলাদেশের একটি অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কী বিষয় নিয়ে রাজনীতি করছে, এটা বিএনপির কোনো নেতৃস্থানীয় লোকও সঠিকভাবে বলতে পারবেন কি-না আমার জোর সন্দেহ আছে। অনেকে হয়তো বলবেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করাই বিএনপির বর্তমান রাজনীতি। কিন্তু খালেদা জিয়া ইস্যুকে কেন্দ্র করে কেন তাকে মুক্তি দেওয়া উচিত, তা নিয়ে বিএনপি এখনও পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেনি। খালেদা জিয়ার বয়স হয়ে গেছে। তিনি হাঁটাচলা করতে পারেন না। তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন প্রভৃতি দাবি বিএনপি রীতিমতো সকাল-বিকেল জিগির করার মতো করছে; কিন্তু এসব দাবি সাধারণ মানুষের কাছে তেমন কোনো আবেদন তৈরি করছে বলে মনে হয় না। পার্টি অফিসে বসে একই কথা বলার মধ্য দিয়ে বিএনপি আদতেই রাজনৈতিক ময়দানে মাঠ গরম করার মতো আবেদন তৈরি করতে পারছে বলে আমার মনে হচ্ছে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি করে যেসব কর্মসূচি দেওয়া হয়, সেখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ তো দূরের কথা, খোদ বিএনপির নেতাকর্মীরাই ঠিকমতো আসেন না। ফলে আন্দোলন আর জমে না। যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে আনা না যায়, যুক্তিতর্ক দিয়ে একটা শক্ত আন্দোলনের ভিত তৈরি করা না যায় এবং আন্দোলনের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে জনগণের কী লাভ হবে, সেটা গ্রহণযোগ্য করে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা না যায়, তাহলে কিসের বিবেচনায় জনগণ বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শামিল হবে? কিসের মোহে সাধারণ মানুষ বিএনপির রাজনৈতিক বক্তৃতায় হাততালি দেবে? খালেদা জিয়ার মুক্তি বিএনপির দাবি; কিন্তু বিএনপির এই দাবি জনগণের দাবিতে রূপান্তরিত করতে না পারলে এ ইস্যু নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করা যাবে না। তাই তার মুক্তি কেন্দ্র করে বিএনপি যতই রাজনীতি করুক না কেন, যতই বক্তৃতা দিক না কেন, এতে করে প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের মাইক্রোফোন গরম হবে; কিন্তু রাজনীতির মাঠ গরম হবে বলে কোনো আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি না। ফলে রাজনীতির মন্দাভাব দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এ দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ডামাডোলের বাইরে আরও কিছু রাজনৈতিক দল আছে, তাদের অবস্থাও প্রায় একই। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের বাম দলগুলোর নানা রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে কম হলেও খানিকটা জনস্বার্থ ও জনসম্পৃক্ততা আছে। কিন্তু বাম দলগুলো জনগণের রাজনীতি বাদ দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি করতে গিয়ে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের এবং কেউ কেউ বিএনপির ঘাড়ে সওয়ার হয়েছেন। ফলে বাম দলগুলোর দৃশ্যমান নিষ্ফ্ক্রিয়তাও বাংলাদেশের রাজনীতির মন্দাভাব বিলম্বিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। আর জাতীয় পার্টির সার্কাসের কথা না বলাই ভালো। কেননা রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের নেতৃত্বের কোন্দল জাতীয় পার্টির একেবারেই নিজস্ব ব্যাপার। তারা নিজেদের মধ্যে মান-অভিমান করেন এবং এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে গালাগালি করে। আবার মিটিং-সিটিং করে উভয় গ্রুপ গালাগালি করে। পরিশেষে বলব, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে জনসম্পৃক্ত রাজনীতির সংস্কৃতি যদি শুরু না করা যায়, তাহলে সত্যিকার অর্থে এ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একটি দায়িত্বশীল ও জনসম্পৃক্তবিরোধী দল খুবই জরুরি। সংসদে জাতীয় পার্টি কি বিরোধী দল, নাকি সরকারি দল- এটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজেরাই একটি বড় ধরনের 'আইডেনটিটি ক্রাইসিসের' মধ্যে ভুগছে। কিন্তু প্রকারান্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের গণতন্ত্র। তাই রাজনীতির মন্দাভাব মজবুত-টেকসই গণতন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। যত দ্রুত রাজনীতির এ মন্দাভাব কাটবে, ততই দেশ ও দশের কল্যাণ। এটা খুবই জরুরি এবং এমনটি সবচেয়ে বেশি জরুরি গণতন্ত্রের পরিপুষ্টির জন্য।

নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়