বর্ধিত ইন্টার্নশিপ এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য সুবিধা

চিকিৎসা

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী

২৭ আগস্ট ২০১৯ তারিখে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী পরিষদ (একনেক) সভায় গ্রামে যেতে অনিচ্ছুক ডাক্তারদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ ও বিরক্তির সংবাদ পরের দিন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে সমবেদনা জানাচ্ছি। নবীন চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় উৎসাহিত না  হওয়ার মূল কারণগুলো খোলামনে বিশ্নেষণ প্রয়োজন। আজ পর্যন্ত কোনো সরকার নিবেদিত চিকিৎসকদের সম্মানদানের জন্য প্রদর্শনীয় উদ্যোগ নেয়নি। অতীতের সরকারগুলো কোনো  কোনো চিকিৎসককে মন্ত্রী বানিয়েছেন, এমনকি রাষ্ট্রপতিও নিয়োগ করেছেন। আবার অপমান করে পদচ্যুতও করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর প্রিয় চিকিৎসকবৃন্দ

১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র ফিল্ড হাসপাতাল 'বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে'র নাম পরিবর্তনের জন্য সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের কিছু স্বাস্থ্য বিভাগীয় আমলা সৃষ্ট সমস্যা সমাধানকল্পে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লেখককে ডেকে বলেন, বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে অধ্যাপক ফজলে রাব্বী বা চক্ষু বিশেষজ্ঞ আলীম চৌধুরী হাসপাতাল করো। উত্তরে বলেছিলাম, নিবেদিত চিকিৎসকদের স্মরণীয়, বরণীয় করে রাখার দায়িত্ব সরকারের, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নয়। পরে তাঁর পরামর্শে মুক্তিযুদ্ধের 'বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে'র পরিবর্তিত নাম হয় 'গণস্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন কেন্দ্র'। এই প্রকল্পের প্রসারের জন্য সাভারে বঙ্গবন্ধু প্রায় ৩০ একর জমি সরকারিভাবে ভূমিদখল করিয়ে দিয়েছিলেন।

ফরিদপুরে জন্মগ্রহণকারী তিনজন খ্যাতনামা চিকিৎসকের নাম বঙ্গবন্ধু প্রায় সময় উল্লেখ করতেন। তারা হলেন- ঢাকা মেডিকেল কলেজের পঞ্চাশের দশকের প্রিন্সিপাল ও হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট কর্নেল এমএম হক, ক্লিনিক্যাল সার্জারি অধ্যাপক কাজী সামসুল আলম, এফআরসিএস যিনি ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর পাশের বাড়ির বাসিন্দা ছিলেন। তিনি সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করে চিকিৎসার জন্য বিপ্লবী ইলা মিত্রকে কলকাতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। অপরজন হচ্ছেন ধাত্রীবিদ্যার অধ্যাপক জোহরা বেগম কাজী। তিনি মহাত্মা গান্ধীর প্রিয় পাত্রী ছিলেন। জোহরা কাজীর পরিবার মধ্যপ্রদেশে সেবা গ্রামে গান্ধী পরিবারের সংলগ্ন বাড়িতে দীর্ঘ সময় বসবাস করেছেন এবং গান্ধীতনয় রামদাস গান্ধীর সঙ্গে জোহরা কাজীর নিবিড় বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। অবশ্য জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু পরিবারের একান্ত প্রিয়জন ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী মনে করতেন, 'খোদার পরে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম।' এ ছাড়াও শেখ মুজিব কমিউনিস্ট পাটির সদস্য ঢাকার নবাবপুরের ডা. এমএ করিম, পূর্ব পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের ডা. টি (তৈয়ব) আলী, ধানমণ্ডির ডা. মেহেরুন্নেসা এবং পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ও কমনওয়েলথ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক এসআইএমজি মান্নানকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। স্নায়ুগ্রন্থি পেসিনিয়ান করপাসলসের নির্ণয়ক হিসেবে উপমহাদেশের একমাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানী অ্যানাটমির অধ্যাপক এসআইএমজি মান্নানের অবদানের কথা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক গ্রন্থ 'গ্রেজ টেক্সট বুক অব অ্যানাটমি'তে উল্লেখ আছে। কলেরা-ডায়রিয়া নির্ণয়ে ব্যবহূত মনসুর মিডিয়ার উদ্ভাবক অধ্যাপক কেএ মনসুরকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু অতর্কিতে মহাখালীর পাবলিক হেলথ গবেষণাগারে উপস্থিত হয়ে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম সন্তান জয় ওয়াজেদকে ১৯৭১ সালে প্রসব করিয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনির অধ্যাপক এমএ ওয়াদুদ। গর্ভকালীন পুরো সময় সেবা দিয়েছিলেন তার স্ত্রী ডা. সুফিয়া খাতুন। পঞ্চাশের দশকে বঙ্গবন্ধুর পরিবার সিদ্ধেশ্বরী স্কুল মাঠের পাশে পুকুরপাড়ে পুলিশ ইন্সপেক্টর আখতারুজ্জামানের টিনের বাড়ির এক অংশে নামমাত্র ভাড়ায় বসবাস করতেন। তখন বঙ্গবন্ধু পরিবারকে চিকিৎসাসেবা দিতেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত খ্যাতনামা পারিবারিক চিকিৎসক ডা.মন্মথ নাথ নন্দী (ডা. এমএন নন্দী) এমবি (কলকাতা)। তিনি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সপরিবারে বসবাস করতেন ঢাকার ওয়ারীর র‌্যাংকিন স্ট্রিটে। ডা. নন্দীর জন্ম মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী ইউনিয়নের কুষ্টিয়া গ্রামে। চল্লিশের দশকে সার্জারিতে উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপের পথে রওনা হয়ে বোম্বাই পৌঁছার পর কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে ডা. নন্দী ইউরোপ যাত্রা মাঝপথে স্থগিত করে রিভার স্টিম নেভিগেশনের স্টিমশিপে গোয়ালন্দে পৌঁছলেন এবং সেখান থেকে বজরা নৌকায় মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে উপস্থিত হলেন। কী অপূর্ব আত্মত্যাগ!

নিবেদিত চিকিৎসকদের সম্মান দিন

মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের জন্য ১০৫৭ কোটি টাকা সরকারি অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের নাম হওয়া বাঞ্ছনীয় ডা. এমএন নন্দী মেডিকেল কলেজ। ডা. নন্দীর মতো নিবেদিত পারিবারিক চিকিৎসক বিরল। তার আদর্শ ও কর্মনিষ্ঠায় তরুণ চিকিৎসকরা অনুপ্রাণিত হবেন। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের নাম ডা. জোহরা কাজী মেডিকেল কলেজ এবং পাবনা মেডিকেল কলেজের নাম অধ্যাপক ফজলে রাব্বী মেডিকেল কলেজ করার প্রস্তাব অনুমোদন করিয়েছিলেন, যা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এমআর খান ও কার্ডিওলজির অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার এমএ মালিক এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরে অধ্যাপক কেএস আলম ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ চত্বরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক ডা. এমএ মোবিনের ভাস্কর্য স্থাপন করা হলে নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত হবেন। উল্লেখ্য, কার্ডিয়াক সার্জারির আকর্ষণীয় পদ ছেড়ে ডা. এমএ মোবিন মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বিলেত থেকে এসে বাংলাদেশ-ত্রিপুরা সীমান্তে বিশ্রামগঞ্জে ৪৮০ শয্যার বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন। শব ব্যবচ্ছেদ মিলনায়তনে অধ্যাপক এসআইএমজি মান্নানের আবক্ষ ভাস্কর্য ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের মানবিক হতে অনুপ্রাণিত করবে।

