বিএনপিতে ভাটার টান?

রাজনীতি

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মহিউদ্দিন খান মোহন

সম্প্রতি বিএনপির দু'জন সিনিয়র নেতা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, অপরজন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম. মোর্শেদ খান। বিএনপির এ দু'জন শীর্ষস্থানীয় নেতার হঠাৎ পদত্যাগে চারদিকে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন, বিএনপিতে ভাটার টান শুরু হয়েছে। আবার কেউ এটাকে নদীর পাড় ভাঙার সঙ্গেও তুলনা করছেন। বিএনপির সমর্থকরা এ পদত্যাগকে 'সুসময়ে মধু খেয়ে দুঃসময়ে পিঠটান' দেওয়া বলে অভিহিত করছেন। আর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নেতিবাচক রাজনীতির কারণেই বিএনপি নেতারা পক্ষত্যাগ করছেন। বিষয়টি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলেরও মনোযোগ কেড়েছে। তারা এ ঘটনাকে বিএনপির জন্য ক্ষতিকর হিসেবেই দেখছেন; যদিও দলটির নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, পদত্যাগী দু'জন নেতা দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় রাজনীতি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ফ্ক্রিয় ছিলেন। ফলে তাদের এ চলে যাওয়া দলে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, প্রবীণ এ দুই নেতা সশরীরে দলের কর্মসূচিতে সক্রিয় না থাকলেও জনমনে তাদের সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারণা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তাদের এ প্রস্থান কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলবে।

প্রশ্ন উঠেছে, তারা কেন পদত্যাগ করলেন? সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, মহাসচিবের মাধ্যমে দলের চেয়ারপারসন বরাবর পাঠানো পদত্যাগপত্রে উভয় নেতাই তাদের শারীরিক অসামর্থ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্নতর তথ্য। তাতে দেখা যায়, দলে উপেক্ষিত হওয়া এবং নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে মতদ্বৈধতা তাদেরকে এ পথে যেতে বাধ্য করেছে। পদত্যাগের পর তারা সংবাদমাধ্যমে তাদের যে প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছেন, তাতে সে ক্ষোভের কথা চাপা থাকেনি। এম. মোর্শেদ খান দলের পরিচালনা পদ্ধতি ও নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেছেন, "বিএনপি বৃহত্তম একটা রাজনৈতিক দল। এ দলের বিশাল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে গণমানুষের কাছে। সে দলটি এখন স্কাইপের মাধ্যমে চলছে। এটা এখন 'বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্কাইপে দল' হয়ে গেছে। এটা বেদনার, এটা ক্ষোভের। স্কাইপেতে কোনো রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র চর্চা হয় না। দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকলে দেশের গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে যায়। এমনকি তা হুমকির মুখে পড়ে।" তিনি তার পদত্যাগকে ব্যক্তিগত কারণে উল্লেখ করে বলেছেন, অনেক বিচার-বিশ্নেষণ করে উপলব্ধি হয়েছে যে, এই দলে অবদান রাখার কিছু নেই। সে জন্য তিনি পদত্যাগ করেছেন (সমকাল, ৭ নভেম্বর, ২০১৯)। অপরদিকে লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান অন্য এক দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, '৮০ বছরের ওপরে আমার বয়স হয়ে গেছে। বিএনপিতে অবদান রাখার মতো অবস্থায়ও আমি নেই। তবে এ কথাও ঠিক, বিএনপির সবকিছুর সঙ্গে আমি একমত নই।' এ প্রসঙ্গে পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে, গত সেপ্টেম্বরে লন্ডনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সভায় তারেক রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের জাতির পিতা' বলে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি (মাহবুব) তার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। তারেক রহমানের ওই বক্তব্যের সমালোচনা করে মাহবুবুর রহমান একটি গণমাধ্যমে বলেছিলেন, "বাপ বলেই জিয়াউর রহমানকে জাতির পিতার আসনে বসানো ঠিক নয়। তারেক রহমান যেভাবে জিয়াউর রহমানকে 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পিতা' ঘোষণা করেছেন, এটা আমি মোটেই ভালোভাবে দেখছি না।" তিনি আরও বলেছিলেন, 'ইতিহাস বিকৃত করে তারেক রহমান নিজের বাবাকে যেভাবে জোর করে জাতির পিতা বানানোর অপচেষ্টা করছেন, তাতে বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে এবং রাজনীতিকে একটি সংঘাতের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে' (কালের কণ্ঠ, ৮ নভেম্বর, ২০১৯)। পত্রিকাটি লিখেছে, পরে বিষয়টি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয় এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে মাহবুবুর রহমানের কাছে পাঠানো হয় তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে। কিন্তু মাহবুব নিজের বক্তব্যে অনড় থাকেন এবং বলে দেন, দুঃখ প্রকাশ নয় বরং তিনি দল থেকে পদত্যাগ করতে চান। তার অনুরোধে নজরুল ইসলাম খান পদত্যাগপত্র লেখেন এবং জেনারেল মাহবুব তাতে স্বাক্ষর করেন। ঘটনাটি সেপ্টেম্বর মাসে ঘটলেও দুই মাস যাবৎ তা গোপন রাখা হয়েছিল। এম. মোর্শে খানের পদত্যাগের পরদিন মাহবুবুর রহমানের পদত্যাগের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

