দারিদ্র্য ও বাঙালির নোবেল বিজয়

স্বীকৃতি

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. খুরশিদ আলম

এ বছরও আরেক বাঙালি নোবেল পেয়েছেন, নাম তার অভিজিৎ ব্যানার্জি, কলকাতার ছেলে। এ পর্যন্ত তিনজন বাঙালি অর্থনীতিবিদ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন অমর্ত্য সেন (১৯৯৮), মুহাম্মদ ইউনূস (২০০৬) এবং অভিজিৎ ব্যানার্জি (২০১৯)। আরেকজন বাঙালি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১৩)। তিনজন অর্থনীতিবিদের মধ্যে একটি চমৎকার মিল রয়েছে। আর তা হচ্ছে, তারা সবাই নোবেল পেয়েছেন দারিদ্র্য বিষয়ে কোনো না কোনো গবেষণা বা কাজ করে।

অমর্ত্য সেন নোবেল পুরস্কার পাবেন বলে প্রায় এক দশক ধরে শোনা যাচ্ছিল। ভারতের অনেকে আবার আমাকে বলেছিলেন, তার নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ কল্যাণ অর্থনীতিতে কাজ করলে তার তেমন দাম দেওয়া হয় না। পরে যখন ১৯৯৮ সালে নোবেল পেলেন, তখন তার মা-ও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না- সত্যি সত্যি তিনি সেবার নোবেল পেয়েছেন কিনা। শেষ পর্যন্ত তিনি নোবেল পেয়েছেন এবং তার ভক্তদের তা আর ততটা আনন্দ দেয়নি। কারণ ইতোমধ্যে তা আশা করতে করতে প্রায় ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার নোবেল পাওয়ার এক বিশেষ তাৎপর্য হলো, ৮৫ বছর পর আবার কোনো বাঙালি নোবেল পেলেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কথা বলাই বাহুল্য। নোবেল পাওয়ার অনেক আগে ১৯৯৪ সালে একদিন ড. ইউনূস বিষয়ে প্রচণ্ডভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন আমার এক সহকর্মী। তিনি সোনাগাজী গ্রাম থেকে এসে বললেন, ড. ইউনূস অতিরিক্ত সুদ নিয়ে গ্রামের মানুষকে আরও গরিব বানিয়ে দিচ্ছেন। আমি তাকে বললাম, সেটি ভিন্নকথা। তবে তার কাজের জন্য তাকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া উচিত। ড. ইউনূসকে কেন নোবেল প্রাইজ দেওয়া দরকার, তার কারণ ব্যাখ্যা করলাম। তিনি কথাটা শুনে মোটামুটি শান্ত হলেন। তার প্রায় ছয় মাস পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন একই কথা বললেন। তা তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাকে হেডলাইন হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। আমি আমার সহকর্মীকে দেখিয়ে বললাম, তফাত হলো আমি যখন বলেছি তখন তা ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়নি, আর প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন যখন বলেছেন, তখন তা হেডলাইন হয়েছে।

অভিজিৎ ব্যানার্জির ব্যাপারটা নিয়ে তত বেশি আলোচনা হয়নি। তবে অনেকে ধারণা করেছিলেন, ভবিষ্যতে তিনি তার কাজের জন্য নোবেল পেতে পারেন। আমার নিজেরও ধারণা ছিল, তিনি গবেষণা করতে করতে হয়তো দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন এবং সে ধারা ধরে একদিন হয়তো নোবেল পেতে পারেন।

নোবেল বিজয়ী এই চারজনের মধ্যে তিনজনের মিল রয়েছে একটি বিষয়ে। তারা তিনজন নোবেল পেয়েছেন দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কোনো না কোনো কাজ করে। অমর্ত্য সেন পেয়েছেন দারিদ্র্য বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞান তৈরির জন্য, মুহাম্মদ ইউনূস পেয়েছেন দারিদ্র্য দূরীকরণে গরিবদের উপযোগী ব্যাংক তৈরির জন্য। আর অভিজিৎ ব্যানার্জি পেয়েছেন দারিদ্র্য দূরীকরণে ল্যাব তৈরি করার জন্য।

আর এবার নোবেলের কারণে তেমন উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। কারণ ইতোমধ্যে চারজন বাঙালি এটি পেয়ে গেছেন, আরও দু'একজন পাই পাই করেও পাচ্ছেন না। তাই প্রথম প্রথম পাওয়ার যে আনন্দ সেটি হয়তো তেমন নেই। এটিও অর্থনীতির তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। একজন হিসাব করে দেখিয়েছেন, বাঙালিরা নোবেল জিতেছে চারটি (রবীন্দ্রনাথ, অমর্ত্য সেন, মুহাম্মদ ইউনূস ও অভিজিৎ ব্যানার্জি); তামিলরা জিতেছে তিনটি (রমন, চন্দ্রশেখর এবং ভেংকট রমন); পাঞ্জাবিরা দুটি (হরগোবিন্দ খোরানা ও আবদুস সালাম); আবার আবদুস সালামের নাম প্রস্তাব করেছিলেন ড. আবদুল মতিন চৌধুরী (প্রয়াত ঢাবি উপাচার্য), পাখতুনরা একটি (মালালা ইউসুফজাই), হিন্দুস্তানি একটি (সত্যার্থী)। বস্তুত সারা ভারতের লোকেরাই বাঙালিদের বেশি মেধাবী বলে মনে করে। হয়তো তারা সামুদ্রিক মাছ বেশি খায়, তাতে আয়োডিন বেশি, সে কারণেও হতে পারে। তবে তামিলরা এ ক্ষেত্রে বাঙালির চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই।

তিনজন দারিদ্র্য নিয়ে নোবেল পেলেও তাদের অবদান ছিল ভিন্ন ভিন্ন। অমর্ত্য সেনের অবদান হলো, তিনি দেখিয়েছেন, খাদ্যের অভাব থাকলে দুর্ভিক্ষ হয়- এটি আমরা সবাই জানি। কিন্তু খাদ্যের অভাব না থাকলেও দুর্ভিক্ষ হতে পারে। অর্থাৎ হাজার বছরের পুরোনো ধারণাকে তিনি বদল করার তত্ত্ব হাজির করেছিলেন। পৃথিবীতে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় এটি একটি অনন্য অবদান। এ ছাড়া তার আরও অনেক তাত্ত্বিক অবদান রয়েছে। যেমন মানব উন্নয়ন সূচক (পাকিস্তানের মাহবুবল হকসহ), দারিদ্র্য পরিমাপ পদ্ধতি, ব্যক্তিস্বাধীনতাই হচ্ছে উন্নয়ন প্রভৃতি।

অন্যদিকে হাজার বছরের পুরোনো জ্ঞান হচ্ছে, ব্যাংক তাদের জন্য যাদের টাকা আছে। আর মুহাম্মদ ইউনূস হাজার বছর পরে এসে দাবি করলেন, ব্যাংক তাদের জন্য হওয়া দরকার, যাদের টাকা নেই। তিনি যখন প্রথম এ তত্ত্বটি হাজির করেন, তখন প্রায় সবাই তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি তা প্রমাণ করতে পেরেছেন- ব্যাংকের টাকা গরিবদের দিলে তা বেশি কাজে লাগে, তারা তা মেরে খায় না। কিন্তু বিত্তশালীরা ব্যাংকের টাকা মেরে খায়। গ্রিক বাংকো ধারণার পর থেকে সারা পৃথিবীতে যা শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল, তা তিনি ভুল প্রমাণ করতে পেরেছেন। সুতরাং তার গৃহীত পদ্ধতির নানা সমালোচনা থাকলেও তার ধারণাটি সম্পূূর্ণ নতুন- এ কথা বলা যায়।

আর অভিজিৎ ব্যানার্জি বহুদিন ধরে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য মাঠে কোনটি বেশি কাজ করে, তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। যেমন কী করলে শিশুরা বেশি শিখবে, কী করলে মায়েরা তাদের শিশুদের টিকা প্রদানের জন্য কেন্দ্রে নিয়ে যাবেন, টাকা দিলে গরিব মানুষ কীভাবে কাজে লাগাতে চায়- এ ধরনের বিষয়, বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প মূল্যায়ন থেকে কী শিক্ষা নেওয়া যায়, তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তার এসব উদ্যোগ থেকে প্রায় ৪০ কোটি মানুষ উপকৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। দারিদ্র্য নিয়ে মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষার কথা প্রায় সবাই বলেছেন; তবে তিনি সরাসরি তা করার চেষ্টা করেছেন। তারপরও অনেকের ধারণা, অভিজিৎকে একটু আগেভাগে নোবেল দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে হোক না তাই, পাশের বাড়ির ছেলেকেই তো দিয়েছে।

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

khurshedbisr@gmail