মেডিকেল কারিকুলামের যুগোপযোগী সংস্কার

পাঁচ বছরমেয়াদি এমবিবিএস কোর্সে মাত্র ১৫ দিন সরেজমিন কমিউনিটি মেডিসিন অধ্যয়নের জন্য বরাদ্দ আছে, যা ছাত্ররা সাধারণত কক্সবাজার ও কুয়াকাটা ভ্রমণ করে ব্যয় করে। ছাত্রদের সঙ্গে নূ্যনতম সংখ্যক শিক্ষক থাকেন না। বর্তমান কারিকুলামে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস, স্কুল শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য, পেশাজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন ব্যয় এবং স্বাস্থ্য খাতের অর্থনীতি পড়ানো হয় না বিধায় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সহজে চিকিৎসকদের প্রভাবিত করতে পারেন। দ্রুত পুঁজিবাদের বিকাশ এবং গ্রামের সঙ্গে শহরের বিচ্ছিন্নতার কারণে নবীন চিকিৎসকদের গ্রাম সম্পর্কে ভীতি, পারিবারিক চিকিৎসক হওয়ার পরিবর্তে ওষুধ কোম্পানি ও ক্লিনিক মালিক প্রভাবিত 'বিশেষজ্ঞ' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে তারা অধিক আগ্রহী হন। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নির্ধারিত কর্তব্য পালন না করেও ধনী সন্তানরা এমবিবিএস পাসের পরপরই ঢাকায় বড় বড় হাসপাতাল ও বিএসএমএমইউতে অবৈতনিক রেসিডেন্সি করে কয়েকবার পরীক্ষা দিয়ে এফসিপিএস-এমডি-এমএস-এমফিল প্রভৃতি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করে বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তির চিত্রটাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কোনো প্রকারে ১০ শতাংশ গ্রামের ছেলেমেয়েরা মেডিকেল কলেজের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯০ শতাংশই শহরের ধনী, উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের সন্তান এবং ৫০ শতাংশের অধিক নারী শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের পিতৃপুরুষের গ্রামে বাড়ি আছে বটে; তবে তারা ৫-৭ বছরেও একবার পরিবারের জন্মভূমি পরিদর্শন করে না। তাদের মনে 'কুসংস্কার আচ্ছন্ন গ্রামের ভীতি' বাসা বেঁধেছে।

মেডিকেল শিক্ষাকে স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উপযোগী করার নিমিত্তে গত দশ বছর ধরে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজে প্রত্যেক অধ্যয়ন বছরে ছাত্রছাত্রীরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে গণস্বাস্থ্য উপকেন্দ্রে এক মাস অবস্থান করে স্থানীয় নদনদী, পশুপাখি, ঋতুর বিভিন্ন ফল ও সবজি এবং গ্রামের প্রচলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, গ্রাম্য চিকিৎসক, দাই ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে পরিচিত হয়। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে ছাত্ররা মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী শুনে, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর ও সমাধি জিয়ারত করে এবং সন্ধান নেওয়ার চেষ্টা করে, কারা এলাকার রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য ছিল। প্রত্যেক দলে ৪-৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকারাও এক মাস সার্বক্ষণিকভাবে গ্রামে অবস্থান করেন এবং সন্ধ্যায় ক্লাস করান বিভিন্ন মেডিকেল বিষয়ে। ছাত্ররা কয়েকদিন গণস্বাস্থ্য ক্লিনিকে সহকারী সেবিকা ও টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজও শেখে। প্রত্যেক অতি দরিদ্র ও দরিদ্র পরিবারে দু'জন শিক্ষার্থী সারাদিন অবস্থান করে তাদের জীবনযাত্রা ও খাদ্য তালিকা লিপিবদ্ধ করে। চতুর্থ ও পঞ্চম বছরের ছাত্ররা প্রেসক্রিপশন অডিট এবং পরিবারের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। গ্রামে অবস্থানকালে অনেকে সাঁতার শিখে নেয়। গ্রামবাসীর সঙ্গে এক বিকেলে সংস্কৃতি অনুষ্ঠানে মিলিত হয়। ছাত্রছাত্রীদের গ্রামে নিরাপত্তা সম্পর্কে ভীতি অনেকাংশে কাটে, কিছুটা হলেও দেশপ্রেম জাগ্রত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশনীতে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক কলেজের এই শিক্ষা পদ্ধতির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা আছে।

প্রান্তিক জনসাধারণের স্বাস্থ্য সুবিধা সরেজমিনে দেখার জন্য মেডিকেল, নার্সিং, ডেন্টাল ও ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কয়েক সপ্তাহ অবস্থান অতীব প্রয়োজনীয়। মেডিকেল শিক্ষা কার্যক্রমে কয়েকটি ওষুধ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান পরিভ্রমণ করে ওষুধের উৎপাদন ব্যয় ও মান নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞানার্জন বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন। যুগের প্রয়োজনে হোমিওপ্যাথি, আর্য়ুবেদ-ইউনানি, আকুপাংচার, ফিজিওথেরাপি ও নার্সিংসেবা সম্পর্কে প্রতি বিষয়ে দুই সপ্তাহ অধ্যয়ন উন্নত মানের চিকিৎসক সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে শিক্ষার্থীদের কয়েক সপ্তাহ ডেন্টিস্ট্রি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও ল্যাবরেটরিতে রক্ত, পুঁজ, মেরুরজ্জুর রস, পায়খানা, প্রসাব প্রভৃতি পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় এবং রক্ত পরিসঞ্চালন শেখানো হবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক বাহিনীর মেডিকেল কলেজে যারা অধ্যয়ন করবে, তাদের নূ্যনতম পাঁচ বছর সামরিক-পুলিশ বা কারাগারের হাসপাতালে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা যৌক্তিক হবে।



ভ্রান্ত নিয়োগ পদ্ধতি ও সীমিত উন্নতির স্তর

বর্তমানে সব চিকিৎসকের নিয়োগ কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা থেকে হয়ে থাকে। ২০ শতাংশ অনধিক ভাগ্যবান তদবির ও আর্থিক বিনিয়োগসাপেক্ষে সরাসরি মেডিকেল কলেজগুলোতে ট্রেনিং পোস্টের বিপরীতে নিয়োগ পান। বাকিরা ইউনিয়ন, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে মেডিকেল অফিসার পদে নিয়োগ পান। নির্বাচিত স্থানীয় কর্তৃপক্ষের চিকিৎসকদের নিয়োগ ও তদারকিতে কোনো ভূমিকা নেই। ফলে ঢাকাস্থ মুনিবদের খুশি করে নবীন-প্রবীণ চিকিৎসকরা কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন-ভাতা সংগ্রহ করতে পারেন। এরা অধিকাংশই প্রভাবশালী আমলা, ব্যবসায়ী ও বিত্তবানদের সন্তান-সন্ততি। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন অর্জিত হলে মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত হয়ে যায় এবং প্রধানমন্ত্রীর আবেদন অগ্রাহ্য করে তারা প্রাতিষ্ঠানিক প্র্যাকটিসের পরিবর্তে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চুটিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যাপৃত হন। স্বাস্থ্য বিভাগে চিকিৎসকদের উন্নতির স্তর অত্যন্ত সীমিত। প্রতিযোগিতা মূলত পরীক্ষা দিয়ে একজন তরুণ চিকিৎসক সহকারী সার্জন হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অধিকাংশের কর্মজীবনের অবসান ঘটে সহকারী সার্জন হিসেবে। ১০ শতাংশ অনধিক মেডিকেল অফিসার জেলা সিভিল সার্জন পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন জীবনের সায়াহ্নে। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের শীর্ষপদগুলো বিসিএস (প্রশাসন) কর্মকর্তাদের দখলে। এটা ক্ষোভের বড় কারণ।

উন্নয়নের লক্ষ্যে এবং চিকিৎসকদের উজ্জীবিত করার নিমিত্তে বিসিএসের (মেডিকেল) পরিবর্তে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের মতো বাংলাদেশ মেডিকেল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করে পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্ব সমন্বয়ে প্রত্যেক জেলায় স্বশাসিত জাতীয় স্বাস্থ্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ফলে চিকিৎসকরা নিজের পছন্দমতো কর্মস্থল বেছে নিতে পারবেন। বাসস্থান, ছেলেমেয়ের শিক্ষা, কাজের অনুকূল পরিবেশ এবং উচ্চতর গ্রেডে কর্মসংস্থান বিবেচনায় চিকিৎসকরা একই স্থানে কিংবা কয়েক বছর পরপর কর্মস্থল বদলাতে পারবেন। জনপ্রশাসন বিভাগ নয়, চিকিৎসক নিজেই হবেন নিজের কর্মের নিয়ামক। জেলা স্বাস্থ্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সব চিকিৎসকের চাকরির নিরাপত্তা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসকদের উন্নতির নূ্যনতম তিনটি স্তর এবং উপজেলা পর্যায়ে চারটি স্তর সৃষ্টি করা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে। কেন্দ্রীয় সরকার জেলা স্বাস্থ্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করবে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিচালকের পদমর্যাদা হবে ডেপুটি সিভিল সার্জনের, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিচালকের পদমর্যাদা হবে অতিরিক্ত সিভিল সার্জনের সমতুল্য। ডেপুটি সিভিল সার্জন পদমর্যাদায় ডেপুটি সেক্রেটারি এবং অতিরিক্ত সিভিল সার্জন জয়েন্ট সেক্রেটারি সমতুল্য হবেন এবং সে মোতাবেক তাদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

