আমার দেখা একাদশ সংসদ নির্বাচন

রাজনীতি

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হচ্ছে দেখে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও চারদলীয় ঐক্যজোট নির্বাচন বয়কট করেছিল। ফলে একতরফা একটি নির্বাচনে প্রায় সব আসনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন 'মহাজোট' সরকার আবারও ক্ষমতাসীন হয়েছিল। বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোটের দাবি ছিল- দেশে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য একটি দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই ন্যায্য দাবির কোনো গুরুত্ব না দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করল। বাধ্য হয়ে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট নির্বাচন বয়কট করে এবং অন্যদেরও নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটকে নির্বাচন থেকে পুনরায় দূরে রাখার অভিপ্রায়ে কৌশল হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে একটি মামলায় অন্যায়ভাবে কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করে সরকার। তিনি যাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারেন, সেই জন্য তার শাস্তি বৃদ্ধি এবং প্রাপ্য জামিন থেকে বঞ্চিত করে।

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পরামর্শক্রমে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট দেশনেত্রীর মুক্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। নির্বাচনে আওয়ামীবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। ড. কামাল হোসেন ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তে ঐক্যফ্রন্ট প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়। নেতৃত্বহীন ও লক্ষ্যহীন অবস্থায় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে সব প্রার্থী ধানের শীষ মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ক্ষমতাসীন সরকারের গণতান্ত্রিক চরিত্র ও মূল্যবোধের অভাবে বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেনি। জনগণ বিরোধী দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণকে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির গণভোট হিসেবে গণ্য করে এবং ধানের শীষের পক্ষে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে সমর্থনের মাধ্যমে গণজোয়ার সৃষ্টি করে। সরকার স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে যে, জনগণ ভোট দিতে পারলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে। তাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ভোট ২৯ ডিসেম্বর রাতেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণের ভোটের অধিকার ডাকাতির মাধ্যমে কেড়ে নেয়। ভোট এতটাই লাগামহীন ছিল যে, সারাদেশে বিএনপির মতো জনপ্রিয় দলকে ৬টিসহ বিরোধী দলকে ৮টি আসন দিয়ে ক্ষমতাসীনরা ২৯২টি আসন দখল করে নেয়। এমন একটি প্রহসনমূলক ও নজিরবিহীন নির্বাচনে আমি কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা) এবং কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। বিরোধী দল নির্বাচনী চ্যালেঞ্জে অবতীর্ণ হবে, এমন ঘোষণার পর থেকেই সারা বাংলাদেশের মতো আমার নির্বাচনী এলাকায়ও শুরু হয়েছিল প্রশাসন যন্ত্রকে ব্যবহার করে গায়েবি মামলা, হয়রানি ও গ্রেপ্তার। বাড়িতে গিয়ে হুমকি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে নির্বাচনের মাঠ থেকে আমাদের নেতাকর্মীদের এলাকাছাড়া করে দেয়। বিনা প্রতিরোধে ভোট ডাকাতির সব আয়োজন সম্পন্ন করে। নির্বাচন কমিশন ও দেশের প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের সঙ্গে নির্বাচনপূর্ব আলোচনায় নির্বাচনে সমতল ভূমি সৃষ্টির যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, প্রশাসন যন্ত্রের মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেন। আমার নির্বাচনী এলাকা কুমিল্লা-১ এবং কুমিল্লা-২ আসনের তথাকথিত নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে, আমার নির্বাচনী এলাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে ভোটের নামে কী পরিমাণ ভোট জালিয়াতি, ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন কীভাবে ২৯ ডিসেম্বর রাতে ডাকাতি এবং পূর্বপরিকল্পিত ছকে অবিশ্বাস্য ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিগত নির্বাচনগুলোতে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭০ শতাংশের কম। সাধারণত কোনো জাতীয় নির্বাচনে এর বেশি উপস্থিতি অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য। ৭০ শতাংশের অতিরিক্ত ভোটার উপস্থিতি, ভোট ডাকাতি, একযোগে ব্যালটে সিল মেরে দেওয়া বা আগের রাতে বাক্সে ভোট ভর্তি করে দেওয়ার মাধ্যমে সম্ভব। একাদশ সংসদ নির্বাচনে যে তাই ঘটেছে, দেশ-বিদেশে সর্বজনস্বীকৃত। কুমিল্লা-১ আসন দাউদকান্দি ও মেঘনা উপজেলা নিয়ে গঠিত। ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দাউদকান্দি উপজেলায় ৯২ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫৫টি ভোটকেন্দ্রে ৭০ শতাংশের কম ভোটার উপস্থিত হয়েছে, যা মোটামুটি স্বাভাবিক বলে বিবেচনা করা যায়। অবশিষ্ট ৩৭টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৭১-১০০ শতাংশ, যা সম্ভব হয়েছে আগের রাতে এবং ভোটের দিন সকালে কেন্দ্র দখল করে একতরফা নৌকায় সিল দেওয়ার মাধ্যমে। নানা হুমকি-ধমকি ও প্রশাসনের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ভোটাররা যে ৫৫টি ভোটকেন্দ্রে মোটামুটি স্বাভাবিকভাবে ভোট দিতে পেরেছেন, সেখানে আমার ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছে মোট ৫৫,৬৭১ ভোট এবং নৌকা পেয়েছে ২১,৭৮১ ভোট।



কুমিল্লা-১ আসনের অপর উপজেলা নদীবেষ্টিত মেঘনা উপজেলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের ভোটের আগের রাত থেকে ভোটকেন্দ্রের ধারেকাছেও যেতে দেওয়া হয়নি। আগের রাতেই নৌকা সমর্থকরা ভোটকেন্দ্র দখল করে প্রায় সব ভোট নৌকায় সিল মেরে বাক্সে ভর্তি করে দেয়। নির্বাচনের দিন সকালে 'ভোট শেষ হয়ে গিয়েছে' এই কথা বলে ভোটকেন্দ্র থেকে ভোটারদের প্রশাসনের সহযোগিতায় সরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে দেখা যায়, ৭০ শতাংশ ভোটপ্রাপ্তির ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা মাত্র একটি, যে কেন্দ্রে ধানের শীষ পায় ১,৪৩২ ভোট এবং নৌকা পায় ৪৩৯ ভোট। জনগণ ভোট দিতে পারলে ফলাফলের ধরনটা একরকম হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু প্রস্তুতকৃত ফলাফলে দেখা যায়, অবশিষ্ট ৩৫টি কেন্দ্রে ৭০-১০০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয় এবং এই ৩৫টি কেন্দ্রে ধানের শীষকে দেওয়া হয় মোট ১০,৬৫৬ ভোট আর নৌকাকে দেখানো হয় মোট ৭৭,২৬৩ ভোট। এই উপজেলায় একটি ভোটকেন্দ্রে ১০০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়, যা কোনোক্রমেই স্বাভাবিক নয়। কুমিল্লা-২ আসনটি হোমনা ও তিতাস উপজেলা নিয়ে গঠিত। কুমিল্লা-২ আসনের তিতাস উপজেলাটি আগে দাউদকান্দি উপজেলার অংশ ছিল। দাউদকান্দি উপজেলার গোমতী নদীর উত্তরে অবস্থিত ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকারের সময় 'তিতাস নামে একটি নতুন উপজেলা' প্রতিষ্ঠা করেছি। নতুন প্রতিষ্ঠিত উপজেলার জনগণ দলমত নির্বিশেষে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী, সমর্থক ও গুণগ্রাহী। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আমাকে তিতাস উপজেলায় সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে সমর্থন প্রদান করে। বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই আসনের হোমনা উপজেলা বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে সমধিক পরিচিত। ইতোপূর্বে হোমনা আসনে ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু করে বিএনপি যতবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, ততবারই বিএনপির প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে (প্রথমে মর্তুজা হোসেন মোল্লা ও পরে চারবার মরহুম এম. কে. আনোয়ার বিজয়ী হন)। এই ধারাবাহিকতায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে হোমনা উপজেলার জনগণ আমাকে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে সমর্থন করে। নির্বাচনে আমার জনপ্রিয়তা দেখে ভীত হয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ভোটের আগের রাত (২৯ ডিসেম্বর) প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কুমিল্লা-২ আসনের উভয় উপজেলার ভোটকেন্দ্রগুলো চর দখলের মতো দখলে নেয় এবং একতরফা নৌকায় সিল মেরে ভোটের অপমৃত্যু ঘটায়। কুমিল্লা-২ আসনের ঘোষিত ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হোমনা উপজেলার ৫৪টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে মাত্র তিনটি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ভোট ৭০ শতাংশের নিচে। বাকি ৫১টি কেন্দ্রে ৭০ শতাংশের ওপরে ভোটপ্রাপ্তি দেখানো হয়েছে। ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ৭১-৮০ শতাংশ প্রাপ্ত ভোটের ১৭টি কেন্দ্রে আমাকে ধানের শীষে ১,৯০৮ ভোট আর নৌকায় ৩১,৪৭৪ ভোট। ৮১-৯০ শতাংশ প্রাপ্ত ভোটের ২৭টি কেন্দ্রে ধানের শীষ ১,৩২৯ আর নৌকা মার্কায় ৬২,৪৯৯ ভোট। ৯১-১০০ শতাংশ প্রাপ্ত ভোটের ৭টি কেন্দ্রে ধানের শীষকে মাত্র ২৪৮ আর নৌকা মার্কায় ১৭,৫৯৯ ভোট দেখানো হয়েছে। হোমনার ৫৪টি কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকে মোট ৪,২১৮ ভোট এবং নৌকা মার্কায় মোট ১,১৬,৯৪৯ ভোট দেখানো হয়েছে। হোমনায় ভোটের নামে কী ধরনের অনৈতিক ও কদর্যকাণ্ড হয়েছে, তা উল্লিখিত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবেন। একইভাবে কুমিল্লা-২ আসনের তিতাস উপজেলার ঘোষিত ফলাফল থেকেও একই চিত্র পাওয়া যায়। তিতাস উপজেলার ৪৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৭০ শতাংশের নিচে প্রাপ্ত ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা মাত্র তিনটি। বাকি ৪২টি কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির হিসাব ৭০ শতাংশের ওপরে। তিতাসের ৪৫টি কেন্দ্রে ধানের শীষকে মোট ১৬,২০৫ ভোট এবং নৌকাকে ৮৯,৩৪৯ ভোট দেখানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই আসনে ৯০ শতাংশ ভোটারকে ভোটে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। কুমিল্লা- ১ ও ২ আসনের মতোই আগের রাতে ভোট ডাকাতির ঘটনা সমগ্র বাংলাদেশেই ঘটেছে। দেশ-বিদেশের সবার কাছে বিষয়টি অত্যন্ত পরিস্কার। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও এ অনৈতিক এবং নজিরবিহীন ভোট ডাকাতির নগ্নচিত্র ফলাওভাবে প্রচার করা হয়েছে। এতদ্‌সত্ত্বেও ভোট ছাড়া গঠিত গায়ের জোরে সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে এক ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী চরিত্রের রূপ ধারণ করেছে। দেশের অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত, রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংসপ্রাপ্ত। পেঁয়াজসহ জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারখানায় পরিণত করা হয়েছে। দেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আর এসব কিছুই হচ্ছে দেশে গণতন্ত্রের অভাবে। তাই দেশ ও জনগণকে রক্ষা করতে হলে দেশের সব জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণ এই সত্যটি যত দ্রুত উপলব্ধি করবে, দেশের জন্য ততই মঙ্গল হবে।
 
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী; সদস্য, জাতীয় স্থায়ী  কমিটি, বিএনপি