মাতৃভাষায় রায় প্রদানের যৌক্তিকতা-৩

ভাষার মাস

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন

আদালতের পর্যবেক্ষণ :এ কথা সত্য যে, বাংলা ভাষায় আইনের পরিভাষার অভাব, তবে অপ্রতুল হিসাবে বিবেচনা করার কারণ নাই। তাহা ছাড়া কোনো ভাষাই রাতারাতি পরিপূর্ণতার শিখরে পৌঁছায় নাই। এই ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার উৎপত্তি বা ইংরেজি ভাষার ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত একটি রূপ উপস্থাপন করা হইল : ইংরেজি ভাষা ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষা পরিবারের অন্তর্গত জার্মানিক ভাষাগোষ্ঠীর একটি ভাষাবিশেষ। অ্যাংস, স্যাক্সন ও জুটদের ভাষার সমন্বয়ে এই ভাষার উৎপত্তি ঘটিয়াছিল বর্তমান ইংল্যান্ডে। ধারণা করা হয়, ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কেন্দ্রীয় ভাষাভাষীরা ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে বসবাস করিত। ওই সময় জার্মান ভাষাগোষ্ঠীর অ্যাল সওস্যাক্সনরা এদের পরাজিত করিয়া ওই দ্বীপপুঞ্জে বসতি স্থাপন করে। এদের ভাষার সংমিশ্রণে ইংরেজি ভাষার আদি রূপ তৈরি হইয়াছিল। খ্রিষ্টীয় অষ্টম ও নবম শতকে নরওয়েজিয়া অঞ্চল থেকে ভাইকিংরা এই অঞ্চলের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। ফলে আদি ইংরেজি ভাষায় ভাইকিংদের প্রাচীন নর্স ভাষার শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে। ১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর ফ্রান্সের নর্মদি অঞ্চলে বসবাসকারী নর্মান জাতি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়া ইংল্যান্ড দখল করিয়া ৩০০ বৎসর নর্মান রাজপুরুষরা ব্রিটিশ শাসন করে। এই সময় রাজকীয় ও প্রশাসনিক কাজকর্ম নর্মানদের প্রাচীন ফরাসি ভাষায় সম্পন্ন হইত। ফলে বিপুল পরিমাণ ফরাসি শব্দ প্রাচীন ইংরেজি ভাষায় আত্তীকৃত হয়। এই নব্য মিশ্র ভাষা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইংরেজি ভাষার সৃষ্টি করে। ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে আধুনিক ইংরেজি ভাষার উদ্ভব ঘটে। এই সময়ের বিখ্যাত কবি শেকসপিয়রের রচনাসহ বহু সাহিত্য রচিত হয়। উল্লেখ্য, প্রথম ইংরেজি গ্রামার লেখা হয় ১৫৩০-১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। এই ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় যে, ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ পূর্বে খোদ ইংল্যান্ডেও তাহাদের বিচারকার্য বিদেশি ভাষায় সম্পন্ন হইত। দীর্ঘ পরিক্রমায় ইংরেজি ভাষা যদি পরিপূর্ণতায় এত সময় লাগে, সে ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার দৈন্যের দিকে তাকানোর কোনো অবকাশ নাই। বাংলা ভাষার শব্দভান্ডার ইংরেজি ভাষার শব্দভান্ডারের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ। উদাহরণ :ইউ, তুমি, কাজিন- এই শব্দদ্বয়ের মধ্যে বাংলা এবং ইংরেজির ব্যবহার তুলনা করিলে আরও পরিস্কার হওয়া যায়।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের মতে, বাংলা ভাষাকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বদরবারে যে উচ্চতায় পৌঁছাইয়া দিয়াছেন তাহা কোনো অবস্থায় মুছে যাওয়ার নহে। কবি তুমি নহে গুরুদেব গ্রন্থের একটি উক্তি এখানে উল্লেখ্য- 'হঠাৎ করে আকস্মিক দুর্ঘটনায় বাংলা ভাষার সব লেখালেখি যদি মুছে যায় বা উঠে যায়, সে ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের রচনাবলী যদি বেঁচে থাকে, আমরা তাই নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।' মাতৃভাষার বিকল্প হিসাবে অন্য কোনো ভাষাকে স্থান দেওয়া সম্ভব নয়। মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য তাহার সর্বোচ্চ হাতিয়ার মাতৃভাষা। তাই মাইকেল মধুসূদন দত্তকে পরিশেষে মাতৃভাষাই মহাকবির মর্যাদা দিয়াছিল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের মতো স্বাস্থ্যদায়ক বলিয়া একাধিকবার মন্তব্য করিয়াছেন। তিনি আরও বলিয়াছেন যে, দূরদেশী ভাষা হইতে আমরা বাতির আলো সংগ্রহ করিতে পারি মাত্র। কিন্তু আত্মপ্রকাশের জন্য প্রভাত আলো বিকীর্ণ হয় আপন ভাষায়।
মাহাত্মা গান্ধীর মতে, নিজের মাতৃভাষাকে ছোট করা মানে নিজের মাকে ছোট করা। আরও বলিয়াছিলেন, যখন তিনি ইংরেজি বলেন তখন তাহার মনে হয়, তিনি একটি পাপ করিলেন।
মাতৃভাষার ক্ষেত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উক্তিটি বাঙালি জাতির স্বাধীনতার প্রাককালে আরও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল এবং আছে। বঙ্গবন্ধু :১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ভাষণে বলেন, 'আমি ঘোষণা করছি, আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। বাংলা ভাষার পণ্ডিতেরা পরিভাষা তৈরি করবেন তার পরে বাংলা ভাষা চালু হবে, সে হবে না। পরিভাষাবিদরা যত খুশি গবেষণা করুন। আমরা ক্ষমতা হাতে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা চালু করে দেব, সে-বাংলা যদি ভুল হয়, তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন করা হবে।'
পরিশেষে বাংলা ভাষায় রায় প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক অসুবিধা আছে, যাহা স্বীকৃত। যেমন বাংলা এবং ইংরেজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে লোকবল, সময়ের তারতম্য বেশ পরিলক্ষিত। ইংরেজি ভাষা প্রয়োগ সহজ কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে ,ি ী, ু, ূ ব্যবহারে; ন, ণ, শ, ষ, স ক্ষেত্রে বানান ভুলসহ অনেক জটিলতা দেখা দেয়। ভাষা চলমান, গতিশীল, পরিবর্তনশীল এবং পরিমার্জনীয়। কিন্তু আমাদের ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভাষাবিদরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপরোক্ত বক্তব্যের ক্ষেত্রে সহজ পদ্ধতি প্রয়োগ করিতে সক্ষম হন নাই। বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ,ি ী, ু, ূ কার, ষত্ব বিধান, ণত্ব বিধান; বর্ণ হিসাবে 'ম', 'ষ'-এর ব্যাপারে বর্ণগুলি, নিয়ম নীতি ভাষা ব্যবহারকারীকে ভাবাইয়া তোলে। সে ক্ষেত্রে ভাষাবিদদের আরও আগাইয়া আসিতে হইবে। বর্তমানে বাংলা ভাষায় প্রমিত বাংলা বানান, বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত সেই ক্ষেত্রে প্রমিত শব্দটা ইংরেজির যে রূপ, তাহা মনে হয় বাংলা প্রমিতের চেয়ে বহুল প্রচলিত। ডিকশনারি অনুযায়ী প্রমিত শব্দের ইংরেজি রূপ স্ট্যান্ডার্ড। যে শব্দটি বহুল পরিচিত কিন্তু সেখানে প্রমিত শব্দটাকেই আরও বিদেশি বলিয়া মনে হইতে পারে।
প্রমিত বাংলা বানান রীতি প্রচলিত না করিয়া সহজ বাংলা বানান নীতি প্রণয়ন করা উচিত ছিল, যেখানে ষত্ব বিধান, ণত্ব বিধান এবং ি কার, ী কার, ু কার, ূ কারসহ আরও অনেক বর্ণের ব্যবহার লোপ করা যায়। এই বিষয়ে ভাষাবিদদের অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ ব্যতীত বাংলা ভাষার ব্যাপক ব্যবহার আরও প্রলম্বিত হইবে।
