সর্বগ্রাসী পচন রুখতে হবে

সমাজ

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন

সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসা, ভালো-মন্দ বিবেচনাবোধ, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য-জ্ঞান, দেশপ্রেম, সুশাসন এবং সামাজিক বন্ধন বর্তমান বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে গেছে। সমাজের এসব অতিপ্রয়োজনীয় উপাদানের পরিবর্তে শক্তভাবে স্থান করে নিয়েছে ব্যক্তিস্বার্থ, গায়ের জোরে আধিপত্য বিস্তার ও ক্ষমতা দখল, অনৈতিক কর্মকাণ্ড, খুন-গুম, লুটপাট, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদকাসক্তি এবং অপশাসন। এ অবস্থার জন্য সমাজবিজ্ঞানের বিবেচনায় বর্তমান সমাজে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও পেশাগত অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সার্বিকভাবে সামাজিক বন্ধনে শৈথিল্যকে মূলত দায়ী করা হবে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, ধর্মীয় আচার-আচরণে অবজ্ঞা, ধর্মীয় শিক্ষাকে অমান্য করা এবং ভালো-মন্দ ও ধর্মীয় বিধিনিষেধকে সগর্বে উপেক্ষা করার ফলে সমাজের এই পচন হয়েছে বলে ধারণা করা হবে। কারণ যাই হোক না কেন, সমাজের সর্বক্ষেত্রে মূল্যবোধের অভাবে দেশ ও জাতি যে অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে, তা আজ সবার কাছেই দৃশ্যমান।

আমাদের সংবিধানে মানুষের ওপর মানুষ শোষণমুক্ত, ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ এবং একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে (সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১০ ও ১১)। এই প্রত্যাশা ও চেতনায় মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে, মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দিয়েছেন; মা-বোন নির্যাতিত হয়েছেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, দেশের বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও কর্মকাণ্ডে তার প্রতিফলন নেই।

সব দেশেই রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় সে দেশের রাজনীতি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনীতি চলছে, তা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে আবর্তিত। রাজনীতিতে বর্তমানে নীতি, আদর্শ ও গঠনতন্ত্র অনুপস্থিত। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের কাছে আজ দেশের স্বার্থ ও জনগণের স্বার্থ নিদারুণভাবে পরাজিত। জনগণের প্রতি বর্তমান সরকারের দায়বদ্ধতা নেই বলেই সমাজের সর্বক্ষেত্রে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। ফলে সমাজের সর্বক্ষেত্রে নীতিহীনতা, নৈরাজ্য, হতাশা, দুর্নীতি এবং পেশি ও অর্থশক্তির দানবীয় দাপট সীমা লঙ্ঘন করে চলেছে। সমাজের সর্বজনীন মূল্যবোধকে প্রতিনিয়ত আঘাত হেনে চলেছে।

রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি সে দেশের অর্থনীতি। কর্তৃত্ববাদী সরকারের আর্থিক সেক্টরে সীমাহীন স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, নৈরাজ্য ও লুটপাটের ফলে জাতীয় অর্থনীতি আজ ধ্বংসের সম্মুখীন। দেশের বেশ কিছু ব্যাংক অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে। ঋণখেলাপিদের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করার ফলে খেলাপির সংখ্যা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২২ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ৮ হাজার ২৩৮ প্রতিষ্ঠানকে ঋণখেলাপি হিসেবে নাম প্রকাশ করেছেন। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৬ হাজার ৯৮৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নাম অর্থমন্ত্রী কৌশলে এড়িয়ে গেছেন।

দেশের অর্থনীতির খারাপ অবস্থার অপর কয়েকটি দৃশ্যমান সূচক হলো- ডলারের বিপরীতে টাকার অব্যাহত দরপতন, নেতিবাচক আমদানি-রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগে নিম্নগতি, শেয়ারবাজারে দরপতন এবং রাজস্ব আদায়ে বিপুল ঘাটতি। এ ছাড়া একটি গোষ্ঠীর অবৈধ অর্থ অর্জনের প্রবল মোহের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নজিরবিহীন রিজার্ভ চুরি, ঋণের নামে ব্যাংক থেকে অর্থ ডাকাতি, লুণ্ঠিত অর্থ বিদেশে পাচার, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ক্যাসিনোবাজি ও শেয়ারবাজার লোপাট করার মতো অনৈতিক ঘটনা এ দেশে ঘটেছে। এসব কারণেও জাতীয় অর্থনীতিতে যে পরিমাণ রক্তক্ষরণ হয়েছে, তা পূরণ করা অসম্ভব।

সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৭নং অনুচ্ছেদে 'সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী' বলে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, বর্তমান সরকারের আমলে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা আদালতে আইনের সমান আশ্রয় লাভ করছে না। ১/১১-এর সময় জরুরি আইনে সরকার দেশে বিরাজনীতিকরণের প্রজেক্টের অধীনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই নেত্রীসহ অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দিয়েছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে প্রত্যেক জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে উল্লিখিত সময়ের সব রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করেছে। সেই প্রক্রিয়ায় বিএনপি নেতারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদন করলেও তাদের একটি মামলাও প্রত্যাহার করা হয়নি। অন্যদিকে একই প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রায় ৬ হাজার মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এভাবে একই দেশে আইন দুটি ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নীতি ও নৈতিকতা নয়; ক্ষমতা ও শক্তিই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। একইভাবে নিম্ন আদালতগুলোকে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন করা হয়েছে। এমতাবস্থায় মানুষ আশা-ভরসার সর্বশেষ স্থান আদালতের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস কীভাবে রাখতে পারে?

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। একটি জাতিকে ধ্বংস করে দিতে হলে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করলেই যথেষ্ট। গত ১০ বছর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের পরিবর্তে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার বৃদ্ধি করার এক আত্মঘাতী খেলা মঞ্চস্থ করা হয়েছে। বোর্ডগুলোর মধ্যে চলেছে গ্রেড ও পাসের হার বৃদ্ধির অনৈতিক প্রতিযোগিতা। কলেজগুলোও এই অপসংস্কৃতির শিকার হয়েছে। ফলে গত ১০ বছরে ক্রমাগতভাবে শিক্ষার মানের অবনতি ঘটেছে। শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকই নয়; উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার মানের অবনতি ঘটেছে। যার ফলে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটিও স্থান পায়নি। দলীয় আনুগত্যের কাছে মেধা ও যোগ্যতা পরাজিত হওয়ায় ক্যাম্পাসে শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে অপরাজনীতি জন্ম নিয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মানের চেয়ে বাণিজ্য প্রাধান্য লাভ করেছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত কিছু মারাত্মক ঘটনা দেশের জনগণকে দারুণ উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলেছে। গত ১১ জানুয়ারি দেশের রাষ্ট্রপতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বলেছেন, 'উপাচার্যরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান নির্বাহী। দায়িত্ব পালনকালে নিজেদের সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতা আপনাদের প্রমাণ করতে হবে। আপনারা যদি অনিয়মকে প্রশ্রয় দেন বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কী হবে?' তিনি কি কোনো তথ্য ও উপাত্ত ছাড়াই উপাচার্যদের লক্ষ্য করে এ ধরনের মন্তব্য করেছেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ প্রশাসনের প্রশ্রয় না পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে 'টর্চার কক্ষ' সৃষ্টি হয় কীভাবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মেধাবী ছাত্ররা নিজেদের হলে কর্তৃত্ববাদী বলয় সৃষ্টি করার জন্য ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেয়। এই ছাত্ররা ভিন্নমতাবলম্বী ছাত্রদের হত্যা, লাঠিপেটাসহ বিভিন্ন নির্যাতন, মাদক বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে সাম্প্রতিক পত্রপত্রিকার শিরোনাম লাভ করেছে।

সম্প্রতি বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এ ছাড়া গত ১০ বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২৫ জন ছাত্র এ ধরনের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ডের যদি সঠিক তদন্তপূর্বক বিচার করা হতো, তাহলে হয়তো আবরারকে এমনভাবে প্রাণ দিতে হতো না। আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা বর্তমানে কারাগারে। তাদের সবাইকে বুয়েট থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। কিন্তু বুয়েটের ন্যক্কারজনক ঘটনার ৩ মাসের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের গেস্টরুমে ২১ জানুয়ারি রাতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ৪ জন শিক্ষার্থীকে বুয়েটের কায়দায় লাঠিপেটাসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন করেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় ৪ শিক্ষার্থীকে রাতের মধ্যেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের ভাগ্য ভালো যে, নির্যাতিত ছাত্ররা সংখ্যায় ৪ জন ছিল। পেটোয়া বাহিনীর মারকে ৪ ভাগে শেয়ার করা জন্য হয়তো ৪ জন ছাত্রকে আবরারের ভাগ্য বরণ করতে হয়নি। আবরারসহ যারা হত্যার শিকার হয়েছে, তারা তো পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনৈতিক ও দানবীয় আচরণের জন্য যারা ছাত্রত্ব হারাচ্ছে এবং কারাভোগসহ বিভিন্ন শাস্তি পাচ্ছে, তাদেরও তো জীবন নষ্ট হয়ে গেল। গত ১৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বোর্ডের এক সভায় ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অস্ত্র ও মাদকের সঙ্গে সংশ্নিষ্টতার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় মোট ৬৭ জন শিক্ষার্থীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্য বহিস্কার করা হয়েছে। এমন নজির আরও আছে। এসব ছেলের বাবা-মায়েরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছেন, প্রত্যাশা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যসহ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা যদি অনিয়মকে প্রশ্রয় না দিতেন বা একটি চিহ্নিত ছাত্রগোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা না করতেন, তাহলে তারা এত ভয়ংকর, বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারত না।

এ ছাড়াও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মূল্যবোধের অবক্ষয়, ব্যক্তিস্বার্থ ও অর্থ অর্জনের অনৈতিক প্রতিযোগিতায় সমাজে অস্থিরতা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খুন, গুম, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুবসমাজ মাদকের ছোবলে বিপর্যস্ত। মাদক ব্যবসায়ীরা সরকারি ছত্রছায়ায় শুধু অবৈধভাবে অর্থ অর্জনের লোভে এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ ধরনের অসহনীয় পরিস্থিতিতে জনজীবন আজ দুর্বিষহ। জনগণ এ ধরনের একটি শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার অবসান চায়।

সদস্য, জাতীয় স্থায়ী কমিটি-বিএনপি; সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী; সাবেক অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়