মুজিববর্ষ

তারুণ্যভরা প্রাণ বঙ্গবন্ধু

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

হাসান মোরশেদ

কৈশোরে যখন শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানরা তখন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। ইংরেজ শাসন ও ইংরেজি শিক্ষার প্রতি বিরূপ মনোভাবের কারণে আধুনিক শিক্ষা থেকেই কেবল তারা পিছিয়ে পড়েনি, চাকরি-বাকরি-রাজনীতি-ব্যবসা সবকিছুতেই তারা পশ্চাৎপদ হয়ে পড়েছিল। তরুণ শেখ মুজিব মুসলিম লীগের কর্মী হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন সাম্প্রদায়িক ভাবনা থেকে নয় বরং তার স্বপ্নে একটা আলাদা রাষ্ট্র ছিল, যেখানে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী তাদের অধিকার আদায়ের সুযোগ পাবে, শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হবে। শুধু মুসলমানদের নয়, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের দৈন্যদশা ও তাকে ভাবাত, জাতপাতের পার্থক্য তাকে আহত করত। তিনি ভাবতেন, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ থাকবে না।
১৮ বছর বয়সে বাংলার প্রধান দুই নেতা শেরেবাংলা ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটে শেখ মুজিবুর রহমানের। শেরেবাংলা তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। ১৯৪১ সালে ২১ বছর বয়সে কলকাতা গিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তিনি সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা শুরু করেন, ১৯৪৩ সালে ২৩ বছর বয়সে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিল সদস্য হন।
এ সময় মুসলিম লীগের মধ্যে দুটি গ্রুপ তৈরি হয়ে যায়। মওলানা আকরম খাঁ ও খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়াশীল গ্রুপ, সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বে প্রগতিশীল গ্রুপ। তরুণ মুজিব প্রগতিশীল গ্রুপের দায়িত্বশীল কর্মী হয়ে ওঠেন। মুসলিম লীগ তখনও জমিদার, জোতদার, খান বাহাদুর ও নবাবদের নেতৃত্বে একটি সাম্প্রদায়িক দল। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের মতো আধুনিক মানুষের নেতৃত্বে শেখ মুজিবের মতো অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার তরুণদের লক্ষ্য হয়ে ওঠে মুসলিম লীগকে জনগণের লীগ ও জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি দেখলেন, মুসলিম লীগ অভিজাত মুসলমানদের সংগঠন হয়ে উঠেছে, ইংরেজ আমলের সাদা চামড়ার বদলে কেবল কালো চামড়ার অভিজাতরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। আগে যেখানে অভিজাত হিন্দুরা ছিল সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণি, সেখানে নতুন মুসলমান সুবিধাভোগী শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ক্রীড়নক হয়ে তারা শোষণ ও বৈষম্যের পুরোনো পদ্ধতিই চালু রেখেছে- এদের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে হিন্দুরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেই, সাধারণ মুসলমানরাও যে বঞ্চনার মধ্যে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে।
দেশ বিভাগের পর কিছুদিন শেখ মুজিব ভারতেই ছিলেন। এই ক্রান্তিকালে মুসলিম লীগ নেতৃত্বের ক্ষমতালোভী প্রতিক্রিয়াশীল আচরণে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানের স্বাধীনতা পূর্ব বাংলার বাঙালির ওপর নতুন ধরনের শাসন ও শোষণব্যবস্থা চাপিয়ে দেবে, যদি না মুসলিম লীগের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল দলের হাতে দেওয়া না হয়। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ব্রিটিশ সরকার ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পরপরই তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের সিরাজুদ্দৌলা হলে ছাত্র ও যুবনেতাদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন এবং পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগবিরোধী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র, যুবক ও রাজনৈতিক কর্মীদের সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সভাতেই তিনি বিশ্লেষণ করেছিলেন যে, মুসলিম লীগ ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করলেও জনগণ আসলে চায় অর্থনৈতিক মুক্তি। সেই মুক্তি অবশ্যই আনতে হবে। ২৭ বছর বয়সের একজন তরুণের এই বিশ্লেষণ তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অম্লান সাক্ষ্য।