বর্ধিত ইন্টার্নশিপ প্রসঙ্গে

বর্তমানে নবীন চিকিৎসকদের চিকিৎসা সংক্রান্ত নিবন্ধন পাওয়ার জন্য এক বছরের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ, জাতি ও চিকিৎসকদের স্বার্থে ইন্টার্নশিপ বাড়িয়ে দুই বছর করার লক্ষ্যে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন। সদ্য পাস করা নবীন চিকিৎসকরা প্রথম বছর নিজ নিজ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিবিড় প্রশিক্ষণ নেবেন। দ্বিতীয় বছর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সার্বক্ষণিকভাবে অবস্থান করে স্থানীয় জনসাধারণকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে জ্ঞানার্জন করবেন। এটা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ইন্টার্নদের ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠাতে হবে, উপজেলায় নয়। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো ভুল কাজ হবে। দেশে প্রায় ৫০০ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে। বর্তমানে প্রতিটিতে দশজনের বেশি চিকিৎসক আছেন, যাদের অনেকে অনুপস্থিত থাকেন। প্রতি উপজেলায় ২০ জন ইন্টার্নশিপ পাঠালে নিয়মিত চিকিৎসকরা আরও বেশি অনুপস্থিত হবেন, সেবা বা প্রশিক্ষণ কোনোটাই হবে না।

একটি ইউনিয়নে বর্তমানে ৩০ থেকে ৫০ হাজার জনসাধারণ বসবাস করেন। আগামী ২০ বছরে ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ৭০ হাজার অতিক্রম করে যাবে। বর্ধিত ইন্টার্নশিপের ফলে ইউনিয়নের জনসাধারণ নিয়মিত দু'জন মেডিকেল অফিসারের অতিরিক্ত দু'জন নিবেদিত আগ্রহী নবীন ইন্টার্ন চিকিৎসকের পরামর্শ ও সার্বক্ষণিক সেবা পাবেন।

সরকারের করণীয়

বর্ধিত ইন্টার্নশিপ একটি জনহিতকর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রী সাহসের সঙ্গে প্রজ্ঞাপনটিকে আইনে পরিণত করুন এবং নিল্ফেম্ন উল্লিখিত সংস্কারগুলো ছয় মাসের মধ্যে কার্যকর করার ব্যবস্থা নিন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র আছে। অধিকাংশই দোতলা বিল্ডিং, প্রায় এক একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত, ৮-১২টি কক্ষ আছে, ২-৩টি পারিবারিক বাসস্থান আছে। অধিকাংশ সেন্টারে সুপেয় পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে; তবে দীর্ঘদিন ব্যবহূত না হওয়ার কারণে অনেকগুলোর অবস্থা সংকীর্ণ। বাউন্ডারি দেয়াল না থাকায় নিরাপত্তার শঙ্কা রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় সংস্কারের পাশাপাশি মেডিকেল অফিসার ও ইন্টার্নদের ২০০০ বর্গফুট বাসস্থান নির্মাণের জন্য নিমিত্তে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিন। অনধিক ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নিম্নলিখিত চিকিৎসা সামগ্রী ও ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি প্রত্যেক ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে দিলে নবীন ইন্টার্নরা আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় জনগণকে উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে উৎসাহিত হবেন।

বর্ধিত ইন্টার্নশিপ নবীন চিকিৎসকদের জন্য উন্নতির সোপান সৃষ্টি করবে। জনগণ পাবে নূ্যনতম খরচে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা। সাধারণ জনগণের এই প্রত্যাশা পূরণ সহজেই সম্ভব। প্রমাণ হবে দেশ কার, সাধারণ জনগণের, না লুটেরা ধনীদের! জনপ্রতি মাত্র ৫০০ টাকা বিনিয়োগে প্রতি ইউনিয়নে সৃষ্টি হবে আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি। এই বিনিয়োগ হবে জনস্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার প্রমাণ।

ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র জনহিতকর ট্রাষ্ট