বিকল্প শক্তি গড়ে ওঠার 'সম্ভাবনা'

রাজনীতি

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

বিভুরঞ্জন সরকার

গত শতকের শেষ দশক থেকে মাঝেমধ্যেই 'বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি'র বিষয়টি সামনে আসে। কিছু তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানানোর আগেই বিষয়টি হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি- এই তিনটি বাংলাদেশে শাসক দল। অর্থাৎ এই তিন দল বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় থেকেছে বা আছে। তবে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি একই ধারার, একই রাজনৈতিক আদর্শ-বিশ্বাসের দল। আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ ভিন্নধারা এবং আদর্শ-বিশ্বাসের দল। এর মধ্যে জাতীয় পার্টি এখন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে টিকে আছে। দুই দলেরই পক্ষে-বিপক্ষে মানুষ আছে, সমর্থন ও বিরোধিতা আছে। এই দুই দলের বাইরে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার তাগিদ আছে। অতি সম্প্রতি ১২টি বামপন্থি দল আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে একটি বাম বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। বাম বিকল্পের কথাও নতুন নয়। বাম শক্তি রাজনীতিতে প্রভাবকের ভূমিকায় যেতে পারবে বলে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা দেশে খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না।

এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে এক যৌথ বিবৃতিতে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি অহিংস বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

ডা. চৌধুরী ও ড. হোসেনসহ আরও কেউ কেউ একটি বিকল্প রাজনৈতিক ধারা অথবা শক্তি গড়ে তোলার কথা বলছেন অনেক দিন ধরেই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে 'আপদ-বিপদ' উল্লেখ করে এই দুই দলের হাতে বন্দি রাজনীতিকে মুক্ত করার কথা কেউ বললে সেটা খারাপ লাগে না। খারাপকে হটিয়ে ভালো এলে কার না ভালো লাগবে! কিন্তু মুসিবত হলো, মানুষ কম খারাপ থেকে বেশি খারাপ অথবা বেশি খারাপ থেকে কম খারাপের বৃত্তের বাইরে যেতে পারছে না। তাই বিকল্প নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বা উৎসাহ কোনোটাই লক্ষ্য করা যায় না। সেজন্য নিন্দা-মন্দ যাই করা হোক না কেন, মানুষ আওয়ামী লীগ-বিএনপি ছাড়ছে না। বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও কামাল হোসেন দু'জনই প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় মানুষ। কিন্তু তাদের নেতৃত্বে দেশে বড় কোনো রাজনৈতিক শক্তি-সমাবেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

তারা আহত বোধ করতে পারেন, ক্ষুণ্ণ হতে পারেন; কিন্তু সত্য এটাই যে, সাধারণ মানুষ তাদের আস্থায় নিতে পারেনি বা পারছে না। তারা নিজেরাই তাদের 'পটেনশিয়ালিটি' নষ্ট করেছেন। মানুষের কাছে যাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে- এমন আশা করার কোনো কারণ নেই। তাছাড়া যারা বিকল্প রাজনৈতিক ধারার কথা বলেন, সাধারণ মানুষ তাদের বিদ্যমান ধারার কোনো না কোনো অংশের প্রতিনিধি বলেই মনে করে। তারা আলাদা, এটা এতদিনেও তারা প্রমাণ করতে পারেননি। তারা কয়েকটি ছোট দল মিলে একটি জোট হয়তো গঠন করতে পারেন; কিন্তু আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির আনুকূল্য না পেলে তাদের কারও পক্ষে ভোটে জিতে আসা সম্ভব বলে মনে হয় না। ভোটারদের 'মাইন্ডসেট' না বদলালে এবং বড় দুই দলের পক্ষপুটে থেকে বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে উঠবে কীভাবে?

দেশের রাজনৈতিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে ইদানীং অতি আশাবাদী কেউ কেউ এমন সিদ্ধান্তে আসেন যে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলেরই মুসলিম লীগের পরিণতি বরণ করার আশঙ্কা আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সে রকম মনে করি না। মুসলিম লীগের পরিণতি বলতে নিশ্চয়ই জনসমর্থনহীনতা বা দুর্বল অবস্থানের কথাই বলা হয়। এই দুই দলের অবস্থান দুর্বল তখনই হবে, যখন তাদের চেয়ে উন্নত বা ভালো রাজনীতি নিয়ে আরও কোনো দলের আবির্ভাব ঘটবে। রাজনীতিতে শূন্যতা থাকে না। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি দুর্বল হলে সবল হবে কে? সে রকম কোনো দল সামনে না দেখা পর্যন্ত মানুষ এ-দল বি-দলই করতে থাকবে। এখন যেমন বিএনপি দুর্বল হলে আওয়ামী লীগ সবল হয় আবার আওয়ামী লীগ দুর্বল হলে সবল হয় বিএনপি।

অনেকে আক্ষেপ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ আর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এক নয়। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ছিল গণতান্ত্রিক, উদার ও প্রগতিমুখীন। আর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সব মিলিয়ে কিছুটা যেন পশ্চাৎগামী। বিশেষ করে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিয়ে আওয়ামী লীগ এখন পিছু হটার নীতি নেওয়ায় অনেকেই উদ্বিগ্ন। প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ আর বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এক থাকার বাস্তব পরিস্থিতি কি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিরাজ করছে? গত শতকের ষাটের দশকে যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রগতিশীলতার পক্ষে পরিবর্তন বা বিবর্তন ঘটছিল, এখনকার পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রতিক্রিয়া ও ধর্মান্ধতার পক্ষে বিশ্বব্যাপী যে উন্মাদনা কিংবা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ তার থেকে চাইলেও বাইরে থাকতে পারবে না, পারছে না। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের ভয়াবহ বিপদ বাংলাদেশেও আছড়ে পড়ছে।

এটাও মনে রাখতে হবে যে, আওয়ামী লীগের মধ্য প্রগতিশীল ধারা তখনই জোরদার হয়েছিল, যখন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে বিজয়ী হচ্ছিল এবং এ দেশেও কমিউনিস্ট পার্টি একটি দৃশ্যমান শক্তি হয়ে উঠছিল। ভালোর সঙ্গে যখন প্রতিযোগিতা হয়, তখন ভালো হওয়ার প্রবণতাই বাড়ে। এখন আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে হচ্ছে বিএনপির মতো একটা সাম্প্রদায়িক-রক্ষণশীল এবং স্বৈর-মানসিকতার দলের সঙ্গে। বিএনপির মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগকে আপস-সমঝোতার পথে হাঁটতে হচ্ছে। এটা দলটিকে আদর্শিকভাবে দুর্বল করে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে দলের শুভার্থীদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে সান্ত্বনা এটাই যে, বিএনপি যদি আলকাতরা হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ হলো পানি। আওয়ামী লীগের রং পরিবর্তন সম্ভব হলেও বিএনপি বদলাবে না। অনুকূল শক্তি-সমাবেশ ঘটিয়ে আওয়ামী লীগকে বদলানো গেলেও বিএনপিকে বদলানো যাবে না।

বিএনপি যে হত্যা-খুনের রাজনৈতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় না- তার প্রমাণ মাঝেমধ্যেই মেলে। আমাদের দেশের রাজনীতিতে ১৫ ও ২১ আগস্ট রক্তক্ষরণের দুটি দিন। বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার পট পরিবর্তনের জঘন্য পথ অনুসরণের এই দুটি দিনের সঙ্গে বিএনপির নাম জড়িয়ে আছে। বিএনপি যে হত্যা-খুনের রাজনৈতিক ধারার বাইরে এত বছরেও দলটি তা সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য করতে পারেনি। ১৯৭৫ সালের আগস্ট কাণ্ডের সময় বিএনপি নামক দলটির জন্মই হয়নি। তাই ওই সময়ের ঘটনার সঙ্গে বিএনপির নাম আসে কীভাবে? একাধিক কারণে সেটা আসে। প্রথমত, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান বেনিফিশিয়ারি। ঘাতকদের সঙ্গে জিয়ার ঘনিষ্ঠতার কথা নানাভাবেই জানা যায়। দ্বিতীয়ত, হত্যা-পরবর্তী সময়ে হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধে বিএনপি সচেষ্ট ছিল। ঘাতকদের বিএনপি সবসময় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। তৃতীয়ত, ২১ আগস্টের ঘটনার সময় বিএনপি-জামায়াত জোটই ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি ২১ আগস্ট ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে হামলাকারীদের আড়াল করার অপচেষ্টা চালিয়েছে।

দেশের বিভেদ ও সংঘাতের রাজনীতির জন্য আমরা অনেকেই এক বাক্যে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে সমানভাবে দায়ী করে থাকি। কিন্তু একবার ভেবে দেখি না, আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে যদি এমন ঘটনা ঘটত, তাহলে আমরা কী করতাম? আমি জানি, একজন আমাকে হত্যার জন্য অস্ত্র তাক করে আছে, দু-একবার ব্যর্থ হামলাও চালিয়েছে- এসব জেনেও ওই সম্ভাব্য ঘাতক বা ঘাতকদের প্রতি কি আমি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে পারব?

আমাদের রাজনীতিতে যদি সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে প্রথম প্রয়োজন হবে আওয়ামী লীগের প্রতি বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আওয়ামী লীগকে অস্ত্র দিয়ে প্রতিহত করার ধারণা গণতন্ত্রের সঙ্গে একেবারেই যায় না। বিএনপি যদি আস্তিনের নিচে অস্ত্র লুকিয়ে রেখে গণতন্ত্রের জন্য কান্নাকাটি করতে থাকে, তাহলে তাতে আওয়ামী লীগ ভুলবে কেন? দেশের মানুষকেও দলপ্রীতির ক্ষেত্রে বিচার-বিবেচনাবোধের পরিচয় দিতে হবে। অন্ধত্ব পরিহার করতে হবে। আওয়ামী লীগকে যদি সমর্থনযোগ্য মনে না হয়, তাহলে বিএনপি কোন বিবেচনায় সমর্থনের তালিকায় আসে?

এখানেই আসে নতুন কিংবা বিকল্প রাজনৈতিক ধারা বা শক্তির জন্ম ও বিকাশের বিষয়টি। কেউ কেউ এই কথাটি বলছেন; তবে তা মানুষের মনে সেভাবে দাগ কাটছে না। রাজনীতি অবসর সময় কাটানো কিংবা বিনোদনের বিষয় নয়। দেশ ও দেশের ভাগ্য নিয়ে যেহেতু রাজনীতির কারবার, তাই সারাক্ষণ সময় দেওয়ার মতো আদর্শবাদী একদল মানুষ এক হয়ে না দাঁড়ালে পুরোনো নেতাদের দিয়ে বিকল্প রাজনীতির ধারণা শক্ত ভিত্তি পাবে না।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক