সোলায়মানের নাটক আজও প্রাসঙ্গিক

স্মরণ

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আবু সাঈদ খান

দেখতে দেখতে নাট্যকার এস এম সোলায়মানের প্রয়াণের ১৮ বছর কেটে গেল। ২০০১ সালে সোলায়মান যখন মারা গেলেন তখন তার বয়স ৪৮। একমাত্র সন্তান আনিকা মাহী একা তখন শিশু। সে এখন ৩১ বছরের তরুণী। বাবার পথ ধরে নাটক নির্মাণে হাত দিয়েছে। ইতিমধ্যে তার লেখা তিনটি নাটক দেশে-বিদেশে মঞ্চস্থ হয়েছে। সে যাই হোক, বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি অনেকটাই অচেনা। অথচ আশি ও নব্বইয়ের দশকে তাঁর সৃষ্টিশীল পদচারণায় নাট্যাঙ্গনে ঝড় উঠেছিল। তাঁর রচিত ও রূপান্তরিত নাটক সবাইকে চমকে দিয়েছিল। তিনি ছিলেন নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা, সঙ্গীতকার ও গায়ক।

'খ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল', 'এলেকশান ক্যারিকেচার', 'এই দেশে এই বেশে', 'গনি মিয়ার একদিন' ইত্যাদি নাটকের মধ্য দিয়েই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল এবং  বন্ধুত্বও হয়েছিল। আশির দশকে আমি রাজনীতির সার্বক্ষণিক কর্মী, সোলায়মান নাটকে একশ' ভাগ নিবেদিত।

তখন সোলায়মান নাট্যকর্মী রোকেয়া রফিক বেবীর সঙ্গে ঘর বেঁধেছেন। সে সময়ে বেবী-সোলায়মান দম্পতি এবং বেবীর বড় বোন জাসদ নেত্রী শিরীন আখতারের পরিবারের একই বাড়িতে বসবাস। শিরীন আখতারের স্বামী মনিরুল ইসলামও জাসদের অন্যতম শীর্ষ নেতা। তাই কারণে-অকারণে মধুবাজারের ওই বাসায় আমার আসা-যাওয়া। তখন সোলায়মান থাকলে আড্ডায় রাজনীতির সঙ্গে নাটকের প্রসঙ্গও আসত। সোলায়মান ছিলেন আমার দেড় বছরের ছোট। সে হিসেবে সমবয়সীও বলা যায়। তবে সম্ভবত তাঁর বৈবাহিক সূত্রে সম্পর্কীয়দের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের কারণে আমাকে বড় ভাইয়ের মর্যাদা দিতেন। আমি তাঁকে সোলায়মান ও আপনি বলে সম্বোধন করতাম।

সোলায়মানের একটি ডকু-ড্রামায় সহযোগিতা করার ঘটনাটি আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। '৯৩ সালের কথা। একদিন মনি ভাই (মনিরুল ইসলাম) বললেন, সোলায়মান তোমাকে খুঁজছে। আমাদের দেখা হলো। সোলায়মান বললেন, আমি আপনার দুই নূরজাহানকে নিয়ে লেখাটি পড়েছি। তখন ফতোয়াবাজদের দৌরাত্ম্য। সিলেটে এক গৃহবধূ ও তার স্বামীকে দেহের অর্ধেক মাটিতে পুঁতে তাদের গায়ে ১০১টি পাথর ছোড়া হয়। এ অপমান ও যন্ত্রণা সইতে না পেরে নূরজাহান আত্মহত্যা করে। এর পর ফরিদপুরের মধুখালীতে আরেক নূরজাহানকে যৌতুকের জন্য পুড়িয়ে মারা হয়। সোলায়মান বললেন, তারা এই ঘটনা দুটি নিয়ে 'ডকু-ড্রামা' বানাবেন। আমি তাদের সঙ্গে সিলেট গেলে ভালো, কিন্তু ফরিদপুরে থাকতেই হবে। কারণ ফরিদপুর আমার জেলা। বললাম, আমি ফরিদপুরে যাচ্ছি; আপনি আসেন। ঘটনাটি আমার চোখ দিয়েও দেখতে চাইলেন। তাই আমার লেখাটিকে আরেকটু বিস্তারিত করতেও বলা হলো। যথাসময়ে বিপ্লব, মাসুম, হাসানসহ ৫/৬ জনের একটি টিম নিয়ে ফরিদপুর এলেন। হোটেল লাক্সারিতে থাকার ব্যবস্থা হলো। রাতের ডিনার শেষে আমাকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বয়ানটি পড়তে হলো। সোলায়মান বললেন, আপনার এই বর্ণনা ধরেই কাজ শুরু হবে। সবাইকে যার যার কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হলো। পরদিন আমরা ঘটনাস্থল মধুখালীর শ্রীপুরে রওনা হলাম। প্রশাসনেরও সহায়তা নেওয়া হলো। ফরিদপুরের জাসদ ছাত্রলীগের নেতা অশোক কুমার সিংহরায়ের বাড়ি মধুখালীতে। ও ওখানে আগেই থাকল। বাড়িটির চিত্র ধারণ ও বেশ কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো। ফরিদপুর হোটেলে এসে রাতভর তা সংযোজন-বিয়োজন চলল। সকালে আরও কিছু সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো। তারপর সিলেটের পর্ব। আমার যাওয়া হলো না। সিলেটের অংশে সাক্ষাৎকার ও ঘটনাটির নাট্যরূপও যুক্ত করা হলো।