১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি কলকাতা ছেড়ে ঢাকা আসেন। ঢাকায় এসেই তিনি তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের নিয়ে 'গণতান্ত্রিক যুবলীগ' গঠনের প্রস্তাব করেন। সক্রিয় রাজনীতির বদলে এটি হবে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। এর একমাত্র কর্মসূচি হবে সাম্প্রদায়িক মিলনের চেষ্টা, যাতে কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়, হিন্দুরা দেশত্যাগ না করে। বিচক্ষণ শেখ মুজিবের তখনই মনে হয়েছিল, পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম লগ্নেই জরুরি কাজটি হচ্ছে, একটা অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ তৈরি করা।
দেশ বিভাগের আগে মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন 'নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ'-এর নাম বদলিয়ে এ সময় 'নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ' করা হয় এবং শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে এদের ভূমিকা দাঁড়ায় ক্ষমতাসীন প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগের দালালি করা। প্রগতিবাদী ও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী অসাম্প্রদায়িক ছাত্রদের নিয়ে শেখ মুজিব আলাদা ছাত্র সংগঠন 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ' গঠন করেন ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি। এর প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক ছিলেন নইমুদ্দীন আহমদ। তখনও ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রেশ থেকে যাওয়ায় কেবল রাজনৈতিক কারণে ছাত্রলীগের নামের সঙ্গে 'মুসলিম' শব্দটি লাগানো হয়েছিল। পরবর্তীকালে সঠিক সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান 'মুসলিম' শব্দটি তুলে দিয়ে 'পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ' নামকরণ করেন এবং সব ধর্মের অনুসারীদের অংশগ্রহণের উপযোগী প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন হিসেবে এটি ভূমিকা রাখে। ভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ছাত্রলীগ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। পরবর্তীকালে জাতীয় স্বাধিকার ও মুক্তিসংগ্রামে ছাত্রলীগ অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে।
পাশাপাশি মুসলিম লীগের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ঘরানার নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ রাখার জন্য তিনি 'মুসলিম লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্প' চালু করেন। এই ক্যাম্পের পক্ষ থেকে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা হতে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই খাজা নাজিমুদ্দিনদের ইন্ধনে মুসলিম লীগের চিফ অর্গানাইজার মওলানা আকরম খাঁ শেখ মুজিবসহ তার অনুগামীদের মুসলিম লীগ থেকে অব্যাহতি ঘোষণা করেন।
সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগ থেকে অব্যাহতি পাওয়া এই নেতাকর্মীরা ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক দল 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' গঠন করেন। বর্ষীয়ান জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয় এবং তরুণ শেখ মুজিব যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। যে রাজনৈতিক দলটি পরবর্তীকালে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র জন্ম দেওয়ার রাজনৈতিক আন্দোলন ও সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব দেবে, তার অন্যতম নেতা হিসেবে নির্বাচিত শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স তখন মাত্র ২৯ বছর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে তখন তিনি কারাগারে। এর আগে ১৯৪৮ সালের ১১ থেকে ১৫ মার্চ তিনি কারাবন্দি ছিলেন বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার সংগ্রামে।
