জীবনের লড়াইয়ে বিজয়

তাফিদার চিকিৎসা

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ইমতিয়ার শামীম

পৃথিবীর সাড়ে সাতশ' কোটি মানুষের প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখের খেরোখাতায় গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি হয়তো আর সব দিনের মতোই গতানুগতিক একটি দিন। কিন্তু পূর্ব লন্ডনের নিউহ্যাম কাউন্সিলের সেলিনা রাকিব ও মোহাম্মদ রাকিব দম্পতির জন্য এটি অন্য রকম একটি দিন- তাদের জীবনের সবচেয়ে বিষণ্ণতম একটি দিন; আবার একই সঙ্গে নিজেদের নতুন করে আবিস্কারের দিন। এই দিনটি এমন এক ভোর নিয়ে এসেছিল, যে ভোরে এই দম্পতির ঘুম ভেঙেছিল তাদের মাত্র ৫ বছরের মেয়ে তাফিদা রাকিবের যন্ত্রণাময় চিৎকার শুনে। মাথায় প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছিল সে এবং খুব দ্রুতই চলে গিয়েছিল ঘুমের দেশে।

এক বছরও পেরোয়নি; গত ৩ অক্টোবর ব্রিটেনের উচ্চ আদালতের বিচারকের রায়ের মধ্য দিয়ে তাফিদার এই ঘটনাটি নতুন এক মাত্রা পেয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাফিদার মা-বাবার ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিল তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি জানাতে। চিকিৎসার জন্য অন্য কোথাও রাফিদাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও সম্মতি দিচ্ছিল না তারা। তাফিদার ক্ষেত্রে যা হচ্ছিল বা হয়েছে, তা মানবিকতার তো বটেই, আইনি অধিকারেরও লঙ্ঘন। মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকে সুরক্ষা দেওয়ার কি নৈতিক, কি আইনি নীতিটি লন্ডনের রয়্যাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই লঙ্ঘন করেছে। তাফিদার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার অনুমতি পেতে এই কর্তৃপক্ষ আদালতে গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সেলিনা-রাকিব দম্পতিও উচ্চ আদালতে গেছেন তাফিদাকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার বিচারিক পর্যালোচনার আবেদন নিয়ে। উচ্চ আদালতের বিচারক গত ৩ অক্টোবর রায় দিয়েছেন, তাফিদাকে তার বাবা-মা ইতালিতে নিয়ে যেতে পারবেন। বিচারক ম্যাকডোনাল্ড বলেছেন, ইইউভুক্ত অন্য একটি দেশ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার অধিকারে হস্তক্ষেপ করার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। তিনি আশা করেছেন, দ্রুতই তাকে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরিত করা হবে। ভবিষ্যতে তার এই মন্তব্যও নিশ্চয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচারিক যুক্তি হিসেবে ব্যবহূত হবে। চিকিৎসা পেশায় যুক্ত সবাইকে অবশ্যই নৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়গুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ডাক্তাররা বলছেন, আফিদা মস্তিস্কের একটি ধমনি ও সরু নালির অস্বাভাবিক সংযোগ ঘটেছে। এর ফলে তার মস্তিস্ক নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। তারা নিশ্চয় আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তাফিদাকে সুস্থ করে তুলতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন একটি সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়েছেন, যা নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের আইনি পরিধি নিয়েও নতুন নতুন চিন্তার জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি হলো, এর মধ্য দিয়ে সেলিনা ও রাকিব নিজেদেরই আবিস্কার করেছেন নতুন করে এবং পৃথিবীর সাড়ে সাতশ' কোটি মানুষের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকেও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন কাঁদতে হয়েছে এই দম্পতিকে; মুখোমুখি হতে হয়েছে নতুন নতুন সংকট ও অভিজ্ঞতার। নিজেদেরই চিনেছেন তারা নতুন করে। উপলব্ধি করেছেন নিজেদের সুপ্ত শক্তিকে, যা তাদের এমন ভয়ানক সংকটের সামনে দাঁড়িয়েও বিচলিত না হয়ে চোখের জল মুছে নতুন একটি ভোরের আশা করতে শিখিয়েছে। অজস্র মানুষকে তারা চিনেছেন নতুন করে। চিনেছেন ব্রিটেন নামক রাষ্ট্রটিকে নতুন করে এবং লেখাই বাহুল্য, দেশটির জনগণকেও, যারা তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, রাস্তায় নেমেছে।

একবার চিন্তা করা যাক, ব্রিটেনের মেডিসিন কনসালট্যান্ট ড. ফিলিপ হাওয়ার্ডের সেই কথাগুলো, যা তিনি বলেছেন তাফিদার জন্য আন্দোলনকারীদের মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করতে এসে। তিনি বলেছেন, চিকিৎসকের নৈতিক দায়িত্ব তো রোগীর জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা। অথচ চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তির জীবন হরণের অনুমতির জন্য কেউ আদালতে গেছে- এমন ভয়ঙ্কর, নিন্দাজনক ঘটনা তিনি জীবনে দেখেননি। তা সত্যিই বলেছেন ড. হাওয়ার্ড। এই তো খুব বেশিদিন হয়নি, এ বছরেরই এপ্রিলের দিকে ২৭ বছরের এক চেক নারী মারাত্মক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। হেলিকপ্টারে করে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্রুনো ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তিনি কোমায় চলে যান। কোমায় অবস্থানের এক পর্যায়ে মরে যায় তার মস্তিস্ক। ডাক্তাররা তাদের পরীক্ষায় জানতে পারেন, মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা এবং অনাগত সেই শিশুর হূৎপিণ্ড ধুকধুক করছে; তখনও সে অপেক্ষা করছে পৃথিবীতে আসবে বলে। তাই মেয়েটির মস্তিস্ক মরে গেলেও তার গর্ভে বাচ্চাটি যাতে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেন চিকিৎসকরা। চার মাস পর গত ১৫ আগস্ট ক্লিনিক্যালি মৃত এই চেক নারী একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেয়, যার ওজন ২ দশমিক ১৩ কেজি বা ৪ দশমিক ৭ পাউন্ড।

একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে বছরদুয়েক আগে। ২০১৬ সালের ১ নভেম্বর কর্তব্যরত অবস্থায় গাড়ি দুর্ঘটনায় মাথায় ভয়ানক আঘাত পেয়ে অচেতন হয়ে পড়েন আর্জেন্টিনার নারী পুলিশ ৩৪ বছরের আমেলিয়া বান্নানা। পেগাদাস শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। অচেতন অবস্থাতেই ওই বছরের বড়দিনের আগে তার কোলজুড়ে এক ছেলে আসে। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে যখন তার জ্ঞান ফিরে আসে, তখন তিনি বোনের কোলে নিজের শিশুটিকে দেখে ভেবেছিলেন, তার বোনের ছেলে হয়েছে।

এর চেয়েও বিস্ময়কর ঘটনা আছে, যা ঘটেছে আমাদের একালেই। ২৭ বছর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে কোমায় চলে গিয়েছিলেন ৩২ বছরের মুনিরা আবদুল্লাহ। চার বছরের ছেলে ওমরকে স্কুল থেকে নিয়ে আসার পথে বাসের সঙ্গে তার গাড়ির সংঘর্ষ হয়। এ সময় মুনিরা ওমরকে বাঁচাতে তাকে নিজের বুকের মধ্যে জাপটে রাখেন। ফলে দুর্ঘটনার পুরো আঘাতই পড়ে মায়ের ওপরে। মুনিরার সেই ছেলের বয়স এখন ৩১; যে বয়সেই বলা যায় এই যাবতীয় ইহজাগতিকতা থেকে দূরে অব্যাখ্যাত এক ঘুমের দেশে চলে যান মুনিরা। তিনি কোমা থেকে ফিরে আসার পর ওমর সেখানকার গণমাধ্যম দ্য ন্যাশনালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'আমি কখনোই আশা ছাড়িনি। আমার সব সময়ই মনে হতো, একদিন না একদিন তিনি জেগে উঠবেন। আমার এই কাহিনীটি আমি সবাইকে শোনাতে চাই। আমি মানুষের কাছে বলতে চাই, প্রিয়জনের ক্ষেত্রে কেউ যেন কখনোই আশা না ছাড়েন। এ রকম অবস্থায়ও কেউ যেন তাদের মৃত না ভাবেন।'

২৭ বছর ধরে সংগ্রাম করেছে মুনিরার পরিবার। দিনের পর দিন তার চিকিৎসা চলেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-আইন হাসপাতালে। ওমরের বড় হওয়া আর মাকেও বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম একই সুতোয়, একই কাঁথায় বোনা। শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে সরকারি অনুদান পেয়ে মাকে নিয়ে জার্মানিতে যান তিনি এবং মাত্র দুই বছরের মধ্যে এ বছরের এপ্রিলে কোমা থেকে ফিরে আসেন ওমরের মা মুনিরা।

এটি ঠিক, এ রকম ঘটনা হয়তো হাতে গোনা যাবে; কিন্তু হাতে গোনার মতো উদাহরণই-বা কম কিসের? বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনাও তো মানুষকে আলোড়িত করে, শক্তি জোগায় আরও এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরির জন্য। সেলিনা-রাকিব দম্পতি আমাদের জন্য তেমন এক দৃষ্টান্ত তৈরির জন্য সংগ্রাম করে চলেছেন। সমগ্র মানব জাতি কৃতজ্ঞ তাদের কাছে। এটি নিশ্চয় ঠিক, ব্রিটেনের চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত। কিন্তু সেখানকার হাসপাতালের চিকিৎসায় ব্যর্থ হওয়ার পরও যদি সেলিনা-রাকিব দম্পতি নতুন কোথাও চিকিৎসার ব্যাপারে উদ্দীপিত হন, সে ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা কোনো ন্যায়সঙ্গত দৃষ্টান্ত হতে পারে না। হতে পারে, দীর্ঘদিনের সাম্রাজ্যবাদিতার চর্চা ব্রিটেনের কোনো কোনো অংশকে এখনও এত অহমিকায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, নিজেদের অসফলতার চিহ্নসমেত কোনো রোগীকে তারা হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার চেয়ে মৃত্যুজগতে ঠেলে দিতেই বেশি আগ্রহী। হতে পারে ব্রেক্সিটের আছর পড়েছে তাদের ঘাড়ে। যদিও এর কোনোটাই এই সিদ্ধান্তকে ন্যায্যতা দিতে পারে না।

আশার কথা, ব্রিটেনের বাঙালি কমিউনিটিসহ সচেতন নাগরিকরা যেভাবে সেলিনা-রাকিব দম্পতির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, উচ্চ আদালতও রায়ের মাধ্যমে সেই অবস্থানের ন্যায্যতা ঘোষণা করেছেন। সেই যে জীবনানন্দ দাশকে বলতে শুনি, 'মানুষের মৃত্যু হ'লে তবুও/ মানব থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে/ প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে'- তাফিদার চিকিৎসার অধিকার প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রাম যেন অতীত থেকে উঠে আসা আজকের মানুষের সেই চেতনার পরিমাপ দেওয়ারই পরীক্ষা। নিশ্চয় এ পরীক্ষায় সেলিনা-রাকিব দম্পতি বিজয়ী হবেন; জয় হবে মানব জাতির।

সাংবাদিক ও লেখক