কাজটি যখন শেষ হলো, তখন সোলায়মান আমাকে তার স্টুডিওতে যেতে বললেন। ধানমণ্ডির আবাহনীর পাশে ওয়ার্ল্ড ভিউ স্টুডিওতে গিয়ে 'ওরা সব নূরজাহান' ডকু-ড্রামাটির চূড়ান্ত সংস্করণ দেখলাম। একটি অনবদ্য দলিল, যার অংশবিশেষ নাটকে রূপ দেওয়ায় আরও প্রাণবন্ত। দেখলাম, প্রিন্টার্সের সম্ভবত গবেষণা সহযোগী বা এ রকম কিছুতে আমার নামও আছে। এ প্রসঙ্গে আরও একটি কথা বলতেই হয়। একদিন মনি ভাই আমাকে একটি খাম দিলেন। তাতে কিছু টাকা। বললেন, সোলায়মান বাইরে গেছে। তাই তোমার হাতে নিজে দিতে পারল না। এটি 'ওরা সব নূরজাহান' ডকু-ড্রামা নির্মাণে তোমার পারিশ্রমিক। আমি বিস্মিত। এ থেকে টাকা পাব- এমন প্রত্যাশায় ওই কাজের সহযোগী হইনি। সে যাই হোক, কোনো ডকুমেন্টারি থেকে টাকা পাওয়ার ঘটনা আমার জীবনে ওই একবারই। তবে সোলায়মান আমাকে বলেছিলেন, কিছু উটকো ঝামেলা আছে। এটি কমিয়ে এনে রাজনীতির ওপর বড় কিছু করবেন। সে ক্ষেত্রে আমাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। সোলায়মানের অকাল প্রয়াণ না হলে সেটি হয়তো হতো।

স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে এস এম সোলায়মান


সোলায়মান একজন 'খ্যাপা' নাট্যকার। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় সমাজবদলের রাজনীতির দীক্ষা নিয়েছিলেন। নাটকের মাধ্যমে তিনি শোষণ-বঞ্চনা, অনিয়ম-অসঙ্গতির বিরুদ্ধে জাগরণ আনতে চেয়েছিলেন। তার নাটকে তা বারবার বাঙ্‌ময় হয়ে ওঠে।

মুক্তিযুদ্ধ ছিল তার চেতনার উৎস। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে তার যে ঘৃণা ও ক্ষোভ ছিল, তা খ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল, এই দেশে এই বেশেসহ অন্যান্য নাটকে দেখতে পাই। তার নাটকগুলোতে দেখা যায় সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বিদ্রোহ। সোলায়মানের মাঝে এক বিদ্রোহী সত্তা বসত করত, যা তার সৃষ্টিকর্মে নানা ব্যঞ্জনা, নানা মাত্রিকতায় প্রকাশিত। তার রূপান্তরিত নাটকেও দেশ, দেশের মানুষ, সমস্যা ও সমাধানের আকুতি ফুটে ওঠে। আহ কমরেড, কোর্ট মার্শাল দেখে মনে হয়নি, বিদেশি নাট্যকারের নাটক দেখছি। এ যেন বাংলাদেশের পটভূমিতেই রচিত। এ কৃতিত্ব মূল নাট্যকার, রূপান্তরক নাট্যকার উভয়েরই। সোলায়মানের ভাষার ওপর মুন্সিয়ানা ছিল- তা নিয়ে কারও দ্বিমতের সুযোগ নেই। তার ভাষা কখনও তির্যক ও ব্যঙ্গাত্মক, আবার কখনও তা স্নিগ্ধ।

