দুর্নীতি বন্ধে পদক্ষেপ তবেই সার্থক হবে

 সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

কামাল লোহানী

রাষ্ট্র চলছে, সরকারও আছে; এমনকি ১৪ দলীয় জোটও আছে। কিন্তু সত্য কথা বলতে কি, রাজনীতি নেই। এখন দেশ চালাচ্ছে মাত্র একটি দলের মন্ত্রিসভা এবং তারও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যেসব মন্ত্রী রয়েছেন, তারা যে কথাই বলুন না কেন, বক্তব্যের শেষে জুড়ে দেন 'প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে' তারা এ কাজ করছেন। এটা তো খুব স্বাভাবিক- মন্ত্রিসভার প্রধান যিনি, তিনিই তো যে কোনো সিদ্ধান্তের শেষে চূড়ান্ত নির্দেশ দেবেন। কিন্তু আমার বক্তব্য, সেই কথাটি মন্ত্রীর বক্তব্য বা ভাষণে অথবা সংবাদ সম্মেলনে ওইভাবে কেন উল্লেখ করতে হবে? তাহলে কি প্রশ্ন ওঠে না- মন্ত্রী হিসেবে তার কি দায়িত্ব শুধু নির্দেশ পালন করা, নাকি নিজেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা? বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবেন। কারণ এ ধরনের কথাবার্তায় রাষ্ট্র ও তার পরিচালকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বলে আমার ধারণা। একেকজন মন্ত্রীকে একেকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হয়, এই মন্ত্রণালয়ের যা কিছু করণীয় তার সিদ্ধান্ত নেবেন এই মন্ত্রী। সব বিষয়েই প্রধানমন্ত্রীকে বিরক্ত করা নিশ্চয়ই মন্ত্রিসভার এত সদস্যের দায়িত্ব হতে পারে না।

রাজনীতির পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে কথা উঠলে কিংবা কোনো সংকট অথবা সমস্যা দেখা দিলে, সে সম্পর্কে বড় মন্ত্রী থেকে ছোট মন্ত্রী অনেকেই ওই বিষয় নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু বলার মধ্যে বেশ পার্থক্যও থাকে। এমনকি কোনো কোনো সময় এক মন্ত্রীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে অন্য মন্ত্রীর বক্তব্যও উচ্চারিত হয়। এটা কোনোক্রমেই কাম্য নয়। অন্যান্য সময় 'প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ' বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রীপ্রবরেরা, এসব 'কন্ট্রাডিক্‌টরি' বক্তব্য কি প্রধানমন্ত্রীর অনুসরণেই বলেন? সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের ধারণা, সরকারের 'মুখপাত্র' থাকা প্রয়োজন এবং একমাত্র নির্ধারিত সেই ব্যক্তিরই (এক বা একাধিক) কেবল সরকারের সিদ্ধান্ত কিংবা কোনো ঘোষণা অথবা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে গণমাধ্যমে ব্রিফিং দেওয়া উচিত অথবা যে কোনো সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে কিংবা তারই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বক্তব্য রাখা উচিত। তাহলে 'কন্ট্রাডিক্‌শন' হবে না। ফলে সরকারের ভাবমূর্তিও অক্ষুণ্ণ থাকবে, যেটা যে কোনো সরকারের পক্ষেই অত্যাবশ্যক।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করার জন্য নিউইয়র্ক গেছেন। তার আগে তিনি দলীয় বৈঠকে নেতাদের সামনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দুর্নীতি সম্পর্কে শুনেছি নাম উল্লেখ করে প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি ওই দুর্নীতি ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশও দিয়ে গেছেন। তিনি থাকতেই ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে চাঁদাবাজির অভিযোগে অপসারণ করেছেন এবং কেন্দ্রীয় কমিটির আরও ৭০ জনকে নানা অভিযোগে পদচ্যুতও করেছেন। এদের মধ্যে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সদস্য যারা অনুপ্রবেশ করেছে, তারাও রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক যাওয়ার আগেই যুবলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী 'কেঁচো খুঁড়তে সাপ' বের করে ফেলেছে। রাজধানীর অফিস ও বাণিজ্যপাড়া মতিঝিল এবং আশপাশ এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন ক্লাবে হানা দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিস্ময়কর এক তথ্য দিয়েছে গণমাধ্যমকে। তা হলো- ইয়ংমেনস ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব; এ ছাড়া বনানী ও বেশ কয়েকটি স্থানে ৬০-এরও বেশি 'ক্যাসিনো'র অস্তিত্বের সন্ধান পেয়েছে। শুধু কি সন্ধান? 'সাপের গর্তে কিলবিল করছে কেবল টাকা আর টাকা।' আবার এই কোটি কোটি টাকা রাখার জায়গা না পেয়ে টাকাগুলোকে অলঙ্কারে রূপান্তরিত করেছে। তাই সিন্দুক ভরেছে স্বর্ণালঙ্কারে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছে শুধু রাজধানী নয়, তার বাইরে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় এ অনুসন্ধান চালানোর। তারা উৎসাহের সঙ্গে দিন-রাত এ কাজ করে যাচ্ছে। এই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে র‌্যাব ও পুলিশ রয়েছে। খবর বেরিয়েছে, যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া এই ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকায় গ্রেফতার হয়েছেন। ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবে হানা দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ১৪২ জনকে গ্রেফতার ও ক্যাসিনোর বিপুল সরঞ্জাম জব্দ করেছে। একইভাবে আরও কয়েকটি ক্লাবে হানা দিয়ে জব্দ করেছে জুয়া, ক্যাসিনোর সরঞ্জাম ও মাদকদ্রব্য। পুরান ঢাকায় এক ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা ও তার ভাই গ্রেফতার হয়েছেন একই কারণে। আর যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণ শাখার সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটও নাকি একই দুর্নীতির 'মহারাজা'। কিন্তু তিনি 'সিনাজুরি' দেখিয়ে তার কাকরাইলের অফিসে এক হাজার যুবলীগ কর্মীকে নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন এবং দু'দিন পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। অফিসেই এসব কর্মীর খানা পাকানো হতো আর কর্মীরা 'সম্রাট ভাই'য়ের পক্ষে নানা স্লোগান উচ্চারণ করত। কী দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ! আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ দু'দিন কী করেছে জানি না! পরে যখন পুলিশ খোঁজখবর করে তখন আর কর্মীদের দেখতে পায়নি; পেয়েছে শুধু কয়েকজন দেহরক্ষীকে। আর খুঁজতে গেলে দেহরক্ষীরা জানিয়েছে, 'তিনি অসুস্থ।' অথচ আজ পর্যন্ত সম্রাটকে পুলিশ বা র‌্যাব পায়নি। তবে কি সম্রাট অফিস ভবনের চারতলা থেকে 'উধাও' হয়ে গেছেন? আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, 'এ অভিযান চলবে এবং ঢাকার বাইরে সব জেলাতেই।' মজার ব্যাপার, এই অনুসন্ধানী বাহিনী কিছু হোটেল-রেস্তোরাঁ এমনকি স্পা ও সেলুনে পর্যন্ত হানা দিচ্ছে। তবে এসব ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে- এ ধরনের কিছু জায়গায় হানা দিয়ে পুলিশ কি সরকারের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে 'জলো' করতে চাইছে না?

এদিকে রাজনীতি ক্ষেত্রে দুটি বড় দলের মধ্যে বেশ পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পালা শুরু হয়েছে। একদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, দলীয় প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ প্রমুখ অভিযুক্ত করছেন- 'অনুপ্রবেশকারীরাই এই দুর্নীতি ও ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত'; আবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল, বিএনপি নেতা গয়েশ্বর রায়, নজরুল ইসলাম খান ও মঈন খান পাল্টা অভিযোগ করে বলছেন, 'নিজেদের দুর্নীতি ঢাকার জন্য আওয়ামী লীগ বিএনপির ওপর দোষ চাপাচ্ছে।' পরস্পরের এই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে সাধারণ মানুষ কিন্তু তীক্ষষ্ট নজর রেখেছে। দেশবাসী যখন প্রধানমন্ত্রীর এই 'সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ' পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাচ্ছে, তখনই বিএনপি রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য পাল্টা অভিযোগ চাপিয়ে দিচ্ছে। এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যেও 'বাতির নিচে অন্ধকার' বিদ্যমান। প্রধানমন্ত্রী জেনেশুনেই এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

যুবলীগের ওপর হামলা ও খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়াকে গ্রেফতার করার পর কেন্দ্রীয় যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী 'তেড়েমেরে' হানা দেওয়া র‌্যাব-পুলিশকে প্রচণ্ড গর্জনে ধমকেছেন এবং বলেছেন, 'এতদিন ধরে যদি ক্যাসিনো চালুই ছিল, তাহলে আপনারা কী করেছেন? থানার পাশে ক্যাসিনো চলে- আপনারা কি তা জানেন না? যদি জেনে থাকেন, তবে কেন এতদিন ধরেননি? আপনারা কি আঙুল চুষেছেন? ক্যাসিনো যেসব এলাকায় আছে তার থানা ও র‌্যাবকেই তো গ্রেফতার করা উচিত।' আসলেই তো। দীর্ঘদিন ধরে যেখানে ক্যাসিনো চলছে এতগুলো জায়গায়, তো পুলিশ এতদিন কী করেছে? কেন ক্যাসিনোতে হামলা চালায়নি বা যারা ব্যবসা করছে কিংবা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেফতার করেনি? আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আপনাদের যদি জিজ্ঞেস করি, এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপনাদের সায় ছিল, প্রশ্রয় ছিল এবং ভাগবাটোয়ারাতে আপনারাও অংশীদার ছিলেন; তাহলে কী জবাব দেবেন? থানার সন্নিকটেই এত বড় ক্যাসিনো ক্লাব এতদিন ধরে চলছিল- এটা কি আপনারা জানতেন না? নিশ্চয়ই জানতেন। তাহলে কোন স্বার্থে এগুলো বন্ধ করেননি? আপনাদেরই এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, 'রাজনৈতিক চাপে এসব ঘটেছে।' শুনে অবাক লেগেছে, তাই যদি হয়, তাহলে আপনাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন আছে? মন্ত্রীকে কেন জানাননি? পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তার তো প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছানোর 'অ্যাকসেস' আছে; তাকে কি ইতিপূর্বে আপনারা জানিয়েছিলেন? আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আপনাদের কিন্তু 'ধোয়া তুলসী পাতা' মনে হচ্ছে না। আপনাদের কারও কারও নীরবতা অথবা দুর্বলতা পুরো বাহিনীর ওপর বর্তাচ্ছে। শুধু কি তাই? ক্ষমতাসীন সরকারকেও বেকায়দায় ফেলছে। প্রধানমন্ত্রী, আপনি যে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, তা অভিনন্দনযোগ্য। আপনাকে সাধুবাদ জানাই। আপনি বলেছেন, 'যার বিরুদ্ধেই এ ধরনের অভিযোগ থাক না কেন, সে যে কোনো দলের হোক না কেন, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।' আপনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও একই কথা উচ্চারণ করেছেন- তবে 'প্রমাণ থাকলে তাকেও ধরা হবে', এমন কথা জুড়ে দিয়েছেন। যাই হোক, আপনি যে নির্দেশ দিয়েছেন তার প্রতি দেশবাসীর আস্থা রয়েছে। তাই তারা এ নির্দেশের বাস্তবায়ন দেখতে চায়। পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করে নয়; সত্যিকার অর্থেই দুর্নীতিবাজ ও কপট রাজনীতির ছত্রছায়ায় স্বার্থবাদী কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রকে শায়েস্তা করাই যেন আপনার এ পদক্ষেপের শেষ পরিণতি হয়। তবেই আপনার এ পদক্ষেপ সত্যি সার্থক হবে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব