রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে দমন-পীড়ন

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মঙ্গল কুমার চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২২ বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও সরকার চুক্তির মৌলিক বিষয়সহ দুই-তৃতীয়াংশ ধারা অবাস্তবায়িত অবস্থায় রেখে দিয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরকারী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার একনাগাড়ে ১১ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়গুলো বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে ১১ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অবস্থা যে তিমিরে ছিল, ১১ বছর পরও কার্যত একই তিমিরে রয়ে গেছে। ২২ বছরেও পার্বত্য সমস্যার কাঙ্ক্ষিত সমাধান হওয়া তো দূরের কথা, সমস্যা আরও জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে সরকার পূর্ববর্তী শাসকদের মতো দমন-পীড়নের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি অনেকটা চুক্তি-পূর্ব অবস্থায় রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাহাড়ি অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণে যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিধান থাকলেও তার পরিবর্তে এই বৈশিষ্ট্যকে ক্ষুণ্ণ করার লক্ষ্যে সরকার সেটেলার বাঙালিদের পুনর্বাসন, সেটেলারদের গুচ্ছগ্রাম সম্প্রসারণ, জুম্ম জনগণকে সংখ্যালঘু করার লক্ষ্যে নতুন করে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঘটানো, জুম্মদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা, বহিরাগতদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণ, ডেপুটি কমিশনার কর্তৃক স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান, ভূমি বেদখল, বহিরাগতদের কাছে ভূমি বন্দোবস্তি ও ইজারা প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রম অব্যাহতভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছে।

চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন প্রণয়ন ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করা হয়। কিন্তু আইন প্রণীত হলেও এসব আইন যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ (স্থানীয়), ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন (রিজার্ভ বন ব্যতীত) ও পরিবেশ, পর্যটন, মাধ্যমিক শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদিসহ ১৬টি বিষয় ও কার্যাবলি এখনও অর্পণ করা হয়নি। পক্ষান্তরে পার্বত্য চুক্তি ও চুক্তি অনুযায়ী প্রণীত এসব আইনকে লঙ্ঘন করে ডিসি-এসপিসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর মাধ্যমে এসব বিষয় পরিচালনা করা হচ্ছে।

চুক্তির পর ২২ বছর অতিক্রান্ত হলেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন বিধিমালা ও ভোটার তালিকা বিধিমালাও প্রণীত হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের নিয়োগ দিয়ে মনোনীত অন্তর্বর্তী পরিষদের মাধ্যমে অগণতান্ত্রিকভাবে তিন পার্বত্য পরিষদ পরিচালনা করে এসব পরিষদকে অথর্ব অবস্থায় রাখা হয়েছে এবং চুক্তিবিরোধী, তাঁবেদারি ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠিত হলেও এখনও একটি ভূমি বিরোধও নিষ্পত্তি করা হয়নি। ক্রমাগত আন্দোলনের ফলে ১৫ বছর পর ২০১৬ সালে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর বিরোধাত্মক ধারা সংশোধন করা হলেও ভূমি কমিশনের বিধিমালা তিন বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কমিশনের বিধিমালা প্রণীত না হওয়ার কারণে ভূমি কমিশনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির বিচারিক কাজ শুরু করা যায়নি। ২২ বছরেও ভূমি কমিশনের পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ, জনবল নিয়োগ এবং রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায় শাখা অফিস স্থাপন করা হয়নি। এভাবেই একের পর এক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ভূমি কমিশনের মাধ্যমে জুম্মদের বেহাত হওয়া জায়গাজমি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে রাখা হয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি নিষ্পত্তি হওয়ার পরিবর্তে ভূমি সমস্যা আরও জটিল হয়েছে এবং ভূমি নিয়ে প্রতিনিয়ত হানাহানি ও সংঘাত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। অস্থানীয়দের কাছে প্রদত্ত প্রায় ২০০০-এর মতো ভূমি ইজারা প্লট এখনও বাতিল করা হয়নি। চুক্তি লঙ্ঘন করে অস্থানীয়দের কাছে জুম্মদের প্রথাগত ভূমি ও মৌজা ভূমি অবৈধভাবে ইজারা প্রদান করা হচ্ছে। ফলে জুম্মদের জীবন-জীবিকা চরমভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ছে এবং একের পর এক জুম্ম গ্রাম উচ্ছেদের মুখে পড়েছে।

প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স গঠিত হলেও এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে ৯০ হাজার জুম্ম পরিবার পরিচিহ্নিত করা হলেও এখনও প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তুদের তাদের স্ব-স্ব জায়গাজমি প্রত্যর্পণ করে পুনর্বাসন করা হয়নি। টাস্কফোর্সের সভায় সিদ্ধান্ত হলেও এখনও অভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তুদের রেশন প্রদান করা শুরু হয়নি। ফলে গত ২২ বছর ধরে অভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তুরা অনিশ্চিত জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে প্রত্যাগত ১২,২২২ প্রত্যাগত শরণার্থী পরিবারের মধ্যে এখনও ৯ হাজার পরিবারের জায়গাজমি ফেরত দেওয়া হয়নি এবং প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের ৪০টি গ্রাম এখনও সেটেলারদের দখলে রয়েছে।

এখনও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও স্থানীয় সংস্থাগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সার্বিক সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের অধীনে নিয়ে আসা হয়নি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনও জনমুখী ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ধারা এবং নিজেদের উন্নয়ন নিজেরাই নির্ধারণ করার পার্বত্যবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন ধারা গড়ে ওঠেনি। চুক্তি বাস্তবায়নের দোহাই দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোটি কোটি টাকার চুক্তিবিরোধী ও জনসংস্কৃতি পরিপন্থি উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলেছে। জুম্মদের বেহাত হওয়া জায়গাজমি প্রত্যর্পণের পরিবর্তে ভূমি জবরদখল, অবৈধভাবে অস্থানীয় ভূমি ইজারা প্রদান, ঠেগামুখে স্থলবন্দর স্থাপনের উদ্যোগ, ঠেগামুখ-চট্টগ্রাম বন্দর সংযোগ সড়ক ও সীমান্ত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা, জমি দখল করে বিলাসবহুল পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, বিধিবহির্ভূতভাবে রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা, রোহিঙ্গাসহ বহিরাগতদের বসতি প্রদান ও জুম্মদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি জুম্মদের সংস্কৃতি ও অস্তিত্ববিধ্বংসী উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে জুম্মদের তাদের চিরায়ত ভিটেমাটি থেকে ক্রমাগত উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

চুক্তির সঙ্গে সঙ্গতি বিধানকল্পে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, ১৮৬১ সালের বাংলাদেশ পুলিশ আইন ও পুলিশ রেগুলেশনসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য সব আইন ও বিধি এখনও সংশোধন করা হয়নি। ফলে এসব আইনের দোহাই দিয়ে ডিসি-এসপিসহ পার্বত্য জেলার জেলা ও উপজেলা প্রশাসন আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, শিক্ষা, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, এনজিও কার্যক্রম ইত্যাদি পরিচালনা করে চলেছে। এতে করে আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরুদ্ধে ২০০০ সালে জনৈক বদিউজ্জামান ও ২০০৭ সালে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম কর্তৃক দায়েরকৃত দুটি মামলায় ২০১০ সালে প্রদত্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে চলমান আপিল মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির কোনো উদ্যোগ গত ১০ বছরেও আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করেনি। আইন-আদালতের দোহাই দিয়ে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা এবং চুক্তি অনুযায়ী প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনকে অকার্যকর করার হীন উদ্দেশ্যে আপিল মামলা মোকাবিলায় সরকার এভাবে নিষ্ফ্ক্রিয়তা প্রদর্শন করছে বলে নিঃসন্দেহে বলা যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা