যেতে হবে আরও বহুদূর

রোহিঙ্গা সংকট

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

হারুন হাবীব

একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চরম বর্বরোচিত আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) সাহসী ও দৃষ্টান্তমূলক রায় দিয়েছেন। তা আইনের শাসন ও মানবতার মর্যাদা রক্ষায় দৃষ্টান্তমূলক বিচারিক সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত সহিংসতা ও বৈষম্যের নীতিতে গণহত্যার উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও রায়ে মন্তব্য করা হয়েছে। সেই যুক্তিতেই অবিলম্বে এই ক্ষুুদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা ও বৈষম্য বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন বিশ্ব আদালত। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দিতে সর্বসম্মতভাবে মিয়ানমারের প্রতি চার দফা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত, যা মেনে চলা দেশটির জন্য বাধ্যতামূলক। যে চারটি নির্দেশ দেওয়া হযেছে, তা হচ্ছে- ১. জাতিসংঘ গণহত্যা সনদ অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের হত্যাসহ সব ধরনের নিপীড়ন থেকে নিবৃত্ত থাকতে হবে; ২. সেনাবাহিনী বা অন্য কেউ যাতে গণহত্যা সংঘটন, ষড়যন্ত্র বা উস্কানি দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে; ৩. গণহত্যার অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত সব সাক্ষ্য-প্রমাণ রক্ষা করতে হবে; ৪. রায় অনুযায়ী আগামী চার মাসের মধ্যে মিয়ানমার যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আদালতকে জানাতে হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ বিপন্ন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এই নৃশংসতাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে আইসিজেতে মামলা দায়ের করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। আবেদনটি ছিল- বর্বরোচিত আচরণে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক গণহত্যা কনভেনশন ভঙ্গ করেছে। রায়টিতে মূলত রাখাইনের মাটিতে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের হত্যা, জখম বা মানসিকভাবে আঘাত করা, পুরো জনগোষ্ঠী বা তার অংশবিশেষকে নিশ্চিহ্ন করা এবং তাদের জন্মদান বন্ধের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ থেকে মিয়ানমারকে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বা কোনো পক্ষ এমন কিছু করতে পারবে না, যা গণহত্যা হিসেবে গণ্য হতে পারে। জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী এই রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে হবে। মোট কথা, রোহিঙ্গাদের রক্ষা করার লক্ষ্যে এই প্রথম আন্তর্জাতিক আদালতের কোনো ব্যবস্থা ঘোষিত হয়েছে।

বলা বাহুল্য, গাম্বিয়ার এই সাহসী পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন ভূ-রাজনৈতিক ও নিছক স্বার্থসংশ্নিষ্ট কৌশলগত কারণে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা সব অর্থেই অস্তিত্বের হুমকিতে। তারা কেবল দেশ ছাড়তেই বাধ্য হয়নি, একই সঙ্গে তাদের সন্তান-সন্ততিদেরও ভবিষ্যৎ বিপন্ন। একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি সরকার বা তার সেনাপ্রশাসন যে আচরণ করে চলেছে, তাকে কেবল সাধারণ বৈরিতা বলা যাবে না। বরং এটি এমন এক বর্বরতা বা পশুত্ব, যাকে থামাতে না পারলে মনুষ্যত্ব শব্দটি অভিধান থেকে মুছে যাবে। আরও আক্ষেপের বিষয় যে, মিয়ানমারের সরকারপ্রধান এবং এককালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে সেনাবাহিনীর অবস্থানকেই সমর্থন করেছেন। মামলাটি যেন খারিজ করে দেওয়া হয়; তারও আবেদন করেছেন, যা তার জীবনের সব অর্জন ধ্বংস করেছে!

স্বভাবতই রায় নিয়ে মিয়ানমার বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তবে গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল আবুবকর মারি তামবাদু এই বিচারকে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ নিপীড়ন ও বঞ্চনার অবসানের পথে একটি 'ছোট পদক্ষেপ' বলে অভিহিত করেছেন। মোদ্দা কথা, আন্তর্জাতিক আদালতের এই রায়ের ফলে রোহিঙ্গারা এই প্রথমবারের মতো মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কারণ বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার যে দীর্ঘ পথ তারা পেরিয়েছে, তা পদে পদে তাদের মনুষ্যজন্মকে অস্বীকার করে এসেছে।

মাত্র ২৫ পৃষ্ঠার রায়। বিশ্ব আদালত সুস্পষ্ট করে বলেননি- রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা হয়েছে বা হয়নি। তবে গাম্বিয়ার আবেদনে রোহিঙ্গাদের যে সুরক্ষা চাওয়া হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে মন্তব্য করেছেন, জাতিসংঘ সনদের ৪১ বিধির আওতায় মূল অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা, তা বিচারের আগেই ওই জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় অন্তর্বর্তী নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী দলের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে 'আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন ঘটেছে বলে বিশ্বাস করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে'- এমন মন্তব্য করেছেন আদালত। অতএব বলতেই হবে, রায়টি কোনো হঠকারী ঘোষণা নয়, বরং আদালত যে অদূর ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাবেন; তারও স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে।

