সাক্ষাৎকার: অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম

করোনাভাইরাস রোধে বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের নিয়মতান্ত্রিকতার অভাব

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: রাজবংশী রায়

চীনের উহান রাজ্য থেকে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে দেশে দেশে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো রোগী পাওয়া না গেলেও মানুষ এই ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কে আছেন। রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রে এই ভাইরাস। এমন প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নিয়ে সমকালের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম।

সমকাল : চীনের উহান রাজ্য থেকে সৃষ্ট করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এই করোনাভাইরাস কী- প্রথমেই এ সম্পর্কে আপনার কাছে বিস্তারিত জানতে চাই।

নজরুল ইসলাম :এটি আতঙ্কের খবর। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো রোগী পাওয়া না গেলেও দেশব্যাপী এই রোগ নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রে এই ভাইরাস। এই করোনাভাইরাস এমন একটি সংক্রামক ভাইরাস, যা এর আগে কখনও মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি। ভাইরাসটির আরেক নাম ২০১৯-এনসিওভি। এটি এক ধরনের করোনাভাইরাস। করোনাভাইরাসের অনেক রকম প্রজাতি আছে; কিন্তু এর মধ্যে মাত্র সাতটি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। বিজ্ঞানীরা অনেকে বলেছেন, ভাইরাসটি হয়তো মানুষের দেহকোষের মধ্যে ইতোমধ্যে 'মিউটেট করেছে'। অর্থাৎ গঠন পরিবর্তন করে নতুন রূপ নিচ্ছে এবং সংখ্যা বৃদ্ধি করছে। এর ফলে ভাইরাসটি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। প্রায় এক দশক আগে 'সার্স' নামে যে ভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্বব্যাপী অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, সেটিও ছিল এক ধরনের করোনাভাইরাস।

সমকাল :করোনাভাইরাস কীভাবে ছড়ায়?

নজরুল ইসলাম :চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠিক কীভাবে শুরু হয়েছিল, সে সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি সে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের অনেকের ধারণা- প্রাণী থেকে মানুষের দেহে এ রোগ সংক্রমিত হয়েছে। এরপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। আবার অনেকের ধারণা- কিছু সামুদ্রিক প্রাণী যেমন বেলুগা জাতীয় তিমি করোনাভাইরাসের বাহক হতে পারে। এই ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল উহানের একটি বাজারে মুরগি, বাদুড়, খরগোশ, সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী পাওয়া যায় এবং এসব প্রাণীর মাধ্যমে করোনাভাইরাস মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। এ সবকিছুই ধারণাগত। আরও স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, বিষয়টি নিয়ে এখনও সবাই অন্ধকারেই আছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই নতুন ভাইরাস সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কিছু বলতে পারেনি।

সমকাল :আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে কী কী লক্ষণ দেখা যায়?

নজরুল ইসলাম :জ্বর দিয়ে এ রোগের লক্ষণ শুরু হয়। জ্বরের সঙ্গে সর্দি, শুকনো কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও শরীর ব্যথা থাকতে পারে। এক সপ্তাহের মধ্যে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। সাধারণ ফ্লুর মতোই হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। করোনাভাইরাস মূলত শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। লক্ষণগুলো হয় অনেকটা নিউমোনিয়ার মতো। কারও ক্ষেত্রে ডায়রিয়াও দেখা দিতে পারে। তবে মানুষের দেহে ভাইরাসটি সংক্রমণের পর এক থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হলে এ রোগ কিছুদিনের মধ্যে এমনতিই সেরে যায়। কিন্তু কিডনি, ডায়াবেটিস, হৃদযন্ত্র কিংবা ফুসফুসের পুরোনো রোগীদের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি নিউমোনিয়া, রেসপাইরেটরি ফেইলিউর অথবা কিডনি অকার্যকারিতার দিকে মোড় নিতে পারে। এতে করে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটতে পারে।

সমকাল :চীনা বিজ্ঞানীদের উদ্ৃব্দতি দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ভাইরাসটি কোনো প্রাণী থেকে ছড়িয়েছে। আপনার অভিমত কী?

নজরুল ইসলাম :ঠিক কীভাবে এই ভাইরাসটির সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, তা এখনও নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। যেমন 'সার্স' ভাইরাস প্রথমে বাদুড় এবং পরে গন্ধগোকুল থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। 'মার্স' ভাইরাস ছড়ায় উট থেকে। তবে করোনাভাইরাস সম্পর্কে যা শোনা যাচ্ছে তা হলো- উহান শহরে সামুদ্রিক খাবারের একটি বাজার আছে। ওই বাজারটিতে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী বেচাকেনা হতো। সেখানে বাজার করতে যাওয়া মানুষের কথা বলা হচ্ছে, যে তারা ওই বন্যপ্রাণী থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে। কিছু সামুদ্রিক প্রাণী, যেমন বেলুগা জাতীয় তিমি করোনাভাইরাস বহন করতে পারে। তবে আরও জানা যায়, উহানের ওই বাজারে মুরগি, বাদুড়, সাপ ও খরগোশ বিক্রি করা হতো। হয়তো এগুলোর কোনো একটি থেকেও এই নতুন ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।

সমকাল :এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকতে আপনার পরামর্শ কী?

নজরুল ইসলাম :করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে। এগুলো ভালো উদ্যোগ। কারণ, সচেতনতার মাধ্যমে এই রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। যে কোনো ভাইরাস প্রতিরোধ করতে হলে এসব পরামর্শ মেনে চলতে হবে। যেমন- ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার, গণপরিবহন এড়িয়ে চলা, প্রচুর ফলের রস এবং পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে, ঘরে ফিরে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। কারণ সাবান কিংবা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে ফেললে যে কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে দূরে থাকা যায়। এ ছাড়া কিছু খাওয়া কিংবা রান্নার আগে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে, ডিম কিংবা মাংস রান্না করার আগে ভালোভাবে সিদ্ধ করে, ময়লা কাপড় দ্রুত ধুয়ে ফেলা, নিয়মিত ঘর ও কাজের জায়গা পরিস্কার রাখা এবং অপ্রয়োজনে ঘরের দরজা-জানালা খুলে রাখা যাবে না।

সমকাল :এখন পর্যন্ত আমরা যা জানতে পেরেছি-নতুন এই ভাইরাস প্রতিরোধে কোনো টিকা কিংবা ওষুধ আবিস্কার হয়নি। তাহলে উপায় কী?

নজরুল ইসলাম :এমনকি কোন পরীক্ষার মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা হবে, সে সম্পর্কেও কারও ধারণা নেই। একই সঙ্গে কোনো চিকিৎসা এখনও চিকিৎসকদের জানা নেই, যা এ রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জানা যায়, তাতে আশা করা যায়- আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো এই ভাইরাস প্রতিরোধের ওষুধ আবিস্কার হবে। তখন এই রোগ মোকাবিলার একটি উপায় বের হবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

সমকাল :এ ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকারিভাবে যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, তা কি যথেষ্ট?

নজরুল ইসলাম :স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এই ভাইরাস মোকাবিলায় যেসব প্রস্তুতি নিয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। রাজধানীর কুর্মিটোলা ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পৃথক ইউনিট চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মেনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সারাদেশে সরকারি সব হাসপাতালে পৃথক পাঁচটি করে শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ছাড়া গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে। অর্থাৎ মানুষ রোগটি সম্পর্কে জেনে আগে থেকে সতর্ক হতে পারছে। প্রতিটি বন্দরে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রস্তুতি মোটামুটি ভালো বলতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে হবে এবং তাদের নির্দেশনা মেনে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের ভাইরোলজিস্ট, কীটতত্ত্ববিদ, রোগতত্ত্ববিদসহ সবাইকে নিয়ে বসে আলোচনা করতে হবে।

সমকাল : আশপাশের দেশগুলোতে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশেও এই ভাইরাস সংক্রমিত হলে পরিস্থিতি কি সামাল দেওয়া যাবে?

নজরুল ইসলাম :করোনাভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লে তা অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। এটি হয়তো সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ, জাতি হিসেবে আমরা নিয়মতান্ত্রিক নই। চীন যেভাবে এই ভাইরাসের উৎসস্থল উহান রাজ্যকে অন্য সব রাজ্য, এমনকি বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, সেটি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ দেশের মানুষ সেটি মানতেও চাইবে না। বাংলাদেশের মানুষকে সেটি মানাতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তখন হয়তো অনেকে সরকারকে দোষারোপ করা শুরু করবেন। এসব কারণেই ভয় লাগে। সুতরাং এটি সংক্রমিত হলে তা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে অতীতে সোয়াইন ফ্লুসহ বিভিন্ন ভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশ সফল হয়েছিল। ওই সফলতার আলোকে করোনাভাইরাস মোকাবিলায়ও সফল হতে পারব- এ প্রত্যাশা করতে পারি। এ জন্য অবশ্যই কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে।

সমকাল :আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

নজরুল ইসলাম :সমকালের জন্য শুভ কামনা।