আহমদ রফিক :ন্যায়নিষ্ঠ কর্মসাধক

জন্মদিন

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

হাসান আজিজুল হক

আমাদের নিকটজন আহমদ রফিক। আমার প্রিয় রফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ সশরীরে হয়নি। হয়েছিল পত্রালাপের মাধ্যমে। সময়টা ষাটের দশকের মাঝামাঝি হবে। ওই সময় আমার কিছু গল্প এদিক-ওদিক ছাপা হয়েছে মাত্র। থাকি খুলনার ফুলতলায় নিজেদের বাড়িতে। ওই ঠিকানাতেই একদিন একটা পোস্টকার্ড এলো, প্রেরক আহমদ রফিক। তিনি লিখেছিলেন, নাগরিক নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা তিনি নিয়মিতভাবে বের করে আসছেন। সেখানে আমার একটি গল্প পেলে ভালো হয়। এর আগে আহমদ রফিকের কয়েকটি প্রবন্ধ ইতস্তত বিভিন্ন পত্রিকায় পড়েছিলাম; কিন্তু তিনি কে বা কী করেন, সে ব্যাপারে তখন পর্যন্ত আমার কোনো ধারণা ছিল না।

গল্প পাঠানোর অনুরোধ হাতে আসার পর ঢাকা-রাজশাহীর কয়েকজন বন্ধু মারফত জানতে পারলাম, আহমদ রফিক ইতিমধ্যেই প্রাবন্ধিক হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন। পাশাপাশি কবিতাও লেখেন। আর পেশায় চিকিৎসক হলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে ডাক্তারি প্র্যাকটিস করার সুযোগ তাঁর হয়নি। কারণ, তিনি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সর্বোপরি, অসাম্প্রদায়িকতা-বাঙালিত্ব-সাম্যবাদ তথা প্রগতিশীল চেতনার প্রতি তাঁর আস্থা প্রশ্নাতীত। এমন পরার্থপর নাকি কমই হয়। এমন বর্ণনা শুনে মানুষটির বিষয়ে আগ্রহ বেড়েছিল বৈ কমেনি। সেই সময় যেহেতু টেলিফোনে আলাপও দুর্লভ, তাই পত্রযোগেই আমাদের আলাপ ক্রমশ বাড়তে থাকল। তাঁর সম্পর্কে পরিচিতজনের দেওয়া পূর্বোক্ত বিবরণ যে একটুও বাড়িয়ে বলা নয়, তা তাঁর লেখা চিঠিগুলো থেকেই আমার কাছে স্পষ্ট হতে থাকল। বলতে দ্বিধা নেই, অগ্রজতুল্য ওই মানুষটির সঙ্গে ভাবনা আদান-প্রদান করে ওই সময়ের তরুণ আমি কম ঋদ্ধ হইনি। যা হোক, পরে নতুন একটা গল্প লেখা হলে, সম্ভবত সেটি 'আবর্তের সম্মুখে', নাগরিক পত্রিকার জন্য তা পাঠালাম। সময়মতো ছাপাও হলো। পরে নাগরিক-এ আমার আরও ক'টি গল্প রফিক ভাইয়ের সম্পাদনায় বেরোয়। তবে দুঃখের কথা এই, আরও অনেক ভালো পত্রিকার মতোই নাগরিক স্বল্পায়ু হওয়ায় তাতে বেশিদিন লেখার সুযোগ আমার আর হয়নি।