আদালতের ১৫ জন স্থায়ী সদস্য এবং গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের মনোনীত অ্যাডহক বিচারপতি সবাই অন্তর্বর্তী আদেশগুলোর বিষয়ে একমত হন। তবে চীনের বিচারপতি সু হানকিন গণহত্যা সনদের বিধানগুলোর আলোকে গণহত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়ে থাকতে পারে- এমনটা মনে করেননি। অবশ্য যে মাত্রায় রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা ও বৈষম্যমূলক আচরণ হয়েছে, তা অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারির জন্য যথেষ্ট বলে তিনি মত দিয়েছেন। মিয়ানমার মনোনীত বিচারপতি ক্লাউস ক্রেস অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বিষয়ে সম্মত হলেও আলাদা ঘোষণায় বলেছেন, এ আদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে সুনির্দিষ্টভাবে সুরক্ষামূলক। সব দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়টির মূল লক্ষ্য রোহিঙ্গাদের সমূলে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করা।

রায়টি ছিল বহুল প্রতীক্ষিত। বিশ্ববাসীর প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। প্রশ্ন হচ্ছে, এই রায় মানতে মিয়ানমার বাধ্য কিনা কিংবা এই রায় যদি না মানা হয়, তাহলে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করার সুযোগ আছে কিনা? বাস্তবিকপক্ষে হয়তো তেমনটা নেই। তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ রায় উপেক্ষা করা কঠিন হবে মিয়ানমারের পক্ষে। কারণ মিয়ানমার তার আচরণের কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুকে ইতোমধ্যে বিশ্বের এক বড় ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অতএব, মনুষ্যত্ব ও সুবিচারের স্বার্থেই বিশ্ববাসীকে এগিয়ে যেতে হবে। মিয়ানমার হয়তো তার প্রচলিত অভ্যাসের কারণে এ রায়কে উপেক্ষা করার চেষ্টা নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ। ভুললে চলবে না; আন্তর্জাতিক আদালতের এই রায় কেবল প্রথাগত নির্দেশ নয়। এর পেছনে বিশ্বের শতাধিক রাষ্ট্রের সমর্থন আছে এবং রায় বাস্তবায়নে গোটা মানবতাবাদী বিশ্বের দৃষ্টি আছে।

রোহিঙ্গা জনস্রোত নিয়ে বাংলাদেশ বিপন্ন। সামান্য জমি ও অতি সামান্য সম্পদ সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিপন্ন মানবতাকে আশ্রয় দিয়েছে; যতটা করা সম্ভব করে চলছে। তবে রোহিঙ্গা সংকটকে সব দেশ সমানভাবে দেখে- তা নয় দুর্ভাগ্যক্রমে। অনেক দেশ ও গোষ্ঠীর নানাবিধ স্বার্থ জড়িয়ে আছে মিয়ানমারের সঙ্গে। বলা বাহুল্য, আদালতের রায়ে খুশি হয়েছে রোহিঙ্গারা। কারণ এটি তাদের প্রথম জয়। যুগ যুগ ধরে এই জনগোষ্ঠী নির্যাতনের শিকার হলেও কোনো সুবিচার পায়নি। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্তকে 'মানবতার জয়' বলে উল্লেখ করেছেন। বলা বাহুল্য, সত্যিকার অর্থেই এ রায় মানবতার বিজয়।

মোট কথা, দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে এই রায় প্রথম বড় পদক্ষেপ, প্রথম ইতিবাচক ধাপ। সর্ব অর্থেই একটি ইতিবাচক যাত্রা। রোহিঙ্গাদের স্বভূমে বা পূর্ণ অধিকারে নিজেদের দেশে প্রত্যাবর্তনের পথে যেতে আরও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। কারণ রায় বাস্তবায়নই এখনকার বড় চ্যালেঞ্জ। পরিপূর্ণভাবে সুবিচার নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু চীনকে অবশ্যই মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। যেদিন আন্তর্জাতিক আদালতের রায়টি ঘোষিত হয়, সেদিনই মিয়ানমারে মানবাধিকার সম্পর্কিত জাতিসংঘের স্পেশাল রিপোর্টিয়ার ইয়ানঘি লি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, চীন যদি সত্যিকার অর্থেই বিশ্বনেতা হতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত আচরণের নিন্দা জানাতে হবে। আমার বিশ্বাস, লির প্রায় সব মন্তব্যের সঙ্গে মানবাধিকারকামী বিশ্ব একমত হবে। কারণ রোহিঙ্গা সংকটে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা হতাশাব্যঞ্জক। মিসেস লির ভাষায় যা লজ্জাজনক। চীন ও রাশিয়ার প্রতিরোধের কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।

চীন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি। কামনা করি, তার বিস্ময়কর বিজয় বিশ্বকে সমৃদ্ধ করুক, অনুপ্রাণিত করুক। তবে উইঘুর মুসলমানদের নিয়ে দেশটির মানবাধিকার অবস্থান অধুনা আলোচিত সংবাদ, যা তার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংকট কেবল একটি ধর্মের সংকট বলে যারা প্রচার করে, আমি তাদের সঙ্গে একমত নই। এ সংকট মানব সভ্যতার, মানবতার। সেভাবে দেখা হলেই কেবল এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।

লেখক, বিশ্নেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
[email protected]