মাতৃভাষায় রায় প্রদানের যৌক্তিকতা-২

ভাষার মাস

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন

বিপক্ষে যুক্তি


১। মাতৃভাষায় তথা বাংলা ভাষায় বিচারকার্য পরিচালনার বিপক্ষে অনেক যুক্তি উপস্থাপন করেন। সেই ক্ষেত্রে প্রধানত বাংলা ভাষায় আইনের পরিভাষার অভাব দীর্ঘদিন। আইনের ভাষা ইংরেজিতে প্রচলিত হওয়ায় মানুষের নিকট এখন ইহা সহজ ব্যবহারযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য এবং মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, বাংলা ভাষায় যেমন পরিভাষার অভাব, তেমনি শব্দ চয়ন, শব্দের ব্যবহার, বানান, সাধু-চলিত, আঞ্চলিক ভাষা; বর্তমানে আবার প্রমিত বাংলা বানান বাংলা ভাষার ব্যবহারকে আরও দুর্বোধ্য করিয়া তুলিয়াছে। পরিশেষে দক্ষ লোকবলের স্বল্পতার কারণে যেখানে বাংলা ভাষার রায় লিখিতে ইংরেজি ভাষার চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগে, সেখানে হঠাৎ করিয়া বাংলা ভাষায় আদালত চালানো শুরু করিলে বিচারকার্যে হোঁচট খাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রহিয়াছে। সেই ক্ষেত্রে মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনিষ্পত্তিকৃত মামলার ভার বা মামলার স্তূপ পাহাড় পরিমাণ জমা হইবে। যাহা হইতে পরিত্রাণ পাওয়া আরও দুরূহ হইবে তথা বিচারপ্রার্থীরা আরও অধিকতর বিড়ম্বনার সম্মুখীন হইবেন।

২। হাসমত আলী গং বনাম আজমিরি বিবি গং মামলায় (৮৪ ডিএলআর ৩৩৩) মাননীয় হাইকোর্ট হইতে নিষ্পত্তি হইয়াছে, যেখানে আদালতে বাংলা, ইংরেজি উভয় ভাষা চলিবে বলিয়া সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। সেই ক্ষেত্রে উক্ত সিদ্ধান্ত বাধ্যকর। কেননা, উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে মহামান্য আপিল বিভাগে কোনো আপিল দায়ের হয় নাই।

৩। যেহেতু আমাদের রায় বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়, সেহেতু তাহা ইংরেজি ভাষায় হওয়া উচিত।

যুক্তি খণ্ডন পক্ষে


উক্ত রায় সম্পর্কে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বলেন যে; হাসমত আলী গং বনাম আজমিরি বিবির মামলায় (৮৪ ডিএলআর ৩৩৩) হাইকোর্ট বিভাগ বাংলা ভাষা প্রচলন আইনকে সংবিধানের পরিপন্থি বা বেআইনি ঘোষণা না করিলেও অধস্তন দেওয়ানি আদালতে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার আইনসম্মত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারার উপর ভর করিয়া এই মামলায় যে রায় দুই বিচারপতি দিলেন- বাংলার সঙ্গে ইংরেজি চলিবে সেটাও এই একই মামলাতে খারিজ হইয়া যায়। কেননা, একই বিষয়ে যদি পূর্ববর্তী আইনের সঙ্গে পরবর্তী আইনের বিরোধ দেখা দেয় তাহা হইলে পূর্ববর্তী আইন বাতিল বলিয়া গণ্য হয়।

দ্রষ্টব্য: 'উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রভাষা' প্রবন্ধ লেখক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। লেখক একই প্রবন্ধে নিজেই ব্যক্ত করেন, 'উক্ত রায় নিষ্ফ্ক্রিয় বা পরিবর্তিত করার জন্য আপিল বিভাগে রণক্লান্ত ভাষাসৈনিকরা কোনো আপিল দায়ের করেননি।' যার অর্থ বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বিশ্বাস ছিল, উক্ত রায়টি বাতিলযোগ্য বা পরিবর্তনীয় ছিল। উক্ত রায় সম্পর্কে সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান উচ্চ আদালতে বাংলা : ভাষার প্রয়োজনীয়তা ও সীমাবদ্ধতা প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, "এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে প্রতিকার চাওয়া হলে এটি খারিজ হওয়ার আশঙ্কা ষোলো আনা। এতে রাষ্ট্রভাষা থেকে আদালতের ভাষাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে লেখা আছে, 'প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা'। সংবিধানের সঙ্গে অন্য যে কোনো আইন বা বিধি থাকুক না কেন, তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাতিল বলে গণ্য হবে। আমার কখনও মনে হয়, কেবল ৩ অনুচ্ছেদটি দিয়ে ইংরেজিবান্ধব আইনগুলোকে চোখ রাঙানো চলে না। বরং এটাই বলা ভালো যে, ৪১ বছরে সংবিধানের অনেক কাটাছেঁড়া হলেও সংবিধান সংশোধনকারীরা ভাষার দিকে মনোযোগী হননি। সংবিধান জাতিকে একটা ভাষাগত গোঁজামিলের মধ্যে রেখে দিয়েছে।"

বিশ্বের অনেক দেশে মাতৃভাষায় রায় প্রদান করা না হইলে তাহা অবৈধ ও অসাংবিধানিক মর্মে বাতিল হওয়ার প্রমাণ রহিয়াছে। ইদানীংকালে মালয়েশিয়ায় ইংরেজিতে রায় লেখার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদের বিরুদ্ধে আনোয়ার ইব্রাহিমের আনা মানহানির মামলা ভাষাগত কারণে সর্বোচ্চ আদালত খারিজ করিয়া দেন। বিশ্বের আরও অনেক দেশে এই ধরনের নজির পাওয়া যায়। বর্তমানে মাতৃভাষায়/জাতীয় ভাষায় বিচারকার্যসহ রায়ের দাবিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দাবি জোরদার হইয়াছে। বর্তমানে ভারতে বেশ কয়েকটি প্রদেশ তথা বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশে হিন্দি ভাষায় রায় প্রদান চালু হইয়াছে।

যদি ন্যায়বিচার সৎগুণ হয় এবং জনগণের কল্যাণের জন্যই যদি এর কাজ হয় তবে তা জনগণের ভাষাতেই হওয়া উচিত। মাতৃভাষায় বিচারকার্য সম্পর্কে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বক্তব্য :

যে ভাষায় বিচারকার্য সমাধা হয় না সে ভাষা বল সঞ্চার করে না। বাক্য গঠন ও বাক্য বিন্যাসে যে ভাষায় ঋজুতা, দৃঢ়তা, নির্দিষ্টতা, নিশ্চয়তার অভাব দেখা দেয়। আইন ও বিচারকার্যে ব্যবহারের ফলে একটি ভাষার উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। ইংল্যান্ডে বিচারকর্মে নরম্যান ফ্রেঞ্চ ভাষা বাদ দিয়ে ইংরেজি প্রচলন ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। হাঙ্গেরিতে জার্মান ভাষা ছেড়ে বিচারকর্মে যেই জনগণের মাজইয়ার ভাষা ব্যবহার শুরু হইল তখন সৌকর্য বৃদ্ধি পায়। নিজেদের ভাষার কল্পিত দৈন্যের অজুহাতে অন্যের ভাষার দ্বারস্থ হওয়া কোনো কাজের কথা নয়। আমাদের ভাষার দৈন্য মোচনের প্রথম পদক্ষেপই হবে আদালতে সেই ভাষার প্রচলন, সে ভাষা তেমন দক্ষ হস্তে না হলেও।

জেলা ও দায়রা জজ চৌধুরী মুনির উদ্দিন মাহফুজ আহম্মেদ উচ্চ আদালতে শুধু বাংলা ভাষা ব্যবহার; আবার কি শহীদ হতে হবে, শীর্ষক প্রবন্ধে আক্ষেপ করে বলেন, যারা বাংলায় রায় লিখেন তাদের নমঃশূদ্রসম এবং যারা ইংরেজিতে রায় লিখেন তাদের ব্রাহ্মণ সমমর্যাদা দেওয়া হয়। কর্মরত অধস্তন আদালতের বিচারকদের থেকে বিচারপতি নিয়োগের বেলায় বাংলায় ভালো রায় লেখককে প্রাধান্য না দিয়া বরং উহা তার অযোগ্যতা হিসাবে বিবেচিত হয়। অপরদিকে ইংরেজিতে রায় লেখককে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে- এ কথা অপ্রিয় হলেও সত্য।

বিদেশে কোনো ল জার্নালে বাংলাদেশের কেস রিপোর্ট হয় বা কোনো আদালত নজির হিসাবে উল্লেখ করেন? কোনো এক মনীষীর ভাষায় বিশ্বের কেহ বাংলাদেশের ল জার্নাল পড়ার জন্য রাত জাগিয়া বসিয়া নাই।

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি