সাক্ষাৎকার : ক্রিস্টোফার উইলসন

উপযুক্ত পরিবেশ পেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়বে

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

--

ক্রিস্টোফার উইলসন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর)। তিনি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বিকাশ ও বাস্তবায়ন দেখাশোনা করেন। গত সপ্তাহে তিনি ঢাকা এসেছিলেন বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সহযোগিতা ফোরাম টিকফার বৈঠকে অংশ নিতে। এ সময় তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি  রাশেদ মেহেদী


সমকাল :এবারের টিকফা বৈঠকে মূল আলোচনার প্রসঙ্গ কী ছিল?

ক্রিস্টোফার উইলসন :টিকফা হচ্ছে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার নানা দিক নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা করা, সীমাবদ্ধতার জায়গাগুলো দূর করা এবং সম্ভাবনার জায়গাগুলো এগিয়ে নেওয়া। সেদিক থেকে এবারের বৈঠক খুবই ভালো হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেশের কারখানায় কর্ম পরিবেশের উন্নতি, বিনিয়োগের জন্য সরকারের নীতিমালায় উদারীকরণসহ বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে। সে সময়ে কিছু চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। সে প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে জিএসপি সুবিধার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে সবচেয়ে কার্যকর আলোচনা হয়েছে দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার কাঠোমোগত সম্প্রসারণ এবং সুযোগ বৃদ্ধি নিয়ে। সার্বিকভাবে এবারের বৈঠকে খুবই সন্তোষজনক এবং অর্থবহ আলোচনা হয়েছে।

সমকাল :গত সাত বছরে টিকফা থেকে উল্লেখযোগ্য অর্জন কী?

ক্রিস্টোফার :টিকফার মধ্য দিয়ে ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজারের আকার প্রায় ছয় দশমিক আট বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সার্বিকভাবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় নয় বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এই অগ্রগতি টিকফার কারণেই সম্ভব হয়েছে। টিকফার আগে অন্যান্য ফোরামে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলোচনা হতো। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে এবং বিস্তারিতভাবে শুধু বাণিজ্য সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনার সুযোগ ছিল না। টিকফা সে সুযোগ করে দিয়েছে। টিকফা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কে গত সাত বছরে খুবই ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

সমকাল :কিন্তু টিকফার মধ্য দিয়ে জিএসপি সুবিধা তো পাওয়া গেল না?

ক্রিস্টোফার :জিএসপি সুবিধার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্নিষ্ট আইন দ্বারা নির্ধারিত ও পরিচালিত হয়। জিএসপি সুবিধা পাওয়ার জন্য কিছু শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেমন কারখানায় উপযোগী কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টি মুখ্য বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে কারখানায় বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টিও এখন জিএসপির শর্তের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে কারখানায় কর্ম পরিবেশের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। তবে অন্যান্য শর্তের ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতির প্রয়োজন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী শর্ত পূরণ হয়েছে বিবেচিত না হওয়া পর্যন্ত জিএসপি সুবিধা কার্যকর হয় না। তবে এ ক্ষেত্রে এটা বিবেচনা করা উচিত যে, জিএসপি সুবিধা না থাকায় খুব বেশি প্রভাব বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পড়ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজার আগের চেয়ে সম্প্রসারিত হয়েছে।

সমকাল :বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে টিকফা কতটা ভূমিকা রাখছে?

ক্রিস্টোফার :বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টি টিকফার আলোচনায় প্রতিবছরই আসছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। যেমন বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি এখনও আছে, এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন দরকার। একই কথা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাঠামোগত দিক থেকেও সমস্যা হয়। সেগুলোও দূর করার কথাও বলা হয়েছে। এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশে আগের চেয়ে বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং সুযোগ দুটোই বেড়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকেও বাংলাদেশে বিনিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়। কিন্তু বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত হলে অবশ্যই বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়বে।

সমকাল :বাংলাদেশ ২০২৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হচ্ছে। তখন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে পাশে থাকবে?

ক্রিস্টোফার :স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়ন ঘটলে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধাগুলো সংকুচিত হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেবে। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সহযোগিতার দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে। অতএব বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কোনো চ্যালেঞ্জ সামনে এলে যুক্তরাষ্ট্র সেটা অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে, দেখবে।

সমকাল :টিকফার বিরুদ্ধে একটা বড় সমালোচনা মেধাস্বত্ব অধিকার।

ক্রিস্টোফার :মেধাস্বত্বের সঙ্গে টিকফার কোনো যোগসূত্র নেই, এটা নিশ্চিত করতে পারি। টিকফা বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর ফোরাম, এখানে মেধাস্বত্ব প্রসঙ্গ নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। আর মেধাস্বত্বের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন কর্তৃপক্ষ আছে এবং আন্তর্জাতিক ফোরামও আছে।

সমকাল :একটা সময়ে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির ভালো অবস্থান ছিল। এখন সেটা অনেকাংশে সংকুচিত। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

ক্রিস্টোফার :বাজার তার নিজস্ব নিয়মে চলে। একটা বাজারে কোনো সময় একটা কোম্পানির পণ্যের নিয়ন্ত্রণ থাকে, আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অন্য কোম্পানি এগিয়ে যায়। কোন দেশের কোম্পানি তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে প্রতিযোগিতায় একটা কোম্পানির টিকে থাকা, এগিয়ে যাওয়া কিংবা পিছিয়ে পড়া। আগেও যেমন, বর্তমানেও তেমনি বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সব দেশের কোম্পানিকেই লড়াই করতে হচ্ছে। আমি যেটা বলতে চাই, ফাইভজি প্রযুক্তির বিকাশ এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তার সুদৃঢ় অবস্থান ধরে রাখার জন্য সচেতন। এর আগেও যখন একেকটা শিল্পবিপ্লব হয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দিয়েছে।

সমকাল :যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে...

ক্রিস্টোফার : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ নিয়ে যেটা বলা হয়, তার বাস্তবতা সমালোচনার চেয়ে ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব কৌশল নিয়ে বিশ্ববাণিজ্যে অবস্থান ধরে রেখেছে, অবস্থান জোরদার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে চীন তার মতো করে পদক্ষেপ নিয়ে, কৌশল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে এখানে যুদ্ধের কিছু নেই। প্রতিযোগিতা আর যুদ্ধ এক বিষয় নয়।

সমকাল : আপনাকে ধন্যবাদ।

ক্রিস্টোফার :আপনাকেও ধন্যবাদ