হলুদ রাজনীতি সমাচার

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মহিউদ্দিন খান মোহন

হলুদের সঙ্গে পরিচয় নেই এমন মানুষ এ ধরাধামে আছে বলে মনে হয় না। হলুদ একটি অতীব প্রয়োজনীয় মসলা। তরকারিতে হলুদ যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী উপাদানও। হলুদ ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক- এমন তথ্যও সাম্প্রতিক সময়ে দিয়েছেন গবেষকরা। রং হিসেবেও হলুদ অনেকের পছন্দের। হলদে রঙের সূর্যমুখী কিংবা সরষে ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন না, এমন মানুষ খুব কমই আছে। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার সৃষ্ট বিখ্যাত চরিত্র 'হিমু'র গায়ে চড়িয়ে দিয়েছেন হলুদ পাঞ্জাবি। এখনও আমাদের দেশে বিয়ের গায়ে-হলুদ অনুষ্ঠানে ছেলেদের হলুদ পাঞ্জাবি আর মেয়েদের হলুদ শাড়ি পরা রেওয়াজের মতো। যে হলুদ রং মানুষের দৃষ্টিকে তৃপ্ত করে, মনকে মাতোয়ারা করে, সে হলুদ শব্দটির কিন্তু নেতিবাচক অর্থে ব্যবহারও কম নয়। যেসব মানুষ সবপক্ষের সঙ্গে সহজেই তাল মেলাতে পারে কিংবা পরিস্থিতি পাল্টে গেলে মুহূর্তে ভোল পাল্টে ফেলে, তাদেরকে বলা হয় হলুদগুঁড়া; যা সব তরকারিতেই প্রযোজ্য। সমাজে এমন হলুদগুঁড়া মানুষের অভাব নেই। হলুদ শব্দটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার হয় সাংবাদিকতা জগতেও। অপসাংবাদিকতাকে 'ইয়েলো জার্নালিজম' বা 'হলুদ সাংবাদিকতা' হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। যখন কোনো সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যম কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হেয় প্রতিপন্ন করা বা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের হীন উদ্দেশ্যে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন বা কল্পনাপ্রসূত সংবাদ পরিবেশন করে, তখন তাকে বলা হয় 'হলুদ সাংবাদিকতা'। হলুদ সাংবাদিকতা দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বিধায় এ অপকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে সংশ্নিষ্টদের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। হলুদ সাংবাদিকতার শিকার হয়ে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে, অনেকের সামাজিক মর্যাদা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, কেউ কেউ সমাজে লাঞ্ছিত-নিগৃহীতও হয়েছেন। হলুদ সাংবাদিকতার শিকার হয়ে কেউ কেউ আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ারও নজির আছে।

হলুদ ও হলুদ সাংবাদিকতা নিয়ে এতক্ষণ যেসব কথা বললাম, তা গৌড়চন্দ্রিকা মাত্র। আমার আজকের বিষয় হলুদ সাংবাদিকতা নয়, 'হলুদ রাজনীতি'। না, চমকে ওঠার কোনো কারণ নেই। সাংবাদিকতার অপব্যবহারকে যদি 'হলুদ সাংবাদিকতা' বলা হয়, তাহলে রাজনীতির অপব্যবহারকে 'হলুদ রাজনীতি' বলে অভিহিত করতে অসুবিধা কোথায়? আর এটা তো স্বীকার্য যে, আমাদের দেশে রাজনীতির নামে অনেকদিন ধরেই অপরাজনীতি চলছে; যা ক্ষতিগ্রস্ত করছে দেশ ও জনগণকে। সাংবাদিকতা যেমন একটি মহান পেশা, তেমনি রাজনীতিও একটি মহান ব্রত। এ দুটি কর্মক্ষেত্রের মধ্যে বেশ সাযুজ্য আছে। সাংবাদিকতা পেশায় যারা আত্মনিয়োগ করেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে স্বীয় কর্মের দ্বারা মানুষকে সত্য জানতে সহায়তা করা। গুজব নয়, ঘটনার পেছনের সত্য কাহিনি এবং সমাজে এর প্রভাব-কুপ্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাই সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে সমাজের সব অসঙ্গতি, দুর্নীতি, অপরাধ ও দুস্কর্ম সম্বন্ধে মানুষকে অবগত করানো একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তবে এরই মধ্যে কেউ কেউ ভিন্ন পথে ধাবিত হয়; যদিও তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম।

