সাক্ষাৎকার: এম এ মান্নান

জনগণের অর্থ নিয়ে রাজনীতি করি না

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সবুজ ইউনুস

সরকারের বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান গত মেয়াদে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারও আগে ছিলেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী। সাবেক এই আমলা ২০০৫ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদেও সুনামগঞ্জ থেকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এম এ মান্নানের জন্ম ১৯৪৬ সালে সুনামগঞ্জে


সমকাল: অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পরও গত এক দশক ধরে দেশের ব্যাপক উন্নতি হচ্ছে। বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল বলা হচ্ছে বাংলাদেশকে। এই উন্নয়নের পেছনে রহস্য বা ম্যাজিকটা কী?

এম এ মান্নান: ম্যাজিক আমার কাছেও মনে হয়। তবে ম্যাজিক বা রহস্যটা ভাঙতে হবে। রহস্যটা মূলত দু'দিক থেকে। বাংলাদেশ সম্পর্কে শুরু থেকেই একটা নেতিবাচক ধারণা ছিল। যেমন ধরুন- তলাবিহীন ঝুড়ি, এত মানুষ, এত দারিদ্র্য; তারপর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ- এই নেতিবাচক ধারণা সারাবিশ্বেই ছিল। বিশেষ করে বিশ্ব গণমাধ্যমে এটা বেশি ছিল। সেখানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যখন আস্তে আস্তে বাড়তে থাকল, ক্রমান্বয়ে তা যখন ৬-এ গিয়ে দাঁড়াল, তখন সবাই চমকে গেল। ৬ কিন্তু একটি ম্যাজিক নম্বর। ৬-এর অচলায়তন ভাঙা হলো ২০০৯ সালে। এখন সেই প্রবৃদ্ধি ৮। এর পর একটানা দেশ সামনে এগোচ্ছে। উন্নয়ন এখন দৃশ্যমান। সারাদেশে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, অবকাঠামো হচ্ছে। বিদ্যুৎ যাচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার; লাইন টানা হচ্ছে এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত। বিরাট বিরাট সেতু নির্মিত হচ্ছে চোখের সামনে। সারাদেশে স্কুল হচ্ছে। বর্তমানে সারাদেশে দেড়শ' শুধু বিশ্ববিদ্যালয়। ৬০-৭০টা মেডিকেল কলেজ। বিশ্বের বড় বড় পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞ অনেক হিসাবনিকাশ করে দেখেছেন, এটা ম্যাজিক নয়; বাস্তব। এ জন্য 'ম্যাজিক' শব্দটা শুনতে ভালো লাগলেও এটাকে ম্যাজিক বলব না। বলব- বাস্তব। সব উন্নয়ন কাজের শুরু কিন্তু এই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে। সব উন্নয়ন প্রকল্পের সূতিকাগার হলো এই মন্ত্রণালয়।

সমকাল: প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ আছে। দুর্নীতি কমাতে কী কী  পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

এম এ মান্নান: দুর্নীতি কমাতে হলে আইন করতে হবে। পুরো প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে ৫টি স্তর রয়েছে। এই স্তর কমাতে হবে। যদি একটি স্তর কমাতে পারি, তাহলে দুর্নীতি করার সুযোগ ২০ শতাংশ বন্ধ হয়ে যাবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পদ্ধতি ডিজিটাল করতে হবে, কেউ যাতে ফাইল নিয়ে বসে থাকতে না পারেন। বসে থাকেন মূলত দুর্নীতির জন্য। এটাই হলো দুর্নীতির ধ্রুপদি নিয়ম। কাগজের স্বার্থসংশ্নিষ্ট কেউ আসবে, তার সঙ্গে দরদাম হবে। সেই সুযোগ তাকে দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী মোটিভেশন কার্যক্রম আছে আমাদের। আমরা দুর্নীতিবিরোধী প্রচার চালিয়ে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করে থাকি। দুর্নীতিবাজদের তিরস্কার করা হচ্ছে। তবে শাস্তি আইনানুগ প্রক্রিয়ায় করতে হবে। একজন পকেটমারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ঠিক হবে না। আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। নতুবা আইনের শাসন থাকবে না।

সমকাল: প্রকল্পে দুর্নীতি রোধে সুনির্দিষ্টভাবে কী কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

এম এ মান্নান: আমার মন্ত্রণালয়ে প্রকল্পগুলো প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে আমার মন্ত্রণালয়ে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ আছে। যারা প্রকল্পগুলো মাঠে গিয়ে দেখভাল করেন, তাদের সচেতন করার চেষ্টা করছি। তারা যেন ঘন ঘন ফিল্ড ভিজিটে যান। আমি নিজে বিভিন্ন বিভাগে গিয়ে প্রকল্প পরিচালকদের নিয়ে সভা করছি। এটা আগে ছিল না। প্রকল্প পরিচালকদের বোঝাচ্ছি; জানতে চাচ্ছি- কেন প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে? কেন ১০ টাকার মাল ২০ টাকায় কেনার খবর পত্রিকায় দেখছি? আমি তাদেরকে বলেছি, যদি আমার অফিসেও কোনো ফাইল বা কাজে দেরি হয়, তাহলে বলেন; আমি সেটা সঙ্গে সঙ্গে করে দেব। যদি ওপরে হয়, তাহলেও বলেন। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে আমি কাজ করিয়ে আনব।

সমকাল: রূপপুর আবাসিক প্রকল্পে একটি বালিশ ফ্ল্যাটে তুলতেই ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার টাকা। এভাবে বিস্ময়কর সব দুর্নীতির খবর আসছে গণমাধ্যমে। এর কী জবাব দেবেন?

এম এ মান্নান: আমাদের এখানে যখন প্রকল্প প্রস্তাব আসে, সেগুলো বিরাট বইয়ের মতো। একশ' দুইশ', এমনকি চারশ' পাতা থাকে। এই প্রকল্প প্রস্তাবটা পাঠিয়েই তারা একনেকে নেওয়ার জন্য জোর তৎপরতা চালাতে থাকে। তারা আমাদের সময় দিতে চায় না। এ জন্য আমরা প্রকল্পের গভীরে যেতে পারি না। কিন্তু গভীরে যেতে হবে। প্রকল্পে লেখা হচ্ছে, যাতায়াত বাবদ ২০ কোটি টাকা, সম্মানী ২০ কোটি টাকা ইত্যাদি। আমরা বলেছি, এগুলো আর হবে না। এখন থেকে সবকিছু স্পষ্ট করে ভেঙে বলতে হবে। প্রকল্পের টাকায় কয়টা গাড়ি কেনা হচ্ছে, কেন কেনা হচ্ছে, কত মডেলের ইত্যাদি ভেঙে বলতে হবে। সবটার দাম আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে। এখানে মোটা দাগে একটি থোক টাকা রাখা হয় ৪০-৫০ কোটি। এ টাকা কেনাকাটার সময় তারা সমন্বয় করে। তখন দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা দেখে যে এত টাকা, কিন্তু মাল কেনব মাত্র ৪টা। তখন তারা ইচ্ছামতো দাম ধরে দেয়। আমরা এগুলো ভাঙব। এগুলো আর চলতে পারবে না। চীনে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির দুর্নীতিবাজ নেতাকে বিচারের মাধ্যমে গুলি করে মারা হয়েছে। তার পরও কিন্তু দেশটিতে দুর্নীতি হচ্ছে। তাদের বিচারও হচ্ছে।

সমকাল: দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে কি?

এম এ মান্নান: আমার ব্যক্তিগত মত বলি। এ দেশে আইন-কানুন প্রয়োগে আমাদের মমত্ত্ববোধ বেশি। এর কারণ সামাজিক। এটা ঘনবসতির দেশ। বলতে গেলে ৯৯ শতাংশ মানুষই বাঙালি। একে অন্যের আত্মীয়। এখানে ক্রস কালচারের বিষয়টা কম। এর পর দেখেন এই কিছুদিন আগেও সরকারের প্রশাসনে বড় বড় কর্মকর্তা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা। এখন অবশ্য অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আসছেন। একসময় দেখা যেত, সবাই একই ভার্সিটির ছাত্র। ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই-ছোট ভাই বা বন্ধু ছিল। এখন অবশ্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক আসছেন। আগে তো উত্তরাঞ্চলের লোক সরকারি চাকরিতেই আসতেন না। এখন আসছেন। এই যে ঘনবসতি, পারিবারিক বন্ধন, মমত্ব; এগুলো আইন প্রয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দেখা গেল, আমারই এক ভার্সিটি-বন্ধু আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে দেখল, আমি একটা অপরাধ করে ফেলেছি। সেখানে সে দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ সে আমার ব্যাচমেট। এটাও একটা বিষয়। এ ছাড়া এমনও উদাহরণ আছে, একটা মামলায় সর্বোচ্চ ৫ বছরের সাজা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বিচারকের। ৫ বছরের বেশি দেওয়ার সুযোগ নেই; কিন্তু কমানোর সুযোগ আছে। বিচারক দেখলেন, লোকটা ধার্মিক। ভুল করেই একটা অপকর্ম করে ফেলেছেন। তখন তাকে সাজা কমিয়ে দিলেন। এগুলো পরিবর্তন করা দরকার।

সমকাল: এক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬৭ কোটি টাকা। উন্নত বিশ্বেও এ রকম প্রকল্প ব্যয়ের নজির নেই। এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন?

এম এ মান্নান: সড়কের একটা বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। বাংলাদেশের মাটি (ভূমি) আর ইউরোপের মাটি; বাংলাদেশের মাটি আর ভারতের ঝাড়খণ্ডের মাটি; বাংলাদেশের মাটি আর চীনের পার্বত্যাঞ্চলের মাটি কিন্তু এক নয়। বাংলাদেশ প্রাইভেট প্রপার্টির হেডকোয়ার্টার। এখানকার মাটিতে সরকার সহজে হাত দিতে পারে না। সেখানে হাত দিলেই ২০-২৫টা আইন আছে। শত শত বছরের পুরোনো আইন। আমাদের দেশে ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু চীনের সরকারকে জমি কিনতে হয় না। যেখানে ইচ্ছা সেখানে চীন সরকার সড়ক বানাতে পারে। কাউকে জিজ্ঞেস করার দরকার হয় না। আমাদের ভূমি কম। অত্যন্ত ঘনবসতি। আমাদের এখানে এক বিঘা জমির যে দাম, ভারতের উত্তরপ্রদেশে তার দাম ১শ' ভাগের এক ভাগ। ভারতের উত্তরপ্রদেশে পড়ে আছে শত শত মাইল ফাঁকা জমি। এগুলো আমরা বিবেচনায় রাখি না। এ ছাড়া আমাদের দেশে প্রাকৃতিক সমস্যা আছে। ৫-৬ মাস ধরে ঝড়-বৃষ্টি হয়। এ সময় কাজ করা যায় না। কাজ করার পরিবেশ থাকে না।

সমকাল: প্রকল্পের টাকায় প্রমোদভ্রমণ  হচ্ছে; এমনকি আপনার মন্ত্রণালয়ের আইএমইডির সচিবও এ রকম ভ্রমণে গেছেন বলে খবর এসেছে পত্রিকায়।

এম এ মান্নান: ভ্রমণের প্রয়োজন কিন্তু আছে। তারা কোনো প্রকল্প সম্পর্কে জানা ও বোঝার জন্য যেতেই পারেন। এসব প্রকল্পে যারা ঋণ দেবে তারা অনেক সময় চালাক হয়। ফলে এগুলো জানার জন্য বিদেশে যেতে হতেই পারে। তবে এর আড়ালে অন্য কিছু যাতে না ঢুকতে পারে, সেটা দেখতে হবে। এ রকম সফরে কত দিন প্রয়োজন, তা একজন মন্ত্রী হিসেবে আমার বিস্তারিত জানার কথা নয়। এ জন্য বিভিন্ন স্তরে সরকারের কর্মকর্তারা আছেন। কিন্তু অনেক চালাক লোক আছেন, যারা ফাঁকি দিয়ে চলে যান। তবে এখন এসব সফর অনেক কমে আসছে। এখন এটা আমি সার্বক্ষণিক নজরে রাখছি, যাতে এগুলো আগামীতে আরও কম হয়। এ জন্য এগুলো স্ট্যান্ডার্ডাইজড করে দেওয়া হচ্ছে। গাড়ি ক্রয় সম্পর্কেও অভিযোগ আছে। আমি প্রগতির গাড়ি চড়ি। কিন্তু আমার কয়েক স্তরের নিচের লোক চড়ছেন অনেক দামি গাড়ি। এগুলো প্রকল্পের গাড়ি। এখন একজন কর্মকর্তা লালমনিরহাটে কী ধরনের দামি গাড়িতে চড়ছেন, সেটা এখানে বসে দেখা সম্ভব নয়।

সমকাল: যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না। এ জন্য ব্যয় বৃদ্ধি পায়। কোনো একটি সড়ক নির্মাণের এক বছরের মধ্যেই তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এম এ মান্নান: মানের প্রশ্নে অনেক সময় কমপ্রোমাইজ করা হয়। ধরুন, আমি একটি এলাকার এমপি। আমার এলাকায় অনেক ইউনিয়ন আছে। সব চেয়ারম্যান চান, তার এলাকায় রাস্তা করা হোক। এখন আমার কাছে ৫ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের টাকা আছে। কিন্তু আমার ওপর এত চাপ যে সেখানে করতে হচ্ছে ৭ কিলোমিটার। অনেক সময় বাধ্য হয়ে সেটা করতে হয়। কারণ আমরা রাজনীতি করি। এটা দুর্নীতি নয়; আপস করা। তখন কাজের গুণগত মানে একটু কমবেশি হয়। ঠিকাদার লাভের জন্যই কাজটা করে; এটা ঠিক। তবে তাকে অবশ্যই গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। রাস্তায় বিটুমিন কম দিলে তাকে ধরতে হবে। এটা দেখার জন্য প্রকৌশলীরা আছেন। আছেন প্রকল্প পরিচালক। কিন্তু ধরুন, পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ হচ্ছে। পিডি যদি ঢাকায় বসে থাকেন, তাহলে তো হবে না। আমরা এখন এসব পিডিকে ধরার চেষ্টা করছি। সচিবদের বলছি। পিডিদের সঙ্গেও আমরা কথা বলছি। এগুলো চলমান ব্যাপার।

সমকাল: অনেক প্রকল্প রাজনৈতিক কারণে নেওয়া হচ্ছে। এ রকম বহু প্রকল্প বছরের পর বছর এডিপিতে থাকছে। কারণ কী?

এম এ মান্নান: রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়। আমরা নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছি। ফলে আমাদের কিছু রাজনৈতিক মতবাদ আছে। রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ আছে। এটা মেনেই চলতে হবে। এটা বাস্তব কথা। তবে জ্ঞানত জনগণের অর্থ নিয়ে আমরা রাজনীতি করি না। টাকা এখানে মারা হয় না। যেমন ধরুন, বিধবা ভাতা। কোনো এক অর্থবছরে ৫০ জনকে দেওয়ার কথা। সেখানে বাস্তব পরিস্থিতির কারণে দিতে হচ্ছে ৬০ জনকে। এ রকম পরিস্থিতিতে এমপি বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে যেভাবেই হোক ওই ৬০ জনকেই কিছু না কিছু দিতে হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা বা ডিসিকে এসব করতে হয় না; কিন্তু আমাদের এটা করতে হয়। কারণ আমাদের প্রতিনিয়ত জনগণের কাছে যেতে হয়। তাদের সমস্যা দেখতে হয়।

সমকাল: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর টাকাও ব্যাপকভাবে নয়ছয় হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই দুর্নীতি দমনে কী পদক্ষেপ নেবেন?

এম এ মান্নান: লিকেজ আছে; এটা অস্বীকার করব না। তবে আগের চেয়ে অনেক কমেছে। এটা আমি দায়িত্ব নিয়েই বলছি। মন্ত্রী-এমপি না হলেও আমি এই একই কথা বলতাম। আমার বাড়ি গ্রামে। বাজেটে প্রথম যখন এটা শুরু হয়, তখনকার চেয়ে এখন এসব অনেক কম হচ্ছে। এখন খোলামেলা আলোচনা করে এগুলো করা হয়। অনেকটা কম্পিউটারাইজড। ডিজিটাল করা হয়েছে। এনআইডি কার্ড রয়েছে। এখন আর প্রথমদিকের মতো যা তা করতে পারে না। এখন এ রকম নয়ছয় করতে গেলে অনেকেই চ্যালেঞ্জ করে। সাধারণ মানুষই বলে, ওকে দিলেন কেন? ওর তো জমি আছে।

সমকাল: বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে তাদেরকে হাজার হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও কেন অপরিকল্পিতভাবে এত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলো?

এম এ মান্নান: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মানে হলো প্রাক্কলন। এটা একটা ধারণা। বিদ্যুৎ একটি স্পর্শকাতর খাত। যখন ঘাটতি হবে তখন রাতারাতি সেটা পূরণ করতে পারবেন না। ভয়ংকর রকমভাবে যদি অপচয় না হয়, তাহলে এভাবে চলতে পারে। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে এই অবস্থাটা থাকে। সারাবিশ্বেই এ রকম আছে। চাহিদা ও উৎপাদনের এ তারতম্য থাকবেই। কয়েক বছর ধরে ব্যাপক শিল্পায়ন হচ্ছে। এখন ঘরে ঘরে এসি, ফ্রিজ, টিভি, মাইক্রোওভেন ইত্যাদি। বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। ফলে এটা ব্যবহার করা যাবে। ২০০৯ সালে বিদ্যুতের খুব খারাপ অবস্থা ছিল। তখন সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। আমরা ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছি। এটা না করলে আজ যে এসি চালিয়ে ঘুমাচ্ছেন, সেটা তো পারতেন না। এখন লোডশেডিং হয় না। একসময় তো লোডশেডিং ছাড়া চলাই যেত না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চান সবাই। এ জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাও রাখতে হবে। নতুবা দেওয়া যাবে না। চাহিদা-জোগান কাঁটায় কাঁটায় মেলানো যাবে না।

সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ।

এম এ মান্নান: আপনাকেও ধন্যবাদ।