নদী রক্ষা, না কমিশন রক্ষা?

জবাবদিহি

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

এম আর খায়রুল উমাম

নদীমাতৃক বাংলাদেশে জালের মতো বিছিয়ে থাকা নদীগুলো মালিকানার অভাবে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। কয়েক দশক ধরে সারাদেশের পরিবেশসচেতন মানুষ নদী রক্ষায় আন্দোলন-সংগ্রাম করে চলেছে। সংগ্রামের পথ বেয়ে আন্দোলনকারীরা নদীকে ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পেলেও তাকে রক্ষা করার জন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষ পায়নি। সেখান থেকেই উঠে আসে নদীর মালিকানা প্রদানের দাবি। ২০০৫ সালের জুন মাসে উচ্চ আদালত এক রায়ে 'নদী দখল ও দূষণ রোধকরণ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নতি সাধন ও নৌপরিবহনযোগ্য করার জন্য 'জাতীয় নদী কমিশন গঠন' করার নির্দেশনা দিয়েছিল। মহাজোট সরকার জনগণের দাবির সঙ্গে উচ্চ আদালতের নির্দেশে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করে। কিন্তু পরিবেশবাদীদের প্রত্যাশামতো কমিশনের কোনো ভূমিকা এ পর্যন্ত দেখা গেল না। নদী রক্ষা কমিশন অন্য আর সব কমিশনের মতোই কাগুজে বাঘ হয়ে পদ-পদবির মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। নদীর মালিকানা গ্রহণের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। কমিশন রাজধানীতে বসে ফাইলের মধ্যে নদী রক্ষা করছে আর সারাদেশ নদীগুলো দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। ব্যবহারকারীরা নিজ নিজ প্রয়োজনমতো বাধাহীনভাবে নদীকে ব্যবহার করে চলেছে।

বাংলাদেশে নদী ব্যবহারকারী পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে নদীশাসন করছে, ভূমি মন্ত্রণালয় নদীর ভূমি ইজারা দেওয়ার নামে দখলের সুযোগ সৃষ্টি করছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় নদীকে নৌপথ হিসেবে ব্যবহার করছে, কৃষি মন্ত্রণালয় নদীর পানি সেচের জন্য ব্যবহার করছে, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় মৎস্য চাষের জন্য পাট্টা দেওয়ার ইজারা দিচ্ছে, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় প্রয়োজন জরিপ না করেই সেতু-কালভার্ট নির্মাণ করছে। শিল্প মন্ত্রণালয় শিল্প বর্জ্যে নদীদূষণ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় সনদ প্রদানের দায়িত্ব নিয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় যে যা প্রকল্প দেয়, তা অনুমোদন দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। ব্যবহারকারীদের এ তালিকা বিস্তারিত করা হলে আরও মন্ত্রণালয় এবং তার কিছু বিভাগের সংশ্নিষ্টতা পাওয়া যাবে। তবে এসব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নদী সংক্রান্ত কাজের কোনো সমন্বয় নেই। কেউ কাউকে কিছু জানানোর প্রয়োজনবোধও করে না। এক পাশে নদী সংস্কারের কাজ চলে; অন্য পাশে মাছ চাষের জন্য পাট্টা দিয়ে নদী বাঁধা হয়। এক পাশে নদী দখলমুক্ত করার কাজ চলে; অন্য পাশে ইজারা দিয়ে নতুন পত্তনের ব্যবস্থা দেখা যায়। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠনের প্রধান লক্ষ্যই ছিল এসব সমন্বয় করা। আপাতত মনে হচ্ছে, কমিশন নদীর মালিকানা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে শুধু নয়, কোনোরকম সমন্বয় করতেও ব্যর্থ।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয়, নদীর অবৈধ দখল ও পুনর্দখল রোধ, অবৈধ অবকাঠামো চিহ্নিতকরণ, বিভিন্ন দূষণ রোধ, মৃতপ্রায় নদী খনন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন, নৌপরিবহন, নিয়মিত পরিদর্শন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কাজে সরকারকে সুপারিশ করবে। সাধারণ মানুষ বহু কমিশন দেখেছে এবং তাদের সুপারিশগুলোর অবস্থাও সবাই জানে। তাই সুপারিশ করে কোনো লাভের লাভ অতীতে হয়নি, বর্তমানেও হবে না, ভবিষ্যতের কথা ভাবার প্রয়োজনই নেই।

কমিশন বছরের পর বছর ধরে দখলদারদের একটা তালিকা তৈরি করে জাতিকে উপহার দিয়েছে। দেশব্যাপী দখলদার উচ্ছেদের ব্যাপকতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ জানে এবং দেখছে, দখলকৃত জায়গায় নির্মিত স্থায়ী অবকাঠামোর মধ্যে বহুতল ভবন আছে। নিশ্চয়ই আলাদিনের প্রদীপের জাদুতে এসব স্থায়ী অবকাঠামোগুলো নির্মাণ হয়নি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে জেলা প্রশাসন দিনের পর দিন নদীর জমি ইজারা দিয়েছে। তাই স্থায়ী অবকাঠামোগুলোর নির্মাণের দায় জেলা প্রশাসনের ওপর পড়ে কিনা ভেবে দেখা প্রয়োজন। এ যেন সর্প হয়ে দংর্শন করে, ওঝা হয়ে ঝাড়ে অবস্থা। মূল বিষয় হচ্ছে, যতই অবৈধ অবকাঠামো হোক না কেন, এটা জাতীয় অপচয়। প্রথমে নির্মাণ, পরে তা অপসারণ ব্যয়, সবটাই অপচয়। নূ্যনতম জবাবদিহি বা দায়বদ্ধতা থাকলে এমন অপচয়ের হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করা যেত। দখলকারীর এ তালিকায় ব্যক্তি যেমন আছে, তেমনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়ও আছে। এসব প্রতিষ্ঠান কোনো নীতি-নৈতিকতায় এবং কাদের অনুপ্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত হলো, তা কি কমিশন খতিয়ে দেখবে?

নদী বেদখলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নেহাত কম নয়। দেশের সাধারণ মানুষ যে প্রমত্তা নদীগুলোকে দেখেছে, তা তাদের চোখের সামনে দিন দিন ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। উজানের একতরফা পানি প্রত্যাহারের সঙ্গে আমাদের নদীশাসনসহ দখল আর দূষণে নদী ক্ষীণ হয়েছে সত্য; কিন্তু নদীর জমি কি শুধু অবৈধ দখল হয়েছে? বৈধ দখল না হলে আজ সংস্কারের উদ্যোগে প্রমত্তা নদীর জায়গা পাওয়া যায় না কেন? প্রতিটা জরিপেই একটু একটু করে নদীর জমির দখল বৈধতা পাওয়ার কারণেই আজ নদী সংস্কারের সময় জমি পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের ছোট-বড় সব নদীরই একই অবস্থা। এ কাজে ভূমি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায় খুব কম নয়। মন্ত্রণালয় একটা শহরের মধ্যখানে সেতু নির্মাণ করেছে ৪০ মিটারের অথচ দুই পাশে সেতু নির্মাণ করেছে ৬০ মিটারের। প্রয়োজন বিবেচনা না করে ইচ্ছামতো এ সেতু নির্মাণ নদী দখলে ভূমিকা রেখেছে। ত্রাণ মন্ত্রণালয়ও পিছিয়ে না থেকে সেতুর কিছু দূরে ২০-৫০ ফুটের কালভার্ট নির্মাণ করে নদী হত্যায় পিছপা হয়নি। জানি না, জনকল্যাণে কমিশন পেছনে ফিরে তাকাবে কিনা?

কমিশন গঠনের পর থেকে রাজধানীর ঠান্ডা ঘরে বসে কমিশন জনকল্যাণে নদী সংক্রান্ত কী কী সুপারিশ রেখেছে, সাধারণ মানুষ তা জানে না। নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রধান নিয়ামক পানি। আমাদের নদীতে পানিই প্রধান সমসা। দেশের অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে মাত্র দুটি নদীর দ্বিপক্ষীয় পানি চুক্তি হয়েছে এবং একটি নদীর পানি নিয়ে আলোচনা চলমান। বাকি ৫১টি নদীর ব্যাপারে কোনো কথা শুনতে পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশ নদীভাঙনের ফলে জমি হারাচ্ছে। সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী নদীতে প্রতি বছর এ ঘটনা দেখা যায়। পঞ্চগড়ে মহানন্দা নদীর পুরো পানি অ্যাকুইডাক করে নিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা এখন নদীর পাথর নিয়ে যুদ্ধ করছি। সীমান্তবর্তী বেশ কিছু ছোট নদীতে সাধারণ উচ্চতার বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হচ্ছে না বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমাদের জালের মতো নদীগুলো ক্রমশ বিপন্ন। সারাদেশে নদীগুলোর বহতা রূপ পাওয়ার আন্দোলন-সংগ্রাম জোরদার হচ্ছে। বিপরীতে বর্তমান মহাজোট সরকার নদী ও নৌপথ সচল দেখতে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। দুর্ভাগ্য এই যে, নদী সংস্কারের নামে শত শত কোটি টাকার প্রকল্পগুলো কোনোটাই জাতিকে বহতা নদী উপহার দেওয়ার জন্য নয়। অতীতে যেসব নদী সংস্কার করা হয়েছে, তা সবই ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানগুলোও সেই পথে হাঁটবে, তা নিশ্চিত। বেশিরভাগ প্রকল্পই রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি উন্নয়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সংক্রান্ত। দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের দাবি, বহতা নদীপ্রাপ্তিতে কমিশনের সুপারিশ পেতে সরকার কতকাল অপেক্ষা করে, তাই দেখার বিষয়।

বাংলাদেশের জনগণকে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে কমিশন, না কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন- তা নিয়ে চিন্তা করার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষদের নেই। জীবনের সব অর্জন বিসর্জন দিয়ে একটা পদ-পদবিই তাদের মোক্ষ। কোথায় গেলে পদ-পদবি পাওয়া যাবে সেটাই বিবেচ্য। তার কাজের ক্ষেত্র বিবেচনার দরকার নেই। দেশের মানুষ নদীর মালিকানা চায়, নদীর সব ব্যবহারকারীর কর্তৃত্ব সমন্বয়কারী চায়, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা গ্রহণকারী চায়। সরকার জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করেছে। হাইকোর্ট নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছেন। আর দুদক চেয়ারম্যান দায়িত্বপ্রাপ্তদের বলে দিয়েছেন, সরল বিশ্বাসে কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে সেটি অপরাধ হবে না। তাই দেশের দায়িত্বপ্রাপ্তরা সরল বিশ্বাসে তাদের কাজ করে চলেছেন। জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে তার মিল থাকল কিনা তাতে কারও কিছু যায় আসে না। পরিসংখ্যানে আমরা উন্নয়নের অগ্রগতিতে বিশ্বের বিস্ময়। নদী গেল, পরিবেশ গেল কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলো; কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্তদের তো সেকেন্ড হোম হলো, বিশ্বের কোটিপতি হওয়ার প্রতিযোগিতায় আমরা তো রোল মডেল হলাম।

প্রাবন্ধিক; সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)
[email protected]