আশ্চর্য কাণ্ড হলো, পত্রালাপের বেশ ক'বছর পর রফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম সামনাসামনি আলাপ হয়। সত্তর-আশির দশকে যখন কোনো কারণে ঢাকা যেতে হয়েছে, অনেক সময়ই তাঁর সাহচর্য পেয়েছি। তবে ঘনিষ্ঠভাবে তাঁর সঙ্গে দিনসাতেক থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল নব্বই দশকের শেষে, তাও আবার শান্তিনিকেতনে। কী একটা উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে বেশ ক'জন কবি-লেখককে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল সেখানে। প্রতিনিধি দলে ছিলেন আহমদ রফিক, আনিসুজ্জামান, সৈয়দ শামসুল হকসহ আরও কয়েকজন। অন্তর্ভুক্ত ছিল এই অধমও। কিন্তু শান্তিনিকেতনে পৌঁছে দেখা গেল, অতিথি ভবনে পর্যাপ্ত ঘর ফাঁকা নেই। চিরকালের সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত রফিক ভাই সব শুনে বলে উঠলেন, আমার জন্য আলাদা ঘরের দরকার নেই, দরকার পড়লে দু'জন এক ঘরে থাকব। এই শুনে আমি বললাম, তাহলে রফিক ভাই আর আমাকে এক ঘরে থাকতে দিন। কর্তৃপক্ষ তেমন ব্যবস্থাই করলেন। ওই সাত দিন আমি রফিক ভাই ও তাঁর জীবনযাপনের ধরন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। দিনভর নানা সেমিনারে অংশগ্রহণ অথবা শান্তিনিকেতনে ঘুরে বেড়ানো। আর দিন শেষে রাতের খাবার খেয়ে ঘরে ফিরে রফিক ভাইয়ের সঙ্গে অন্তহীন আড্ডা। তখন মনে হয়েছিল, রফিক ভাইয়ের লেখার ভঙ্গি যেমন নির্ভার ও বাহুল্যহীন বা বক্তৃতার সময় তাঁর কণ্ঠস্বর যেমন সংযত-স্পষ্ট থাকে, তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাপনের ধরনটাও ঠিক তেমনি। একটুও বাহুল্য নেই, কেবল মাথা উঁচু করে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস-আত্মসম্মান বজায় রেখে জীবন ও সময়ের দাবি মিটিয়ে চলা। আর সেই দাবি মেটানোর মধ্যে কোথাও আত্মপ্রচারের লেশমাত্র নেই, নেই প্রচারের চটক। একটুও বাড়তি চাওয়া নয়, বাড়তি কোনো সুবিধার আশায় কোথাও ধরনা দেওয়া নয়। কেবল দায়বদ্ধ থাকা সত্য, ন্যায় ও নীতির কাছে।

তাঁর চলাফেরা ও ব্যক্তিত্বের এই স্বতন্ত্র মেজাজ তখন শান্তিনিকেতনের কয়েকজন অধ্যাপকের নজরেও পড়েছিল। একজন তো আমাকে বলেই বসলেন, আপনাদের এই প্রবীণ প্রতিনিধি যখন কোনো অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন, খুব জোরে কথা বলেন না; কিন্তু যা বলেন, প্রচণ্ড স্পষ্ট করে বলেন। এই হলেন চিরকালের শক্ত শিরদাঁড়ার মানুষ রফিক ভাই। এখন তাঁর সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ প্রায়ই হয়। বস্তুত আমি তো মনে করি যে, আমাদের চিন্তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে একটা সাযুজ্য সবসময়ই ছিল; তাই দু'জন পরস্পরের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে কখনও কান্ত হই না।

রফিক ভাইয়ের গবেষণাকর্মের প্রাচুর্য ও প্রাবন্ধিক-সত্তার বিস্তার দেখে প্রকৃতই বিস্মিত হতে হয়। প্রায় ৭০ বছরের লেখক-জীবনে তিনি যেভাবে বহু বিচিত্র বিষয়ে একের পর এক গ্রন্থ রচনা করে চলেছেন। তাতে যে কোনো তরুণ লেখকের মনেও ঈর্ষা জাগতে পারে। নিরন্তর কর্মসাধনায় এমনভাবে নিবিষ্ট থাকা খুব সহজ কাজ নয়। জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে তিনি যেমন লিখেছেন, এর পাশাপাশি লিখেছেন চে গুয়েভারাকে নিয়েও। বাংলা ভাষায় চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক 'সিরিয়াস'

গ্রন্থের বড়ই অভাব। সেই অভাব মেটাতে চিকিৎসা বিষয়ে বাংলায় লিখেছেন

একাধিক বই। যতদূর মনে পড়ে, ডেভিডসনের চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক বিরাটাকৃতির ইংরেজি গ্রন্থের বাংলা অনুবাদও তাঁরই করা।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনায় তাঁর নির্মোহ অনুসন্ধানমূলক প্রয়াসের জন্য তো কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। ভাষা আন্দোলনের পূর্বাপর ইতিহাস ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া নিয়ে সহযোদ্ধা আবদুল মতিনের সঙ্গে লেখা তাঁর বইটি আমাদের জন্য যেমন এক অমূল্য সম্পদ, তেমনি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতির অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে তাঁর সাম্প্রতিক লেখালেখিও আমাদের আলোর পথ দেখায়। ভাষা আন্দোলন নিয়ে ছোটদের জন্যও তিনি লিখেছেন একাধিক বই। এ তো তাঁর বৃহত্তর সমাজের প্রতি, সমাজমানসে প্রকৃত ইতিহাসের প্রবাহ প্রবেশ করানোর কর্তব্যের প্রতি দায়বদ্ধতারই পরিচয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও তাঁর বইয়ের সংখ্যা কম নয়। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ আমাদের দীপিত করে। এই বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের রেখে যাওয়া পদচিহ্ন আমাদের নতুনভাবে চিনতে শেখায়। সম্প্রতি তিনি রবীন্দ্রনাথের যে সবিস্তার জীবনী রচনার উদ্যোগ নিয়েছেন বাংলা একাডেমির অনুরোধে, তার দিকেও আমি আগ্রহব্যঞ্জক দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছি।

দেশভাগ বিষয়ে তাঁর বৃহদাকৃতির সৌধপ্রতিম গ্রন্থ 'দেশবিভাগ :ফিরে দেখা'র কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাইব। দেশভাগের ফাঁপাত্ব ও অপ্রয়োজনীতা এই বইতে তিনি যেভাবে ইতিহাসের সাক্ষ্য ও নিজস্ব প্রজ্ঞা দিয়ে উপস্থাপন করেছেন, তা আমার কাছে তুলনাহীন বলে মনে হয়। আমি নিজে দেশভাগের শিকার এবং তা সমগ্র উপমহাদেশের সীমাহীন ক্ষতি এখনও করে যাচ্ছে বলে অভিমত পোষণ করি। কিন্তু আমাদের সাম্যবাদী বন্ধুরাও কেউ কেউ যখন দেশভাগ অনিবার্য ছিল বলে গরম গরম বয়ান ঝাড়েন, তখন সেসব বক্তব্যকে নিছক বাতুলতা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারি না। আশার কথা, রফিক ভাইয়ের এই সুলিখিত মহাগ্রন্থটি উপরোক্ত এমন সব আসর-মাতানো বাতুল বয়ানের সামনে এক মোম ও যুক্তিযুক্ত নিরেট জবাবরূপে হাজির হয়েছে।

রফিক ভাইয়ের বয়স যে ৯০ অতিক্রম করছে, এমন কথা শুনে প্রথমে আমি একটু হকচকিয়েই গিয়েছিলাম। যে মানুষটি এখনও একাধিক পত্রিকায় সপ্তাহে সপ্তাহে কলাম লেখেন নিয়মিত (সেসব লেখার কোনোটির মানই কিন্তু নেহাত নূ্যন নয়), যাঁর প্রতি বছরে পাঁচ থেকে সাতটি সুলিখিত বই বের হয় আর আরও আরও কত সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ-কবিতার হিসাব বাদই দিলাম। তাঁর বয়স আবার ৯০ অতিক্রম কী করে! রফিক ভাইয়ের মানসগঠন যেমন সোজাসাপটা ও নির্মোহ, তাঁর জীবনযাপনের ধরনেও এর ছাপ পড়েছে বলে আমার মনে হয়। আর সে জন্যই এই বয়সেও তাঁর এমন নীরোগ ও সচল থাকাটা সম্ভব হয়েছে। সম্ভবত পাশাপাশি তাঁর ডাক্তারি-জ্ঞানও তাঁকে এমন সুস্থ-সবল-সক্রিয় জীবনযাপনের আনুষঙ্গিক নিদান খুঁজে নিতে সাহায্য করেছে।

আহমদ রফিক ভাইয়ের বয়সও তাহলে ৯০ অতিক্রম করে গেল! আমি এ আশা করব না যে, তিনি শতায়ু হোন। কারণ আমি জানি, রফিক ভাই ঠিকই শতায়ু হবেন। আমি বরং এমন আশা করব, রফিক ভাই শতবর্ষ পার করে আরও ক'বছর সম্পূর্ণ সজীব-সচল-সজাগ থাকবেন। তাঁর দৃঢ়চেতা-ন্যায়নিষ্ঠ জীবনপ্রবাহ আমাদের যেন আরও অনেকদিন পথ দেখাতে পারে।

শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক