ক্যাসিনো অভিযান, দুর্নীতি ও রাজনীতির মেলবন্ধন

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

শহিদুল ইসলাম

হঠাৎ করেই ঢাকায় সরকার, পুলিশ ও র‌্যাবের নাকের ডগায় পঞ্চাশাধিক 'ক্যাসিনো' নামক জুয়ার আড্ডার অস্তিত্ব আবিস্কার দেশবাসীকে হতভম্ব করে দিয়েছে। গত বুধবার সেসব ক্যাসিনোর মধ্যে কয়েকটিতে পুলিশ-র‌্যাব ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একটি ফুটবল ক্লাবে ছদ্মবেশে একটি ক্যাসিনোর ওপর অভিযান চালিয়ে ক্যাসিনো পরিচালক যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করেছে। এর বাইরে তথাকথিত দাপটশালী যুবলীগ নেতা শামীমের গুলশানের নিকেতন এলাকায় রাজসিক ভবনটিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা, এফডিআরের কাগজপত্র, অস্ত্র ও মদ জব্দ করেন। ফলে দেশে নতুন করে এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। লোকের মুখে মুখে আজ ক্যাসিনোর কথা।

এর পাশাপাশি ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিপথগামীদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারির বিষয়টিও আলোচনায় সমভাবেই রয়েছে। ইতিমধ্যে র‌্যাব বেশ ক'টি ক্যাসিনো সিলগালা করে দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'ছাত্রলীগের পর যুবলীগ ধরেছি' (সমকাল ২০.৯.২০১৯)। এতে পরিস্কার হয় যে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া এ দেশে কিছুই হয় না। এসব ক্যাসিনো গত আট-দশ বছর ধরে চলছে। জনগণের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এতদিন রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি নাকে খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে ঘুমিয়েছিল? না; বিভিন্ন দৈনিকের খবরে প্রকাশ যে পুলিশের সহযোগিতায় এসব ক্যাসিনো চলছিল। র‌্যাব কি জানত না? তারা কেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছিল? প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরই তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল! এর সঙ্গে খবরে প্রকাশ- ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কিছু প্রভাবশালী নেতা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন। সে সঙ্গে কিছু বিদেশিও জড়িত।

খবরে প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কেবল ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নয়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, এমনকি এমপি-মন্ত্রীদের অপরাধের তদন্তও করা হচ্ছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রধানমন্ত্রীর একটি নিজস্ব টিম তদন্ত প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে। সেই কালো তালিকায় ২৭ জন এমপির নাম রয়েছে বলে জানা যায়। বিতর্কিত নেতারা গা ঢাকা দিয়েছেন (সমকাল ২০.৯.২০১৯)। আটক যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদের একটি টর্চার সেলও আবিস্কৃত হয়েছে। একটি অভাবনীয় অপরাধ জগতের খবর একদিনের মধ্যে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে। দেশবাসী হতভম্ব। বিভিন্ন কাগজে সেই 'গডফাদারদের' নাম-পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। 'হাইব্রিড' বললেও তারা আওয়ামী লীগেরই লোক। এখন অবশ্য খালেদ মাহমুদকে যুবলীগের কেউ নয় বলা হচ্ছে। কিন্তু কেউ তা বিশ্বাস করছে না। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা কত দূর বাস্তবায়ন হয়, দেশবাসী তা দেখতে চায়। ইতিপূর্বে গডফাদারদের গা স্পর্শ করা হয়নি। দুর্নীতির শিকড় কত নিচে নেমে গেছে যে, সেখান থেকে দেশকে তুলে আনা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ক্যাসিনো কাহিনীর মধ্যেই শামীম ও কলাবাগান ক্লাবে অভিযান চালিয়ে কৃষক লীগ নেতা ফিরোজকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরপর দু'দিনের এই অভিযানে সমগ্র দেশ স্তব্ধ। এসব জায়গা থেকে মাদকদ্রব্যও পাওয়া গেছে।

দুই. পত্রপত্রিকার খবর পড়ে এটি পরিস্কার হওয়া যায় যে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতা ছাড়া প্রকাশ্যে এমন দুর্নীতির প্রসার ঘটতে পারত না। ১৮৩৫ সালে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা প্রচলনের সময় বলা হয়েছিল, পিরামিডের চূড়ার কিছু লোককে শিক্ষিত করে তুললে তা আপনাআপনিই চুইয়ে নিচের লোককে শিক্ষিত করে তুলবে। তা যায়নি। এমনটি করা যায় না। কিন্তু দুর্নীতির ক্ষেত্রে এটা সত্য। পুঁজিবাদের প্রফেট অ্যাডাম স্মিথ পরিস্কারভাবেই বলেছিলেন যে, মানুষ প্রকৃতিগতভাবে লোভী। তাদের সে লোভ পূরণে রাষ্ট্র যদি সহায়তা দেয়, তাহলে সমাজে কিছু ধনীর জন্ম হবে। তারা শিল্প-কারখানা, কৃষি খামার গড়ে তুলবেন এবং লাখ লাখ মানুষের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবেন। তার এই প্রফেটিক মন্তব্য যে কত সত্যি আজ বাংলাদেশে তা প্রমাণিত হলো। ক্ষমতার চূড়ায় যারা সবসময় প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে রয়েছেন, তাদের মধ্যে কতজন সে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত, তা প্রকাশ পাবে যদি প্রধানমন্ত্রী তা চান।

তিন. বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় প্রতি বছর হুহু করে বাড়ছে। এটা নিশ্চয়ই আনন্দের খবর। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, এই বর্ধিত জিডিপি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। কিছু লোভী দুর্বৃত্তের দখলে চলে যাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে তারা শক্তি সঞ্চয় করছে। ফলে সমাজে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। খোঁজ নিয়ে দেখুন, সমস্ত ক্যাসিনোর মালিক ও তাদের নিয়ন্ত্রক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বের অতীত ইতিহাস কী বলে? হয়তো মাত্র দশ-পনেরো বছরের মধ্যে তারা তাদের অতীত বিসর্জন দিয়ে আজ অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অবৈধভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। সেই সঙ্গে তাদের সহায়তাদানকারী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের ও অন্যদের সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে গেছে। সরকারি ভাষ্যমতে, আমরা দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছি। মধ্যম ও উচ্চআয়ের দেশের শরীরে কিছু উপসর্গ সুপ্ত থাকে। তার মধ্যে ক্যাসিনো সংস্কৃতি একটা। কাজেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলে একসময় এ উপসর্গগুলোকে কি বৈধতা দিতে হবে? পুঁজিবাদ যে কোনো নৈতিকতার ধার ধারে না। ইসলামের পুণ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃত সৌদি আরবে সম্প্রতি হালাল নাইট ক্লাব উদ্বোধন করা হয়েছে। সেখানে কী হবে? এই ভিডিওটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, তা প্রমাণ করে উচ্চ ও মধ্যম আয়ের দেশের আইনসঙ্গত 'ক্যাসিনো' বা 'নাইট ক্লাবে' যা হয়, সেখানে তার ব্যতিক্রম হবে না। এগুলোই পুঁজিবাদী সমাজের অগ্রযাত্রার একটা উপসর্গ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ধনকুবেররা সেখানে আসবেন। ক'দিন মজা লুটবেন। তারপর চলে যাবেন। ইতিমধ্যে দেশ অর্জন করবে মিলিয়নস ডলার।

বাংলাদেশের উঠতি ধনী শ্রেণি সেই পথই অনুসরণ করছে। সমকাল প্রশ্ন তুলেছে, কাদের পকেটে যায় 'ক্যাসিনো'র টাকা? উত্তরটা এ রকম- এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পকেটে যায়। দু'দিনের মধ্যে খালেদ, শামীম, ফিরোজের গ্রেফতার দেশের জন্য অশনিসংকেত। এমন কতজন যে এখনও ধরা পড়েনি কিংবা ভবিষ্যতে ধরা পড়বে (যদি পড়ে) কেউ জানে না। যাদের রাজনৈতিক শক্তি যত বেশি তাদের পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। কারণ দুর্নীতির সঙ্গে রয়েছে রাজনীতির মেলবন্ধন।

চার. প্রধানমন্ত্রী একটু দেরি করে ফেলেছেন। বিলম্বে হলেও দেশবাসী প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন দেখতে চায়। দুর্নীতির শিকড় সমাজের রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, সেসব নির্মূল করে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়া ভীষণ কঠিন কাজ। তবু মানুষ আশা ছাড়তে চায় না। ছাড়ে না। প্রধানমন্ত্রীকে তার অবস্থানে অনড় থাকতেই হবে। দেশবাসী আপনার সঙ্গে থাকবেন। দুর্নীতির সঙ্গে রাজনীতির মেলবন্ধন ছিন্ন করুন।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়