কখনও প্রমিত, কখনও-বা নানা অঞ্চলের ভাষার মিশ্রণে কারুকার্যময়, যা তার নাটককে করেছে অনবদ্য ও গতিময়।

আমি নাটকের আঙ্গিক বিচারের যোগ্য ব্যক্তি নই। তবে সাদা চোখে যা দেখেছি, যা উপলব্ধি করেছি, তা থেকে বলা যায়, তার নাটকে মঞ্চ ও দর্শকদের মধ্যে এক ধরনের আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয়। নাটকে গানের ব্যবহার, ভাষার ছন্দময় প্রকাশ দর্শককে আরও বেশি আবেগ তাড়িত করে। তার রূপক উপস্থাপনের খোলস খুলে দর্শকদের সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই দেশে এই বেশে নাটকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বেগম রোকেয়া ও জহির রায়হানকে মর্ত্যলোকে ফিরিয়ে আনার অতিপ্রাকৃত অবয়বের মধ্যে রেখে দর্শকদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করানোর কৌশল অভিনব ও চমকপ্রদ।

শৈশবে যখন যাত্রা দেখতাম, অত্যাচারী রাজা বা খলচরিত্রের আস্ম্ফালনে কান্না আসত। তা ভুলিয়ে দিত ও বাড়তি চিন্তার খোরাক দিত যাত্রার অতি সাদাসিধে এক গায়েন 'বিবেক'। আমি সোলায়মানের নাটকের কোরাসের মধ্যে সেই বিবেকের সাক্ষাৎ পাই অন্য রূপে, অন্য আঙ্গিকে। তার নাটকের কোরাসে সদা আশাবাদ থাকে; থাকে প্রেরণা। 'ইঙ্গিত' নাটকের শেষাংশে আছে- 'মানুষ ভাবিতে কী দোষ/ শুরুতে তোর রইল গলদ শেষটা হবে কী/ তুই আর কতকাল হয়ে বেহুঁশ মুখ বুজে সইবি/ সোনার দেশে হাজার শকুন দিতাছে গা-ঝাড়া/তুই একবার শুধু শক্তি নিয়ে সাহস করে দাঁড়া/ তোরা প্রতিরোধে দে নাড়া/ একবার সাহস করে দাঁড়া/ ভাঙরে গলদের গোড়া/ একবার সাহস করে দাঁড়া/ কইরে সিস্টেমটাকে খোঁড়া / একাত্তরের যোদ্ধারা তোরা/ একবার সাহস করে দাঁড়া।'

এস এম সোলায়মান দেশে ও দেশের বাইরে নাটক নিয়ে সাড়া ফেলেছিলেন। নিউইয়র্কেও প্রবাসীদের নিয়ে নাটক করেছেন। সেখানে বাংলা ভাষায় নাটক হয়েছে। দুর্ভাগ্য, সোলায়মানের কাজের যে পৃষ্ঠপোষকতা দরকার ছিল, তিনি তা পাননি। এমনকি তার জীবদ্দশায় নাটকের যথার্থ মূল্যায়নও হয়নি। মৃত্যুর এত বছর পরও তার নাট্যকর্ম নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে নাট্যকার মামুনুর রশীদের কথাই সত্য। তিনি লিখেছেন, 'সোলায়মানের আরও একটি বড় ব্যর্থতা প্রিন্ট মিডিয়াকে ব্যবহার করতে না পারা। আপাতদৃষ্টিতে এ এক হাস্যকর ব্যর্থতা যদিও। এই একটি জায়গায় ঢুকতে পারেনি সে। দর্শক সাথে ছিল, কিছু সমঝদারও, কিন্তু পায়নি ছাপার অক্ষরে সহযোগিতা। পিট চাপড়েছে অনেকে, কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা দেয়নি। নাটকে করতালির প্রশংসার অভাব হয়নি। কিন্তু কাগজে-কলমে বড় একটা তা প্রকাশ পায়নি।'

আমার মনে হয়, সোলায়মানের প্রয়োজনে নয়; নাট্য আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিতে এস এম সোলায়মানের সৃষ্টির যথার্থ মূল্যায়ন জরুরি। তার ১৮ বছর আগে রেখে যাওয়া নাটকগুলো আজও প্রাসঙ্গিক, নতুন যুগের পতাকাবাহী।

সাংবাদিক ও লেখক
[email protected]