ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন তাসলিমা তামান্না


সমকাল :শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেছেন। এর আগে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও একইভাবে পদত্যাগে বাধ্য হন। অন্যদিকে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসির পদত্যাগের দাবি তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. আরেফিন সিদ্দিক :বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের বিচরণ কেন্দ্র। যে বয়সে ছেলেমেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আসে, তখন তাদের মানসিক গঠন, চিন্তাভাবনা অনেক স্পর্শকাতর অবস্থায় থাকে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত তারা যে লেখাপড়া করেছে, সেটা বাস্তবায়নের জন্য তারা একটা জায়গা চায়। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তারা যুক্ত হয়। এ ধরনের পরিবেশে শিক্ষার্থীদের সহায়ক পরিবেশ ধরে রাখাটা প্রশাসনের দায়িত্ব। বিশ্ববিদ্যালয় একটা স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে কাজ করে। সেখানে তারা শিক্ষার্থীদের মতামত, প্রত্যাশা বিবেচনায় রাখে। একজন শিক্ষকই পদোন্নতি পেয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্যে দায়িত্বে আসেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক একটা ভিন্নমাত্রার সম্পর্ক। শিক্ষকের কাজ শেখানো, শিক্ষার্থীর কাজ শেখা। শেখা ও শেখানোর কাজ সবসময় যদি আন্তরিকতার মধ্যে রাখা যায়, তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইদানীং যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তা অনেকটা দূর করা যেত। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক অনাস্থাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংকট তৈরি করছে।

সমকাল :বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতিরও অভিযোগ রয়েছে।

ড. আরেফিন সিদ্দিক : অন্য সব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দুর্নীতি দমন, দুর্নীতিবাজকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কারণ, এখানে দুর্নীতি হলে সুদূরপ্রসারী একটা প্রভাব পড়ে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে, সেটা তদন্ত করে দেখা শিক্ষা কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্ব। তারা এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে- সেটাই ছাত্রসমাজ, দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে।

সমকাল : যেসব উপাচার্য দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিদায় হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?

ড. আরেফিন সিদ্দিক :চাকরিচ্যুতি তো একটা বড় শাস্তি। একই সঙ্গে দুর্নীতির মতো অপরাধ যদি তিনি করেন এবং সেটা প্রমাণিত হয়, তাহলে এর জন্য যে শাস্তি বিধানে আছে, সেটা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

সমকাল :'৭৩-এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী দেশের চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অধীনে চলছে। কিন্তু অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি নিয়মে নিয়োগসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলছে। একই দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ রকম দুই নিয়ম কেন?

ড. আরেফিন সিদ্দিক :বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় দেশে ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এর মধ্যে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তীকালে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পরিচালিত হয় শিক্ষাবিদদের দ্বারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদ, শিক্ষকদের দ্বারা। বঙ্গবন্ধু ওই সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব করেন একজন শিক্ষাবিদকে। অর্থাৎ উচ্চতর শিক্ষা প্রশাসনের সর্বত্র তিনি শিক্ষাবিদদের যুক্ত করেন। পরবর্তীকালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কারণে শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। আর সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বঙ্গবন্ধু যে স্বায়ত্তশাসিত কাঠামো দিয়েছিলেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও সেটা আর দেওয়া হয়নি। ওই সময় যারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে খসড়া করেছিলেন তাদের অনেকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এতটা স্বায়ত্তশাসন দেওয়া ঠিক হচ্ছে কি-না বলে বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক বলেছিলেন, শিক্ষকদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে দাও। আমি চাই, শিক্ষকরা তাদের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাক।

সমকাল :'৭৩-এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী নিয়োগ এখন বিতর্কিত হচ্ছে। দলীয়করণ, অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অযোগ্য, অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। এটা সংস্কার বা পরিবর্তন কি জরুরি বলে মনে করেন?

ড. আরেফিন সিদ্দিক :আমার মনে হয় না। বঙ্গবন্ধু এটা সুচিন্তিতভাবে দিয়ে গেছেন। শিক্ষকরা যদি নিজের বিবেক দ্বারা তাড়িত হন, তাহলে এর চেয়ে ভালো আদেশ আর থাকতে পারে না। কারণ এখানে সবকিছু শিক্ষকদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনভাবে পরিচালনার জন্য। উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার স্বাধীনতা, একাডেমিক কাঠামো অত্যন্ত প্রয়োজন। আমার মতে, সব বিশ্বদ্যিালয়কেই স্বায়ত্তশাসন দেওয়া দরকার।

স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা মনোনয়ন দিচ্ছেন, নির্বাচন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে শিক্ষকরা, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ছাত্র সংসদের প্রতিনিধি, সরকারি প্রতিনিধি, জাতীয় সংসদ সদস্য, অধিভুক্ত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-অধ্যক্ষ আছেন। এখানকার সিদ্ধান্ত ভুল হওয়ার কথা না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এখানে এমন কিছু মানুষের সংযুক্তি হচ্ছে, যারা সিনেটে এককভাবে প্রভাব বিস্তার করে তাদের পক্ষে মত নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। সিনেটের নির্বাচনও তারা প্রভাবিত করছেন।

সমকাল :অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই উপাচার্য বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে দলীয়করণের অভিযোগ রয়েছে।

ড. আরেফিন সিদ্দিক :কোনো উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ছাত্রভর্তিতে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই বিষয়গুলো আলোচনা এবং সেখান থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে জানানোর সুযোগ আছে। এ ছাড়া নৈতিক স্খলন, দুর্নীতি- এগুলোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে শাস্তির বিধান এবং চাকরিচ্যুতির বিধান রয়েছে। যোগ্যতা ছাড়া শুধু দলীয়করণের কারণে নিয়োগের অভিযোগ থাকলে সেটাও জানানো যাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে। একজন যোগ্য ছাত্র নিয়োগ না পেয়ে তার চেয়ে কম মেধাবী টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার নিয়োগ পেলে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা কাজ করবে। টাকা চেয়ে একজন আবেদনকারীর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা অচিন্তনীয় ব্যাপার।

সমকাল :উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া উচিত?

ড. আরেফিন সিদ্দিক : ক্যাম্পাসে বহু নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক আছেন, যারা নিজেদের পদ-পদবির জন্য দৌড়াদৌড়ি কিংবা তদবির করেন না। বরং তারা নিবেদিতভাবে স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানে সসম্মানে কাজ করে যাচ্ছেন। এমন শিক্ষকদের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে হবে। এ কাজটা শিক্ষক সমাজকেই করতে হবে। শিক্ষকরাই জানেন কোন শিক্ষক কীভাবে তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন, কোন শিক্ষক আন্তরিকতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের শেখানোর দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া সরকারের কর্তৃত্বে যারা আছেন, তারাও একটু খোঁজ নিলে জানতে পারবেন, একটা ক্যাম্পাসে কোন শিক্ষকের ওপর শিক্ষার্থীদের আস্থা আছে, কার ভেতরে দুর্নীতির সম্পৃক্ততা নেই।

সমকাল : শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংকট নিরসনে সরকারের নির্দেশনা কী হওয়া উচিত?

ড. আরেফিন সিদ্দিক : নতুন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। এটা খুবই জরুরি। আমাদের সময় প্রত্যেক বিভাগে এমন কিছু নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ছিলেন, যারা নতুন শিক্ষক যোগ দেওয়ার পর হাতে-কলমে শেখাতেন। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, সেটাও শেখাতেন। অস্বীকার করে লাভ নেই- এখন শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সেভাবে সময় দেন না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন, ঘড়ি ধরে শ্রেণিকক্ষে যান। তারপর অনেককে বিভাগে, বিশ্ববিদ্যালয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ শিক্ষক নিজ নিজ কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কেউ কেউ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, কনসালট্যান্সি করেন। শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে যুক্ত থাকার ব্যাপারটাই এখন নেই। এ জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়টা জোরদার করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী মিড-লেভেলের শিক্ষকদেরও দেশে বা বিদেশে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথের কথায়, শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হচ্ছে, মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানো। একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানোই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল কাজ।