বিএনপির 'জেনে শুনে বিষপান'!

রাজনীতি

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মহিউদ্দিন খান মোহন

'আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান...' কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্রোতাপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম। রবীন্দ্রসংগীতের যারা সমঝদার, তারা এ গানটি অত্যন্ত অভিনিবেশ সহকারেই শ্রবণ করে থাকেন। বলে নিই, এ নিবন্ধের লেখকও তাদের গোত্রভুক্ত। আমাদের রাজনীতির অঙ্গনেও এবার রবীন্দ্রসংগীত প্রাসঙ্গিক। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণকে 'জেনে শুনে বিষপান' বলে অভিহিত করেছিলেন গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সিটি নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণকে জেনেশুনে বিষপান বললেও তাদের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে তেমনটি মনে হয়নি। বরং প্রচার কার্যক্রমে তারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে পাল্লাই দিয়েছিলেন। অবস্থাটা দাঁড়িয়েছিল, 'কেউ কারে নাহি ছাড়ে, সমানে সমান'। গত ১০-১২ বছরে প্রকাশ্যে বা রাজপথে বিএনপির এমন সরব উপস্থিতি দেখা যায়নি। অনেকেরই মনে হয়েছিল, দলটি বোধ করি আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে। স্থবিরতা ঝেড়ে ফেলে পুনরায় চলতে শুরু করল। দুই মেয়র প্রার্থীর জনসংযোগ তথা প্রচারে নেতাকর্মীদের বিপুল উপস্থিতি দলটির শুভানুধ্যায়ীদের মনে কিঞ্চিৎ আশারও সঞ্চার করেছিল। তারা ভেবেছিলেন, প্রচারে নেতাকর্মীদের যে রকম সরগরম উপস্থিতি, ভোটের দিনও তারা হয়তো ভোটকেন্দ্রে বেশ শক্তভাবে অবস্থান নেবে। কিন্তু এমন ধারণা পোষণকারীরা হতাশ হয়েছেন। কারণ, ভোটের দিন কেন্দ্রগুলোতে বিএনপির নেতাকর্মীদের দেখা পাওয়া যায়নি। তারা যেন হঠাৎ কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিলেন। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন ওইসব নেতাকর্মী? কেন তারা ভোটকেন্দ্রে শক্ত অবস্থান নিয়ে দাঁড়াতে পারলেন না? এমন অজস্র প্রশ্ন এখন উচ্চারিত হচ্ছে সর্বত্র।

অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে ক্ষমতাসীন দলের হুমকি, ভোটকেন্দ্র দখল, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে গতানুগতিক কৈফিয়ত দাঁড় করানোর চেষ্টা হচ্ছে। ভোটের আগের দিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, 'ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা করলে জনগণই তা প্রতিরোধ করে নিজেদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করবেন' (সমকাল, ১ ফেব্রুয়ারি)। বিএনপি মহাসচিবের কথার বাস্তব কোনো প্রতিফলন ভোটের দিন দেখা যায়নি। তারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্র দখল, জোরপূর্বক বিএনপি এজেন্টদের বের করে দেওয়া, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া এবং বুথে ঢুকে ভোটারদের নৌকায় ভোট দিতে বাধ্য করা, ক্ষেত্রবিশেষে নিজেরাই বোতাম চেপে ভোট দেওয়াসহ নানা অভিযোগ আনলেও, সেসব অনিয়ম প্রতিরোধে কোনো উদ্যোগ নেননি। ভোটের দিনের যেসব খবর পরে সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তাতে অনেক ঘটনার উল্লেখ থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের জবরদস্তির বিরুদ্ধে বিএনপির একজন নেতাও কোথাও প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সোচ্চার হয়েছেন- এমন খবর পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক, পর্যবেক্ষকসহ অনেকেই ভোটকেন্দ্রে বিএনপির এ গরহাজিরের কথা বলেছেন। এমনকি আমি নিজেও ১০-১২টি কেন্দ্রে গিয়ে কোথাও বিএনপির নেতাকর্মীদের দেখতে পাইনি। যাও দুয়েকজনকে পেয়েছি, তারা দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন্দ্র থেকে দূরে, নিরাপদ স্থানে।

বিএনপির বিরুদ্ধে সমর্থকদের আরেকটি অভিযোগ হলো, দলটির নেতাকর্মীরা প্রচারে ব্যাপকভাবে অংশ নিলেও ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট প্রার্থনায় মনোযোগ দেয়নি; ভোটকেন্দ্রে যেতে উদ্বুদ্ধ করেনি। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, নৌকার কর্মীরা তিন-চারবার এসে লিফলেট দিয়ে গেছে; দৈনিক পত্রিকার ভেতরে লিফলেট ঢুকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিএনপির কর্মীরা রাস্তায় রশিতে পোস্টার ঝুলিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে। এমনকি ভোটার স্লিপও তারা বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয়নি। আর ভোটের দিন তো তারা লা-পাত্তা। ফলে দলটির সমর্থক-ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে সাহস বা উৎসাহ, কোনোটাই বোধ করেননি।

প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি এ নির্বাচনকে সিরিয়াসলি নিয়েছিল কিনা? তারা কি লড়াই করে ভোটযুদ্ধে জয়লাভের জন্য নেমেছিল, নাকি শুধু অস্তিত্বের জানান দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য? সন্দেহটা জেগেছে এ জন্য যে, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েই দলটির মহাসচিব বলেছিলেন, এই সরকার এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়- সেটা প্রমাণ করার জন্যই তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তার এ বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে তখনই বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কেউ কেউ মন্তব্য করেছিলেন, সর্বশক্তি নিয়োগ করে খেলে জয়লাভের পরিবর্তে শুধু রেফারির পক্ষপাতিত্ব প্রমাণের জন্য মাঠে নামলে সে টিমের কপালে নিদারুণ পরাজয় ছাড়া অন্য কিছু জোটার সম্ভাবনা থাকে না। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। বরাবরের মতো এবারও বিএনপি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের পেশিশক্তি ও প্রশাসনের অপব্যবহারের অভিযোগ তুললেও এ বিষয়ে রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিদের অভিমত- একটি দল ক্ষমতার অপব্যবহারের চেষ্টা করতেই পারে। তবে সে চেষ্টা প্রতিহত করার উদ্যোগটাও বিরোধীপক্ষকে নিতে হবে। বলাই বাহুল্য, ১ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন বিএনপির মধ্যে তেমন চেষ্টা দেখা যায়নি। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগেই তারা মাঠ ছেড়ে দিয়েছিল। এবার মাঠ ছেড়েছে ভোটের দিন। ভোটযুদ্ধের ময়দান থেকে বিএনপির এহেন পৃষ্ঠ প্রদর্শন দলটির সমর্থকদের হতাশা আরও বাড়িয়ে দিল।

নির্বাচনে অনিয়ম-কারচুপির প্রতিবাদে পরদিন ২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি ঢাকা মহানগরীতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিল। কিন্তু সে হরতাল নগরীর কোথাও পালিত হয়নি। আর বিএনপিও নামেনি রাজপথে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের ফুটপাতে বসে স্লোগান দিয়েই তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছে; রাস্তায় নামার চেষ্টাও করেনি। একবার রাস্তায় নেমেছিল অবশ্য। তবে রাস্তা ছাড়ার জন্য পুলিশের ৩০ মিনিটের আলটিমেটাম পেয়ে বাধ্যগত ছাত্রের মতো তিন মিনিটের মধ্যেই তারা রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে উঠে গেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন সুবোধ বিরোধী দলের দেখা অতীতে আর পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে হাস্যকর হলো, নগরীর কোথাও হরতাল পালিত না হলেও 'হরতাল সফল' করার জন্য বিএনপি মহাসচিব নগরবাসীকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। এর পর গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর থানায় থানায় বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু নগরীর কোথাও কোনো মিছিলের দেখা মেলেনি; যদিও দলটির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মিছিল অনুষ্ঠিত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। ভোটের দিন নেতাকর্মীদের অস্বাভাবিক নীরবতার পর হরতাল ও বিক্ষোভ মিছিলের মতো বড় কর্মসূচিতে যে তাদের দেখা পাওয়া যাবে না, তা আগেই অনুমান করা গিয়েছিল। তারপরও বিএনপির নীতিনির্ধারকরা কেন এসব নিষ্ফম্ফল কর্মসূচি ঘোষণা করেন, তা ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছে না দলটির তৃণমূল কর্মীরা।

এদিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপির লাভ-লোকসান কী হলো, তা নিয়ে অলোচনা হচ্ছে এখানে-সেখানে। এ বিষয়ে বিএনপির ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে গত ৩ ফেব্রুয়ারি সমকালের প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, নির্বাচনে হেরে গেলেও রাজনৈতিকভাবে নিজেদের 'লাভবান' ভাবছে বিএনপি। এ নির্বাচন উপলক্ষে দলের নিষ্ফ্ক্রিয় নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন পর রাজপথে নেমে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। একই সঙ্গে দলটি মনে করে, বর্তমান সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়- এটাও তারা আরেকবার প্রমাণ করতে পেরেছে। পরাজিত হয়ে বিএনপি নিজেদের লাভবান ভাবলেও রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সিটি নির্বাচনে পরাজয়ে বিএনপি বড় একটি হোঁচট খেয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এবারের সিটি নির্বাচনেও সরকারি দলের চাপ ও কৌশলের কাছে হেরে টিকতে পারেনি তারা।

এদিকে নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করতে বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠক করেছে গত ৫ ফেব্রুয়ারি। বৈঠকে সিটি নির্বাচনে সরকারি দলের 'ভোটকেন্দ্র দখল' ও 'কারচুপি'র পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টিও স্বীকার করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।

সিটি নির্বাচনে বিএনপি জয়ের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে নেমেছিল- এমনটি মনে হয়নি। প্রার্থীদের পয়সা-কড়ি খরচ হয়েছে প্রচুর। প্রচারে লোক সমাগমও ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু নির্বাচনী কাজে দলটির নেতাকর্মীরা যে মোটেই সিরিয়াস ছিলেন না, তা দৃশ্যমান হয়েছে ভোটের দিন। সম্ভবত পরাজয় অবধারিত জেনেই তারা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন; সরকারি দলকে মোকাবিলার চেষ্টা করেননি। এ থেকে এটাই প্রতীয়মান- জয়ের জন্য নয়, মাঠে নামার সুযোগ সৃষ্টির জন্যই দলটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। বোধ করি এ কারণেই গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এ নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়াকে 'জেনে শুনে বিষপান' বলেছিলেন। এখন বিষাক্রান্ত সেই বিএনপির সামনের দিনগুলো কেমন হয়, সেটাই দেখার বিষয়।

সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্নেষক