খবরটি অনেকেরই হয়তো দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন হাজারো রকমের পিলে চমকানো খবরের মধ্যে এটি হয়তোবা তেমন গুরুত্ব পায়নি। তার ওপর খবরটি ছাপা হয়েছিল পত্রিকার ভেতরের পাতায়, গত বছরের ১০ নভেম্বরের সমকালে। শিরোনাম ছিল-'শীর্ষ সন্ত্রাসী হওয়ার নেশায় বিভোর ৩ তরুণ'। খবরটির শিরোনামই বলে দেয়, ঘটনা কতটা ভয়ংকর। গাজীপুর থেকে সমকাল প্রতিনিধির পাঠানো খবরে বলা হয়েছে- পিস্তল আর মোটরসাইকেল কিনে বড় সন্ত্রাসী হয়ে বিত্তবৈভবের মালিক হওয়ার নেশায় বিভোর ছিল কিশোর আলী হোসেন আপন। তার নাম শুনলে সমাজের লোকজন ভয় পাবে, মুখের ওপর কেউ কথা বলতে পারবে না- এমন স্বপ্ন কুরে কুরে খাচ্ছিল ১৯ বছর বয়সী আপনকে। আর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে রাইসুল ইসলাম রিফাত ও ইমন রায়হান নামের ঘনিষ্ঠ দুই বন্ধুকে সহযোগী করে নেয়। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম শিকার হন আপনের আপন চাচা ও চাচি। বেড়াতে আসার নাম করে দুই বন্ধুসহ চাচার বাসায় রাতযাপনের পর তারা শ্বাসরোধ করে হত্যা করে চাচি রিনা আক্তারকে। চাচা সিদ্দিক ব্যাপারীকে করে কুপিয়ে জখম। তারপর আলমারি ভেঙে তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে পালিয়ে বেশিদিন থাকতে পারেনি ওরা। প্রথমে আলী হোসেন আপন ও পরে তার দুই বন্ধু ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে।

গাজীপুরের উল্লিখিত ঘটনার গভীরে যদি আমরা অভিনিবেশ সহকারে মনোযোগ দিই, তাহলে যে সত্যটি বেরিয়ে আসবে, তা গা শিউরে ওঠার মতো। একজন কিশোর, যে বয়সে তাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে নিজেকে 'মানুষ' হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টায় রত থাকার কথা, একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্য তার মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করার কথা, তা না করে সে বিত্তবৈভবের মালিক হওয়ার জন্য বেছে নিল নিকৃষ্টতম একটি পথ! বলা নিষ্প্রয়োজন, সুস্থ চিন্তার অভাবই তাকে এ পথে পা রাখতে প্ররোচিত করেছে। এ জন্য আমাদের বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতিও কম দায়ী নয়। আপন দেখেছে, এ সমাজে এখন অপরাধীদের দোর্দণ্ড প্রতাপ, অসাধু ব্যক্তিদের প্রাধান্য। ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, অর্থ আত্মসাৎকারীরা সমাজের মাথা, পেশিশক্তির কদর বেশি। সে দেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল যুবককে বেকারত্বের অভিশাপে ধুঁকে ধুঁকে মরতে। পাশাপাশি সে এও দেখেছে লেখাপড়ার ধার না ধেরে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি করে অনেককে অর্থবিত্তের মালিক হতে। আপন হয়তো ভেবেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী হতে পারলেই সবকিছু হাতের মুঠোয় চলে আসবে। তার এ ভাবনাকে অমূলক বলা যাবে না। কারণ, এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই আমাদের দেশে।

কিন্তু কেন একজন কিশোর সুস্থ জীবনের পরিবর্তে অসুস্থ জীবনে প্রবেশ করবে? কেন সে আলোর পথে না গিয়ে অন্ধকার সুড়ঙ্গে পা রাখবে? তার তো এই বয়সে খুনি হওয়ার কথা ছিল না। গত বছর সমকাল সারাদেশে কিশোর অপরাধ সংক্রান্ত যে সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, তাতে এই অধঃপতনের পেছনের কারণটি প্রতিভাত হয়ে উঠেছিল। এর প্রধান কারণ, আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাতে পারছি না। তাদের মনে এ ধারণা গেঁথে দিতে পারছি না যে, মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়া আমাদের আক্ষরিক অর্থেই মানুষ হতে হবে। সমাজের দায় তো এ ক্ষেত্রে আছেই, পরিবারের দায় কি কম?

প্রসঙ্গক্রমেই আমাদের শিক্ষাদান পদ্ধতির কথা এসে যায়। এখন শিশুরা কী শিখছে? আমরা ছেলেবেলায় অক্ষরজ্ঞান রপ্ত করতাম 'বর্ণবোধ' নামের একটি ছোট্ট বই থেকে। তারপর পিতা-মাতা আমাদের হাতে তুলে দিতেন 'আদর্শলিপি' নামের আয়তাকৃতির আরেকটি বই। সীতানাথ বসাক প্রণীত সে বইটি প্রকৃতই আদর্শ পুস্তক। শিশুকে অক্ষরজ্ঞানদানের পাশাপাশি নীতি-নৈতিকতার পাঠও রয়েছে সেখানে। স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের প্রতিটি অক্ষবকে আদ্যাক্ষর ধরে এমন কিছু বাক্য সেখানে রয়েছে, যা একজন শিশুকে নীতিবোধসম্পন্ন মানুষ হওয়ার প্রাথমিক পাঠদানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 'অ' তে-অসৎ সঙ্গ ত্যাগ কর, আ তে- আলস্য দোষের আকর, উ তে- উগ্রভাব ভালো নয়, ঊ তে- ঊর্ধ্বমুখে পথ চলিও না, ঈ তে- ঈশ্বরকে বন্দনা কর ইত্যাদি। আদর্শলিপিতে প্রতিটি অক্ষর দিয়ে যেসব উপদেশবাক্য লেখা রয়েছে, তার সবটা যদি কেউ আত্মস্থ করে এবং জীবনচলার পথে মেনে চলে, সে কখনও বিভ্রান্ত হতে পারে না, অনৈতিক পথে পা বাড়াতে পারে না। কিন্তু এখন কি শিশুদের বর্ণবোধ-আদর্শলিপি দিয়ে শিক্ষার শুরু হয়! এখন তাদেরকে শেখানো হয়- অ তে- অজগরটি আসছে ধেয়ে, আ তে- আমটি আমি খাব পেড়ে। প্রথমেই ভীতিকর একটি জীবের সঙ্গে পরিচিতি ঘটানো হচ্ছে আর তার পরেই শেখানো হচ্ছে আত্মকেন্দ্রিকতা বা স্বার্থপরতা। 'আমটি আমি খাব পেড়ে' কথার মধ্যে সর্বজনীন চিন্তার কোনো ছাপ নেই। বিষয়গুলো হয়তো অনেকের কাছেই তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে। তবে তা মোটেই হেলাফেলা করার বিষয় নয়।

আমাদের শৈশব-কৈশোরে পিতা-মাতা কড়া নজর রাখতেন আমরা কোথায় যাই, কার সঙ্গে মিশি, কী করি। কিন্তু আজকাল কি বাবা-মায়েরা সেরকম যত্ন নেন সন্তানের প্রতি? আজকাল অনেক ভাদ্রঘরের ছেলেমেয়েদের দেখা যায় নষ্ট হয়ে যেতে। একটি সত্য ঘটনা। হাজার কোটি টাকার মালিক এক পিতাকে তার বন্ধু জিজ্ঞেস করলেন- ভাই, আপনার ছেলেটিকে অনেকদিন দেখি না। একবার ডাকুন না। বিত্তশালী বাড়ির ভেতরে খবর পাঠালেন ছেলেকে আসার জন্য। একটু পরে কাজের লোক এসে জানাল- ভাইয়া তো তিন দিন আগে লন্ডন গেছে। আগন্তুক তার বন্ধুকে প্রশ্ন করলেন- আপনার ছেলে তিন দিন ধরে বাড়িতে নেই, আর আপনি তার খবর রাখেন না! কেমন পিতা আপনি? বলাই বাহুল্য, বিত্তশালী ব্যক্তিটি তার ছেলেকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেননি। ছেলেটি মাদকাসক্ত। তিনি তার ছেলেকে টাকার জোগান দিয়েছেন; কিন্তু প্রকৃত যেটা দেওয়া দরকার, তা দিতে পারেননি। সন্তানদের স্নেহের পাশাপাশি যে শাসনও দরকার, যথাযথ নজরদারি দরকার, তা আজকাল অনেক বাবা-মাই মনে রাখেন না।

আমরা যখন স্কুলে পড়েছি, তখন পাঠ্যবইয়ে বিখ্যাত মানুষের জীবনী থাকত। আমাদের সেগুলো পড়তে হতো। হাজী মোহাম্মদ মহসিন, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস প্রমুখ বরেণ্য ব্যক্তির জীবনী আমাদের পাঠ্য ছিল। সে কি শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য? না, ওইসব জীবনী আমাদের পড়ানো হতো ওই মহান ব্যক্তিদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য। তাদের সততা, দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ আর কর্তব্যপরায়ণতা আত্মস্থ করানোর জন্য তা আমাদের পড়ানো হতো। এখনও শিশুপাঠ্যে মহান ব্যক্তিদের জীবনী আছে; কিন্তু সেখানে ভর করেছে রাজনীতি। যখন যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের পছন্দমাফিক মহান ব্যক্তিদের জীবনী শিশুদের পাঠ করতে দেওয়া হয়। ফলে আমাদের পূর্বপুরুষদের অনেকেরই কীর্তিময় জীবনের কথা শিশুরা জানতে পারে না। আমাদের দায়িত্বশীলরা ভুলে যান যে, তারা যাকে অপছন্দ করছেন, অপাঙ্‌ক্তেয় করে এক পাশে সরিয়ে রাখছেন, তাদের সম্বন্ধেও আজকের শিশুদের জানা উচিত। সেখান থেকেও শিশুদের অনেক কিছু শেখার আছে; কিন্তু এসব বুড়োশিশুকে সে পাঠ দেবে কে?

সমাজচিন্তকরা মাঝেমধ্যেই এই বলে হতাশা প্রকাশ করেন যে, অনৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ধারায় আমাদের আগামী প্রজন্ম বিলীন হতে বসেছে। তাদের হাতে এখন বইয়ের পরিবর্তে অস্ত্র, মাদকদ্রব্য? তাদের চোখে এখন স্বপ্ন মানুষ হওয়া নয়, বিত্তশালী হওয়া। তারা এখন জ্ঞান আহরণের পরিবর্তে কীভাবে শর্টকাট পথে বড়লোক হওয়া যায়, সে চিন্তায় বিভোর। প্রশ্ন উঠতে পারে, আগামী প্রজন্মের একটি অংশের মধ্যে সৃষ্ট এ নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্য দায়ী কারা। এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এ জন্য দায়ী করা যাবে না। রাষ্ট্র থেকে পরিবারের প্রতিটি স্তরে যারা দায়িত্বে রয়েছেন, দায় তাদের সবার। দায়িত্ব পালনে তাদের ব্যর্থতা, কখনও তাদের নেতিবাচক ভূমিকা এ অবক্ষয়ের কারণ। একজন রাজনৈতিক নেতা বা সমাজপতি যখন একজন কিশোর বা যুবককে নিজের স্বার্থোদ্ধারে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তখনই রোপিত হয় সর্বনাশের বীজ। চোখের সামনে সন্তানের বখে যাওয়া দেখেও যে পিতা-মাতা নির্বিকার থাকেন, দায়ী তো তারাও। তাদের এ নির্বিকারত্ব আগামী প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে। আমরা যারা আশাবাদী মানুষ, তারা ঘনঘোর এ অন্ধকারেও আলোর রেখা দেখি। এর মধ্যেও যখন দেখি অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে তরুণের আরেকটি অংশ, আশায় বুক বাঁধি তখনই। না, হতাশার সাগরে ডুবে যাওয়ার মতো অবস্থা এখনও হয়নি আমাদের। আজ যারা বিভ্রান্ত, ভুল পথে পা রেখেছে অর্থবিত্ত আর পেশিশক্তিতে বলীয়ান কুহকে, নিশ্চয়ই তাদের বোধোদয় হবে একদিন। কিন্তু তার আগে আমাদের রোধ করতে হবে এই পচন প্রক্রিয়া। অনৈতিকতা আর অপরাধকে অবলম্বন করে গড়ে উঠতে যাচ্ছে যে প্রজন্ম, তাদেরকে দেখাতে হবে সঠিক পথ। এ দায়িত্ব যদি আমরা পালন না করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক