সাক্ষাৎকার

কম খরচে ভালো চিকিৎসা হৃদরোগ হাসপাতালে

অধ্যাপক ডা. মো. আফজালুর রহমান

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: রাজবংশী রায়

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ও অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি ১৯৮৪ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৯২ সালে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট থেকে ডক্টর অব মেডিসিন, এমডি কার্ডিওলজি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৪ সালে কার্ডিওলজি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি এবং গ্লাসগোর রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন এবং এডিনবার্গের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স থেকে এফআরসিপি ডিগ্রি লাভ করেন। ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি ও কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চ ও টেকনোলজি উদ্ভাবনের জন্য তিনি স্বনামধন্য। এসব বিষয়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদক ও পুরস্কার পেয়েছেন

সমকাল :আপনি এই হাসপাতালের শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং এখানেই চিকিৎসক, শিক্ষক ও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই হাসপাতাল নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতার কথা সংক্ষেপে শুনতে চাই।

আফজালুর রহমান : জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল দেশের সর্ববৃহৎ সরকারি বিশেষায়িত হৃদরোগ হাসপাতাল। এক কথায় এই অভিজ্ঞতার কথা বলা খুবই কঠিন। তবে এটুকু বলতে পারি, এই হাসপাতাল দেশের সর্বস্তরের মানুষের হৃদরোগ চিকিৎসায় অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। এই নিরলস চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মধ্য দিয়েই দেশের আপামর জনসাধারণের আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়েছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দেশের যে কোনো প্রান্তের সাধারণ মানুষ যে কোনো ধরনের হৃদরোগের সমস্যায় পড়লেই সর্বপ্রথম এই হৃদরোগ হাসপাতালের কথা স্মরণ করে। এটা একটা বড় সফলতা। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালের বিছানা সংখ্যার ৩-৪ গুণ রোগী এখানে ভর্তি থাকলেও সবাই চিকিৎসাসেবা পায়।

সমকাল :অবকাঠামোগত সামর্থ্যের চেয়ে রোগী বেশি, আপনি বলছেন। এই সংকট সমাধানে আপনারা কী করছেন?

আফজালুর রহমান : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর হাসপাতালের অতিরিক্ত চতুর্থতলা ভার্টিকেল এক্সটেনশনের কাজের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এবং প্রশাসনিক জঞ্জাল পরিস্কার করে এ কাজটি এখন সফলভাবে শেষের পথে। বর্তমানে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে সব মিলিয়ে বেড রয়েছে ৪১৪টি। এর সঙ্গে নতুন ভবনে আরও ৮৩৪টি বেড সংযোজিত হলে সর্বমোট বেডসংখ্যা দাঁড়াবে ১২৪৮টি। তখন এটি হবে দেশের হৃদরোগে সর্ববৃহৎ এবং সর্বাধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্র। উন্নত বিশ্বে হৃদরোগের যে ধরনের জটিল অস্ত্রোপচারসহ যে যে ধরনের আধুনিক চিকিৎসা হয়, এখানেও অতি অল্প খরচে সেই একই সেবা পাওয়া যাবে।

সমকাল : চিকিৎসার ক্ষেত্রে কী ধরনের সাফল্য রয়েছে?

আফজালুর রহমান : অবকাঠামো বৃদ্ধির পাশাপাশি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এই হৃদরোগ হাসপাতাল। এখানে দেশের অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়ে বিভিন্ন ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা, যেমন- এনজিওগ্রাম, স্টেন্টিং বা রক্তনালিতে রিং লাগানো, পেসমেকার প্রতিস্থাপন, হূৎপিণ্ডের ভাল্ক্বের ত্রুটি সংশোধন এবং বাইপাস অপারেশন, রক্তনালির অপারেশনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। এতে হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে অত্যাধুনিক ৩৮ বেডের আইসিইউ, সাতটি অত্যাধুনিক কার্ডিয়াক সার্জারি অপারেশন থিয়েটার ও একটি ইমার্জেন্সি ভাসকুলার অপারেশন থিয়েটার সর্বদা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও তিনটি অত্যাধুনিক ভাসকুলার সার্জারি অপারেশন থিয়েটার অচিরেই চালু হবে।

সমকাল :অভিযোগ পাওয়া যায়, রোগীরা অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যে ওষুধ পায় না।

আফজালুর রহমান :সব রোগীকে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় ব্যবহূত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ স্ট্রেপটোকাইনেস সিসিইউ-১ ও সিসিইউ-২তে বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ভর্তিকৃত সব রোগীর প্রথম দু'দিন এবং চারটি করে ইনজেকশন এনোক্সাপারিনও বিনামূল্যে দেওয়া হয়। হৃদরোগ চিকিৎসায় সব প্রয়োজনীয় ওষুধও হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এছাড়া আমরা যে বিভিন্ন ইন্টারভেনশনাল পদ্ধতিতে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকি, তাতে প্রচুর ডাই ব্যবহার করতে হয়। এটাও বেশ ব্যয়বহুল। ক্যাথ ল্যাবগুলোতে এই ওষুধটিও বিনামূল্যে দেওয়া হয়। আর জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে দেশের ভেতরে সরকারিভাবে বিনামূল্যে সরবরাহ এটাই প্রথম।

সমকাল :আমরা দেশ ও বিদেশে দেখে ও জেনে আসছি যে, একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান, প্রশিক্ষিত নার্স, ব্রাদার, জুনিয়র ডাক্তার এমনকি বয়-আয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর আনুপাতিক হারে নার্স ও ডাক্তারের সংখ্যা একেবারেই কম।

আফজালুর রহমান :এ ব্যাপারে সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে প্রচুর সংখ্যক নার্স নিয়োগ দিয়েছেন। চিকিৎসক নিয়োগ একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমার মনে হয়, চিকিৎসকদের পাশাপাশি নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয়দেরও প্রশিক্ষণ দরকার। উন্নত দেশে নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয়রা রোগীর সেবায় খুব দক্ষ। আমরাও চেষ্টা করছি তাদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ নার্স, আয়া ও ওয়ার্ডবয় তৈরি করতে। চিকিৎসা একটি সম্মিলিত দলবদ্ধ প্রচেষ্টা। আমি আশাবাদী, বাংলাদেশে হৃদরোগ চিকিৎসার একটি সর্বোৎকৃষ্ট পেশাগত জনবল তৈরি হবে।

সমকাল :আমরা জানি, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুহার হৃদরোগে। এই রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় কী কী?

আফজালুর রহমান : যে কোনো রোগই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। হৃদরোগের ক্ষেত্রে এ কথাটা সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। হৃদরোগ প্রতিরোধযোগ্য। হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। ধূমপান ত্যাগ করতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার-দাবারে অভ্যস্ত হতে হবে। প্রতিদিন টাটকা শাক-সবজি, ফলমূল খেতে হবে। অধিক তেল-চর্বি জাতীয় খাবার বর্জন করতে হবে। প্রতিদিন কমপক্ষে আধঘণ্টা হাঁটতে হবে। ৪০ বছর বয়সের পর নিয়মিত কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, রক্তে উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল আছে কি-না দেখতে হবে এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা নিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

সমকাল :এ দেশের চিকিৎসকদের সেবার মানসিকতা নিয়ে নাগরিকদের প্রশ্ন ও অভিযোগ কম নয়। আপনি কী বলেন?

আফজালুর রহমান : আমি সবার জন্য একটাই কথা বলি, মানুষ মানুষের জন্য। মানুষের জন্য কাজ করুন। দেশের জন্য কাজ করুন। আমরা যেহেতু চিকিৎসক, আমাদের সুযোগ অন্য আর দশটা পেশার চেয়ে অনেক বেশি। মনোযোগ দিয়ে রোগীর সেবা করাই পরম ধর্ম এবং দেশসেবার অন্যতম কাজ। মানুষের সেবার মাঝেই সব আনন্দ ও তৃপ্তি। অন্য কিছুতে তা নেই। আমার একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে রোগীর সেবা অর্থাৎ শ্রম, মেধা ও মনন খাটিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলা। আমি সুদক্ষ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তৈরি করার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যেসব কাজ করছি, তার মূল লক্ষ্য কিন্তু দেশের রোগীদের সেবা করা। আমি সবার উদ্দেশে বলব, হাতে-কলমে কাজ শিখুন, প্রশিক্ষণ নিন, গবেষণা করুন, প্রকারান্তরে এ দেশের রোগীরাই সুফল পাবে। দেশের গৌরব বাড়বে।

সমকাল :সেবা প্রদানে আন্তরিকতার ক্ষেত্রে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের চিত্র কেমন? সবচেয়ে বড় অবদান বা উল্লেখযোগ্য দিক কোনটি বলে আপনি মনে করেন?

আফজালুর রহমান :বছরের ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালটি বিরতিহীনভাবে চলমান থাকে। আমরা হৃদরোগে আক্রান্ত কোনো রোগী হাসপাতালে এসে পৌঁছলে তাকে ফিরিয়ে দিই না। এই মুহূর্তে বিছানার সংকট রয়েছে, যা আমরা অচিরেই কাটিয়ে উঠব। কিন্তু ফ্লোরে বা করিডোরে রেখে হলেও আমরা সব রোগীকে সঠিক চিকিৎসাসেবাটা দিয়ে যাচ্ছি। বিছানা খালি নেই বলে কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। আমি মনে করি, এটাই এই হাসপাতালের সবচেয়ে বড় উল্লেখযোগ্য দিক।

সমকাল :যে কোনো হাসপাতালে কেবল চিকিৎসা নয়, ল্যাব টেস্ট গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আপনারা কী করছেন?

আফজালুর রহমান :তা অনেকটা বলতে পারেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শুরু হওয়া উত্তর ব্লকের নিচতলায় পুরনো ক্যাথ ল্যাব বিভাগটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন করে মধ্য ব্লকের দ্বিতীয়তলায় স্থানান্তরের কাজ এগিয়ে চলছে। এতে করে একই ফ্লোরে ক্যাথ ল্যাব, সিসিইউ ও পিসিসিইউ সেবা রোগীরা অতি দ্রুত লাভ করবে। বর্তমান অর্থবছরে সিএমএসডির মাধ্যমে নতুন ও উন্নতমানের দুটি এনজিওগ্রাম মেশিন ক্রয় করা হয়েছে। এছাড়াও ক্যাথ ল্যাবের জন্য স্টেন্ট লাগালে রোগীরা কতটুকু উপকৃত হবে, সেই লক্ষ্যে এফএফআর ও আইভাস নামক অত্যাধুনিক মেশিন সংযোজন করা হয়েছে। এ ছাড়াও রোগীদের চিকিৎসার স্বার্থে, ফোরডি আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন, নতুন কালার ডপলার ইকো মেশিন, ভাসকুলার ডপলার মেশিন, ইসিজি মেশিন সরকারি সব নিয়মনীতি অনুসরণ করে ক্রয় করা হয়েছে। আমাদের সবার একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে, কোনো ধরনের হয়রানি ও বিড়ম্বনা ছাড়াই যেন একজন রোগী স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় উন্নতমানের চিকিৎসা পায়।

সমকাল :আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আফজালুর রহমান :সমকালের জন্যও শুভেচ্ছা।