সন্ত রবিদাস ও বিজেপির সাম্প্রদায়িকতা

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

গৌতম রায়

সম্প্রতি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে মধ্যযুগের সমন্বয়ী সাধক সন্ত রবিদাসের একটি দীর্ঘকালের মন্দির ভাঙার নির্দেশ আদালতের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। আদালতের সেই নির্দেশ ঘিরে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চরম উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আদালতের নির্দেশ শুধু দিল্লি অঞ্চলেই নয়, গোটা দেশের দলিত মানুষের ভাবাবেগকে প্রচণ্ড রকমভাবে আহত করেছে। আর সন্ত রবিদাসকে ঘিরে সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের ভেতরে জাতপাতের বেড়া ভাঙার যে সামাজিক ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে রয়েছে, সেই ঐতিহ্যের বহুত্ববাদী প্রবণতাকে এককেন্দ্রিক প্রবণতায় পর্যবসিত করে নিজেদের মতাদর্শকে সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে এখন কার্যত আদালতের নির্দেশকে ব্যবহারের পথে হাঁটতে চাইছে সংঘ-বিজেপি।

এ অবস্থায় কেবল দিল্লিতেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাকে সামাজিক, ধর্মীয়- সব ধরনের বিভাজনের পথে পরিচালিত করতে চেষ্টার কসুর করছে না রাজনৈতিক হিন্দুরা। রবিদাসের মন্দির ভাঙাকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদীদের ভেতরে ভারতের বহুত্ববাদী ধ্যান-ধারণাকে বিনষ্ট করে, জাতপাতবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের প্রভাবের ধারাকে ধ্বংস করার একটা জোরদার তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে।

আমাদের দেশে কয়েক হাজার বছরব্যাপী প্রবহমান বহুত্ববাদী সমন্বয়ী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে তৎপরতার শেষ নেই আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির। মধ্যযুগের সমন্বয়ী সাধনার প্রতীক তথা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম প্রাচীন সৈনিক সন্ত রবিদাসের মন্দির ভাঙার জন্য আদালতের নির্দেশ ঘিরে যথেষ্ট খুশি গোটা রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শিবির। দুর্ভাগ্যের বিষয়, দিল্লিসহ দেশের কোনো প্রান্তেই সংঘ-বিজেপি তথা দেশের প্রশাসনের এই যৌথ প্রচারের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রচার বামপন্থিরা ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল করছে না। সন্ত রবিদাসের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বামপন্থি রাজনীতিকরা গোটা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। বামপন্থিদের পক্ষ থেকে খুব স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে, গোটা ভারতবর্ষের বুকে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি যখন বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বুকে কুঠারাঘাত করতে উঠেপড়ে লেগেছে, এ রকম একটি পরিস্থিতিতে, দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের ভাবাবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সন্ত রবিদাসের মন্দির ঘিরে কোনোরকম হঠকারিতার পরিচয় দেওয়া আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।


বস্তুত সন্ত রবিদাস মধ্যযুগের জাতপাতের বেড়া ভেঙে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিলেন। সেই লড়াই যুগ যুগ ধরে দেশের দলিত, পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষ নিজেদের ভেতর সঞ্চারিত করে এসেছে। এই ভাবাদর্শের মূলে আঘাত করাই হলো সন্ত রবিদাসের মন্দির ভাঙা ঘিরে আদালতের নির্দেশ নিয়ে বিজেপির একগুঁয়ে মনোভাবের সবচেয়ে বড় কারণ। এভাবেই দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান ঘিরে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষ, যাদের ভেতরে প্রথাগত শিক্ষার সম্যক বিকাশ এখনও তেমনভাবে হয়নি, তাদের কাছে এই ধারণাটা বিজেপি-সংঘ বদ্ধমূল করে দিতে চায় যে, প্রচলিত সংবিধানের থেকে সংঘের চিন্তাভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি কার্যকর।

সাম্প্রদায়িকতাকে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে স্থাপিত করার ক্ষেত্রে বিজেপির কাছে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো হাজার হাজার বছর ধরে ভারতবর্ষে প্রবহমান বহুত্ববাদী সংস্কৃতি। এই বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে না পারলে আরএসএস বা তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি কিংবা তাদের সব ধরনের সঙ্গী-সাথির পক্ষে নির্বাচনী সাফল্য সত্ত্বেও, তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি 'রাজনৈতিক হিন্দুত্ব'কে স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণেই তারা সবচেয়ে তৎপর মধ্যযুগের সমন্বয়ী সাধনার সাধক সন্ত রবিদাসের চিন্তা-চেতনার মূলে আঘাত হানতে। এই আঘাতের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু, সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে হলো দেশের দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ।

বামপন্থিদের পাশাপাশি গুরু রবিদাস জয়ন্তী স্মরণ সমিতির পক্ষ থেকে গোটা বিষয়টি ঘিরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অখিল ভারতীয় রবিদাস সংগঠনের পক্ষে শুকদেব ওয়াঘমারে গোটা বিষয়টির পেছনে আরএসএসের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, দিল্লির যে মন্দিরটি ঘিরে সমস্যা তৈরি করা হচ্ছে, সেই মন্দিরের জমিটির প্রতি আরএসএসের তীব্র নজর ও লোভ আছে। আরএসএস যে কোনো উপায়ে সরকারের কাছ থেকে সেই জমিটি নিজেদের দখলে নিতে চায় বলে শুকদেব ওয়াঘমারে প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন।



পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে ভারতে ভক্তি আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় চরিত্র হলেন সন্ত রবিদাস। আজকের পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশের বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চলে এক উদার মানবতাবাদী দর্শন, সঙ্গীত ও চেতনার ভেতর দিয়ে ভক্তি আন্দোলনকে এক উন্নতির শিখরে উপনীত করেছিলেন সন্ত রবিদাস। সন্ত রবিদাস একাধারে ছিলেন কবি, সমাজ সংস্কারক এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন। আবার অনেকেরই ধারণা, ১৩৭১ খ্রিষ্টাব্দে তার জন্ম। জনশ্রুতি- যে পরিবারে তার জন্ম, সেই পরিবারটির জীবিকা ছিল পশু চামড়ার ব্যবসা। ভারতবর্ষের সামাজিক বিন্যাস অনুযায়ী সে পরিবারটি ছিল অস্পৃশ্য। তাই নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার ভেতর দিয়ে রবিদাসকে নিজের জীবন পরিচালিত করতে হয়েছিল। রবিদাসের জীবনের এই প্রতিবন্ধকতা পরে তার অনুগামীদের সামাজিক সংস্কারের পক্ষে আন্দোলন সংঘটিত করতে খুব সাহায্য করেছিল। ভারতবর্ষে মধ্যযুগের সাধনার ধারায় সন্ত রবিদাস ছিলেন ভক্তি আন্দোলনের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব তথা কবি রামানন্দের শিষ্য।

মধ্যযুগের সমন্বয়ী সাধনের অন্যতম সেরা সাধক সন্ত রবিদাসের সমন্বয়ী চেতনাসমৃদ্ধ বেশ কিছু গান গুরু গ্রন্থ সাহিব গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মধ্যযুগের অপূর্ব মরমিয়া সাধক দাদুপন্থিদের সাধনার ধারায়ও সন্ত রবিদাসের বেশ কিছু গান ও চিন্তাধারা সমন্বিত হয়েছে।

পঞ্চবান নামক সন্ত রবিদাসের গানসংবলিত একটি পুস্তক দাদুপন্থি সাধকরা তাদের সাধনার ধারার সঙ্গে সমন্বিত করেছেন। রবিদাস তার জীবন, কর্মধারা ও গানের ভেতর দিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেছেন জাতপাত ব্যবস্থার এবং লিঙ্গবৈষম্যের।

রবিদাসের এই জাতপাতের বিরুদ্ধে লড়াই মধ্যযুগের ভারতে সামাজিক বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিল। শিখ ধর্মের মধ্যেও যে জাতপাত ব্যবস্থা ও লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে একটা স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি আছে, সেই দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশে সন্ত রবিদাসের চিন্তা-চেতনার অনেকখানি প্রভাব আছে।

সন্ত রবিদাস বা তার সমন্বয়বাদী চিন্তাধারা, বহুত্ববাদের প্রতি আকর্ষণ- সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, রাজনৈতিক হিন্দুদের কাছে বিশেষ রকমের না পছন্দের বিষয়।

গত শতাব্দীর ছয়ের দশক থেকে 'বনবাসী কল্যাণ আশ্রম' নামক একটি শাখা সংগঠন তৈরি করে আরএসএস; দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের ভেতরে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন 'সাম্প্রদায়িকতা'র প্রচার, প্রসার ও প্রয়োগের লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করেছে। বস্তুত উচ্চবর্ণের অভিজাত ও হিন্দুদের সংগঠন আরএসএস, দলিত হিন্দুদের কাছে, তফসিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত হিন্দুদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে, তাদের উচ্চবর্ণের হিন্দুতে রূপান্তর করার লোভ দেখিয়ে, এই বনবাসী কল্যাণ আশ্রমকে নানাভাবে পরিচালিত করে চলে।

এই সংগঠনকে প্রধান হাতিয়ার করেই তারা গুজরাট গণহত্যায় সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর বর্বরোচিত অত্যাচার চালিয়েছে। সন্ত রবিদাসের সমন্বয়ী চিন্তা-চেতনা দলিত সম্প্রদায়ের মানুষকে, পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষকে, কোনো অবস্থাতেই সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের শিবিরের দিকে ঘেঁষতে দেয় না।

বর্ণ হিন্দুদের জাত ব্যবস্থা যে পিছিয়ে পড়া মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো ধরনের মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে না- এই চিন্তা-চেতনার প্রকাশ, প্রচার ও প্রসারে সন্ত রবিদাসের অনুগামীরা দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সামাজিক আন্দোলন করে চলেছেন। তাদের এই সামাজিক আন্দোলনের রেশ উত্তর ভারতের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে পূর্ব ভারত, পশ্চিম ভারত, এমনকি দক্ষিণ ভারতেও প্রসারিত হয়েছে। সে কারণেই মধ্যযুগের সমন্বয়ী চিন্তা-চেতনার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব সন্ত রবিদাসের দিল্লির মন্দির নিয়ে তাদের এত ক্ষোভ।

ভারতীয় গবেষক