বাংলা ভাষা ব্যবহার না করার মনস্তাত্ত্বিক এবং আর্থিক যোগ রহিয়াছে। ব্রিটিশরা বিচারকার্য ফারসি ভাষা হইতে বাংলায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়াছিলেন। কিন্তু এ দেশি বাঙালিরা ইংরেজি ভাষায় ঝুঁকিয়া পড়িলেন, চাকুরি-বাকুরির আশায়।
আমার অনুভূতি :আমি গর্বিত আমার ভাষা বাংলা, যাহা ইউনেস্কোর জরিপ অনুযায়ী বিশ্বের ১ নং মধুরতম ভাষা, যেখানে ইংরেজি ভাষা ১০ নং ক্রমিকে।
আমি গর্বিত জাতিসংঘের অফিসিয়াল
ভাষা না হওয়া সত্ত্বেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু
১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলায়
ভাষণ দিয়াছিলেন।
আমি গর্বিত ১৯১৩ সালে বাংলা ভাষায় সাহিত্যের জন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাইয়াছিলেন।
আমি গর্বিত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেন।
আমি গর্বিত বাংলা ভাষার শহীদদের জন্য পালিত ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
আমি গর্বিত সাবেক মাননীয় প্রধান বিচারপতি এ.বি.এম. খায়রুল হকের প্রতি, যাহার অনুপ্রেরণা আমাকে বাংলায় রায়
প্রদানের সাহস জুগিয়েছে। আমি আমার মাতৃভাষায় বিচারকার্য চর্চা করার একটি সুযোগ পাইয়াছি।
আমি গর্বিত ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন মাননীয় বিচারপতি মাঝেমধ্যে বাংলায় রায় দিতেছেন। তবে আমি বিশেষভাবে মাননীয় বিচারপতি আশরাফুল কামালের জন্য
গর্বিত যে, তিনি বিগত দুই বৎসর সকল রায় বাংলায় দিতেছেন।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা :পরিশেষে আদালতের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু তথ্য উল্লেখ করা হইল :রিট বেঞ্চে কনিষ্ঠ বিচারপতি হিসাবে থাকাকালে হঠাৎ আদালতে বিভক্ত একজন সিনিয়র আইনজীবী কোম্পানি আইনের দিকপাল হিসাবে বিচার অঙ্গনে পরিচিত। অবজ্ঞাভরে আদালতকে বলিলেন- তিনটি কাজ বাংলায় সম্পন্ন করা যায় না। (১) নামাজ পড়া, (২) কোম্পানি আইন করা এবং (৩) হাইকোর্টে রায় দেওয়া। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার, বিজ্ঞ আইনজীবী এই বক্তব্যটুকুও বাংলায়ই উপস্থাপন করেন। বেঞ্চ পরিচালনাকারী জ্যেষ্ঠ বিচারপতির নির্দেশে ওই দিন কোনো বক্তব্য দিতে পারি নাই। তবে বিজ্ঞ আইনজীবীর (২) ও (৩) নং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হইয়াছে। ১ নং বিষয় সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করার আমার ইমানি দায়িত্বের বাহিরে। তবে আমাদের সামনে যে চারটি আসমানি কিতাব আছে, তাহা কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়।
অভিজ্ঞতার আলোকে আরও একটি ঘটনা; জনৈক বিজ্ঞ আইনজীবী এবং বর্তমানে যিনি হাইকোর্টের মাননীয় একজন বিচারপতি হিসাবে কর্মরত আছেন। তাহার ওকালতি জীবনে কোনো এক মক্কেলকে তাহার বাংলায় মুদ্রিত ইংরেজি ভিজিটিং কার্ডটি কোনো ব্যক্তিকে পারিশ্রমিক দিয়া বাংলায় অনুবাদ করিয়া উনাকে খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। এর পর হইতে ইংরেজিতে ভিজিটিং কার্ড ছাপান নাই। তিনি একাধিকবার বাংলা ভাষার গুরুত্বের উপর জোর দিয়াছেন; কিন্তু এই বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য প্রদান হইতে আমি বিরত। আপনারা যেভাবে বুঝিবেন সেটাই আমার মন্তব্য।
পরিশেষে উচ্চ আদালতের ভাষা বাংলা বা আদালতের ভাষা বাংলা, না ইংরেজি- সেই রায়ের ভার আপনাদের উপরেই রহিল।
[সমাপ্ত]
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট
বিভাগের বিচারপতি

বিষয় : ভাষার মাস