আইসিজের রায় মানতে মিয়ানমার বাধ্য?

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সনদ এবং আইসিজের নিজস্ব বিধি অনুযায়ী আইসিজের আদেশ মানতে সব পক্ষই আইনত বাধ্য। তবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আদালত যেমন পুলিশ বা অন্য প্রশাসনযন্ত্রের মাধ্যমে রায় বাস্তবায়ন করতে পারেন, আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থায় সেটি সম্ভব নয় বলেই অনুপস্থিত। সুতরাং বাস্তবে রায় মানা বহুলাংশে সংশ্নিষ্ট রাষ্ট্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। যদিও অধিকাংশ রাষ্ট্রই আইসিজের রায় মান্য করে থাকে, তবুও অমান্য করারও কিছু নজির রয়েছে।

আইসিজের রায় অমান্যকারী রাষ্ট্রের মধ্যে স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে, যে দেশটি নিকারাগুয়ার পক্ষে দেওয়া রায়কে ১৯৮৪ সালে অমান্য করেছিল। ১৯৭৩ সালে 'পারমাণবিক পরীক্ষা' মামলায় আইসিজের দেওয়া অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করেছিল ফরাসি দেশ। ১৯৪৯ সালে কারফিউ চ্যানেল মামলার রায় অমান্য করেছিল আলবেনিয়া, যে রায় ছিল যুক্তরাজ্যের পক্ষে। তবে রায়ের খেলাপ শুধু আন্তর্জাতিক আইনের খেলাপই নয়; জাতিসংঘ সনদেরও খেলাপ বিধায় রায় না মানার নজির খুবই কম।

রায় অমান্যের বিরুদ্ধে প্রতিকার :রায় অমান্যের বিরুদ্ধে একমাত্র প্রতিকার প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তা পরিষদকে। জাতিসংঘ সনদের ৯৪(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো রাষ্ট্র আইসিজের রায় অমান্য করলে, রায় পাওয়া রাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের দ্বারস্থ হতে পারে। তবে নিরাপত্তা পরিষদ কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা একান্তই নিরাপত্তা পরিষদের ব্যাপার। আইসিজে নিরাপত্তা পরিষদকে বাধ্য করতে পারেন না। নিরাপত্তা পরিষদে যেতে হবে রায় পাওয়া রাষ্ট্রকে, অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে গাম্বিয়াকে।

যে কোনো দেশ সাধারণ পরিষদে নালিশ করতে পারবে বৈকি; কিন্তু নিন্দা প্রস্তাব পাস করা ছাড়া সাধারণ পরিষদের কিছুই করার থাকবে না। পুলিশি ক্ষমতা একমাত্র নিরাপত্তা পরিষদেরই রয়েছে। তারপরও সাধারণ পরিষদের নিন্দা প্রস্তাব মিয়ানমারের ওপর বড় রকমের কূটনৈতিক, আইনি ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে বাধ্য।

ফৌজদারি ব্যবস্থা :আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত বা আইসিসি আইসিজে থেকে অনেকভাবেই আলাদা আদালত। প্রথমত, আইসিজের মতো এটি জাতিসংঘের অংশ নয়। এটি একটি বহুজাতিক চুক্তির সৃষ্টি। এটি একান্তই একটি ফৌজদারি আদালত। এই আদালতে কোনো রাষ্ট্রকে আসামি করা যায় না; আসামি হতে হবে ব্যক্তি। এই আদালতে যেতে উভয় পক্ষের সম্মতি লাগে না; তবে যে দেশে অপরাধ ঘটেছে সে দেশটি রোম চুক্তিভুক্ত হলে তবেই আইসিসি এখতিয়ার গ্রহণ করতে পারেন। এই আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন, জেল দিতে ও জরিমানা করতে পারেন। বাংলাদেশ রোম চুক্তিভুক্ত হলেও মিয়ানমার তা নয়। তাই মিয়ানমারের ভূমিতে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিচার এ আদালতে হতে পারে না বলে সেখানে মিয়ানমারে সংঘটিত গণহত্যার বিচার করতে পারে না। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হতে পারে এ কারণে যে, দেশান্তর করা মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞাভুক্ত। আর তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে- এই যে ভুক্তভোগী যে মুহূর্তে মিয়ানমারের ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখবে; অপরাধ তখনই হবে, তার পূর্বে নয়। আর তখন অপরাধ হবে বাংলাদেশের মাটিতে; মিয়ানমারের মাটিতে নয়। এ কারণে আইসিসি এই অপরাধের বিচার করতে পারবেন। কারণ যে দেশের ভূমিতে অপরাধ হয়েছে, অর্থাৎ বাংলাদেশ রোম চুক্তিভুক্ত।

আইসিসি চারটি অপরাধের বিচার করতে পারেন, যথা- ১. গণহত্যা; ২. মানবতাবিরোধী অপরাধ; ৩. যুদ্ধাপরাধ; ৪. আক্রমণজনিত অপরাধ। এই আদালত সু চিসহ অনেক কর্তাব্যক্তিকে সাজা দিতে পারবেন। সাজাপ্রাপ্তদের আটক রাখার জন্য নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে আইসিসির ব্যবস্থা রয়েছে। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি (ওপরওয়ালার দায়) নামে একটি তত্ত্ব রয়েছে। যার অর্থ হলো, নিম্ন অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের অপরাধ বন্ধ করতে পারে এমন কর্তাব্যক্তি যদি তার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যক্তিদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ বন্ধ না করে, তাহলে সেটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইয়ামাসিতা নামক এক জাপানি জেনারেলের ফাঁসি হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সু চি এবং মিয়ানমারের বহু সেনাধ্যক্ষের এই মতে সাজা হতে পারে- অপরাধ বন্ধে তাদের ব্যর্থতার জন্য।

রায় বাস্তবায়ন :রোম চুক্তিভুক্ত প্রতিটি রাষ্ট্রই আইসিসির রায় বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। যার ফলে সাজাপ্রাপ্তরা রোম চুক্তিভুক্ত কোনো দেশে প্রবেশ করলে সে দেশের দায়িত্ব হবে তাদের আইসিসির কাছে হস্তান্তর করা। বহু বছর পূর্বে আইসিসি সুদানের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান ওমর আল বশিরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর তিনি রাষ্ট্রপ্রধান থাকাকালীন সুদান ছেড়ে কোথাও যেতেন না এই ভয়ে- অন্য দেশে গেলে সে দেশ তাকে আইসিসির কাছে সোপর্দ করতে পারে।

আইসিসি মামলার বর্তমান অবস্থা :রোম চুক্তি অনুযায়ী যে তিনটি উপায়ে আইসিসি এখতিয়ার গ্রহণ করতে পারেন তার একটি হলো- আদালতের প্রসিকিউটর যদি মনে করেন, অভিযোগ তদন্ত করার মতো যুক্তিসঙ্গত তথ্য-উপাত্ত রয়েছে, তাহলে তিনি শুনানি প্রাক-শুনানি আদালতে তা পেশ করে তদন্ত পরিচালনার অনুমতি চাইবেন এবং সেই আদালত অনুমতি প্রদান করলে, তদন্তে নেমে পড়বেন। এরই মধ্যে প্রাক-শুনানি আদালত প্রসিকিউটরকে তদন্তের অনুমতি দিয়েছেন এবং তিনি তদন্ত শুরু করেছেন। রোম চুক্তির ৫৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রাক-বিচার চেম্বার প্রসিকিউটরের আবেদনের ক্রমে প্রয়োজনীয় আদেশ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন, তা যদি তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজন হয়। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলে আসামির সম্পদ ক্রোকের জন্য চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর সহায়তা চাইতে পারেন।

৫৮ অধ্যায় প্রসিকিউটরের দরখাস্তের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন, যদি প্রাক-বিচার আদালত মনে করেন- এটা বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি আইসিসি আদালতের এখতিয়ারাধীন অপরাধ করেছে এবং আদালতে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য ও এটা নিশ্চিত করার জন্য যে, সে যাতে তদন্ত অথবা বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে না পারে।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সময় প্রাক-বিচার আদালত সব সদস্যরাষ্ট্রকে অনুরোধ করতে পারেন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আইসিসি আদালতে হাওলা করার জন্য। এ অনুরোধ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অথবা ইন্টারপোলের মাধ্যমে পৌঁছানো যাবে। যেসব রাষ্ট্র রোম চুক্তিভুক্ত নয়, তাদের সঙ্গেও আইসিসি অস্থায়ী চুক্তি বা বন্দোবস্ত সম্পন্ন করে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার এবং হস্তান্তরের অনুরোধ করতে পারেন। আইসিসি কোনো আন্তঃসরকারি সংস্থার সাহায্য-সহায়তাও চাইতে পারেন।

৮৬ অধ্যায় অনুযায়ী সব চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রের ওপর দায়িত্ব রয়েছে আইসিসি আদালতকে সাহায্য-সহায়তা প্রদানের। তবে শুধু চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রগুলোই সাহায্য-সহযোগিতা করতে বাধ্য, যদি তারা আইসিসির সঙ্গে ক্ষণস্থায়ী ব্যবস্থা বা চুক্তি করে না থাকে। প্রাক-বিচার আদালত অভিযুক্তের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সমনও জারি করতে পারেন। ৫৯ অধ্যায়ে বলা হয়েছে- চুক্তিভুক্ত দেশগুলো গ্রেপ্তারের অনুরোধ পেলে তা কালবিলম্ব না করে তামিল করবে।

৬১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গ্রেপ্তার অথবা অভিযুক্তের হাজিরার পর প্রাক-বিচার আদালত অভিযোগ নিশ্চিত করতে প্রসিকিউটর আসামি ও তার আইনজীবীর উপস্থিতিতে শুনানি করবেন। তবে প্রাক-বিচার আদালত যদি মনে করেন, আসামি তার উপস্থিতির অধিকার বর্জন করেছে বা সে পালিয়েছে বা তাকে পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে তার অনুপস্থিতিতেই অভিযোগ নিশ্চিত করার শুনানি হতে পারে। তবে তার পক্ষে আইনজ্ঞ নিয়োগ হতে পারে। ওই শুনানিকালে প্রাক-বিচার আদালত স্থির করবেন- অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে কিনা এবং থাকলে প্রাক-বিচার আদালত মূল মামলা শুনানির জন্য বিচার আদালতে পাঠাবেন। অভিযোগের পক্ষে সিদ্ধান্ত হলে আইসিসি প্রেসিডেন্ট বিচারিক আদালত গঠন করবেন। বিচার হবে হেগে। তবে অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার হতে পারবে না।

ওপরের বর্ণনা থেকে স্পষ্ট- প্রসিকিউটর এখনই সু চি এবং অন্যদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার জন্য দরখাস্ত করতে পারেন। যদিও আইসিসি পরোয়ানা মিয়ানমারেও পাঠাতে পারেন; তবুও মিয়ানমারের সাহায্য-সহযোগিতা চাইতে পারবেন না, যদি মিয়ানমার আইসিসির সঙ্গে ক্ষণস্থায়ী ব্যবস্থা বা চুক্তি না করে। তবে সু চি এবং অন্যান্য আসামি চুক্তিভুক্ত কোনো দেশে গেলে সেই দেশগুলো তাদের গ্রেপ্তার করে হেগে পাঠাতে আইনত বাধ্য থাকবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি