বাঙালি জাতি ও সংস্কৃতির সার্থক রূপায়ণ

ভাষার মাস

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

খ্যাতিমান ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র মতানুসারে, ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা ভাষার প্রকাশকালকে চিহ্নিত করা হলে তার সমৃদ্ধির ইতিহাস প্রায় ১৫শ' বছর বিধৃত। এটি সর্বজনস্বীকৃত যে, ভাষাকে কেন্দ্র করেই নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর জাগতিক সব মেলবন্ধনের সূচনা ঘটে এবং ধীরে ধীরে তার বিকাশ ও প্রসারের সঙ্গে একটি সর্বজনীন জাতিসত্তার সমষ্টিগত স্বরূপের আবর্তন ঘটে। বাঙালি জাতির জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ও বিস্তার মাতৃভাষা বাংলাকে ঘিরেই পরিপুষ্ট। এই উপমহাদেশে বিভাজিত অঞ্চল পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্ব ও পশ্চিমাংশের ভৌগোলিক দূরত্বের কারণেই নয়; শোষণ-শাসন, নিপীড়ন-বঞ্চনা ইত্যাদির বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি, মনমানসিকতা ও চিন্তাচেতনার পার্থক্যই ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে অধিকতর ক্ষোভ-প্রক্ষিপ্ত করেছিল। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর ভিত্তি স্থাপিত হলেও অর্থনীতির ওপর রাজনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য। আমরা জানি, এ উদ্দেশ্যকে পরিপূর্ণতা দানের উদ্দেশ্যেই সুনিপুণ নষ্ট পরিকল্পনায় তারা ধর্মকে শোষণের ঢাল হিসেবে বেছে নিয়েছিল।
কিন্তু বাঙালি আদিকাল থেকেই ঐতিহ্যিক চেতনায় ধর্মান্ধতা বর্জন করে ধার্মিকতাকে গ্রহণ করার মাধ্যমেই তাদের মানবিক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষতার শাশ্বত বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে জাতীয়তাবাদের আলোয় প্রজ্বলিত হয়েছিল, যা একুশের চেতনায় পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার- এই মৌলিক অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত ঐক্যবদ্ধ বাঙালি বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষার মর্যাদায় সমাসীন করতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে বদ্ধপরিকর ছিল। স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার পটভূমিতে দীর্ঘ সংগ্রামের বিবক্ষিত পরিক্রমা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় এই অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনাই দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয় গভীরে মনোবূ্যহ নির্মাণে অপরিসীম ব্রতধারীর ভূমিকা পালন করেছে। সমাজ-সংস্কৃতির বিকাশ আবরণে ধর্ম আপেক্ষিক কোনো বস্তু হিসেবে নয়; সনাতনিক নিয়ম বা স্বাভাবিক সহজ-সরল-মানবিক বৃত্তিকে গঠন করার প্রক্রিয়ায় এর ভূমিকা সাবলীল, অবারিত ও চিরঞ্জীব। বিভিন্ন সূত্রমতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৭০টি শাখা-প্রশাখা ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত ১৯টি প্রধান ধর্মমত প্রচলিত। ধর্ম অনুসারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠের দিক থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও ইসলামের অবস্থান বিশ্বব্যাপী উল্লেখযোগ্য হলেও এই বাংলাদেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য সংখ্যাগুরু বা লঘুর ভিত্তিতে নয়; বরং ধ্যান-ধারণা, ঐতিহ্য-কৃষ্টি-সংস্কৃতি এবং সৃজনশীল মনন-মানসে চিরায়ত মৃন্ময়ী আদান-প্রদান ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ছিল।
মূলত ধর্মনিরপেক্ষ প্রত্যয়টির সর্বজনীন ব্যাখ্যা হচ্ছে, জাগতিক জীবনপ্রবাহে ধর্মবিষয়ক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য বা কর্মকাণ্ডে জড়িত নয় এমন কিছু ধর্মীয় বিষয়-বহির্ভূত প্রসঙ্গকে সব জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন এবং গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে সমাজে বিরাজিত মূল্যবোধ, রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান ও লোকাচারকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। এইচপি ব্যাকারের মতে, অসাম্প্রদায়িক প্রত্যয়টি অপবিত্র, পাপী, ঈশ্বরহীন, বিধর্মী ইত্যাদির সমার্থক নয়। বরং নিজ নিজ ধর্মের প্রতি নিজস্ব শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাসের সঙ্গে অন্য ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের প্রতি যুক্তি ও প্রায়োগিক বিবেচনায় সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে সমপরিমাণ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মান পোষণই অসাম্প্রদায়িকতাকে সব ধর্মের মৌলিক-মানবিক নির্যাস হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বাংলার সামাজিক ইতিহাসের অপ্রতুলতা, বস্তুনিষ্ঠ তথ্যপ্রবাহ ইত্যাদি এই অসাম্প্রদায়িক সম্পর্কের স্বরূপ নির্ণয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি এবং বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যের সার্থক রূপায়ণ করতে পেরেছে একুশের এই মহান ভাষা আন্দোলন।

বস্তুতপক্ষে অজানাকে জানার আগ্রহ, প্রোথিত অনুভূতি এবং অদম্য ইচ্ছার বস্তুনিষ্ঠ নিয়ামক হিসেবে আদর্শগত সমাজ উদ্ভূত উপাদান হচ্ছে শুভ, সত্য ও সুন্দরের অবগাহন ও জয়গান। পাশ্চাত্যের বিখ্যাত ভাববাদী দার্শনিকদের অনেকেই মানব অভিজ্ঞতার এই নৈতিকতাকে আইনের প্রকারন্তরণকে ন্যায়পরায়ণতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বিপরীতে দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ধারণায় এর মানদণ্ড হিসেবে সুস্পষ্ট হয়েছিল 'সততা'। মানুষের চরিত্রকেই নৈতিকতার বহুমাত্রিক প্রতিস্থাপন করে নানাবিধ ব্যাখ্যায় ইতিহাস-সমৃদ্ধ হয়েছেন স্টুয়ার্ট মিল, কান্ট, মার্কস, রাসেল, সার্ত, ম্যুরসহ অনেকে। গ্রিক যুগে সফিস্টরা নৈতিক সমস্যাকে বিবেচনায় এনে জ্ঞানকে সত্যের আধার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জার্মান লোকসাহিত্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রতিধ্বনি ছিল 'ওই রাজা শ্রেষ্ঠ রাজা, যে পণ্ডিতের কাছে যায়। ওই পণ্ডিত নিকৃষ্ট পণ্ডিত, যে রাজার কাছে যায়।'
আমরা জানি, পবিত্র ধর্মের নামে অপসংস্কৃতি তথা সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, বর্বরতা ও নৃশংসতা, হত্যা, সহিংসতা ও প্রতিহিংসাবাদকে উন্মাদিত করে ইসলামের পবিত্রতা, মানবিকতা, সর্বজনীনতা, নান্দনিকতা, সৃজনশীলতা, অগ্রসরমানতা। সর্বোপরি শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতি অবিচল বিশ্বের সব মানবগোষ্ঠীর কল্যাণ চেতনাকে বিনষ্ট, বিভ্রান্ত ও কলুষিত করার যে অপচেষ্টা অব্যাহত আছে, তা পরিপূর্ণভাবে ইসলাম ধর্ম, পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থি। বিশ্বের কিছু সংখ্যক দেশে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও সেসব দেশের অন্য ধর্ম বা ধর্মাবলম্বীদের অবজ্ঞা বা ধর্মীয় অধীন করে রাখার বিধান পবিত্র ইসলামে নেই বরং বিপ্রতীপ বার্তায় সর্ব ও বিশ্বজনীন মানবিক প্রাগ্রসর সত্তাকে সংশ্নেষ প্রদৃপ্ত করে। ইসলামের আদর্শিক নীতিমালায় ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতায় ধর্মের প্রচেতা বিকাশ কিঞ্চিৎ রূপায়িত নয়। প্রকৃত অর্থে ধর্ম মানব-চেতনার নিরাকৃত নিরক্ষ বলয়। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিশ্বাস প্রতিমুখ এবং রাজনৈতিক কলুষমুক্ত চেষ্টন দ্যোতনা। ফলে রাষ্ট্র কাউকে বিশ্বাসের খাঁচায় বন্দি করতে পারে না বা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ধর্মবিশ্ব রাষ্ট্রের ওর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবে যৌক্তিক নয়।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি শুধু যে মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তা নয়। এটি প্রগতির পথকে রুদ্ধ করে সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। জাতি বা রাষ্ট্রের সব রকম সাংস্কৃতিক, আর্থ-সামাজিক ও প্রথাগত সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির চেতনাকেও সংকটময় করে তোলে। আজ বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতায় যা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, তা শুধু ধর্মের অপব্যবহার নয়; পবিত্র ইসলামকে অপ্রিয় ও জনবিমুখ করার একটি জঘন্য অপকৌশল হিসেবে কাজ করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতা বা অসাম্প্রদায়িকতা কোনোভাবেই ধর্মহীনতাকে উৎসাহিত করে না। সমাজ-ব্যক্তিজীবনে সাবলীল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির ওপর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার মধ্যেই ধর্মনিরপেক্ষতার মৌলিক নির্যাস নিহিত। সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘিষ্ঠ স্ব-স্ব ধর্মের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন এবং অন্যান্য ধর্মের প্রতি কার্যকর সহনশীলতাকেই ধর্মনিরপেক্ষতার কাঠামো ও ক্রিয়াশীল ভিত্তি হিসেবে ধরা যায়। একজন সত্যিকার ধার্মিক ব্যক্তিই অসাম্প্রদায়িক হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পবিত্র ইসলামের ইতিহাসে মদিনা সনদ এবং প্রিয় নবীর জীবন ও চরিত এক আদর্শ অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়।
বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনের মতে, 'সেক্যুলারবাদ থেকে জাতীয়তাবাদ। একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ডের জনগণ স্বাধীনতা ও সমতার ভিত্তিতে আপন জনজীবন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করবে এবং সেখানে সবার সমান অধিকার থাকবে। কেউ বেশি, কেউ কম অধিকারী হবে না ধর্ম, বর্ণ ও মতবাদের জন্য। এর চালিকা আত্মিক ভাবধারা হচ্ছে মানবতাবাদ। একটি বিশেষ ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী এই ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হলে তাকে বলা হয় জাতীয়তাবাদ।' এই সার্বিক ভাবধারাকে কোনো ধর্ম, বর্ণ বা বিশেষ মতবাদের দ্বারা বিভাজিত করলে যা দাঁড়ায়, তা হলো সাম্প্রদায়িকতা। অর্থাৎ বিকৃত জাতীয়তাবাদ।
ধর্মের নামে একটি বিশেষ ধর্ম মতাবলম্বীদের অন্য ধর্মাবলম্বীদের থেকে পৃথক করে তাদের অধিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা সমাজগর্হিত, অযৌক্তিক ও অসমর্থনযোগ্য কর্ম, যা বৈষম্য সৃষ্টি করে অন্যদের হেয় বা নিকৃষ্ট জ্ঞান করে এবং বাস্তব সুযোগ-সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত রেখে একটি ক্ষুুদ্র শ্রেণি বা গোষ্ঠীকে শোষক, অন্যদের শোষিত শ্রেণিতে পরিণত করে। সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র স্বৈরাচারী রাষ্ট্র বা বৈষম্যমূলক শোষক রাষ্ট্রমাত্র। গণতন্ত্রের মূলনীতি হচ্ছে জনগণের স্বাধীনতা ও সমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করা। ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে আমরা ধর্মকে সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত বিবেচনা করব। ধর্মের শাশ্বত অমিয় বার্তা গ্রহণ এবং এর মৌলিক শিক্ষায় নিজেদের আলোকিত করে অন্যের মঙ্গলে আত্মনিবেদনের মধ্যেই প্রকৃত অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার জয়গান। মাতৃভাষা আন্দোলন আমাদের প্রাণস্পদনে এভাবেই গাঢ় ঝঙ্কার, যা চলমান গতিতেই জ্যোতিস্মান, মাথা নত না করে সত্যজয়ে অনির্বাণ উপযোগ। বিচ্ছেদ, বিরোধ, সংঘাত ইত্যাদিকে নিধন করে ধর্ম-দলমতনির্বিশেষে একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিকতার দর্শনে সমৃদ্ধ শুধু শান্তিময় স্বদেশ নয়, বৈষম্যবিহীন একীভূত ঝলমল বিশ্ব প্রতিষ্ঠার অনবদ্য অঙ্গীকার। নিরন্তর অগ্রযাত্রার পথিকৃৎ প্রোজ্জ্বল হোক মহান ভাষা আন্দোলন এবং একুশের অমিয় যাচন।
  শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়