দিল্লি সহিংসতার দায় মোদি-অমিত জুটির

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সুধীন্দ্র কুলকার্নি

ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৪৭ সালে যখন ভারত আধুনিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা হয়, তখন নাগরিকত্ব নামে কোনো ধারণা ছিল না। সে সময় যারাই এখানে বসবাস করত, এমনকি কেউ দূর থেকে এসে থাকলেও তারা সবাই বৃহত্তর ভারতীয় পরিবারের সদস্য হয়ে যায়। হঠাৎ করে আমদানি হওয়া বৈধ নাগরিকত্বের ধারণা এসে ভারতের বন্ধন ও সমাজের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করে। হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের ফলে সৃষ্টি হয়ে ঘৃণা আর ঘৃণা থেকে দাঙ্গা-সহিংসতা। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের মধ্যেই রাজধানীতে জাতিগত বিদ্বেষের সে আগুন জ্বলে ওঠে। নরেন্দ্র মোদি যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন, যখন ট্রাম্প হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টায় জীবন উৎসর্গকারী মহাত্মা গান্ধী আশ্রম প্রদর্শন করছিলেন, যখন তিনি ও তার স্ত্রী মেলানিয়া ভালোবাসার নিদর্শন আগ্রার তাজমহল দেখছিলেন, ঠিক সে সময় দিল্লির একটি অংশ কার্যতই জ্বলছিল। মোট কথা, বিশ্বের অন্যতম দুই গণতান্ত্রিক দেশ যখন তাদের ধর্মীয় বৈচিত্র্য নিয়ে একে অপরের প্রশংসা করছিল, তখন বিশ্ব ভারতের রাজধানীতেই দেখেছে ভিন্ন চিত্র।
আমরা দেখছিলাম, পুলিশ কীভাবে এতটা নির্লিপ্ত থাকতে পারে। আমরা জানি, গণতান্ত্রিক যে কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ চরিত্র জরুরি; জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। অথচ ভারতের গণতন্ত্র এ মৌলিক বিষয়টি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২০ পেরিয়ে গেছে।
ঘটনাটি আকস্মিকভাবে এক দিনেই ঘটেনি। নানা ঘটনার পরম্পরায় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ছিল সর্বশেষ ঘটনা। সংঘর্ষের বিবরণ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের হেডলাইন স্টোরিতে এসেছে- দিল্লি পুলিশের নাকের ডগায় মানুষ কীভাবে রড, লাঠি দিয়ে মারছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এসব চলছিল। তারা দেখে দেখে মুসলমানদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টার্গেট করছিল। তিন দিনের এসব ন্যক্কারজনক ঘটনা যখন পুলিশের নাকের ডগায় ঘটছিল, তখন তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।
হ্যাঁ, দিল্লির ঘটনায় টার্গেট ছিল মুসলমানরাই। জয় শ্রীরামের নামে পুলিশের সহায়তায় মুসলমানদের ওপর এ প্রতিশোধ নেওয়া হয়। এটাই 'সভ্য' ভারতের সর্বশেষ 'সুন্দর' দৃশ্য। এর মাধ্যমে হিন্দু আধিপত্যবাদের পরিচয়ই আমাদের সামনে দৃশ্যমান হলো। যে রামের নামে এসব হচ্ছে, অথচ রাম ছিল ভারতীয় সভ্যতার অন্যতম গৌরবান্বিত দৃশ্য।
আমরা সত্যিই জানি না, ট্রাম্প যখন আহমেদাবাদের গান্ধী আশ্রম পরিদর্শন করেন কিংবা পরিদর্শন করেন দিল্লির রাজঘাট, তখন তার মনে কী চিন্তা কাজ করছিল। তবে ভারতীয় হিসেবে আমাদের ভাবনায় এটাই আসছিল যে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি ভারতীয় সভ্যতার নিদর্শনবাহী দুটি স্থাপনার আদর্শ ধারণ করছেন? আমরা জানি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দলের জনপ্রিয় স্লোগান হলো- 'জয় শ্রীরাম'। ঠিক এই স্লোগান দিয়েই প্রথম মুসলমানদের ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদে ভেঙে ফেলা হয়েছিল, যাতে সে জায়গায় রামের জন্মস্থানের মিথ হিসেবে মন্দির নির্মাণ করা যায়। অবশ্য মোদি কখনও মহাত্মা গান্ধীর প্রশংসা করার সুযোগ হাতছাড়া করেননি। বিদেশি অতিথি যেই হোক, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোক, মোদি তাদের গান্ধী আশ্রম পরিদর্শন করাবেনই। কিন্তু কখনও মোদি কি গান্ধীর হিন্দু-মুসলিম সুসম্পর্কের শিক্ষা গ্রহণ করেছেন? অথচ গান্ধীর জীবনে এটিই ছিল অন্যতম ব্রত। গান্ধীকে সাচ্চা ভারতের আইকন বলা ছাড়া গান্ধীর আদর্শ ও দর্শন মোদির কাছে নেই। আর তারই সম্ভাব্য উত্তরসূরি অমিত শাহ, তার দল বিজেপির প্রধান এবং ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি সরাসরি দিল্লির পুলিশ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন।

নরেন্দ্র মোদি কিংবা অমিত শাহ কেউই দিল্লির এই সহিংসতার দায় এড়াতে পারেন না। ভারত যখন তার মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আতিথেয়তা দিচ্ছে, তখন নিশ্চয়ই তারা এই দাঙ্গা চাননি। কিন্তু এটি তো হঠাৎ সংঘটিত হয়নি। আমরা দেখেছি, এই ক'দিন আগে দিল্লির নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক স্লোগান দেন। যখন বিজেপি সেখানে গো-হারা হারল, তখন বিজেপির দলীয় ক্যাডারদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি হয়, যার প্রকাশ তারা সহিংসতার মাধ্যমে ঘটিয়েছিল। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, অমিত শাহর আজ্ঞাবহ পুলিশ বাহিনী তাদের থামাতে কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করবে না। সেটাই আমরা বাস্তবে দেখেছি, দুই মাস আগে যখন জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটিতে সহিংস কাণ্ড ঘটানো হয়, তখন কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
তৃতীয় যে বিষয়টির কারণে সরাসরি নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করা যায় সেটি হলো- নাগরিকত্ব আইন সংশোধনে তাদের ঔদ্ধত্য ও বৈষম্যমূলক আচরণ। আমরা দেখেছি, আসামে এনআরসি করা হলো, সেখানে কেবল মুসলমানদের জন্য বন্দিশিবির নির্মাণ করা হচ্ছে। এ কারণে ভারতের মুসলমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকাংশের মধ্যে চরম অবিশ্বাস ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভারতের এ নীতি ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ও মেনে নিতে পারছে না। যার ফলে আমরা নাগরিকত্ব সংশোধন আইন নিয়ে প্রায় পুরো ভারতে সবার অংশগ্রহণে অহিংস আন্দোলন দেখেছি। অথচ নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ সেসব আন্দোলনকে ভালোভাবে নেননি; এমনকি তারা প্রতিবাদকারীদের যে আলোচনার দাবি ছিল, তাও প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি এর মাধ্যমে তারা গণতন্ত্রের মৌলিক বিষয়কেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন। এরই মাধ্যমে মোদি 'সকলের বিশ্বাস' নামে যে কথার প্রচলন করেন কিংবা তার 'সবার সঙ্গে, সবার বিকাশ' স্লোগানও অর্থহীন হয়ে যায়।
নরেন্দ্র মোদি ভারতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজকীয় সংবর্ধনা প্রদানের মাধ্যমে যা-ই অর্জন করতে চান না কেন, এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে, তিনি এবং অমিত শাহ রাজনীতিতে যে সাম্প্রদায়িক খেলা খেলছেন, এর মাধ্যমে ভারতের গণতন্ত্র ও সভ্যতা লজ্জার মধ্যেই পড়ছে। দিল্লির ঘটনা তার একটি উদাহরণ মাত্র।
ভারতীয় রাজনীতিক; এনডিটিভি থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

বিষয় : প্রতিবেশী