১৯৪৯-এর ডিসেম্বর মাসে তিনি আবারও গ্রেপ্তার হন। কারাবন্দি থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে টানা ১২ দিন অনশন করেন এবং কারাগারের ভেতরে থেকে বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সংগঠিত করেন। দুই বছর দুই মাস পর কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের সাংগঠনিক হাল ধরেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক কারাবন্দি অবস্থায় মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে দলের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমানকে এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। তখন তার বয়স মাত্র ৩২ বছর। তাঁর অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতায় আওয়ামী লীগ আরও বেশি করে গণমুখী সংগঠন এবং পূর্ব বাংলার গণমানুষের অধিকার আদায়ের অবিকল্প মাধ্যম হয়ে ওঠে। এর ফলে অনেক বছর ধরে টালবাহানা করতে করতে মুসলিম লীগ সরকার শেষ পর্যন্ত সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর মতো বর্ষীয়ান নেতারা যুক্তফ্রন্টের আইকন থাকলেও মাঠের রাজনীতি সংগঠিত করেছেন শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের তরুণ নেতৃত্ব। পুরো জনপদজুড়ে তাদের উদ্দাম ছুটে চলা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানুষকে মুসলিম লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করার কঠিন কাজ নিশ্চিত করেছে শেখ মুজিবের তরুণ নেতৃত্ব। ফলাফলও ছিল চমকপ্রদ। পাকিস্তান হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুসলিম লীগ প্রায় উচ্ছেদ। মুসলিম লীগের ধনাঢ্য নেতা ওয়াহিদুজ্জামানকে ১৩ হাজার ভোটে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হন শেখ মুজিবুর রহমান। যুক্তফ্রন্ট সরকারের সবচেয়ে তরুণ মন্ত্রীও হন তিনি।
১৯৫৭ সালে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানী অধিকাংশ নেতাকর্মীসহ পদত্যাগ করে নতুন দল ন্যাপ গঠন করলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সোহরাওয়ার্দী তখন ব্যস্ত গোটা পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ে, পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগের হাল ধরার সময় তাঁর ছিল না। দলের স্বার্থে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করে মাঠে নামেন শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর বয়স তখন ৩৭ বছর। শেখ মুজিব দেশজুড়ে সাংগঠনিক সফর শুরু করলেন, অপেক্ষাকৃত তরুণদের নিয়ে গঠন করতে পাগলেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় কমিটিগুলো। আওয়ামী লীগ নতুন প্রাণ ফিরে পেল- দিন দিন জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল অদম্য গতিতে। মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খানের মতো বর্ষীয়ান নেতাদের জনপ্রিয়তা ছাপিয়ে ভাস্বর হয়ে উঠতে লাগলেন শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আইয়ুব খানের সামরিক আইনের খড়্‌গ পেরিয়ে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনের ঝুঁকি নেন শেখ মুজিব। আতাউর রহমান খানের মতো বয়স্ক নেতারা আওয়ামী লীগের বদলে এনডিএফ জোটে রাজনীতি সীমাবদ্ধ রাখতে আগ্রহী ছিলেন; কিন্তু শেখ মুজিব এদেরকে পাত্তা না দিয়ে তাঁর তরুণ সহকর্মীদের নিয়ে আবারও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। ১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রীয় মদদে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও তিনি শক্ত হাতে দমন করেন তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক প্রাণশক্তির জোরে।
সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু, নিজের হাতে আওয়ামী লীগকে আবার সংগঠিত করা এবং ১৯৬৫-এর পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের অরক্ষিত অবস্থা শেখ মুজিবুর রহমানকে নতুন কর্মকৌশল নির্ধারণের সুযোগ করে দেয়। পুরোনো স্থবির রাজনীতি আর নয়, এই জনপদের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য স্পষ্ট, পরিকল্পিত ও নতুন ধরনের দাবি উত্থাপন করতে হবে।
১৯৬৬ সালে যখন তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন, সামরিক শাসক আইয়ুব খান ও তার ধামাধরা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিবিদরাই শুধু নয়- ন্যাপ নেতা মওলানা ভাসানী এবং আওয়ামী লীগের বয়স্ক নেতারাও ৬ দফার বিরোধিতা করেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর তরুণ সহকর্মীদের নিয়ে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে ৬ দফা প্রস্তাব পাস করিয়ে নিয়ে আবারও ছুটে যান বাংলার গ্রামগঞ্জ, পথে-প্রান্তরে সাধারণ মানুষের কাছে। সারা বাংলার মানুষ একতাবদ্ধ হতে থাকে ৬ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে।
এ সময় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তিনি সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। এর আগে ১৫ বছর ধরে তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ, সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ তিনজন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান। আওয়ামী লীগ থেকে পুরোনো ধ্যান-ধারণার প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্ব বিদায় নেয়।
তরুণ নেতা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান এভাবেই হয়ে ওঠেন তরুণদের নেতা। ১৯৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, সেই মামলার বিরুদ্ধে বিপুল গণঅভ্যুত্থান, স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনা হয়ে মুক্তিযুদ্ধের শুরু, সবই মূলত তরুণদের বিপুল প্রাণের উদ্যোগ। এমন অভূতপূর্ব তরুণ জাগরণ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব সাধারণ নয়। পুরোনো ঘুণেধরা প্রতিক্রিয়াশীল আপসকামী রাজনীতিকে পেছনে ফেলে এই যে নবজাগরণ, তার সারথি শেখ মুজিবুর রহমান, তরুণরা তাঁর বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা। এই তরুণরাই ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে কারাগার থেকে মুক্ত করে শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেছে। স্বাধিকার আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১-এর ৩ মার্চ এই তরুণরাই তাঁকে 'জাতির পিতা' হিসেবে বরণ করেছে। আওয়ামী লীগের ভেতরের অবশিষ্ট প্রাচীনপন্থিদের তোয়াক্কা না করে তরুণদের সঙ্গে নিয়েই ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক উচ্চারণ করেছেন- 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান আর্মি জেনোসাইড শুরু করার পর তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বন্দিত্ব বরণ করেছেন এই তরুণদের ওপর তাঁর আস্থা ও ভরসার শক্তিতে।
বাংলার তরুণরা তাদের প্রিয় বঙ্গবন্ধুর আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন সর্্েবাচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে। তাঁর অনুপস্থিতিতে এ দেশের তরুণরা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে- সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের একক প্রেরণাবিন্দু তিনিই ছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ যখন বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এলেন, তখন তিনি ৫০ পেরিয়ে মাত্র
দুই বছর বেশি। এবার শুরু তাঁর নতুন সংগ্রাম- অর্জিত স্বদেশকে মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের মতো করে নির্মাণ।
স্বদেশ নির্মাণের নতুন সংগ্রামেও তিনি সঙ্গী হিসেবে তরুণদেরই সাথি করেছেন, তাদের ওপরই ভরসা ও আস্থা রেখেছেন। বিশ্বাস করেছেন, নতুন রাষ্ট্রের তরুণ নাগরিকরা হবে আদর্শবান ও মানবিক মুল্যবোধসম্পন্ন, কর্মঠ ও অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল। ১৯৭২-এর ৯ মে রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দানের বক্তৃতায় ছাত্রদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন : 'ছাত্র ভাইদেরকে বলি, একটু পড়ালেখা করো। বাবার হোটেলে আর কতোকাল খাবে? পয়সাকড়ি নেই। তোমাদের কষ্ট হচ্ছে জানি। কিন্তু লেখাপড়া একটু করো। আন্দোলন করো আমার আপত্তি নাই। আমার জন্ম আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তোমাদের একটু মানুষ হতে হবে। মানুষ না হলে দেশ গড়তে আমি পারব না। ভবিষ্যতে তোমাদের এ দেশের শাসনভার হাতে নিতে হবে। চুঙ্গা ফুকাও আমার আপত্তি নাই। কিন্তু মেহেরবানি করে একটু কাজ করো।'
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বয়স তখন তিন পেরিয়েছে মাত্র আর তিনি পেরিয়েছেন ৫০। মধ্য ৫০ ছিল তাঁর বিকাশের শ্রেষ্ঠ সময়। এর আগে একটা নতুন রাষ্ট্রের
জন্ম দিয়েছেন তিনি, নতুন জাতিসত্তার পিতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন- এই সময়টা ছিল তাঁর পূর্ণ প্রাজ্ঞতা দিয়ে নতুন রাষ্ট্র ও জাতিসত্তা গড়ে তোলার সময়।
এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তাই কেবল ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছে নতুন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক বিকাশের সম্ভাবনা। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার শৈশব, যৌবন পেরিয়ে পূর্ণ ৫০-এর দিকে ধাবমান। কিন্তু তারুণ্যের যে বিপুল সৃষ্টিশীলতা, উদ্দাম লাবণ্য- বাংলাদেশ সেটা অর্জন করতে পারেনি সেই মানুষটির অনুপস্থিতিতে, যিনি প্রতীক ছিলেন পূর্ণ প্রাণের সম্ভাবনার।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক

বিষয় : মুজিববর্ষ