অগ্নিগর্ভ ভারত

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

হরিপদ দত্ত

সংকট মোচন আর ভোটের রাজনীতির দিকে তাকিয়ে শাসক শ্রেণির অংশ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস আসামে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জির উদ্ভব ঘটিয়েছিল। সেই বীজ আজ বিজেপির জলসিঞ্চন আর যত্নআত্তিতে বিশাল বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। দেশটি আজ গভীর সংকটে পতিত। প্রশ্ন উঠতে বাধ্য- আগে নয়, পরে নয়, এখন কোন এই সংকট? এর সহজ উত্তর- এমন অর্থনৈতিক সংকটে দেশটি এর আগে পড়েনি। উদ্ধারের কোনো পথ নেই। জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। পাকিস্তানি জুজুর ভয় দেখিয়েও কাজ হয়নি, বাবরি মসজিদ বিতর্কের রায় সুপ্রিম কোর্ট পক্ষে দিলেও উদ্ধার মিলছে না সংকট থেকে। ইংরেজ যুগ থেকে আজ পর্যন্ত একটাই পথ মিলেছে তা হচ্ছে, সাম্প্রদায়িকতা। পরিণতিতে দেশ ভেঙে গেছে। কিন্তু সংকট বিমোচন ঘটছে না। খণ্ডিত দেশটিকে তো আর খণ্ড-বিখণ্ড করা যায় না। তা হলে মাটি নয়, ভাগ কর মানুষকে, নাগরিকদের। তাই কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীকে ভাগ কর মধ্য দিয়ে, হিন্দু-মুসলমানে। ভারতীয় জনগণের হিন্দু-মুসলমানের বড় অংশই এই ধর্মীয় বিভাজনে সায় নেই। আজ এই যে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি, তাতেও নয়। কালঘুম ছুটে গেছে তাই বিজেপি সরকারের। জনগণের ভেতর কিংবা বাইরের কারও কারও মনে শঙ্কা হতেই পারে- এবার বুঝি দেশটা ভেঙেই গেল। আপাতত এ ধারণা অমূলক। কেননা ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এ পর্যায়ে যায়নি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বদলে গেছে। সোভিয়েতসহ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পর বিশ্ব পুঁজিবাদ একক শক্তিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্ব। সারাবিশ্ব পুঁজির জালে বন্দি। দেশ ভাঙলে লাভের চেয়ে ক্ষতি। নিরাপদ বিশ্ব পুঁজি সংকটে পড়বে। সমাজতান্ত্রিক ব্লক আর পুঁজিবাদী ব্লকের দ্বন্দ্বটা আজ নেই। আঞ্চলিক সংঘাত জিইয়ে রাখলেও দেশ ভাঙার পক্ষে আজ সাম্রাজ্যবাদীরা নেই। সংঘাতপূর্ণ ইয়েমেন শিয়া-সুন্নিরা ভাঙতে পারবে না; ইরাক, সিরিয়াও ভাঙবে না। ইরাক আর তুরস্ক থেকে ভূমি কেড়ে নিয়ে স্বাধীন কুর্দিস্তানও হবে না।


অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের সন্দেহ এবং আতঙ্ক দুটিই আছে। সেই আতঙ্ক ওরা বয়ে এনেছে সাতচল্লিশের দেশ ভাগের ব্যক্তিক এবং পারিবারিক বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে। অন্যদিকে দীর্ঘ ৩৪ বছর বাম শাসনের একটা প্রভাব তাদের চেতনায় এখনও রয়েছে। ধর্ম হোক, ভাষা হোক, উগ্র জাতীয়তাবাদ ওরা পছন্দ করে না। কিছু বাঙালি বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ তৃণমূল কংগ্রেসের অত্যাচার। আত্মরক্ষার্থে ওদিকে ভিড়েছে তারা, ধর্ম-দর্শনের দৃষ্টিতে নয়। তা ছাড়া ছোট হয়ে যাওয়ার ভয়টা আছে। বাংলা ভেঙে ছোট হয়েছে, আর ওরা ছোট হতে চায় না, বৃহৎ ভারতের সঙ্গেই থাকতে চায় চাকরি-ব্যবসা নানা সুবিধার জন্য। এনআরসির বিরুদ্ধে হোক, চাই কি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাম ছাত্র সংগঠনই সবার আগে প্রতিবাদ মিছিল বের করে রাতের বেলা। তাদের দাবি, এ হামলা বিজেপি সরকারের ফ্যাসিস্ট এবং স্বৈরাচারী কাজ। কেবল তাই নয়, ২৪ ঘণ্টার ভেতর সারা ভারতের ছাত্র সমাজ গর্জে ওঠে। ভারতবর্ষের সংবিধানে বর্ণিত গণতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার অঙ্গীকার করে তারা।

