মানবিক মূল্যবোধের বিকাশেই মুক্তি

মানবাধিকার

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

নাছিমা বেগম

বঙ্গবন্ধু ও মানবাধিকার- এই দুটি শব্দ একই সূত্রে গাঁথা। বঙ্গবন্ধুর জন্মই হয়েছিল মানুষের অধিকার সুরক্ষার জন্য। মানবাধিকারের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ছিল অবিচল। শৈশব থেকে আমৃত্যু তিনি মানবাধিকারের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত সর্বজনীন মানবাধিকারের মূল সুর হলো, প্রতিটি মানুষের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার জন্মগত অধিকার। মানুষ হিসেবে এই অধিকার প্রত্যেকের প্রাপ্য, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। মানবাধিকার শাশ্বত এবং কোনো দেশের সীমারেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, যুবক, বৃদ্ধ, শিশু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, আদিবাসী, তৃতীয় লিঙ্গ, প্রতিবন্ধী যাই হোন না কেন, তিনি গ্রাম বা শহর বা বিশ্বের যে প্রান্তেই বসবাস করেন না কেন, সবার সমান অধিকার।
মানবাধিকার আসলে কী? মানবাধিকার মূলত একদিকে জীবনের অধিকার, স্বাধীনভাবে কথা বলার, চলাফেরা করার অধিকার; অন্যদিকে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য সবকিছুর অধিকার। কার্যত অধিকার ও দায়িত্ব একে অন্যের পরিপূরক। অধিকার পূরণের ক্ষেত্রে অধিকার প্রদানকারীর যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি অধিকার ভোগকারীরও দায়িত্ব রয়েছে। উভয়পক্ষের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন ছাড়া অধিকার বাস্তব রূপ পায় না। বঙ্গবন্ধু তাঁর শৈশব থেকেই মানবাধিকারের এই সত্যটিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। তাঁর শৈশবের জীবনগাথা বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়, শিশুকাল থেকেই তিনি মানবদরদি ছিলেন। তাঁর আজীবনের লক্ষ্য ছিল, দুঃখী মানুষের মুখে যেন হাসি থাকে।
মানবাধিকার একক ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি অনেক ব্যক্তির সমষ্টি জনগণের জন্যও সমানভাবে কার্যকর। বঙ্গবন্ধু নিজের কোনো সুবিধা আদায়ের জন্য কখনও সংগ্রাম করেননি, তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন সাধারণ জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য। কারা সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত জাতির পিতার সমগ্র জেল জীবন ৩০৫৩ দিন পাঠ করলে দেখা যায়, তিনি নিজের কোনো ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য কখনও সংগ্রাম করেননি, সংগ্রাম করেছেন জনদাবি আদায়ের জন্য। জনস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনের, বিশেষ করে যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো তাকে কারাযাপন করতে হয়েছে। বাংলা ও বাঙালির অধিকার, বিশেষ করে জনদাবি আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধুর এই আত্মত্যাগের বিবরণ বঙ্গবন্ধু রচিত 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' এবং 'কারাগারের রোজনামচা' গ্রন্থ দুটির পরতে পরতে উলেল্গখ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু জনদাবি আদায়ে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন এবং সফল হয়েছেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু অনশন শুরু করে যখন প্রায় মৃত্যুপথযাত্রী, তখন পাকিস্তানের শাসকরা তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু রচিত এই অসামান্য গ্রন্থ দুটি পাঠ করলে আমাদের আগামী প্রজন্ম জানতে পারবে বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেমের অসামান্য ইতিহাস। জনদাবি ও মানবাধিকার সুরক্ষায় পাকিস্তান শাসনামলের অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবাদ এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবিতে কতটা সংগ্রাম তিনি করেছেন। উদাহরণস্বরূপ উলেল্গখ করা যায়, আমাদের প্রিয় স্বদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানবাধিকার সংগ্রামের ফসল হিসেবে। আর এই ফসল ফলিয়েছেন আমাদের জাতির পিতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারক-বাহক, উদ্দীপক ও মহানায়ক ছিলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে বর্ণিত রয়েছে, বাংলাদেশের জনগণের জন্য সমতা, মানবসত্তার মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। আর এগুলোর সমষ্টিই হলো মানবাধিকার।
আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর মাত্র ১০ মাসের মাথায় বঙ্গবন্ধু যে সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন, সেই সংবিধানে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত ৩০টি অনুচ্ছেদ সংবলিত সর্বজনীন মানবাধিকার দর্শনের পুরোপুরি প্রতিফলন রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পাদন না করলে অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবাইকে দায়িত্ব সম্পাদন করতে হবে। তাঁর ভাষায়, আমরা যদি একটু কষ্ট করি, একটু বেশি পরিশ্রম করি, সকলেই সৎপথে থেকে সাধ্যমতো নিজের দায়িত্ব পালন করি এবং সবচাইতে বড় কথা সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকি, তাহলে আমি বিনাদ্বিধায় বলতে পারি, ইনশালল্গাহ, কয়েক বছরেই আমাদের স্বপ্নের বাংলা আবার সোনার বাংলায় পরিণত হবে। অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন ও ড. মো. রহমত উলল্গাহ সম্পাদিত এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থেকে প্রকাশিত 'বঙ্গবন্ধুর মানবাধিকার দর্শন' গ্রন্থটি বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত বক্তৃতার সারসংক্ষেপ ও সংবাদভাষ্যের সংকলন। গ্রন্থটিতে পাকিস্তান শাসনামলের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সে সময় প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাক্কালে ও স্বাধীনতা-উত্তর দেশ গঠনের জন্য বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তিনি যেসব বক্তৃতা দিয়েছেন, সেই বক্তব্যের নির্যাস থেকে মানবাধিকার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাচেতনা ও দর্শন নির্ভুল ও অবিকৃতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

মানবাধিকারের অন্যতম দর্শন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বঙ্গবন্ধু বিশ্বাসী ছিলেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকেই তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ছিলেন। বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা স্থান পাবে না, এ বিষয়ে তার প্রত্যয় ছিল অবিচল।
বঙ্গবন্ধু বলতেন, এই রাষ্ট্রের মানুষ হবে বাঙালি। তাদের মূলমন্ত্র হবে-সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধর্মকে ব্যবহারের বিরুদ্ধে ছিলেন। তার দৃষ্টিতে সব ধর্মই সমান এবং সমঅধিকার দাবিদার।
বঙ্গবন্ধু দুর্নীতিকে ঘৃণা করতেন। তিনি জানতেন, দেশের উন্নয়নের অন্যতম বাধা হলো দুর্নীতি। দুর্নীতিবাজ, মুনাফাখোররা অন্য মানুষের অধিকার হরণ করে নিজেরা মুনাফা লোটেন। তিনি তার বিভিন্ন বক্তৃতায় দুর্নীতিবাজ-মুনাফাখোর-চোরাকারবারিদের দমনে কঠোর মনোভাব পোষণ করেন। তাঁর সুযোগ্যকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার মতোই দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষুষ্ণতা নীতি গ্রহণ করছেন। কার্যত বাংলাদেশের মাটি থেকে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদককে রুখে দেওয়ার এখনই সময় এবং সবার সমবেত প্রচেষ্টায় তা প্রশমিত হবে বলে বিশ্বাস করি।
বঙ্গবন্ধু একজন মানবপ্রেমী মানুষ ছিলেন। মানুষের প্রতি তাঁর অসামান্য দরদ ছিল। ছোট-বড়, ধনী-গরিব নির্বিশেষে তিনি সবাইকে ভালোবেসেছেন। তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন। মৃত্যুর আগমুহূর্তেও তিনি তঁাঁর মানবপ্রেমের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাক্ষী সেলিম (আব্দুল) ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দেওয়াকালে আব্দুল উলেল্গখ করেন, দু'জন কালো পোশাকধারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি করলে তার হাতে এবং পেটে গুলি লাগে। গুলি খেয়ে তিনি দরজার সামনেই পড়ে যান। পরে সিঁড়ির পাশে হেলান দিয়ে বসে থাকা অবস্থায় দেখেন, ৪-৫ আর্মির লোক বঙ্গবন্ধুকে তাঁর রুম থেকে ধরে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে বলেছিলেন, 'ঐ ছেলেটা ছোটবেলা থেকে আমাদের এখানে থাকে, একে কে গুলি করলো?' এ রকম একটা অচিন্তনীয় ভীতিকর পরিস্থিতিতেও বঙ্গবন্ধুর মন কেঁদে উঠেছিল কাজের ছেলে আব্দুলের জন্য। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও পিতার মতোই মানবদরদি একজন মানুষ।
বাঙালি জাতির কী দুর্ভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধু সারাজীবন অন্যের অধিকার সুরক্ষা করতে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনের, নিজের আরাম-আয়েশের কথা ভাবেননি। অথচ তাঁর জীবন কেড়ে নেওয়া হয় মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের মাধ্যমে। পাকিস্তানিরা যেখানে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সাহস করেনি, সেখানে এ দেশেরই একদল বিপথগামী সেনাসদস্য কল্পনাকেও হার মানিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর এই হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম ঘটনা এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কখনই পূরণযোগ্য নয়। পদাঙ্ক অনুসরণ করে মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন এবং ২০০৯ সালে তাঁর শাসনামলে প্রণীত হয় মানবাধিকার কমিশন আইন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আইন অনুযায়ী এর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম স্বাধীনভাবে পরিচালিত করছে। তবে বর্তমানে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনাচার তৈরি হয়েছে। বিশ্বাস করি, মানবিক মূল্যবোধ সৃজনের মাধ্যমে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সবার মাঝে মানবাধিকার সুরক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টিতে একযোগে-একমনে কাজ করে আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পাশাপাশি মানবিক বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে পরিচিত করতে সমর্থ হবো। মানবিক বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

বিষয় : মানবাধিকার