ভাসানী-বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক ও সংহতি

 স্মরণ

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর পারস্পরিক বোঝাপড়া অটুট ছিল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকার পরও যাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পিতৃতুল্য সম্মান করতেন। মওলানা ভাসানীও বঙ্গবন্ধুকে সন্তানতুল্য স্নেহ করতেন। ১৯৫৭ সালে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করলেও সত্তরের নির্বাচন বর্জন ও পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু পর্যন্ত ইতিহাস বিশ্নেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অকুণ্ঠ সমর্থক ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর ১১ মার্চ টাঙ্গাইলে বিন্দুবাসিনী হাই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় ন্যাপপ্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান সাত কোটি বাঙালির নেতা। নেতার নির্দেশ পালন করুন।

স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে মওলানা ভাসানী গুরুর মতো পরম শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক নিয়ে বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব মসিউর রহমান ১৫ আগস্ট, ২০১৫ দৈনিক কালের কণ্ঠে লিখেছেন, মওলানা ভাসানীর অনুরোধ কখনও উপেক্ষা করা হতো না। একবার বঙ্গবন্ধুকে তিনি চিঠি লিখলেন, তাঁর ওষুধের দরকার। থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে  চেষ্টা করে আমরা ব্যর্থ হই। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রতিনিধি যাঁরা ছিলেন, তাঁদের বঙ্গবন্ধু অনুরোধ জানালে তাঁরা ওষুধটি পাঠান। মওলানা ভাসানীকে সন্তোষে সেই ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হয়।

১৯৭৪ সালের ১৪ এপ্রিল ভাসানী পল্টনে এক মহাসমাবেশের ডাক দেন। পরে একটি মিছিল নিয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ঘেরাওয়ের জন্য বঙ্গভবনের দিকে যাত্রা শুরু করেন। খবর শুনে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান রাস্তায় চলে আসেন। মিছিল কাছে আসতেই বঙ্গবন্ধু মওলানা ভাসানীর পা ছুঁয়ে সালাম করলেন। এ দৃশ্য দেখে হাজার হাজার মিছিলকারী জনতা হতভম্ব। বঙ্গবন্ধু তাঁর 'হুজুর' ও কয়েকজন নেতাকে সম্মান দেখিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন। হুজুরকে ধরে ধরে নিলেন। ভেতরে বসিয়ে মিষ্টিমুখ করালেন। সার্বিক পরিস্থিতি হুজুরের সামনে তুলে ধরলেন। হুজুর কিছু পরামর্শ দিয়ে বিদায় নিলেন।

মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা নিয়ে ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মওলানা পুত্রসম স্নেহ করতেন। তিনি নিজেই বলেছেন, 'আমার রাজনৈতিক জীবনে অনেক সেক্রেটারি এসেছে, কিন্তু মুজিবরের মতো যোগ্য সেক্রেটারি অন্য কাউকে পাইনি।' উল্লেখ্য, মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতি থাকাকালে বঙ্গবন্ধু তাঁর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু মওলানাকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন প্রায়ই কোনো নিরাপত্তারক্ষী ছাড়াই শুধু গাড়ির ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে রাতের অন্ধকারে মওলানার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতেন। সে খবর তৎকালীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই জানতেন না।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তখন মওলানা ভাসানী খুবই কেঁদেছেন। তিনি ওইদিন বারবার বলেছেন, 'সব শেষ হয়ে গেল!' তিনি এত দুঃখ পেয়েছিলেন যে, ওইদিন কোনোকিছুই খাননি; কারও সঙ্গে সাক্ষাৎও করেননি।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রকাশ্যে বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের সঙ্গে মওলানা ভাসানীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো অবনতি ঘটেনি। মওলানা ভাসানী-বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে চমৎকার একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। 'ভাসানীকে যেমন জেনেছি' গ্রন্থে তিনি লিখেছেন (পৃ. ৭৮) :"গভর্নরদের নাম ঘোষণার তিন-চার দিন আগে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে গণভবনে গেছি। দেখি বঙ্গবন্ধু বের হচ্ছেন। দেখেই জিজ্ঞেস করলেন, 'কোনো কাজ আছে নাকি?' বললাম, 'না, এমনিই আপনাকে দেখতে এসেছিলাম।' বঙ্গবন্ধু আর ক্যাপ্টেন মনসুর আলী একটা টয়োটা গাড়িতে উঠলেন। সাধারণত বাড়িতে ফেরার সময় তিনি মার্সিডিসে ফেরেন এবং একা। আমি ভাবলাম, বঙ্গবন্ধুর পিছু পিছু তাঁর বাড়ি পর্যন্ত গিয়ে বাসায় ফিরব। ওমা! গণভবনের গেট ছেড়ে গাড়ি ডানে না গিয়ে বাঁয়ে মোড় নিল। আমরাও পিছু নিলাম। ভাবলাম, অন্য কোথাও যাবেন। ফার্মগেট থেকে শহরের দিকে না গিয়ে বাঁয়ে মোড় নিলো। আমরাও পিছু নিলাম। ভাবলাম, অন্য কোথাও যাবেন। ফার্মগেট থেকে শহরের দিকে না গিয়ে গাড়ি ঘুরল টাঙ্গাইলের দিকে। অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখে আমরা যখন চৌরাস্তা পর্যন্ত এলাম, তখনও বুঝতে পারিনি- যাচ্ছেন কোথায়। চৌরাস্তায় এসে পরে বুঝলাম, টাঙ্গাইল যাচ্ছেন। সত্যিই তাই। উনি সন্তোষ গেলেন। বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি দাঁড়াল। বঙ্গবন্ধু ও মনসুর ভাই হুজুরের ঘরে গেলেন। আমি প্রায় তিনশ' গজ পেছনে রাস্তা থেকে দূরে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। খুব সম্ভবত তাদের মিনিট চল্লিশেক আলাপ হলো। আবার ছুটলেন ঢাকার দিকে।"

স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ায় তৎপর মওলানা ভাসানী ১৯৭০ সালের নির্বাচন বর্জন করায় ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি আসনে জিতে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা পর্যন্ত সময়ে শেখ মুজিবের প্রতি মওলানা ভাসানীর 'সমর্থন' দেওয়ার এই কৌশলকে 'রীতিমতো মাস্টার স্ট্রোক' হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ থেকে অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার প্রতিবাদে আরও একবার স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মওলানা ভাসানী।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার শোকের মাস আগস্ট এলেই দেশে কিছু চাটুকার মুজিব-বন্দনার আড়ালে ইতিহাস বিকৃতির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, যা আজকের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে। এসব চাটুকার কিছুটা ঘুরিয়ে হলেও সুকৌশলে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মওলানা ভাসানীকে জড়িত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। তারা কখনও কখনও বলে থাকে, মওলানা ভাসানী নাকি খন্দকার মোশতাকের সরকারকে সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ জানাননি। অথচ সত্য হলো, খন্দকার মোশতাকের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে দূত পাঠানো হয়েছিল তার সরকারকে সমর্থন করে একটি স্টেটমেন্ট দেওয়ার জন্য। কিন্তু মওলানা তার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। বাংলাদেশের অনেক রাজনীতিবিদ মওলানাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু মওলানা সবার চালাকি বুঝতে পারতেন।

মনে রাখতে হবে, মওলানা ভাসানী কোনো সাধারণ নেতা ছিলেন না। প্রায় ৮০ বছরের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি নিজের দেশ ও জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই-সংগ্রাম করেছেন আপসহীন ভূমিকায় থেকে। বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই কোনো না কোনোভাবে মওলানা ভাসানীর কাছে ঋণী। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে গঠিত প্রবাসী মুজিবনগর সরকারকে সংঘাত ও অনৈক্যের অশুভ পরিণতি থেকে রক্ষা করা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নেওয়াও ছিল মওলানা ভাসানীর প্রধান অবদান। তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকার গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রশ্নে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর অবস্থানকে যারা বিতর্কিত করতে চায় বা করছে, তারা মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি। তারা মওলানা ভাসানীর অনুসারী ও বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও চেতনার পক্ষের শক্তিকে বিভক্ত রেখে নিজেদের ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। মনে রাখতে হবে, ভাসানী-মুজিবের সম্পর্ক প্রসঙ্গে যাদের সামান্যও ধারণা রয়েছে, তাঁরা নিশ্চয় একবাক্যে স্বীকার করবেন, 'পুত্রের মতো' প্রিয় শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোবাসতেন মওলানা ভাসানী।

প্রসঙ্গক্রমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সংলাপের কিছু কথা উল্লেখ করতে চাই। সেদিন আমি মওলানা ভাসানী সম্পর্কে কিছু কথা বললে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উত্তরে বলেছিলেন, মওলানা ভাসানী মহান নেতা। তিনি আমাদের সবার শ্রদ্ধার। তাঁর অমর্যাদা করা কারও উচিত হবে না। ১৯৯৭ সালের ১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মৃত্যু দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবের মধ্যে ছিল 'প্রগাঢ় ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক'। এই বিষয়টি বরাবরই তিনি উল্লেখ করে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বক্তব্যটুকু থেকে নামধারী ইতিহাসবিদদের শিক্ষা নেওয়া এবং এর মর্মকথা অনুধাবন করা উচিত। ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানীর অমর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে চাই, মজলুম জননেতা প্রদর্শিত পথ ভুলে গেলে কিংবা সেই পথ থেকে বিচ্যুত হলে জাতি হিসেবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ
[email protected]