পুলিশই পারে পুলিশের ভাবমূর্তি ফেরাতে

প্রশাসন

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

পুলিশ রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সমাজের অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে পুলিশের সর্বাধিক ভূমিকা রাখার জনপ্রত্যাশা মোটেও অমূলক নয়। কিন্তু সঙ্গতই উদ্বিগ্ন না করে পারে না পুলিশ যখন অপরাধ কিংবা দুস্কর্মের হোতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। উল্লেখ্য, কোনো উর্দিধারী সংস্থার কেউ যদি অপরাধ কিংবা দুস্কর্মে লিপ্ত হয় কিংবা সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলে, তখন দায়টা বর্তায় গোটা বাহিনী কিংবা সংস্থার ওপর। বলা হয়ে থাকে, পুলিশ জনগণের বন্ধু। সরকারের নির্বাহী প্রধান থেকে শুরু করে পুলিশপ্রধানও (আইজিপি) এযাবৎ বহুবার পুলিশকে জনগণের আস্থা অর্জনের ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। পুলিশকে জনগণের সত্যিকারের বন্ধু হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন। কিন্তু পুলিশ কি জনগণের বন্ধু হতে পেরেছে?

অসত্য নয় যে, পুলিশের অনেক অর্জন আছে। এই অর্জনকে খাটো করে দেখার কোনো কারণ নেই। তার পরও জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারছে না পুলিশ। পুলিশের মূল দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু তা করতে গিয়ে তাদের কেউ কেউ কেন নিজেদের বারবার বিতর্কে জড়াচ্ছে? কেন পুলিশ হেফাজতেও মানুষ নিরাপত্তাহীনতার তীরে বিদ্ধ হচ্ছে? পুলিশ সম্পর্কে মানুষের মনে এত শঙ্কার পেছনে কি পুলিশের ভূমিকাই দায়ী নয়? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ফের জরুরি হয়ে পড়েছে। ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধ- এসব গল্প তো আছেই; পুলিশ যেন এখন ভয়ঙ্কর আততায়ী হয়ে উঠছে। খুন-ডাকাতি-ছিনতাই-দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও ধর্ষণের মতো বহুবিধ গুরুতর অপরাধে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নতুন করে ক্রমেই বাড়ছে। এই চিত্র সভ্য, মানবিক, আধুনিক, ন্যায়পরায়ণ, আদর্শ সমাজের জন্য ব্যঙ্গাত্মক, প্রশ্নবোধক।

খুলনার জিআরপি থানা পুলিশ হেফাজতে আশ্রিতা এক নারীর থানার ওসি ও কয়েকজন সদস্য কর্তৃক ধর্ষিত হওয়ার ঘটনার রেশ না কাটতেই ফের এক এসআই কর্তৃক আসামির স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠল! যশোরের শার্শা উপজেলার গোড়াপাড়া পুলিশ ক্যাম্পের এসআই খায়রুল ও তার সোর্সের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ নিয়ে সমাজে তোলপাড় চললেও তাকে প্রত্যাহারের মধ্য দিয়েই আপাতত ব্যবস্থা(?) গ্রহণপর্ব যেন শেষ হলো। ৩ সেপ্টেম্বর রাতে করা ধর্ষণ মামলায় এসআই খায়রুলকে আসামি তো করাই হয়নি, উপরন্তু বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে থানায় ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। আক্রান্তের বক্তব্য হলো- ভয়ে তিনি এসআই খায়রুলকে আসামি করেননি। পরে আক্রান্ত ওই গৃহবধূ সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের কাছে খায়রুলের নাম প্রকাশ করেন এবং সবার বিচার দাবি করেন। উল্লেখ্য, ওই দিন আক্রান্ত নারী নিজেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে গেলে আইনি জটিলতার কারণে তাকে পুলিশের কাছেই ফেরত পাঠানো হয়। কারণ ওই চিকিৎসা কিংবা শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া প্রচলিত আইনমাফিক (দীর্ঘদিন ধরে এ আইন বা নিয়ম বদলের দাবি জানানো হচ্ছে নানা মহল থেকে) পুলিশের মাধ্যমেই হতে হবে। আক্রান্ত ওই নারীর স্বামীকে এসআই খায়রুল গ্রেফতার করে প্রথমে ৫০ বোতল ফেনসিডিল দিয়ে আদালতে চালান করেন। এর ক'দিন পর ওই এসআই গভীর রাতে সোর্সসহ আসামির ঘরে ঢুকে মামলা থেকে অব্যাহতি দানের জন্য তার স্ত্রীর কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। তিনি টাকা দিতে অসম্মত হওয়ায় এসআই খায়রুল সোর্স কামরুল সহযোগে ওই নারীকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ। মামলাটি পিবিআইয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। আমাদের দেশে ধর্ষণের তদন্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রক্রিয়া এখনও জটিলতার বৃত্তবন্দি।


নিশ্চয়ই অনেকে ভুলে যাননি দিনাজপুরে টহল পুলিশের কাছে আশ্রয় চেয়ে ইয়াসমিন নামের এক অসহায় নারী কীভাবে ধর্ষণের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছিলেন। হয়তো মনে আছে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান থানার উপপরিদর্শক জাহিদুল ইসলামের অস্ত্রের মুখে এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের কথাও। এমন দৃষ্টান্ত আরও দেওয়া যাবে। এবারে অভিযোগ, পুলিশ আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দানের জন্য টাকা দাবি করে না পাওয়ায় তার স্ত্রীকে ধর্ষণের। ঘটনা আরও আছে। ৫ সেপ্টেম্বর সমকালে প্রকাশ, ছিনতাইচেষ্টার অভিযোগে গণপিটুনির শিকার পুলিশ। রাজধানীর মতিঝিলে ব্যবসায়ীর ১০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে ঢাকার বংশাল থানায় কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল আল মামুন। ৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে সে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী পুলিশের প্রহারে আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এ রকম ঘটনা অতীতেও অনেক ঘটেছে। একই দিন সমকালে ভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ, রাজশাহীর পুঠিয়া থানার ওসি সাকিল উদ্দীন আহমেদ বাপ্পীর বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। তার বিরুদ্ধে রয়েছে অন্যের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ। হত্যার অভিযোগেও তিনি অভিযুক্ত। যতদূর জানি, বিধি অনুযায়ী পুলিশের কোনো সদস্যের নামে মামলা হলে তিনি যেদিন গ্রেফতার হবেন বা জামিন নেবেন, সেদিন থেকেই তিনি সাময়িক বরখাস্ত থাকবেন। বাপ্পী ইতিমধ্যে দু'বার জামিন নিয়েও কী করে স্বপদে বহাল আছেন? কোন খুঁটি তাকে এমন শক্তি জুগিয়েছে? ৬ সেপ্টেম্বর সমকালের আরেকটি প্রতিবেদনে জানা যায়, কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের সংরক্ষিত বনভূমির এক হেক্টর জায়গা দখল করে নিজস্ব স্থাপনা গড়েছেন পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক একামুদ্দিন। তার আবার নিজস্ব বিরাট বাহিনী রয়েছে, যারা এসব পাহারা দেয়! বাপরে বাপ!

