মাতৃভাষায় রায় প্রদানের যৌক্তিকতা

ভাষার মাস

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন

উচ্চ আদালতে বাংলায় রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধা বা যে সকল বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হইতে হয়, সেই বিষয়ে ভাগ করিয়া নেওয়া। এই বিষয়টি সামনে রাখিয়াই আমি আমার বক্তব্যকে একটা মোকদ্দমা আকারে উপস্থাপন করার চেষ্টা করিব। তবে মোকদ্দমার রায়ের ভার আপনাদের ওপর। মোকদ্দমার ঘটনা- ১৯৫২ সালে বাংলা, ১৯৭১ সালে দেশ, যাহা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সংক্ষিপ্ত শানেনুজুল।

১৯৫২ সালের ভাষা অর্জনের পিছনে জাতির ত্যাগ-তিতিক্ষা, রক্তদান সম্পর্কে আমরা সকলে অবগত। তেমনি ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পিছনে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই মুখ্য ভূমিকা পালন করিয়াছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেই স্বাধীনতার বীজ বপন হইয়াছিল। যাহা অঙ্কুরিত হইয়া ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পরিপূর্ণতা লাভ করিয়া স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়। কিন্তু ভাষার ভিত্তিতে যে জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতাকে ছিনিয়া আনে, সেই জাতির রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি নিয়া বিজ্ঞজনের মধ্যে এখনও বিরোধ। যেখানে ভাষার প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্থান-কাল-পাত্রভেদে পরস্পরবিরোধী যুক্তি পরিলক্ষিত হয়। দেশ স্বাধীন হইল, সংবিধান প্রণয়ন হইল, সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রভাষা বাংলাকেই জনগণ বেছে নিল, কিন্তু বাংলা ভাষা সর্বস্তরে চালু হইল না। তাই স্বাধীনতার পরপর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রয়োগের জন্য একাধিক পরিপত্র জারি করা হয়। সর্বোপরি ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষার প্রচলন আইন সংসদ কর্তৃক পাস হয়। যাহার পরিপ্রেক্ষিতে সর্বস্তরের বাংলা, বিশেষ করিয়া আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়া তর্ক-বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। এমনকি বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং এই বিষয়টি বাংলাদেশের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ হইতে নিষ্পত্তি হয়। যেখানে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, নিম্ন আদালতে ইংরেজি ভাষা চলিতে কোনো আইনগত বাধা নাই। যেহেতু উক্ত রায়টি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের, সেহেতু তাহা নিম্ন আদালতের উপর বাধ্যকর। কিন্তু উচ্চ আদালতের বিষয়ে উক্ত মামলায় কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় নাই। উপরের বিষয়টি পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিনিয়তই যেমন আইন অঙ্গনের বিভিন্ন সভা-সমিতিতে আলোচিত হয়, তেমনি বিভিন্ন সম্মানিত সুধী-বিজ্ঞজন তাহাদের লেখার মাধ্যমে বিভিন্ন মত প্রকাশ করিয়া থাকেন। এই হইল মোকদ্দমার ঘটনা। এখন প্রশ্ন- রাষ্ট্রভাষা কী? এবং আদালতের ভাষা কী?

মোকদ্দমার বিচার্য বিষয় সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষা বাংলা হইলে আদালতের ভাষা কী? আদালত রাষ্ট্রের অঙ্গ কিনা? প্রথমে রাষ্ট্রভাষা বাংলা এবং আদালতের ভাষা বাংলা কিনা, সেই পক্ষে যুক্তি- ১। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তদান, দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হিসাবে উল্লেখ আছে। এখানে রাষ্ট্রভাষা বাংলা, যাহা সহজভাবে বোধগম্য। এখন আদালত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত কিনা? বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা প্রদান করা হইয়াছে। যেখানে রাষ্ট্র বলিতে সংসদ, সরকার ও সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে সাধারণভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ রহিয়াছে। যাহা নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ এবং যাহা আমাদের সংবিধানের যথাক্রমে চতুর্থ ভাগে নির্বাহী বিভাগ, পঞ্চম ভাগে আইন বিভাগ বা আইনসভা এবং ষষ্ঠ ভাগে বিচার বিভাগের (সুপ্রিম কোর্ট) কথা উল্লেখ করা আছে। এই ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ। সেই ক্ষেত্রে যেহেতু বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের অঙ্গ, সেহেতু সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচার বিভাগের তথা আদালতের ভাষাও বাংলা।