আমাদের রাজনীতি নিয়ে আজকাল অনেককেই নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করতে দেখা যায়। বলতে শোনা যায়, রাজনীতি ভালো মানুষের জন্য নয় বা ভালো মানুষরা রাজনীতি করে না। কেন সাধারণ্যে এ নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হলো? যে রাজনীতি আমাদের একটি স্বাধীন স্বদেশ ভূমি উপহার দিয়েছে, আমাদের বাক, ব্যক্তি ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার এনে দিয়েছে, সে রাজনীতি কেন এখন সাধারণ মানুষের কাছে অচ্ছুত বিষয়? রাজনীতির প্রতি গণমানুষের এই নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির জন্য যে এক শ্রেণির রাজনীতিকই দায়ী, সেটা বোধকরি ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। একসময় রাজনীতিকরা ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র। সাধারণ মানুষের কাছে তারা ছিলেন অসাধারণ মানুষ। সম্মানের অতি উঁচু আসনে ছিল তাদের অবস্থান। এ উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে যেসব মহান রাজনীতিকের দেখা আমরা পাই, তারা তাদের আপন কর্মের দ্বারাই সে আসন অর্জন করেছেন। কারণ, তাদের রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশ ও জনগণের কল্যাণ। ব্যক্তিগত লোভ-লালসা বা স্বার্থচিন্তা তাদের কখনও আচ্ছন্ন করতে পারেনি। বিত্ত-বৈভব গড়ার মোহে তারা দিকভ্রান্ত হননি, আদর্শচ্যুত হননি। দেশ ও মানুষের জন্য তাদের আত্মত্যাগ ইতিহাসে করে রেখেছে অমর। আমরা কিন্তু সে রাজনীতিরই উত্তরাধিকার। তবে সে রাজনীতিতে রং ধরেছে অনেক আগেই; এখন তা প্রকট হয়েছে। আমাদের রাজনীতি আজ পরিণত হয়েছে হলুদ রাজনীতিতে। এখানে এখন আর রাজনীতির শুদ্ধ চর্চা হয় না। তার পরিবর্তে রাজনীতিকে ব্যবহার করে কীভাবে রাতারাতি ধনবান ব্যক্তিতে পরিণত হওয়া যায়, রীতিমতো তার প্রতিযোগিতা চলছে।

হলুদ রাজনীতি যেন এটি পরশ পাথর। যার স্পর্শে এ রাজনীতির ধারক-বাহকদের ভাগ্য খুলে যায় রাতারাতি। কপর্দকহীন অবস্থা থেকে তারা কেউ পরিণত হন শিল্পপতিতে, কেউবা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। দু-চার বছর আগে যারা বাসে চড়তেন, তাদের বাহন হয় পাজেরো, প্রাডোসহ নানা মডেলের বিলাসবহুল গাড়ি। তাদের ব্যাংক ব্যালেন্স এতটাই স্টম্ফীত হয়ে ওঠে যে, দেশের ব্যাংকে আর কুলোয় না। তখন তারা বিদেশের ব্যাংকের দ্বারস্থ হন। পাচার করে দেন কোটি কোটি টাকা। এসব হলুদ রাজনীতিকের ছবি আমরা দেখছি সম্প্রতি সরকারের শুদ্ধি অভিযানের পর। যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন বা গ্রেপ্তার এড়িয়ে বিদেশে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন, তারা সবাই হলুদ রাজনীতির একেকজন ক্রীড়নক। ইসমাইল হোসেন সম্রাট, খালেদ মাহমুদ চৌধুরী, জি কে শামীম, মমিনুল হক সাঈদ, হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান, তারেকুজ্জামান রাজীব- এরা সবাই হলুদ রাজনীতির প্রতিমূর্তি। এরা কেউ বিত্তশালী ছিলেন না। কেউ ঢাকায় এসে ফুটপাতে দোকানদারি করেছেন, কেউ করেছিলেন টং দোকান, কেউবা খেটেছেন ফাইফরমাশ। তারপর একসময় পা রাখেন রাজনীতির অঙ্গনে। ব্যস, পেয়ে যান ওপরে ওঠার সিঁড়ি। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি আর ক্যাসিনোর মতো জুয়ার মাধ্যমে তারা একেকজন বনে গেছেন টাকার 'তিমি মাছ'। রাজনৈতিক পরিচয় আর ক্ষমতার অপব্যবহার করেই যে তারা তাদের ভাগ্য ফিরিয়েছেন, সেটা না বললেও চলে।