পশ্চিমবঙ্গের বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। শাসন ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছে বামফ্রন্ট, জনভিত্তি (ভোট) ভেঙে পড়েছে। কিন্তু শিক্ষিত মেধাবী তরুণ সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীর্ঘ বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে। মানুষকে চমকে দিয়ে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব ক'টি আসনই দখল করেছে সিপিএম সমর্থক ছাত্র সংগঠন এসএফআই অর্থাৎ ভারতীয় ছাত্র ফেডারেশন। এতে প্রমাণ করা চলে যে, মেধাবী ছাত্র সমাজ অর্থাৎ চিন্তাশীল, সৃজনশীল তারুণ্য সমাজতন্ত্রের পক্ষে। অন্যদিকে দিল্লির কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ দখল করেছে এসএফআই তাদের সঙ্গী দলিত ছাত্রদলের সঙ্গে যৌথভাবে। পশ্চিমবঙ্গে পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের এবং তথাকথিত শরণার্থী-অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে যিনি প্রথম বিষোদ্গার করেছিলেন, তার নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন তিনি বিজেপি সরকারের অংশীদার সাংসদ। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কাগজ ছিঁড়ে নিক্ষেপ করেছিলেন স্পিকারের দিকে। তখন রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার। তার দাবি ছিল, উদ্বাস্তুরা ভোট দেয় বামেদের, আজ তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করে বিজেপি, আসলে সবই ভোটের খেলা। সংখ্যালঘু বাঙালি মুসলমান আর পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু হিন্দুরা শাসক দলের ভোটার মাত্র। এই মমতাই বামফ্রন্টকে উৎখাত করার জন্য বিজেপিকে হাত ধরে বাংলায় নিয়ে আসেন। আজকে এনআরসির নামে বিজেপিবিরোধিতা তার একটি রাজনৈতিক কৌশল। বাম কিংবা কংগ্রেসের পুনরুত্থান ঠেকানোই তার উদ্দেশ্য।

তৃণমূল আর বিজেপি দুটি দলই সাম্প্রদায়িক দল। একদল খেলে মুসলিম ভোট নিয়ে, অন্য দল হিন্দু ভোট। দুটি দলই ধর্মের নামে মানুষকে ভয় দেখায়। বোঝাতে চায় তাদের ভোট দিলেই তারা রক্ষা পাবে। তাদের ভোট না দিলে এক দল বলে, অন্য দল তাদের দেশ থেকে বের করে দেবে। তারাই তাদের রক্ষাকর্তা। অন্য দল বলে, তাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় না রাখলে দেশটা পাকিস্তান হয়ে যাবে। তৃণমূল দেখায় কমিউনিস্টদের ভয়, বিজেপি দেখায় মুসলমানের ভয়। উভয় দলই জানে ভয় দেখালেই মানুষ বশে থাকবে। ভয়ের এই পরিবেশ কেবল জনগণের ভেতরই তৈরি করেনি এই দুটি দল, প্রশাসনের ভেতরও। প্রশাসনের প্রতিটি অঙ্গই তারা প্যারালাইস্ট করে দিয়েছে। বর্তমান সময়ের মতো ভারতবর্ষে পূর্বে কখনও এমনি অবস্থা তৈরি হয়নি। জনগণ আজ দিশেহারা। দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে। মানুষের আয় কমে গেছে। চাকরি নেই। কোটি কোটি কর্মক্ষম মানুষ বেকার। একটার পর একটা শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রিজার্ভ ব্যাংক শূন্য। ঘনীভূত হচ্ছে আগামী ভয়ানক দিন। তাই জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে ঘোরাতে তৈরি করা হচ্ছে ধর্মবিদ্বেষ। কেবল মুসলিমরাই নয়, খ্রিষ্টান-বৌদ্ধরাও। হিন্দুদের বড় একটি অংশ রয়েছে, যারা দলিত বা নীচুজাত বলে বর্ণিত। অভূতপূর্ব এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে ভারতে। তাই দরকার এনআরসি। মানুষকে ধর্মের নামে ভাগ করতে রাষ্ট্রহীন, নাগরিকত্বহীন করে আতঙ্কিত করতে আজ এই আয়োজন। তবে রক্ষাকবচও আছে। ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে ধর্মরাষ্ট্র করার চেষ্টাকে সমর্থন কর এবং বিজেপিকে ভোট দাও, ক্ষমতায় রাখো। এই হচ্ছে বিজেপির হাতিয়ার। অন্যদিকে তৃণমূল বলছে উল্টো। তারা বলছে, রাষ্ট্রের সংবিধান রক্ষা করবে তারা, বিনিময়ে ভোট দিতে হবে তাদের। উদ্বাস্তুদের-শরণার্থীদের বাঁচাবে, মুসলমানদেরও বাঁচাবে যদি তারা ভোট দেয়।

ধর্মবাদী মৌলবাদের প্রধান শত্রু হচ্ছে গণতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতা। তাই তাকে ধ্বংস করাই তার কাজ। এটা সহজ হয় একটি রাষ্ট্রে যদি একই ধর্মের লোকের বাস হয়। ভারতবর্ষ বহু ধর্মের, বহু জাতি আর ভাষা-সংস্কৃতির দেশ। বিশেষ ধর্মের কর্তৃত্ব এখানে সম্ভব নয়, যদিও সংখ্যা বড় হোক। দেশকে টিকিয়ে রাখতে হলে ধর্মনিরপেক্ষ, জাতিনিরপেক্ষ ও ভাষা-সংস্কৃতি নিরপেক্ষ হতেই হবে। রাষ্ট্রের সমস্যা, জনগণের সমস্যা সমাধানের পথ ধর্ম, জাতি বা ভাষা বিভেদের পথে অসম্ভব। আসামে অনুন্নয়ন, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট বাঙালি বা মুসলমানদের বিতাড়নের পথে সম্ভব নয়। দেশভাগের সময় হিন্দুরা আসামে প্রবেশ করেছে, এটা মিথ্যা নয়। কিন্তু ওরা বাঙালি হিন্দু। গোড়ার ইমিগ্রেশনটা ঘটেছে পলাশী যুদ্ধের পর মহাদুর্ভিক্ষ নেমে এলে। তখন হিন্দু-মুসলমান এবং আদিবাসীও ছিল সেই দলে। একাত্তরে যুদ্ধের সময়ও এমনটা ঘটেছে। বহু বছর ধরেই আসামে মাইগ্রেশন চলেছে। উর্বর ভূমি, অধিক খাদ্যশস্য, জীবনের নিরাপত্তা ইত্যাদির প্রশ্নেই এমনটা ঘটেছে। পরিণামে অসমিয়াদের দ্বারা বাঙালি নিধন বা গণহত্যাও কম হয়নি। রাজনীতির স্বার্থে মানুষে মানুষে সংঘাত তৈরি করে কম রক্ত ঝরেনি। এখন রাষ্ট্র সরাসরি এনআরসির নামে ভাষা ও ধর্মকে সামনে রেখে ভয়ংকর এক খেলায় মেতেছে। এ সমস্যা সহসা মিটবে না। মানবতার বিপর্যয় ঘনীভূত হবে।

সর্বশেষ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পার্লামেন্টে পাস হয়েছে। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ব্যাপারটা পড়েছে মহাবিপদে। মানুষ আন্দোলনে নেমেছে। ক্রমেই তা হিংসার ফাঁদে পড়েছে। আগুনে পোড়ানো হচ্ছে ট্রেন, বাস, দোকান ইত্যাদি। অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে দেশ। আশ্চর্য এই, পশ্চিমবঙ্গে এসব যখন ঘটছিল, তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল অদৃশ্য। শত শত কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। আরও আশ্চর্য এই যে, এই সংবিধানবিরোধী এবং গণবিরোধী আইনটি যখন বিজেপি সরকার সংসদে পাস করিয়ে নেয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সাংসদদের অর্ধেকই সেখানে ছিল অনুপস্থিত। এই রহস্য বড় জটিল। পর্দার আড়ালে, দৃশ্যের বাইরে কী হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে? জনগণ জানতে চায়। কলকাতায় বড় বড় মিছিল হচ্ছে পথচারী জনগণকে দুর্ভোগে ফেলে। তৃণমূল সরকারের পুরোটাই নেমে এসেছে পথে। বিরোধী দলেরাও। এমনকি বিজেপিও। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এরই ভেতর ভারতীয় রাজনীতিতে রূপান্তর ঘটেছে। ভিড় জমানো মিছিল রাজনীতিতে তেমন কাজে আসে না। তৃণমূল সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর ঐক্যের সম্ভাবনা খুব কম। বিরোধীরা মমতাকে বিশ্বাস করে না। নারদা, সারদার মহাদুর্নীতির চাপ এলেই মমতা সব ছেড়ে ছুটে যান দিল্লি। আপস হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে বাম-গণতন্ত্রী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থানই একমাত্র পথ। ধর্ম যেখানে রাজনীতির হাতিয়ার, সম্প্রদায় তোষণ যেখানে তৃণমূল-বিজেপির ভোটের রাজনীতির চালিকাশক্তি, তাকে নির্মূল করতে হবে। অগ্নিগর্ভ ভারতকে রক্ষার একমাত্র শক্তি হচ্ছে বাম-গণতন্ত্রীদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে জনগণের সংগ্রামীপন্থি প্রগতিশীল ছাত্র-যুবসমাজ, এটাই বাস্তবতা।

-কলকাতা প্রবাসী কথাসাহিত্যিক