ভারতে নাগরিকত্ব আইন, মানুষের ঐক্য

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

হরিপদ দত্ত

নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে ভারতে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলন চলছে। খুব সহজে তা ঝিমিয়ে পড়বে, এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। সমাজের নানা শ্রেণি আর ধর্মের মানুষ পথে নামছে। রক্ত ঝরছে। আন্তর্জাতিক মহল সেদিকে দৃষ্টি রাখছে। প্রতিবাদ হচ্ছে বিশ্বের বড় বড় শহরে। ২০ ডিসেম্বর অভূতপূর্ব একটি ঘটনা ঘটেছে নয়াদিল্লিতে। ভারতের দলিত শ্রেণির নেতা; যার পরিচিতি কেবল ভারত নয়, বাইরেও আছে; সেই চন্দ্রশেখর আজাদ পথে নেমে এলেন। দিল্লির ঐতিহাসিক জামে মসজিদ থেকে সেদিন জুমার নামাজের পর প্রতিবাদ মিছিল বের হওয়ার কথা। পুলিশকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে আজাদ ঘোষণা করেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তিনি মিছিলে হাঁটবেন। আশ্চর্য এই, চন্দ্রশেখর আজাদকে রুখতে দিল্লিতে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। মিছিল যেন বড় আকার না নেয়, তার জন্য আগাম সতর্কতা হিসেবে মসজিদসংলগ্ন মেট্রোর একাধিক স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুলিশ আজাদকে গ্রেপ্তারে তৎপর। অথচ কোনো কাজই হয়নি। পুলিশ হেরে যায় আজাদের কাছে।

আজাদ যেন অতিমানব। পুলিশের হাত ফসকে পলকে অদৃশ্য নিরাকার হয়ে যান তিনি। জনতার ভিড়ে ভিড় হয়ে যান। মাও সে তুংয়ের উক্তির মতো, জলের ভেতর মাছের জলের আকার নেওয়ার মতো ঠিক। মিছিলের পাশের বাড়ির ছাদ লাফিয়ে একটার পর একটা ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে। আচমকা দেখা যায় আজাদ মিছিলের একেবারে সামনে। আজাদ বিশ্বাস করেন, হিন্দুরা যেমন মানুষ, 'অস্পৃশ্য' দলিত হিন্দুরাও মানুষ। ঠিক একই মানুষ মুসলমান, খ্রিষ্টান, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, কাদিয়ানি, অরণ্যচারী প্রাচীন প্রকৃতিবাদী কৌম সমাজ। আজাদ এটাও বিশ্বাস করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতবর্ষের আতঙ্কিত মুসলমানরা সাচ্চা দাবি করেন, তারা ভারতীয়। কেননা, সাতচল্লিশে ধর্মের নামে দেশ ভেঙে গেলেও নেতাদের কূটচালে ভেজা দেশত্যাগের আহ্বানকে অস্বীকার এবং প্রত্যাখ্যান করেন তারা। হাজার বছর পর আজ হঠাৎ কেন তারা বাইবেলীয় প্রাচীন ইহুদিদের মতো পিতৃমাতৃভূমি পরিত্যাগ করবেন?

বার্ধক্য আর মৃত্যু প্রায় সমার্থক। এরা একে অন্যের প্রতিকল্প বার্ধক্য আর তারুণ্যের ব্যাখ্যাটা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের মতো বাংলা সাহিত্যে এমন জাজ্বল্যমান ব্যাখ্যা অন্য কেউ দিয়েছেন কিনা সন্দেহ। আত্মভীতি, পরিবারভীতি বার্ধক্যকে পলায়নপর করে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে, পেষণের বিরুদ্ধে, হিংস্রতার বিরুদ্ধে তারুণ্যই প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, বিপ্লব, বিদ্রোহ ঘোষণা করে বুক চেতিয়ে। এককালের প্রতিবাদী রাজনীতির তরুণ মুখ ছিলেন যারা, তারা আজ বার্ধক্যে আনত। দীর্ঘ সময় ধরে একটা শূন্যতা বিরাজ করছিল। দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর সাহস ঘাটতির জন্য প্রতিবাদ জমে উঠছিল না সর্বনাশা নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে। আজ দিল্লি থেকে কলকাতা, মুম্বাই, হায়দরাবাদ, লখনৌ জেগে উঠেছে তারুণ্যের প্রতিবাদ কণ্ঠধ্বনিতে। বিপন্ন মুসলিম সমাজ যখন অস্তিত্বের প্রয়োজনে পথে নামে এই দাবিতে যে- এ দেশ আমাদেরও, আমরা এ দেশের, তখন তারুণ্য শিহরিত হয়। দীর্ঘদিন নীরব নিস্পৃহ থাকার পর আত্মকুণ্ডলায়ন ভেঙে কলকাতায় জেগে ওঠে তারা ২১ ডিসেম্বর ঘনায়মান আলো-আঁধারির সন্ধ্যায়। তীব্র শীত-ঠান্ডা কেঁপে ওঠে।

সন্ধ্যার আঁধার ফালা ফালা হয়ে যায় হাজার হাজার তরুণ শিক্ষার্থীর বজ্রনির্ঘোষে।

বহুদিন পর ডানপন্থি, বামপন্থি, মধ্যপন্থি, গণতন্ত্রী ছাত্র-যুবসমাজ হাতে হাত ধরে পথে নামে। কোনো রাজনৈতিক দল যা পারেনি, ছাত্ররা তা করে দেখিয়েছে।

কলকাতার রাজপথ কেঁপে ওঠে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, আলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অপরাপর কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে। নতুন নতুন স্লোগানে মুখর হয় শহর। বাবাসাহেব আম্বেদকর, জোসেফ স্ট্যালিন, বিপ্লবী শহীদ ভগৎ সিং, আরও অনেকের ছবি প্ল্যাকার্ডে ভেসে ওঠে। নানা পথ ও মত একপথে মিলে গেল। এমন সুশৃঙ্খলা মিছিল বহুদিন দেখেনি মানুষ। এ যেন সাপের শীতঘুম ভেঙে ফণা তুলে জেগে ওঠা। এ মিছিল কোনো ক্ষমতালিপ্সু, ভোট-ভিখারি বা ভোট-ডাকাত রাজনৈতিক দলের মিছিল নয়। ভোটের পুতুল বানিয়ে গরম গরম উল্টোপাল্টা কথায় রাজপথ দাপিয়ে ভোটার-জনগণকে দলে ধরে রাখা বা দলে টানার ধান্দাবাজ মিছিল এটা নয়। এটি ন্যায়ের মিছিল, গণতন্ত্র রক্ষার মিছিল, সভ্যতা রক্ষার মিছিল। কেননা, পৃথিবীর বেশ ক'টি রাষ্ট্রের মতো ভারতের গণতন্ত্রও বাঘের মুখে পড়েছে। পাকিস্তানে তো গণতন্ত্র তার জন্মলগ্ন থেকেই নেই। খুবই জটিল সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে দেশটি। প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো প্রবল রাজনৈতিক নেতার শূন্যতা চলছে। আঞ্চলিক নেতা-নেত্রীদের দ্বারা জাতীয় নেতৃত্বদান মোটেই সম্ভব নয়। সংগ্রামী জনতাই শেষ ভরসা। সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যদি নতুন নেতার আবির্ভাব ঘটে, তবেই জনগণের জন্য শুভ।

জাতিগত শুদ্ধিকরণ একটি ভয়ংকর কার্যক্রম ভাবনা। সাতচল্লিশে আর একাত্তরে যেমনটা করেছিল পাকিস্তানি শাসকশক্তি পূর্ববঙ্গে। আধুনিক একটি দেশ বহুত্ববাদের ভেতরই সমৃদ্ধ হয়। জাতি, ধর্ম, ভাষা মিলেমিশে গণতন্ত্র সমৃদ্ধ হয়। এই বিশ্ব কিংবা একটি দেশ বিশেষ কোনো জাতি, ভাষাভাষী বা ধর্মের জনগণের একচেটিয়া অধিকারের জন্য নয়। নানা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, জাতির সমন্বয়েই আধুনিক বহুত্ববাদী রাষ্ট্র বা জাতি গঠিত হয়। ভিন্ন মত, ভিন্ন পথ, ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন সংস্কৃতি মিলেই শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। এ কথা ভুলে গেলে, এটিকে অস্বীকার করলে ভারতের জন্য বিপদ অনিবার্য। ভারতে দলিতদের দ্রোহ কখন তৈরি হয়? যখনই অস্পৃশ্যতার নামে তারা অত্যাচারিত হতে থাকে। একজন আম্বেদকরের, নমঃশূদ্র নেতা যুগেন্দ্র মণ্ডলের কিংবা চন্দ্রশেখর আজাদের উদ্ভব ঘটে এমনি যুগসন্ধিক্ষণে। আনুগত্যের যুগের অবসানকল্পে আসে প্রতিরোধের যুগ। হাতে তার ভারতের সংবিধান। বাইবেল, কোরআন, গীতা-বেদ নয়। এমন দৃশ্য ভূ-ভারতে বিরল।

ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বদলে শাসকরা চায় ভারতকে ধর্মরাষ্ট্র বানাতে। তারা চায় বিশেষ ধর্মের উচ্চবর্গীয় সমাজ দরিদ্র-নিম্নবর্গীয়দের পদানত করতে এবং অপরাপর ধর্মের মানুষকে দেশছাড়া করতে, বিশেষ করে মুসলমানদের। কেবল মুসলমানই নয়, সমধর্মী বাঙালিদেরও দলন-পেষক-দমন করতে চায় তারা। বাঙালিরা চন্দ্রশেখর আজাদের মতো পৌরাণিক কোনো চরিত্রের নামে দল বানায়নি। তারা গণতন্ত্রের পথে। ওই পথেই এগোতে চায়। কিন্তু গণতন্ত্রের পথটা তো মধু দিয়ে ভেজানো নয়, বরং বিষ মাখানো। তবু তারা পথে নামে যতটা বাঙালি হিসেবে, তার চেয়ে অধিক মানুষ হিসেবে। জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা নাগরিকত্ব আইন ভারতকে কোথায় নিয়ে যাবে, বলা শক্ত। এটা সত্য যে- ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, জাতি-গোত্রের নামে মানুষকে ভাগ করতে পারলে বশে রাখা সহজ। আরও সহজ যদি তার নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রহীন করে দেওয়া যায়। নাগরিকত্বহীন মানুষ এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে যে, সে ক্ষুধার কথা ভুলে যায়, তার অধিকারের কথাও। সে মানসিক ভারসাম্য হারায়। আত্মহত্যা করে বসে। কী অপরাধ তাদের? তাদের পূর্বপুরুষরা কি সাতচল্লিশে ধর্মের নামে দেশ ভাগ করেছিল? সাতচল্লিশে প্রায় শিক্ষাবঞ্চিত, দরিদ্র, রাজনীতি বোধবুদ্ধিহীন জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ ভাগ মানুষ জানতই না দেশ কী, স্বাধীনতা কী, দ্বিজাতিতত্ত্ব কী, বঙ্গভঙ্গ কী। তাদের ধর্মকে, সম্প্রদায়কে একদল স্বার্থান্বেষী ব্যবহার করে দেশ ভেঙেছে। মানুষ ঠেকে বুঝেছে বলেই আজ ঐক্যবদ্ধ হতে চায়। ধর্মকে পেছনে ঠেলে মানুষ পরিচয়ে। উত্তর প্রদেশে গুলিতে মরেছে ১৬ জন। মিছিলে পোশাক দেখে গুলি। সহজে চেনা যায় ধর্মটা কী। কিন্তু তরুণদের বড় অংশকে পোশাকে চেনা যায় না, ভাষায়ও নয়। ওরা একই ভাষায় কথা বলে, পোশাকও একই। প্রশাসনের এখানেই ধন্দ, ওরা কারা? হিন্দু-মুসলমান। উর্দু আর হিন্দি তো প্রায় এক। ভাষায় বোঝা যায় না। বোঝা যায় না ধর্মটা কার কী। সেখানেই দমনকারীদের সমস্যা।

সারা আসামে আছে একশ'টি 'বিদেশি' ট্রাইব্যুনাল। নাগরিককে রক্ষা করার সাংবিধানিক রক্ষাকবচ সেসব ট্রাইব্যুনালে গ্রাহ্য হয় না। বছরের পর বছর ধরে তাতে বন্দি আছে পরিবার-বিচ্ছিন্ন বাঙালি হিন্দু-মুসলমান। মায়েদের থেকে শিশুদের বিচ্ছিন্ন করা হয় একটু বয়স হলেই। পশুরা-পাখিরা যেমনি তাদের সন্তানদের পরিত্যাগ করে। বন্দিশিবির থেকে বের করে দেওয়া সেসব শিশু পথকুকুরে পরিণত হয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের গাইডলাইন অবজ্ঞা করে অনেক সময় বন্দি রোগীদের হাসপাতালের বেডে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়, যাতে পালাতে না পারে। অধিকারহীন, নাগরিকত্বহীন, রাষ্ট্রহীন অপমান-অসম্মানের শিকার বাঙালির এ যেন এক নরক। ঈশ্বর নয়, এ নরকের অধিপতি মানুষ। কোকরাঝারের আটক বীণাপাণি সাহা, বিবি রহিমা আর রোশমিনা কল্পিত নাম নয়, ঈশ্বরের তৈরি বাস্তব মানুষ। মানুষ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। মুশকিলটা হলো 'মানুষের' চেয়ে ভোটপ্রার্থী ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতির ফড়িয়াই অধিক। ওরা রাজপথে গলা ফাটায়, মায়াকান্না করে। ওরা ছদ্মবেশী লুটেরা-দুর্নীতিবাজ। মানবতা, মনুষ্যত্বে নামাবলি গায়ে দিয়ে শয়তানের মুখ ঢাকা দেবতার দেবীর মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায়। তরুণ ছাত্র-জনতাই প্রকৃতপক্ষে নাগরিকত্ব আইন বা নাগরিকপঞ্জির সাচ্চা প্রতিরোধ শক্তি।

কলকাতা প্রবাসী কথাসাহিত্যিক