সম্প্রতি সমকাল ঢাকার বেশ কয়েকজন কাউন্সিলরকে নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনগুলোতে স্থানীয় ওইসব তথাকথিত রাজনৈতিক নেতার ভ্যাগাবন্ড থেকে ক্রোড়পতি বনে যাওয়ার অন্তরালের কাহিনি সবিস্তারেই বর্ণনা করা হয়েছে। মোহাম্মদপুরের তারেকুজ্জামান রাজীব খেতাব নিয়েছিলেন 'জনতার কাউন্সিলর'। অথচ জনতার এই কাউন্সিলরের প্রধান কাজই ছিল চাঁদাবাজি ও দখল। পাগলা মিজান ছিল টেন্ডারবাজ। ২৫ অক্টোবর সমকালে 'তার সবকিছুই চাঁদাবাজির টাকায়' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিএম সিরাজুল ইসলাম ভাট্টির কোনো ব্যবসা ছিল না, ছিল না পৈতৃক সম্পত্তিও। তার আজকের বিত্ত-বৈভবের উৎস চাঁদাবাজি। গত ২৬ অক্টোবরের সমকালে 'চাঁদা না দিলেই চলে মনজুর অত্যাচার' শীর্ষক প্রতিবেদনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মনজুর কীর্তিকলাপের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। টিকাটুলী এলাকার যারা মনজুকে চিনতেন, তারা অবাক হয়েছেন- একজন নিবেদিতপ্রাণ আওয়ামী লীগ কর্মীর এই অধঃপতনের খবর পড়ে। ২৭ অক্টোবর সমকাল 'কাউন্সিলর জনি একাই একশ' শিরোনামের প্রতিবেদনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হুমায়ুন রশিদ জনির দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়েছে। ২৯ অক্টোবরের সমকাল তুলে ধরেছে সেগুনবাগিচা এলাকার সিটি কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন রতনের উত্থান ও অপকর্মের চমকপ্রদ কাহিনি। এলাকায় একসময় যার পরিচিতি ছিল টোকাই, তিনি এখন বিত্তশালীই শুধু নন, প্রচণ্ড ক্ষমতাধর এক রাজনৈতিক নেতা। তার মূল পেশা চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি। গ্রেপ্তার ও বহিস্কৃত যুবলীগ নেতা সম্রাটের হাত ধরেই তার এ উত্থান।

বস্তুত সরকার দুর্নীতি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু করার পর নেতা নামধারী কিছু মানুষের যে কদাকার চেহারা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে সবাই বিস্ময়ে হতবাক! রাজনীতির পরিচয়কে মুখোশ হিসেবে ব্যবহার করে অঢেল সহায়-সম্পত্তির মালিক বনে যাওয়া এ মানুষগুলো যে প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মী নয়, তা বুঝতে কারও বাকি থাকেনি। এরা রাজনীতির নামে অপরাজনীতি করেছে, যাকে হলুদ রাজনীতি হিসেবেই আখ্যায়িত করা যায়। এদের সম্পর্কে শীর্ষ রাজনীতিকদের সতর্ক এবং কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের চার সহযোগী সংগঠনের জন্য সৎ নেতা খুঁজে বের করতে দলের চারজন নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্ত ধন্যবাদার্হ। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি দল গঠন-পুনর্গঠনে সৎ ও নীতিবান কর্মীদের মূল্যায়ন করেন, তাহলে চলমান হলুদ রাজনীতির অবসান হতে পারে।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক