রাজনীতির নতুন ছক

এনআরসি

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ফরিদুল আলম

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার গত এক দশকের বেশি সময় ধরে চলমান উষ্ণ সম্পর্কে কি এবার ফাটল ধরতে যাচ্ছে কি-না, এই মুহূর্তে এটাই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্নেষকদের জন্য বিশ্নেষণের বিষয়। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চূড়ান্তভাবে ভারত সরকার কর্তৃক আসামের নাগরিকত্বের তালিকা করা হলো, সেটা নিয়ে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে বিস্তর বিতর্ক। ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আসামে এই নাগরিকত্বের তালিকা হালনাগাদ করা নিয়ে সেখানে কার্যত এক ধরনের স্পষ্ট বিভাজনের সৃষ্টি হয়। বিজেপি সরকার যে সুনির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল এর প্রমাণ হচ্ছে, ২০১৬ সালে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ২০ লক্ষাধিক অবৈধ বাংলাদেশির বসবাস রয়েছে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য আসামে। গত ৩১ আগস্ট সরকার কর্তৃক ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনশিপের (এনআরসি) চূড়ান্ত ফলাফলেও মোটামুটি এমন সংখ্যার কথাই জানানো হলো। ভারত সরকারের দাবি অনুযায়ী ১৯ লাখ ছয় হাজার ৬৫৬ জন অধিবাসী তাদের নাগরিকত্বের সপক্ষে প্রমাণাদি দাখিল করতে পারেননি। সে মোতাবেক তাদের পরিচয় তারা রাষ্ট্রহীন মানব। অবশ্য কিছুটা আনুষ্ঠানিকতা তারা রেখেছে এনআরসি ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আপিল সুবিধা রেখে এবং সে জন্য সময় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২০ দিন অর্থাৎ চার মাস। এ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাদের বিষয়ে কোনো দায়িত্ব নেবে না ভারত সরকার অর্থাৎ চূড়ান্তভাবে তাদের পরিচয় হবে রাষ্ট্রহীন হিসেবে।

এই বাদপড়া লোকদের অধিকাংশই বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়ে অবৈধভাবে বসবাস করছে বলে ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছিল। এদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলিম। উল্লেখ্য, আসামে ৩১ লক্ষাধিক মুসলমান রয়েছে এবং এ সংখ্যাটি ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পর সর্বাধিক। এ ক্ষেত্রে ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকারের বৈশিষ্ট্য যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখব, উগ্র হিন্দুত্ববাদী এই দলটি ওপরে যতই উদারপন্থা প্রদর্শন করুক না কেন, ধীরে ধীরে তারা তাদের দলীয় আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। ইতিমধ্যে তারা টানা দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করে কিছুটা দেখিয়ে দিয়েছে। কাশ্মীর নিয়ে মোদি সরকারের পদক্ষেপ এবং আসামের এনআরসি নিয়ে নির্বাচনের আগেই এক ধরনের ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনের পর ও সরকার গঠনের পর তারা সেটা বুঝিয়ে দিল। বিষয়টি নিয়ে তারা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের পক্ষে উদ্বেগ জানানো সত্ত্বেও তারা এটিকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এর ফলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে আশ্বস্ত করলেও এই পদক্ষেপ থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার এক ধরনের শঙ্কা থেকে যায়। এ কারণেই শঙ্কা থেকে যায়, যারা নাগরিক অধিকার হারালেন বা চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় হারাতে যাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশের বলে ভারতের দাবি এবং এটি যদি ভারতের পছন্দসই সমাধান না হয়, তবে ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির পথে এটা বারবার কাঁটা হয়ে সামনে আসবে।

আমি মনে করি না, ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রতি তাদের দেশের নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদপড়া ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতি খুব কঠোর হবে। এর পরিবর্তে বরং তাদের ভাষায় হিন্দুত্ববাদের আদর্শকে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করার এটা একটা উপলক্ষ হিসেবে তারা দেখছে। তারা এই মেয়াদে ক্ষমতাসীন হয়ে গত মেয়াদের এবং সেই সঙ্গে তাদের দলীয় আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে এখন উঠেপড়ে লেগেছে। এই লক্ষ্যে তারা যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠার জন্যও তারা মোটামুটি তাদের সব পরিকল্পনা গুছিয়ে এনেছে। এর সবকিছুর মূলে তাদের মৌলবাদী ধ্যান-ধারণার বিকাশ এবং বিস্তার ঘটানো। এর মধ্য দিয়ে তারা প্রতিবেশী রাষ্ট্র, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করলেও এর কোনো নৈতিক এবং আইনগত ভিত্তি তারা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না জেনেই বারবার বাংলাদেশকে এ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হতে আশ্বস্ত করেছে। গত মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয় শংকরের বাংলাদেশ সফরের সময়ও এ নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তার বক্তব্য ছিল- এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বস্তুতপক্ষে বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের এবং কোনো রকমের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে এ বিষয়ের আনুষ্ঠানিক অবতারণা না হওয়া থেকে এটাই অনুমান করা যায়, বিজেপি সরকার সেখানে বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক গেম খেলছে, যার মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ের জন্য তাদের দল সরকার পরিচালনায় বহাল থাকতে পারে। আর বর্তমান সময় তাদের জন্য খুব বেশি উপযোগী এ কারণে যে, বিজেপিবিরোধী দলগুলোর মধ্যে তাদের নীতির বিষয়ে একক এবং যৌথভাবে সে রকম শক্ত প্রতিবন্ধকতা এখনও তৈরি হয়ে ওঠেনি।


প্রশ্ন হচ্ছে, প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চূড়ান্তভাবে সরকারের সিদ্ধান্তের বৈধতা পাবে- এর মধ্য দিয়ে আসলে সেখানকার সাধারণ মানুষ কতটুকু সুফল পাবে! এই চূড়ান্ত তালিকায় বঞ্চিতরা বিশেষ আদালত বা এনআরসি ট্রাইব্যুনালে মামলা এবং যথাযথ প্রমাণ দাখিলের মাধ্যমে তাদের নাগরিক অধিকার ফিরে পেতে পারেন বলা হলেও আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, এই বিশেষ আদালতের ধারণা প্রবর্তন করা হয় ১৯৬৪ সালে। এরপর থেকে এ পর্যন্ত এক লক্ষাধিক মানুষকে আটক করে বিভিন্ন কারাগারে রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতে এনআরসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫১ সালে এবং এর প্রতিষ্ঠার পেছনে মূল উদ্দেশ্যই ছিল প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করা। এ ক্ষেত্রে ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকারের পদক্ষেপবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধিতা করে এলেও তা যে কেবল বিরোধিতার কারণেই বিরোধিতা- এর প্রমাণ অন্য দলগুলো, বিশেষ করে ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রভাব বিস্তারকারী কংগ্রেসই; কিন্তু এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছিল বিজেপি, যার সুফল কেবল এখন ঘরে তুলতে চাইছে তারাই। আর প্রক্রিয়াটি যে মোটেও স্বচ্ছ নয়, এর প্রমাণ বেশ কয়েকজন বিধায়কের নাম এতে রয়েছে, যারা আসামের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবশালী। সেই সঙ্গে এটাও জানা যাচ্ছে, সেখানকার অনেক নাগরিকের মধ্যে এ নিয়ে এক ধরনের কঠোর সরকারবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। যার প্রমাণ অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে নাগরিকত্বের প্রমাণ দাখিল থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন। সুতরাং এই আপিলের সুবিধা যে তারা খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন, এমনটা ভাবা যাচ্ছে না। ট্রাইব্যুনালগুলো এ ক্ষেত্রে কাজ করবে বলে বলা হচ্ছে; এর অনেকগুলোর অবস্থান দূরবর্তী স্থানে। ট্রাইব্যুনালে সুবিচার না

পেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের গৌহাটি গিয়ে হাইকোর্ট এবং সেখানেও যদি সুবিচার না মেলে তবে দিল্লি গিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে আনার মতো সক্ষমতা ক'জনের রয়েছে, সেটাও দেখার বিষয়।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে ভারত সরকারকে বড় ধরনের এক সংকট মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দিতে পারে- কেউ কেউ এমন ধারণা করলেও এ ক্ষেত্রে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা না থাকলে সরকার পরিস্থিতি উতরে যেতে পারে। সার্বিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, পুরো বিষয়টি বিজেপি তাদের নিজস্ব রাজনীতির ছকে ফেলে পরিচালনা করছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে চিহ্নিত করে তাদের ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার হরণ করে নিজেদের রাজনৈতিক সমর্থনের পাল্লাটাকে আরও ভারী করতে চাইছে ক্ষমতাসীন দল। তবে মানবিক বিবেচনায় সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয়, রাষ্ট্রের এমন আচরণের বলি হতে যাচ্ছে কিছু নিরীহ মানুষ। অথচ বিশ্ব সম্প্রদায়ের এ ক্ষেত্রে হয়তো কেবল নির্বাক হয়ে বসে দেখা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়