এখন আদালত কী? সংবিধানের ১৫২ নং অনুচ্ছেদের আদালতের সংজ্ঞা অনুযায়ী আদালত বলিতে সুপ্রিম কোর্টসহ যে কোনো আদালত বুঝাইবে। সংবিধানের ১০৯ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের অধস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের উপর উক্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকিবে। সেই ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ যদি রাষ্ট্রের অঙ্গ হয় এবং আদালত বলিতে যদি সুপ্রিম কোর্টসহ সকল আদালতকে বুঝানো হয়, সেই ক্ষেত্রে যেহেতু বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের অঙ্গ, সেহেতু তাহার ভাষাও বাংলা ভাষা হওয়া উচিত।

২। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ নং অনুচ্ছেদের ১ নং উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে। ২ নং উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল বলিয়া গণ্য হইবে। দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং যেহেতু সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, সেহেতু অন্য সে সকল আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন বিশেষ করিয়া আদালতের ভাষা সংক্রান্ত তাহা সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আইনের ওই সকল ধারা সাংবিধানিকভাবে বাতিলযোগ্য। ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ও ১৩৮ ধারা এবং ১৮ আদেশের ৫ হইতে ৯ নং বিধি এবং ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ২১২ (৬), ৩৫৬, ৩৫৭, ৩৬০(৩), ৩৬১ (১), ৩৬৪, ৩৬৭, ৩৭১, ৩৭২, ৫৫৮ ধারায় ভাষা সম্পর্কে আলোকপাত করা হইয়াছে; যেখানে আদালতে ইংরেজি ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু তাহা সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইনের আরও একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম বিশেষ আইন সর্বক্ষেত্রে পদ্ধতিগত আইনের উপর কর্তৃত্ব করিবে, সেই ক্ষেত্রেও ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইনটি ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধি আইন এবং ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের যে সকল ধারার ভাষা সংক্রান্ত বক্তব্য প্রদান করা হইয়াছে, তাহার উপর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করিবে, যাহা উক্ত ধারাগুলি বাংলা ভাষায় আইন প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে অকার্যকর।

৩। আইনের যুক্তি ছাড়াও মাতৃভাষায় আদালতের রায় প্রচারের ক্ষেত্রে মানব অধিকারের বিষয়টি জড়িত রহিয়াছে, যাহা আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারের বিধানাবলি দ্বারা যেমন সংরক্ষিত, তেমনি সংবিধানের ২৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংস্কৃতি তথা জনগণের সংস্কৃতি এবং জাতীয় ভাষা সংরক্ষণের বিষয়টিও সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত।

৪। ধর্মীয় অনুভূতির দিকে আলোকপাত করিলে দেখা যায় যে, সেই ক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব প্রদান করা হইয়াছে। এই ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনের সুরা ইব্রাহিম, আয়াত-৪ এ বলা হইয়াছে- আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তাহার সহজাতির ভাষাভাষী করিয়া পাঠাইয়াছি, তাহাদের কাছে পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন ও যাহাকে ইচ্ছা সত্য পথে পরিচালিত করেন, আর তিনি শক্তিমান ও তথ্য জ্ঞানী।

সুরা আর রুম, আয়াত-২২, আর তাঁহার নির্দেশনাবলির মধ্যে প্রধান নিদর্শন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। ইহাতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রহিয়াছে।

সুরা মরিয়ম, আয়াত-৯৭, আমি তোমার ভাষায় এই (কোরআন) সহজ করিয়া দিয়াছি যাহাতে তুমি তাহার দ্বারা সাবধানীদের সুসংবাদ দিতে পার এবং তর্কপ্রিয় সম্প্র্রদায়কে সতর্ক করিতে পার।

[পরবর্তী অংশ আগামীকাল]
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট
বিভাগের বিচারপতি