বিষয়টি প্রায় সবারই জানা। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা আরও বেশি করে জানেন। কারণ তাদের যানবাহনে চড়েই নিত্যদিন লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করে থাকেন। নিত্যদিন যাতায়াতে শিক্ষার্থীদের জন্য খাতির বা কনসেশনের ব্যবস্থা নেই পৃথিবীর অপরাপর দেশের মতো। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এও জানেন যে, বাংলাদেশে তারা একচেটিয়া ব্যবসায়ের সুযোগ পেয়ে থাকেন, যা পৃথিবীর খুব কম দেশেই বিদ্যমান। তারা জানেন, বাংলাদেশে রেলপথ, রেলপথে যাত্রীসেবা বিশেষত উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে নিদারুণভাবে আজও সীমিত। নদীপথ-নৌযানকে কবেই না সমাধিস্থ করেছি আমরা এবং নানা কারণেই ব্যবসাটা একচেটিয়া। ব্যক্তিমালিকানা যদি একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ পায়; বিপদ-বিপর্যয়ের আশঙ্কার অস্তিত্ব, এমনকি ক্রমবৃদ্ধির আশঙ্কা সেখানে প্রকট হয়ে ওঠে। বাস্তবে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ এই ব্যক্তিমালিকানায় পরিবহন সেক্টরের ব্যবসার অসহায় শিকারে পরিণত আজ নয়- বহুকাল ধরে। সম্প্রতি নির্দিষ্ট কোনো সময়ের জন্য পরিবহনসংশ্নিষ্টরা ধর্মঘটের ডাক দেননি। তারা বলেছিলেন, তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ ধর্মঘট চলবে অনির্দিষ্টকালের জন্য। দাবিটি কী? পরিবহন আইনের সংশোধিত বিধানগুলো প্রত্যাহার- দাবি তাদের এই একটাই। সংস্কারকৃত এই আইনের বিধানগুলো কার স্বার্থে প্রণীত? যাত্রীসাধারণ, চালক-মালিক-সবার স্বার্থেই। দীর্ঘ আলোচনা ও সব পক্ষের মত নিয়েই এক বছর আগে আইনটি প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু এখন তারা বাতিল বা প্রত্যাহার চান ততটুকুই, যতটুকু যাত্রীদের স্বার্থে প্রণীত। যেমন- অতি দ্রুত চালালে শাস্তি, লাইসেন্সবিহীন চালক চালালে শাস্তি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চালালে শাস্তি, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালালে শাস্তি, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালালে শাস্তি প্রভৃতি। কিন্তু এগুলো কি আমাদের দেশেই শুধু নিষিদ্ধ? না; পৃথিবীর সর্বত্রই তা নিষিদ্ধ। কিন্তু দাবি মানলে ওই শাস্তির বিধানগুলোকে প্রত্যাহার করে নিতে হবে।

প্রত্যাহারের পরিণতি কী? পথে পথে দুর্ঘটনার আশঙ্কা, অহেতুক নিরীহ যাত্রীদের মৃত্যুর আশঙ্কা বৃদ্ধি। ধর্মঘটে নিয়োজিতরা তা জানেন না, তা নয়। তারা যে ধর্মঘট ডেকেছিলেন, এই ধর্মঘট কি আইনসম্মত? আমরা জানি, দেশে শ্রম আইন বিদ্যমান। এই আইনে আমাদের শ্রমিক সমাজের স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষিত হয়নি- এ অভিযোগ শুধু নানা সেক্টরে বাংলাদেশে কর্মরত শ্রমিকদের বা দেশবাসীর; তা নয়। এ অভিযোগটি খোদ আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থারও (আইএলও) বটে। সেই শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন কোনো কারণে প্রয়োজনে ধর্মঘট ডাকতে পারবে, তবে তার আগে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিত দিয়ে বলতে হবে, এই দাবি এত তারিখের মধ্যে মানতে হবে এবং না মানলে তারা ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হবেন। যদি কর্তৃপক্ষ না মানে তবেই একটি ধর্মঘটকে বৈধ বলে বিবেচনা করা হয়। আরও এক কারণে ধর্মঘটটি ছিল অবৈধ। কোনো ট্রেড ইউনিয়ন যদি ধর্মঘট কোনো কারণে ডাকতে চায় তবে ওই ট্রেড ইউনিয়নের নির্দিষ্ট সংখ্যক বৈধ সদস্য থাকতে হবে এবং সেই সদস্যদের অধিকাংশ ভোটে যদি ধর্মঘট আহ্বানের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়, তবেই কর্তৃপক্ষের কাছে সংশ্নিষ্ট ট্রেড ইউনিয়ন দাবি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে না মানলে ধর্মঘট করা হবে উল্লেখ করে নোটিশ পাঠাতে পারে। দৃশ্যতই এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো কিছু করা হয়নি। তাই শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ীও ওই ধর্মঘট ছিল সম্পূূর্ণ বেআইনি। কিন্তু সংশ্নিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নগুলো (বিশেষ করে পরিবহন শিল্প) কোনোদিন এই আইন মেনে ধর্মঘট ডাকেন না। কি শ্রম আইন, কি পরিবহন আইন- কোনোটাই তারা মানতে চান না, মানেনও না এবং বেআইনি ধর্মঘটীদের বা এর উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে কখনও কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করেন না। ফলে এই শিল্পের মালিক, শ্রমিকরা দুঃসাহসী, বেপরোয়া থাকেন। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রী এবং সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক বলেছিলেন, পরিবহন আইন অবশ্যই কার্যকর করা হবে এবং কোনো চাপেই আইনটির বাস্তবায়ন বন্ধ বা স্থগিত হবে না। কিন্তু ইতোমধ্যে উভয় পক্ষের আলোচনায় প্রেক্ষাপট বদলে গেছে এবং এই আইনটির সংশোধনসহ বেশ কিছু দাবির প্রতি সরকারের তরফে সম্মতি জ্ঞাপন করা হয়।

এখন ট্রেড ইউনিয়ন বলতে প্রধানত শ্রমিক লীগ। পরিবহন সেক্টরের শ্রমিকদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে পরিবহন শ্রমিক লীগ, যা একটি সরকার সমর্থিত সংগঠন। তাহলে এটাও তো স্পষ্ট- সরকার সমর্থিত, সরকারি লোকদের দ্বারা পরিচালিত পরিবহন শ্রমিক লীগই সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মঘটে নেমেছিল কিংবা নামছে বারবার। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন সঙ্গতই উঠেছিল, সরকার কি তাদের প্রণীত এই আইনটির দ্রুত এবং পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে সত্যই আন্তরিক কি-না। সে প্রশ্নটিও তোলাই যায় চলমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। সমস্যাটির কোনো টোটকা সমাধান নেই বলে আমার ধারণা। তাই বিষয়টির স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে কিছু কাজ করা প্রয়োজন।

এক. বিআরটিসি সরকারি সড়ক পরিবহন পরিসেবার কথা আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি। জনগণের দাবিতে পাকিস্তান সরকারও ইআরটিসি নামে সংস্থাটি চালু করে প্রদেশের নানা স্থানে আরটিসি বাসের চাহিদা থাকায় তখন আরও বৃদ্ধি করার দাবি উঠেছিল। পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, কুষ্টিয়াসহ দেশের প্রতিটি জেলাতেই ডিপো স্থাপন করে বেশ ভালো সংখ্যক বাস ডিপোগুলোতে দিয়েছিল। তাদের ভাড়াও ছিল কম এবং যাত্রীসেবাও ছিল উন্নততর। কিন্তু সামরিক শাসক এরশাদ ক্ষমতায় এসে এক কলমের খোঁচায় ঢাকা ছাড়া অন্য ডিপোগুলো থেকে বিআরটিসির বাসগুলো ক্রমান্বয়ে প্রত্যাহার করে নেন। তার প্রতিবাদ ওঠে দেশজুড়ে। ক্ষমতা বদলের পর ডিপোগুলোতে নামমাত্র সংখ্যক বাস সরবরাহ করে সেগুলো চালু করা হয়েছিল। কিন্তু বেসরকারি বাসগুলোর মালিক-শ্রমিকদের ধ্বংসাত্মক বিরোধিতার কারণে বা সুযোগে ডিপোগুলো থেকে বাসগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। যে ক'টি দোতলা বাস ছিল, সেগুলোকে বেসরকারি বাস মালিক-শ্রমিকরা ভেঙেচুরে দিতে থাকলে দোতলা বাসগুলো পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিয়ে বেসরকারি পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপের শাস্তি না দিয়ে সরকারই নতি স্বীকার করে অপরাধীদের আরও বেশি বেশি দুঃসাহসী-দুর্বিনীত করে তোলে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার কারণে সরকার অবিলম্বে প্রত্যেক জেলার বিআরটিসি ডিপোগুলোতে ১০০টি ভালো (নতুন হলে সর্বোত্তম) বাস ও অন্তত ৫০টি ট্রাক সরবরাহ করে সেগুলো ঢাকাসহ সব আঞ্চলিক রুটে চালু করে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধান করা সম্ভব। দুই. অতি দ্রুত পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথের আধুনিকায়ন, ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ, বগি, নতুন ইঞ্জিনসহ সার্ভিস চালু করুন। ট্রেনের সংখ্যা ওইসব অঞ্চলে দ্বিগুণ করাও প্রয়োজন। তিন. সর্বাংশে নিহত ও সমাধিস্থ নদ-নদীকে দখলমুক্ত করে, সিএস খতিয়ান মোতাবেক সেগুলোর দৈর্ঘ্য-প্রস্থে উদ্ধার ও খননের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় গভীরতা নিশ্চিত করে সেগুলোকে বার্ষিক বহমান করে তোলার মাধ্যমে কার্যকর নৌপরিবহন সার্ভিস চালু করা হোক। জনমত শতভাগ এই দাবিগুলোর পেছনে রয়েছে। রয়েছে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ ও নির্দেশনা।

যে কোনো সূত্র থেকেই এ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে অবিলম্বে তা বিভিন্ন জেলার সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে  পৌঁছানো এবং চলমান শুকনো মৌসুমটি সে কাজের উপযুক্ত হয় তার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের স্মরণে রাখা দরকার, নদী পুনরুদ্ধার শুধু নৌপরিবহন চালু করার জন্যই প্রয়োজনীয় নয়। দেশব্যাপী পরিবেশের উন্নয়ন, কৃষিতে স্বল্প ব্যয়ে সেচ সম্প্রসারণ, বনায়ন ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যও অপরিহার্য। নতুন সড়ক আইনের সংশোধন না করে পরিপূর্ণ প্রয়োগ করতে হবে। যে পন্থায় কথায় কথায় ধর্মঘট ডাকা হয়, এই ধর্মঘটকে বেআইনি ঘোষণা করে ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এবারের কৌশলটা ছিল নতুন। মালিকরা জানেন না এই ধর্মঘটের ব্যাপার- এই দাবিই মালিকরা করেছিলেন। সরকারকে সব রকম স্বেচ্ছাচারিতার উৎস খুঁজে বের করতে হবে। নৈরাজ্যের স্থায়ী অবসানকল্পে সরকার ও প্রশাসনকে দৃঢ় থাকতে হবে। যাত্রীদের স্বার্থকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে। পরিবহন খাতের নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে যাত্রীস্বার্থ রক্ষায় মনোযোগ বাড়াতে হবে।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
raneshmaitra@gmail.com