পুলিশের বিপথগামীদের দুস্কর্মের খতিয়ান আরও দীর্ঘ করা যাবে। আমাদের অভিজ্ঞতায় এও আছে, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ বিভাগ বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সচেষ্ট হয় কিংবা এতই মন্থর গতিতে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা চূড়ান্ত অর্থে শিষ্টের দমন, দুষ্টের লালনে রূপ নেয়। পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন উঠছে। দিনের পর দিন মানুষের কাছে পুলিশের গ্রহণযোগ্যতা কমছে। আস্থা অর্জনে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে পুলিশ। অতীতে হাইকোর্ট পুলিশের উদ্দেশে এমনও বলেছেন, 'ধরে নিয়ে মেরে ফেলবেন, গ্রেফতার পর্যন্ত দেখানো হবে না- এর একটা স্থায়ী সমাধান দরকার।' আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে দুর্বৃত্তপরায়ণ লোকের প্রবেশের সুযোগ পাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত। একে গোড়ায় গলদ হিসেবে গণ্য করা যায়। এবার পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে প্রক্রিয়া অনুসৃত হয়েছে এবং স্বচ্ছতার যে দৃষ্টান্ত মিলেছে; শুদ্ধিকরণের জন্য এমনটিই হলো মুখ্য দাওয়াই। নিয়োগ প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন করতে না পারলে কিংবা নিয়োগকালে যদি অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রাধান্য পায়, তাহলে পেশাজীবনে এর প্রতিফলন ঘটবেই। অতীতের প্রায় সব নিয়োগ প্রক্রিয়াই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। দুর্মুখেরা এমন কথাও বলেছেন, নিয়োগ থেকে পোস্টিং, বদলি প্রক্রিয়া পর্যন্ত যেখানে এত বিনিয়োগ, সেখানে তো দুস্কর্ম-পঙ্কিলতায় তারা জড়াবেই। এই তিক্ত কথা অনেক ক্ষেত্রেই অমূলক নয়।

জনবান্ধব পুলিশ প্রশাসন যদি গড়ে না ওঠে তাহলে একদিকে যেমন সামাজিক স্থিতিশীলতা-জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, অন্যদিকে আইনের শাসনও থেকে যাবে সুদূর পরাহত। 'পুলিশ জনগণের বন্ধু'- এই আপ্তবাক্য যতই ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হোক না কেন, বাস্তবতা এখনও এর বিপরীত। অথচ বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ এমনকি স্বাধীন দেশেও বহু ক্ষেত্রে পুলিশের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। কিন্তু কেন, কী করে, কাদের জন্য পুলিশের এত অর্জনের বিসর্জন ঘটছে, তা খতিয়ে দেখে যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত করতে পুলিশ বিভাগকেই জোরদার ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বন্ধ করতে হবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কিংবা উদ্দেশ্যমূলক পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার। দায়বদ্ধতা-জবাদিহির পাঠও পুষ্ট করতে হবে। দিতে হবে পেশাদারিত্বের পরিচয়। আমরা বিশ্বাস করি, পুলিশ বাহিনীতে অনেক দায়িত্ব-কর্তব্যপরায়ণ, নিষ্ঠাবান, সৎ, দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। একজন ডিআইজি মিজান, একজন ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ গোপাল, একজন ওসি মোয়াজ্জেম, হেলাল কিংবা সাকিল উদ্দিন আহমেদ, একজন এসআই খায়রুল- এমন দুস্কর্মকারী কতিপয়ের কারণে গোটা বাহিনীর বদনাম হতে পারে না। পুলিশের যারা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত তাদের শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। যথাযথ প্রতিকারের মধ্য দিয়েই নিশ্চিত করতে হবে প্রতিবিধান।

সমাজে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ- 'বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ'। এই প্রবাদ বাক্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেক নজিরই আমাদের সামনে রয়েছে। সিস্টেমের যে পুঞ্জীভূত গলদ তা সারাতে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে নিজেদের দিকে সর্বাগ্রে তাকাতে হবে। পুলিশকে তাত্ত্বিকভাবে শুধু জনগণের বন্ধু বললেই হবে না, কাজে তা প্রমাণ করতে হবে। বন্ধুত্বের প্রধান শর্ত আস্থা অর্জন। আর এই আস্থা অর্জন করতে না পারলে সমাজে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাবে। পুলিশের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে- তা অসত্য নয়। তার পরও তাদেরই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশই পারে পুলিশের হূত ভাবমূর্তি ফেরাতে।

সাংবাদিক ও লেখক