বোঝা যাচ্ছে, কেবল শারীরিক অসামর্থ্যের কারণে বয়স্ক এই দুই নেতা পদত্যাগ করেননি। কারণ মস্তিস্ক সচল থাকলে রাজনীতিতে বয়স কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ৯৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগেও ন্যাপের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। এখনও অনেক রাজনীতিক আছেন যারা অশীতিপর, কেউ কেউ ৯০-এর দ্বারপ্রান্তে। বন্ধুদেশ মালয়েশিয়ার দিকে তাকাই। ৯২ বছর বয়সেও মাহাথির মোহাম্মদ তরুণের মতো দেশটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। বয়স এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি, দাঁড়াতে পারেও না। কেননা, রাজনীতিকরা মুটে-মজুর নন যে, ভারী কোনো বোঝা তাদেরকে বহন করতে হয়। চিন্তার সুস্থতাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয়। সুতরাং এম. মোর্শেদ খান এবং লে. জে. (অব.) মাহবুবের পদত্যাগের কারণ বয়স নয়, অন্য কিছু; যার ইঙ্গিত তারা দিয়েছেন তাদের সাক্ষাৎকারে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে মতপার্থক্যই যে তাদের দলত্যাগের অন্তর্নিহিত কারণ, তা আর অপ্রকাশিত নেই।

বর্তমানে বিএনপিতে তারেক রহমানের কথাই শেষ কথা- এটা সর্বজনবিদিত। তার নির্দেশেই নাকি সবকিছু হয়। বলা হয়ে থাকে, তিনি নাকি বিভিন্ন ইস্যুতে লন্ডনে বসে স্কাইপেতে দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন, নানা বিষয়ে নির্দেশনা দেন। তার সেসব নির্দেশনা কতটা পালিত হয়, তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে বর্ষীয়ান নেতা ইনাম আহমদ চৌধুরীকে প্রথমে মনোনয়ন দিয়ে পরে তাকে অসম্মানজনকভাবে বঞ্চিত করে মনোনয়ন দেওয়া হয় খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরকে। যে কারণে ক্ষুুব্ধ ইনাম আহমদ চৌধুরী দলত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। প্রচার রয়েছে, মুক্তাদিরের লন্ডন কানেকশন ভালো। আর সে কানেকশনের জোরেই তিনি নিজের মনোনয়ন ও যুবদলের কমিটি করিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। কেন্দ্রের এ অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে সিলেটের ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা গণপদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে তাদেরকে শান্ত করে প্রতিবাদস্বরূপ সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী, কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক, সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক শামসুজ্জামান জামান ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তারা চারজন তাদের পদত্যাগপত্র দলের মহাসচিবের কাছে জমা দিয়েছেন গত ৪ নভেম্বর। মহাসচিব তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ-বর্জন কিছু না করে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু তাতে তেমন কোনো ফলোদয় হবে কিনা, তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় রয়েছে। কেননা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দোহাই দিয়ে গঠিত কমিটি পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম। রাজনৈতিক সচেতন মহল বলছে, যদি সিলেট যুবদলের কমিটি নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান না হয়, তাহলে ঘটনা অনেক দূর গড়াতে পারে। ধস নামতে পারে সিলেট বিএনপির রাজনীতিতে।

এদিকে সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, বিএনপির আরও বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা মোর্শেদ খান-মাহবুবুর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে যাচ্ছেন। যে কোনো সময় তাদের দলত্যাগের ঘোষণা আসতে পারে। আলোচিত ওইসব নেতা বিভিন্ন কারণে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ক্ষুব্ধ। অনেকে নিজেকে দলে বাহুল্য মনে করছেন। তাদের অভিযোগ- চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে দলে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে তাদেরকে কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। তরুণ নেতৃত্ব সামনে আনার নামে দলকে 'কচি-কাঁচার মেলা'য় পরিণত করা হচ্ছে। আর সে কারণে রাজনীতিতে অভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। সিনিয়র নেতারা তাদের এ উষ্ফ্মার কথা প্রকাশ্যে উচ্চারণ না করলেও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তা অকপটেই বলে থাকেন। তেমন একজন নেতা কথা প্রসঙ্গে বললেন, তরুণ নেতৃত্বকে অবশ্যই সামনে আনতে হবে। তবে পুরোনো ও অভিজ্ঞ নেতাদের ছুড়ে ফেলে দিয়ে নয়। প্রবীণের অভিজ্ঞতা ও নবীনের উদ্দামতার সমন্বয়েই সাফল্য অর্জন সম্ভব। কিন্তু যেভাবে বিএনপিতে বর্ষীয়ান নেতারা অবহেলিত হচ্ছেন এবং ক্রমান্বয়ে দলত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাতে অচিরেই দলটিতে অভিজ্ঞ নেতার প্রচণ্ড অভাব দেখা দিতে পারে।

বড় বড় নেতার দলত্যাগের ঘটনাকে বিএনপি নেতৃত্ব আমলে না নিতে চাইলেও সাধারণ নেতাকর্মীদের মনোবল তাতে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেউ কেউ এ প্রসঙ্গে স্বৈরশাসক এরশাদের সময় বিএনপির অনেক নেতার দলত্যাগের উদাহরণ টানেন। কিন্তু তারা এটা ভুলে যাচ্ছেন যে, সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছুই বদলে গেছে। এরশাদের শাসনামলে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা দল ছাড়লেও সে সময় ছাত্রদলের ছিল ভরা যৌবন। একজন সাবেক ছাত্রনেতা সেদিন টকশোতে বলছিলেন, আশির দশকে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতো, তাদের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ যেত ছাত্রদলের দিকে। অথচ এখন সেই ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনে পূর্ণ প্যানেল দিতে পারে না। একজন সিনিয়র সাংবাদিক এ প্রসঙ্গে বললেন, বিএনপিকে টিকে থাকতে হলে তার ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে। মাইনাস নয়, প্লাসকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায় যে ভাটার টান পরিলক্ষিত হচ্ছে, বিএনপিকে তা কোথায় নিয়ে যাবে, শুধু ভবিতব্যই বলতে পারে।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক