অধিকার প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অঙ্গীকার

মুজিববর্ষ

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

নাছিমা বেগম

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সময়ের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন। বর্তমানে নারীর অধিকার মানবাধিকার হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত হলেও আমরা জানি, যুগ যুগ ধরেই রাষ্ট্র, সমাজ এবং জনজীবনে সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে নারীরা বৈষম্যের শিকার। এ অবস্থার উত্তরণের জন্য নারীদের প্রতিনিয়তই করতে হয়েছে সংগ্রাম। আশার কথা হলো, দিন দিন মানুষের মাঝে সচেতনতা বেড়েছে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা-১৯৪৮। জাতিসংঘ ঘোষিত সর্বজনীন মানবাধিকারের মূল সুর হলো, প্রতিটি মানুষের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার জন্মগত অধিকার। মানুষ হিসেবে এই অধিকার প্রত্যেকের প্রাপ্য, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। মানবাধিকারের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অঙ্গীকার ছিল অবিচল।
সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রে যে ৩০টি অনুচ্ছেদ রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর প্রতিটিরই প্রতিফলন রয়েছে আমাদের সংবিধানে। উলেল্গখ্য, জাতিসংঘ কর্তৃক নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ (সিডও) সনদ-১৯৭৯ গ্রহণের অনেক আগেই বঙ্গবন্ধু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছেন। সিডও সনদের ১৬টি অনুচ্ছেদে নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপে যেসব অনুশাসন দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিটি অনুশাসনই বঙ্গবন্ধুর ১৯৭২-এর সংবিধানে বিদ্যমান। সংবিধানের প্রস্তাবনায় সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিতকরণের অঙ্গীকার রয়েছে। সংবিধানের দ্বিতীয় অধ্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার হিসেবে রয়েছে নারী-পুরুষের সমঅধিকার। ২৭ অনুচ্ছেদে সব নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। পুরুষ ও নারীর মধ্যে সমতা ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সংবিধানে ২৮(৪) উপ-অনুচ্ছেদে বিশেষ বিধানও রাখা হয়েছে।
সাধারণ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটদান এবং জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সংস্থাগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকার রয়েছে। বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের জন্য সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে নারীর জন্য জাতীয় সংসদের আসন সংরক্ষিত রাখা হয়। সংরক্ষিত আসনে ১৫ জন নারী সদস্য নিয়ে প্রথম সংসদের যে যাত্রা শুরু, পরবর্তীকালে তা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ জনে উন্নীত হয়। এ ক্ষেত্রে ৬৫(২) অনুচ্ছেদের অধীনে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত ৩০০ আসনেও নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রিসভায় দু'জন নারী মন্ত্রী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই ধারাকে অব্যাহত রেখে তার সুযোগ্যকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে আরও সুগঠিত করেছেন। সংবিধানের ৯ অনুচ্ছেদের অধীনে স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণে অনুশাসন রয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

বঙ্গবন্ধু শুধু রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত ছিলেন এমনটি নয়। তিনি ব্যক্তিজীবনেও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমভাবে নিবেদিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পাঠ করলে আমরা দেখতে পাই, তাঁর পরিবারে নারীর ক্ষমতায়ন ছিল। বঙ্গবন্ধুর মা ও তাঁর স্ত্রী পৈতৃক সম্পত্তির মালিক ছিলেন। 'কারাগারের রোজনামচা' গ্রন্থের ২২২ পৃষ্ঠায় ডায়েরিতে বঙ্গবন্ধু উলেল্গখ করেছেন, সরকার যদি ব্যবসা করতে না দেয়, তবে তার বাবা, মা ও স্ত্রীর যে সম্পত্তি আছে, তার আয় থেকে পরিবারের সংসার খরচ ভালোভাবেই চলবে। বঙ্গবন্ধুর এই সরল লিখন থেকে এটাই বোঝা যায় যে, তিনি নারীর আয়কে কতটা গুরুত্ব সহকারে দেখতেন এবং এর প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি পরিবারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্ত্রী-কন্যার মতামতের মর্যাদা দিতেন। যেমন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা যখন ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে জ্যেষ্ঠকন্যা শেখ হাসিনার বিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করেন, তখন তিনি সহমত প্রকাশ করে বলেছিলেন, 'হাসুকে একবার জিজ্ঞেস করে নিও।' জীবন সাথি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কন্যার মতামতের প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন। তাঁর জীবনের চলার পথে বহু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি স্ত্রী রেণুর সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক জীবনের আদর্শকে অনুসরণ করে আমাদের ব্যক্তিজীবনে স্বামী-স্ত্রী-পুত্র-কন্যার পারিবারিক বন্ধন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত রাখতে পারলে সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা অনেক কমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

আগে সন্তানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে শুধু পিতার নাম ব্যবহার করা হতো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় পিতার নামের সঙ্গে মায়ের নাম যুক্ত করে জনজীবনের সর্বস্তরে সন্তান-সন্ততির পরিচয়ের ক্ষেত্রে পিতার নামের সঙ্গে মায়ের নাম উলেল্গখ বাধ্যতামূলক করা হয়। তৃণমূলের নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য তাদের জীবন দক্ষতামূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষিত বেকার নারীদের আত্মকর্মসংস্থান এবং কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীরা ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সার ট্রেনিং গ্রহণ করে আয় করতে পারায় তাদের অর্থনৈতিক সমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কর্মজীবী মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব ও গর্ভকালীন সময়ে চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য সবেতনে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিশেষ বিধান থাকায় নারীদের কর্মে প্রবেশে বাধা কমে আসছে।
সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদ আলোকে 'প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে।' ২৯(৩)(ক) অনুচ্ছেদে 'নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশ যাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করতে পারেন, সে উদ্দেশ্যে তাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা হতে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না।' এ বিধানের আওতায় নারীদের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগের সমসুযোগ থাকার পরও বিশেষ সুযোগ হিসেবে নির্ধারিত কোটায় নিয়োগ পাওয়ায় চাকরি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের সব ক্যাডারেই নারীরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। নারীরা নিজ মেধা ও যোগ্যতা বলে প্রশাসনের বিভিন্ন উচ্চপদে যেমন সচিব-সিনিয়র সচিব, বিচার বিভাগে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনে স্বীয় যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থাপ্রধান এবং মাঠ প্রশাসনে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনীতে নারীদের নিয়োগ ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আজকে নারী মেজর জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে নারীর দায়িত্ব পালন অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সব পেশাতেই নারী দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য-উপ-উপাচার্য পদে নারীরা সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ যে প্রাথমিক শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করেছে। তথ্যপ্রযুক্তিতেও নারীর অংশগ্রহণ আজ দৃশ্যমান। এ কথা নির্দি্বধায় বলা যায় যে, বাংলাদেশের নারীদের শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২-এর সংবিধানে সুস্পষ্ট বিধান রেখে গেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় সরকারের জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার কাজ এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের সব সূচকেই নারীর অবদান রয়েছে। প্রতি বছর বৈশ্বিক জেন্ডার সমতার প্রতিবেদনে নারী ও পুরুষের বৈষম্য এবং বিভিন্ন সময়ে বৈষম্য দূরীকরণে দেশগুলোর অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। স্বাস্থ্য ও গড় আয়ু, শিক্ষার সুযোগ, অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন মূলত এই চারটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ২০১৯ সালের বৈশ্বিক জেন্ডার সমতা প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৪৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫০তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। টানা পঞ্চমবারের মতো সেরা অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের নারী-পুরুষ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে গৃহীত কার্যক্রম আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। এর স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইউএন ওমেন 'পল্গ্যানেট ৫০ :৫০ চ্যাম্পিয়ন' ও গেল্গাবাল পার্টনারশিপ ফোরাম 'এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড' প্রদান করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ এবং সমগ্র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নারী শিক্ষা এবং নারী উদ্যোক্তাদের কর্মকাণ্ড প্রসারে নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়েছে গেল্গাবাল সামিট অব ওমেন কর্তৃক মর্যাদাপূর্ণ 'গেল্গাবাল ওমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড-২০১৮'। বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে রোল মডেল হলেও ধর্ষণের এই ঘটনা তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সবার মাঝে এক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এর নিরসনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নারীর চলাচল নিরাপদ করার লক্ষ্যে গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অতএব আর বিলম্ব নয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে নারীর অধিকারকে সুসংহত করার জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
  চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

বিষয় : মুজিববর্ষ