একটি শহরের তিনটি গল্প

উন্নয়ন

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার

উন্নয়ন যদি কেবল গাড়িওয়ালাদের কথা চিন্তা করে করা হয়, তবে তা অর্থহীন। উন্নয়নে সাধারণ মানুষের কতটুকু অংশীদারিত্ব আছে, তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নির্বাচিত করপোরেশন যদি একটি বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয় বা নাগরিক উদ্বেগের সমাধান করার পর্যাপ্ত ক্ষমতা না রাখে, তবে আমরা সিটি নির্বাচন দিয়ে কী করব? কয়েকদিন আগেই ধুমধাম করে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণে সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনে নগর ভোটারদের আশাব্যঞ্জক সাড়া মেলেনি। সম্ভবত নগরীর নাগরিককুল কিছুটা ক্লান্ত! এত কলেবরের নির্বাচনে কী লাভ, যদি তা নগরবাসীর কল্যাণে না আসে? অবশ্য নগরবাসী বলতে যদি কেবল নগরের এলিট শ্রেণিকে বোঝানো হয়, তবে ভিন্ন কথা!

এখানে নগর যানজটের গল্প বলব না। কারণ এটি বহুল আলোচিত, সর্বপরিচিত ও জটিল প্রকৃতির। যেমন- আমি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের বিজনেস স্কুল-ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে পড়াই। এটি কুড়িল বিশ্বরোড ও বসুন্ধরা সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। আমার বাসা মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডি এলাকায়। বিবিএ ক্লাস ও স্টুডেন্ট কাউন্সিল শেষে বিকেল ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করলে রাত ৭টা থেকে ৯টায় বাসায় পৌঁছা যায়। তবে যেদিন এমবিএ ক্লাস থাকে, সেদিন সুবিধা রাত ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে ১১টায় বাসায় পৌঁছা যায়।

কেস-১ :কুড়িল বিশ্বরোডে একটি উন্মুক্ত রেলক্রসিং ও তিন-চারটি রোডের কানেকশন থেকে অনবরত গাড়ি প্রবাহিত হলেও পথচারীদের জন্য কোনো ফুট ওভারব্রিজ না থাকার কারণ কী? অথচ এখান থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়- আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা যাতায়াত করে। প্রতিদিন শত-সহস্র পথচারী ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হয় ও রেললাইন ক্রস করে। এটা কি দেখারও কেউ নেই! এখানে একটি এলিভেটেড কমপেল্গক্স ফুট ওভারব্রিজ বা নান্দনিক ডিজাইন ও আধুনিক সুবিধা সংবলিত আন্ডারপাস নির্মাণ করা জরুরি।

কেস-২ :জাতীয় সংসদ ভবনের নিকটবর্তী আসাদগেটে গ্রিনহেরাল্ড স্কুলের দু'পাশে দুটি ফুট ওভারব্রিজ থাকলে ভালো হতো। দু'পাড়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়; যেমন- সেন্ট জেভিয়ার্স গ্রিনহেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, সেন্ট জোসেফ হাই স্কুল ও কলেজ, ওয়াইডব্লিউসিএ জুনিয়র গার্লস হাই স্কুল, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি এবং পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। ইম্পেক্ট ফ্যাক্টর বিবেচনায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অথবা সিটি করপোরেশন এখানে দুটি অটোমেটিক ফুট ব্রিজ নির্মাণ করতে পারে। এর তিনটি সুনির্দিষ্ট ইম্প্যাক্ট রয়েছে : ১. ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত হবে; ২. স্কুলের সামনে গাড়ির ভিড় কমবে; ৩. ট্রাফিক জ্যাম কমবে।

কেস-৩ :ফুটপাত, রাস্তা ও পাবলিক স্পেসে ধূমপানের বিরুদ্ধে অভিযান করা সময়ের আদেশ। প্যাসিভ ধূমপান জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর বিরূপ প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে শিশু ও নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত ক্ষতিকারক। পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ঢাকা সিটিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসের অভিজ্ঞতা বলে যে, এখানে পরিস্থিতি ক্রম অবনতিশীল হচ্ছে। সব পাবলিক স্পেস, এমনকি ফুটপাতের রাস্তায় ইলেকট্রনিক সিগারেটসহ তামাকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জন্য নির্বাহী আদেশ জারির সময় এসেছে এবং এরূপ আদেশ দক্ষতার সঙ্গে কার্যকরকরণ আবশ্যক।

গল্প তিনটির বিষয়বস্তু ঢাকাকে নূ্যনতমভাবে বসবাসযোগ্য করার অংশমাত্র। এগুলো সিটি করপোরেশনের এখতিয়ারভুক্ত না হলে, এ ক্ষেত্রে করপোরেশনকে অন্তত সমন্বয়কের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব দেওয়া আবশ্যক। কারণ একটি নির্বাচিত করপোরেশনকে তার নাগরিক স্টেকহোল্ডারদের প্রতি সংবেদনশীল হতে হয়।
নাগরিকরাই নগর শাসন, উন্নয়নের লক্ষ্য ও মাধ্যম। সুতরাং সাধারণ নাগরিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগের বিকাশ নগর শাসন ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। এ ক্ষেত্রে ভালো ফল পেতে সুনীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন কৌশল ও দক্ষতাকে একত্রে কাজে লাগাতে হবে।

নবনির্বাচিত সিটি মেয়রদ্বয়কে অভিনন্দন! যতদূর জানা যায়, ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের যথেষ্ট যোগ্যতা ও নেতৃত্বগুণ রয়েছে। এখন তাদের যা পাওয়া দরকার তা হলো, প্রয়োজনীয় সম্পদ, দায়িত্ব-কর্তৃত্ব, যথাযথ ক্ষমতা ও নাগরিকদের কাছে জবাবদিহি কাঠামো। তাদের যা গড়তে হবে তা হলো, কালচার অব কমিটমেন্ট এবং ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলার ভিশনের প্রতি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি। সাহসী ও দৃষ্টান্ত স্থাপনমূলক নেতৃত্বের মনোভাব প্রদর্শনের সঙ্গে গণনাগরিকবান্ধব সেবা, উন্নয়ন ও জবাবদিহিমূলক নগর শাসনব্যবস্থা প্রণয়ন মিশনের দৃঢ় ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন পরিকল্পনার কৌশলটি এখানে অবশ্যই আবশ্যক।

সবাই যদি সবকিছুর জন্য কেবল প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন, তবে সেটা ভালো দেখায় না। প্রধানমন্ত্রী একা সব সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না, যা মূলত সামষ্টিক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নেতৃত্ব সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। তবে তিনি অবশ্যই এখানকার প্রধান বা নীতিগত বাধাগুলো সরিয়ে ফেলতে পারবেন, কালচার অব কমিটমেন্ট বিনির্মাণের চেষ্টা করতে পারবেন এবং সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য একটি পথ নির্মাণ বা মানচিত্র আঁকতে পারবেন।

ভবিষ্যৎ রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা ও নগর উন্নয়নের জন্য মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ-তরুণীদের নেতৃত্বের পথ উন্মুক্ত করার জন্য সেতুবন্ধ ও রূপান্তরকরণের দিকে মনোনিবেশ করতে পারবেন। ক্ষমতাসীন দলের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দলকে অবশ্যই একই পথ অনুসরণ এবং এখানে সহযোগিতা করতে হবে। আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি বিনির্মাণ করতে হবে।
 

সহযোগী অধ্যাপক, ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, এআইইউবি, ঢাকা
 rafiqul.talukdar@gmail.com