আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস

নদী সুরক্ষায় বঙ্গবন্ধুর সারাজীবন

মুজিববর্ষ

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ রোকন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আপাদমস্তক রাজনীতিক, সন্দেহ নেই। সে কারণেই তিনি হাজার বছরের ইতিহাসে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যে উপমহাদেশের সবচেয়ে অগ্রসর জাতি বাঙালিকে প্রথমবারের মতো স্বতন্ত্র রাষ্ট্র উপহার দিতে পেরেছিলেন। রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণেই গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত পল্লিতে জন্মগ্রহণ করেও তিনি কালে কালে হয়ে উঠেছিলেন আপামর বাঙালির 'বঙ্গবন্ধু' এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা। কিন্তু ইতিহাস, রাষ্ট্র, রাজনীতির বাইরেও গঙ্গা-যমুনা-মেঘনা বিধৌত এই ভূখণ্ডের প্রকৃতি ও প্রতিবেশ সম্পর্কেও তার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা বিস্ময়কর। এই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি, আরও ভেঙে বললে নদী-নালার সঙ্গে তার যে আত্মার সম্পর্ক, সমকালীন অন্যান্য রাজনীতিকের মধ্যে তা দেখা যায় না। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে কেবল আজকের বাংলাদেশ নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে যেসব প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেখা যায়, তাদের প্রায় সবাই ছিলেন নাগরিক আবহে বেড়ে ওঠা। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু ব্যতিক্রম। তিনি পূর্ব বাংলার জলহাওয়ায় কেবল বেড়েই ওঠেননি, একটি রাষ্ট্রের স্থপতি হয়েও নিভৃত পল্লি ও প্রান্তরের শিকড়কে ভুলে যাননি।

আমরা দেখি, বঙ্গবন্ধু প্রায়ই নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন 'পানির দেশের মানুষ' হিসেবে। চল্লিশের দশকে রাজস্থানের মরু অঞ্চলে লেক দেখে তার নিজের দেশের কথা মনে হয়েছে। তিনি অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখছেন- 'পানির দেশের মানুষ আমরা। পানিকে বড় ভালবাসি। আর মরুভূমির ভিতর এই পানির জায়গাটুকু ছাড়তে কত যে কষ্ট হয় তা কি করে বোঝাব!'

পঞ্চাশের দশকে চীন সফরে গিয়েও বঙ্গবন্ধু একই পরিচয় দিচ্ছেন। হ্যাংচো লেকে তার নৌকা চালনায় দক্ষতা থেকে স্থানীয় এক মাঝি অবাক হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু লিখছেন- 'এক মাঝি জিজ্ঞাসা করলো, আপনাদের বাড়ি কোন দেশে? দোভাষী সাথে ছিল, বললাম, পূর্ব পাকিস্তান। মুখের দিকে চেয়ে রইলো। মনে হলো কোনোদিন নামও বোধহয় শোনে নাই, তাকে বুঝাইয়া বললাম, তারপর সে বুঝলো। তাকে বললাম, আমরা পানির দেশ, বৎসরে ৬ মাস আমরা পানির মধ্যে বাস করি।' কীভাবে নৌকা চালিয়ে স্থানীয়দের অবাক করেছিলেন, লিখেছেন সেই কথাও- 'আমার নৌকায় সামনের যে দাঁড় ছিল, প্রথমে আমি দাঁড়টা টানতে শুরু করলাম। কার নৌকা আগে যায় দেখা যাবে! কেউই পারে না, কারণ আমি পাকা মাঝি, বড় বড় নৌকার হাল আমি ধরতে পারি। দাঁড় টানতে, লগি মারতে সবই পারি।' (আমার দেখা নয়াচীন)।

বঙ্গবন্ধুর শৈশবে নদীর ভূমিকার কথা লিখেছেন তার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা- 'আমার আব্বার শৈশব কেটেছিল টুঙ্গিপাড়ার নদীর পানিতে ঝাঁপ দিয়ে, মেঠোপথের ধুলোবালি মেখে। বর্ষার কাদাপানিতে ভিজে।' (শেখ মুজিব আমার পিতা)।

গত বছর মার্চে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল এজেন্ডাতেও শেখ হাসিনা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বেড়ে ওঠার যে দিনগুলোর কথা ইংরেজিতে লিখেছেন, সেখানে নদনদী বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে- 'নদী ও মৌসুমী বন্যা ছিল আমাদের জীবনের অংশ। আমার পিতা প্রায়শই আমাদের বলতেন বাংলাদেশে মানুষের জীবন ও জীবিকা কতটা নিবিড়ভাবে ভূমি, নদী, জলাভূমি ও সাগরের সঙ্গে মিশে রয়েছে।'

আমরা দেখব স্বাধীন দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু কীভাবে সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্তু নদনদীর সঙ্গে যে আত্মিক যোগাযোগ সেটা কেবল ব্যক্তিগত ভাবনায় নয়; তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই ফুটে উঠছে। সংগঠন গোছাতে গিয়ে তিনি যেহেতু ঘন ঘন ভ্রমণ করতেন, তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে ৪০-৫০ দশকের নৌপথেরও জীবন্ত বর্ণনা পাওয়া যায়। এক স্থানে লিখেছেন- 'পরের দিন নৌকায় আমরা রওয়ানা করলাম, আশুগঞ্জ স্টেশনে ট্রেন ধরতে। পথে পথে গান চলল। নদীতে বসে আব্বাসউদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তাঁর নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটি দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলিও যেন তাঁর গান শুনছে।'

নদীর এমন মনোমুগ্ধকর বর্ণনা পরবর্তীকালেও দেখা যায়। যেমন চীন সফরে হংকং থেকে ক্যান্টন বা গুয়াংজু যেতে যেতে বঙ্গবন্ধুর উপলব্ধি- 'মনে হলো এ তো আমার পূর্ব বাংলার মতো সকল কিছু। সবুজ ধানের ক্ষেত, চারদিকে বড় বড় গাছ। মাঝে মাঝে মাটির ঘরের গ্রাম, ছোট ছোট নদী, ট্রেনটা পার হয়ে যাচ্ছে।' (আমার দেখা নয়াচীন)।

১৯৫২ সালের সেই দফার সফরে ক্যান্টন থেকে পিকিং, সেখান থেকে নানকিং গেছেন বঙ্গবন্ধু। লিখছেন- 'নানকিং শহর নদীর পাড়ে।... পীর সাহেব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইরা নদীর পাড়, বিরাট নদী, নদীর পাড়ে কারখানা, নদীর ঢেউ দেখতে ভালোবাসে। কারণ পাঞ্জাব ও সীমান্তের ভাইদের কপালে এ সমস্ত কম জোটে। আমরা পূর্ব বাংলার লোক নদীর পাড়ে যাদের ঘর, নদীর সাথে যাদের বন্ধুত্ব, ঢেউয়ের সাথে যাদের কোলাকুলি, তারা কি দেখতে ভালোবাসে এগুলি?' (আমার দেখা নয়াচীন)।

নদীর প্রতি নিছক ব্যক্তিগত মুগ্ধতা নয়; নদী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও তিনি ভেবেছেন পঞ্চাশের দশক থেকে। আগেই বলেছি, কেবল রাজনৈতিক দিক থেকে নয়, নদী-ভাবনার ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধু স্পষ্টই নিজের সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। মনে রাখতে হবে, তখন আন্তর্জাতিক পর্যায়েই সবেমাত্র আইএইচই ডেলফটের মতো নদী ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। ভাবা যায়, সেই ১৯৫৬ সালে বঙ্গবন্ধু নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কথা বলছেন। তাও আবার একটি রাজনৈতিক দলের সম্মেলনে। আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য- 'বন্যা পূর্ব্ব পাকিস্তানিদের জীবনে নূতন নয়। কিন্তু বিজ্ঞান সমৃদ্ধ ও সম্পদ বলিষ্ঠ মানুষ অসহায়ের মত আজও প্রকৃতির রুদ্র পীড়ন সহ্য করিবে কিনা ইহাই হইল সবচেয়ে বড় সওয়াল। হোয়াংহো নদীর পল্গাবন, ট্যানিসিভ্যালির তাণ্ডব ও দানিয়ুবের দুর্দমতাকে বশে আনিয়া যদি মানুষ জীবনের সুখ সমৃদ্ধির পথ রচনা করিতে পারে তবে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মত শান্ত নদীকে আয়ত্ত করিয়া আমরা কেন বন্যার অভিশাপ হইতে মুক্ত হইব না? (দৈনিক আজাদ, ২০ মে ১৯৫৬)।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের একটি বড় অংশ বঙ্গবন্ধুকে কাটাতে হয়েছে কারাগার থেকে কারাগারে। সেখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশিত 'কারাগারের রোজনামচা' বইটিতে আমরা দেখি, এত কষ্ট, নির্যাতন ও দুশ্চিন্তার মধ্যেও তিনি বাংলাদেশের নদী ও প্রকৃতির কথা ভাবছেন। বন্যায় মানুষের দুর্দশা মোচনের উপায় খুঁজছেন। তিনি তখনই বুঝতে পেরেছিলেন, নদী ব্যবস্থাপনা কেন জরুরি। একুশ শতকে দাঁড়িয়ে আমরা নদী ব্যবস্থাপনার যথার্থ পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক করতে পারি। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে বা সত্তরের দশকে সেটা সহজ ছিল না। কারণ তখনও নদী ব্যবস্থাপনার পশ্চিমা পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাগুলো প্রকট হয়ে ওঠেনি। তাই আমরা দেখি, আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে সত্তরের নির্বাচনের প্রাক্কালে রেডিও ও টেলিভিশনে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছেন- 'পানি সম্পদ সম্পর্কে গবেষণা এবং নৌ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য অবিলম্বে একটি নৌ-গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা প্রয়োজন।... বন্যা নিয়ন্ত্রণকে অবশ্যই প্রথম কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জরুরি অবস্থার ভিত্তিতে একটা সুসংহত ও সুষ্ঠু বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা আশু প্রয়োজন।... যমুনা নদীর উপর সেতু নির্মাণ করে উত্তরবঙ্গের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়টিকে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিই।... আভ্যন্তরীণ নৌ ও সামুদ্রিক বন্দরের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।' (২৮ অক্টোবর, ১৯৭০)।

অক্টোবরের ওই ভাষণের পরপরই নভেম্বরের ১২ তারিখ দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উপকূলে আঘাত হানে। এতে কমবেশি ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। ২৬ নভেম্বর ঢাকার তৎকালীন হোটেল শাহবাগে বঙ্গবন্ধু এ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে বলেন- 'আজাদীর ২৫ বছর পরেও বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যে এমনকি পরিকল্পনা পর্যন্ত তৈরি হয়নি।... ঘূর্ণিবার্তা প্রতিরোধ আশ্রয়স্থল নির্মাণের জন্যে গত ১০ বছরে মাত্র ২০ কোটি টাকার সংস্থান হয়নি। অথচ ইসলামাবাদের বিলাস বৈভবের জন্য ২২০ কোটি টাকার অভাব হয়নি। বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা প্রণয়নের পূর্বেই পশ্চিম পাকিস্তানের মংলা ও তারবেলা বাঁধ নির্মাণের জন্য ১০০ কোটি ডলার বরাদ্দের ব্যাপারে কোনো অসুবিধা দেখা দেয়নি।... দেশবাসীকে আরেকটি ঘূর্ণিবার্তা ও গরকীর (জলোচ্ছ্বাস) অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে এক ব্যাপক পুনঃনির্মাণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এজন্যে ব্যাপকভাবে উপকূলীয় বাঁধ ও ঘূর্ণিপ্রতিরোধী পর্যাপ্ত আশ্রয়স্থল নির্মাণ, সুষ্ঠু বিপদ সংকেত ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করতে হবে।'

মুক্তিযুদ্ধে নদীর অবদান সম্পর্কে এখন আমরা গবেষণা করছি এবং নদনদীর ভূ-রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত গুরুত্ব বুঝতে পারছি। কিন্তু একজন দূরদর্শী রাজনীতিক হিসেবে বঙ্গবন্ধু সেই একাত্তরেই নদীর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। লক্ষণীয়, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে তিনি নদীকে প্রতিরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়ে বলছেন- 'আমরা ওদের পানিতে মারবো'। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার দূরদর্শিতা হাতে-কলমে প্রমাণ হয়েছিল। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী বৃহৎ-নদী-বিচ্ছিন্ন বা বিল ও হাওর এলাকাগুলোতে যেতে পারেনি। সেখানে গড়ে ওঠা মুক্তাঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং অধিকৃত এলাকায় গেরিলা হামলা চালিয়েছেন। বর্ষাকালে যখন দেশের নদীগুলো টইটম্বুর হয়ে উঠেছিল; মুক্তিযোদ্ধারা যখন নদীপথ ধরে একের পর এক 'গাবুরা মাইর' দিতে শুরু করেন; তখন পাকিস্তানি বাহিনীর ক্রমাগত ঢাকার দিকে পিছু হটা ছাড়া উপায় ছিল না। আমরা এও দেখি, স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে বঙ্গবন্ধু নদীর মাধ্যমেই তার ভালোলাগা প্রকাশ করছেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে, ১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি, রেসকোর্স ময়দানের অসম্পাদিত ভাষণটিতে দেখা যায়, তিনি কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্ধৃত করে বলছেন- 'নম নম নম সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি/ গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি।'

সদ্য স্বাধীন দেশে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেও বঙ্গবন্ধু নদনদীর ভূ-রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষাগত গুরুত্বের কথা ভুলে যাননি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে নদী ও বন্দরের প্রয়োজনীয়তা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে ২ এপ্রিল ১৯৭২ ঠাকুরগাঁওয়ে এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেন- 'আমার যেগুলো পোর্ট আছে চট্টগ্রাম, চালনা পোর্ট। জাহাজ আসতে পারে না ভালোভাবে। জাহাজগুলো ডুবাইয়া দিয়ে গেছে নদীর মুখে, যাতে জাহাজ আসতে না পারে।'

নৌপথ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সংকট আমরা কয়েক বছর ধরে জোরেশোরে বলছি। অথচ বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন দেশে, সেই ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ চাঁদপুরে এক জনসভায় বলেছেন- '২৫ বৎসর বন্যা নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় করে নাই। নদী খাল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। না হলেও ১৫০০ মাইল নদীপথ নষ্ট হয়েছে।... জানি মেঘনায় ভাঙে, মাঝে মাঝে কিছু দিই, যোগাড় করে কিছু কিছু দেয়া হয়।'

নদী ভাঙন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর দুশ্চিন্তা দেখি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্যেও- 'নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে কষ্ট হয়। নদী ভাঙছে কত, তোমার জানা আছে যে, বাংলাদেশের মানুষ গান গায়- একূল ভাঙ্গে ওকূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা। আমরা চেষ্টা করতে পারি।'

এখনকার পাম্পভিত্তিক সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কুফল হিসেবে আর্সেনিক এসেছে। নেমে যাচ্ছে সুপেয় পানির স্তর। যদি আমরা ভূপৃষ্ঠের জলাশয় ব্যবহার করে সেচ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারতাম, তাহলে হয়তো এই সংকট দেখা দিত না। ১৯৭৫ সালের ২১ জুলাই নবনিযুক্ত জেলা গভর্নরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বলছেন- 'পাম্প পেলাম না, এটা পেলাম না- এসব বলে বসে না থেকে জনগণকে মবিলাইজ করুন। যেখানে খাল কাটলে পানি হবে, সেখানে সেচের পানি দিন। সেই পানি দিয়ে ফসল ফলান।'

কয়েক বছর পরে নবগঠিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অভিমুখ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার সেই সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়। পাকিস্তান আমলে নৌবাহিনীতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য প্রসঙ্গে ১০ ডিসেম্বর ১৯৭৪ চট্টগ্রামে জওয়ানদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন- 'যারা জীবনে কখনো পানি দেখে নাই, যারা পানির মধ্যে গোসল করে নাই, তাদের নৌবাহিনীতে গ্রহণ করা হতো। আর, যারা বাংলাদেশের মানুষ, যারা পানির মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে, যারা পানির মধ্যে খেলে বেড়িয়েছে; নদীমাতৃক এই বাংলার সেই বাঙালিদের নৌবাহিনীতে স্থান হতো না।... বাংলাদেশ নদীমাতৃক। আমাদের নৌবাহিনীর প্রয়োজন আমাদের রক্ষা করবার জন্য।... আমি আস্তে আস্তে নৌবাহিনী গড়বো। নৌকায় করে আমার নৌবাহিনীর ছেলেরা চলবে। তবু আমি বাংলাদেশকে মর্ডগেজ দিয়ে কারও কাছ থেকে কিছু আনবো না।' এই যে নৌবাহিনীর নিজস্ব শক্তি, নিজের দেশের উপযোগী শক্তির প্রয়োজনীয়তা, পরবর্তীকালে আর কোনো সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধুর মতো করে বুঝেছিলেন কি?

আমরা জানি, ১৯৭৩ সালেই বঙ্গবন্ধু নদী খননে উদ্যোগী হয়েছিলেন। রাজবাড়ীর পাংশায় চন্দনা-বারাসিয়া নদী খননের মধ্য দিয়ে এই কাজের উদ্বোধন করেছিলেন। তিনি তখনই, রাষ্ট্রের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও কিনেছিলেন অন্তত সাতটি ড্রেজার। সমুদ্র ও নদীবন্দর সংস্কার, নৌযান মেরামত এবং বিদেশ থেকে বার্জ-টাগবোট কেনার ক্ষেত্রে তিনি মোটেও কালক্ষেপণ করেননি।

দেশের অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থায় আঞ্চলিক অভিন্ন নদী কতটা ভূমিকা রাখে এখন আমরা অভিজ্ঞতা ও সংকট দিয়ে জানছি। অথচ বঙ্গবন্ধু তখনই বুঝেছিলেন, আমাদের অভিন্ন প্রায় সব নদীর উজান যেহেতু ভারতে, সেখান থেকে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে সর্বাগ্রে। দেশভাগের ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী বঙ্গবন্ধু জানতেন, এই সীমান্ত নির্ধারণে ব্রিটিশ ভারতের শেষ বড়লাট লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ও সীমান্ত আঁকার দায়িত্বপ্রাপ্ত সিরিল জন র‌্যাডক্লিফ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত ছিলেন। ভূ-রাজনীতিতে দক্ষ নেহরু তৎকালীন ভারত ও পাকিস্তানের সীমারেখা এমনভাবে চেয়েছিলেন, যাতে করে তৎকালীন পাকিস্তান পানিসম্পদের ক্ষেত্রে ভারতনির্ভর থাকে। আর পাকিস্তান নেতৃত্ব ভূ-রাজনীতি ভুলে গিয়ে তাৎক্ষণিক ও ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য কীভাবে একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই আক্ষেপ আমরা দেখি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে।

অভিন্ন নদী নিয়ে বঙ্গবন্ধুর নদীবিষয়ক দূরদর্শিতা আমরা দেখি যে, একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার বাইরে তিনি নদীর কথা ভাবছেন। তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফিরলেন আর ১৯ মার্চে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে নদীর প্রসঙ্গ তুললেন। কী হবে অভিন্ন নদীগুলোর ভবিষ্যৎ। মাত্র দুই মাসের কিছু সময়ের বেশি, তিন মাসও না। অথচ তখনই যৌথ নদী কমিশন বা জেআরসি গঠনের আলোচনা হচ্ছে এবং ওই বছরের নভেম্বরে চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে!

গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা ব্যারাজ এবং তখন বঙ্গবন্ধু সরকারের ভূমিকা নিয়ে নানা অপপ্রচার আছে। কিন্তু ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশ ও ভারতের দুই প্রধানমন্ত্রী, মুজিব-ইন্দিরা, একটা যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, কোনো চুক্তিতে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত ফারাক্কা চালু হবে না। পুরো ফারাক্কা ব্যারাজ নয়, মাত্র কয়েকটা জলকপাট 'পরীক্ষামূলকভাবে' চালু করার জন্য বাংলাদেশের কাছ থেকে অনুমতি নেয় ভারত। পরে তারা আর এটা বন্ধ করেনি। অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে পঁচাত্তর-পরবর্তী চিত্র ভিন্ন আলোচনার বিষয়।

আমাদের বিবেচনায় বাংলাদেশের নদনদীর প্রধান সংকট ছয়টি- প্রবাহস্বল্পতা, ভাঙন, দখল, দূষণ, বালু উত্তোলন, সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা। মনে রাখতে হবে, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে নদী ভাঙন ছাড়া বাকি পাঁচটি সংকট প্রকট হয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বালু উত্তোলন ছাড়া বাকি পাঁচটি সংকট নিয়েই সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা করেছেন, নিজের সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবসে নদীবান্ধব এই মহান নেতার জন্মশতবার্ষিকীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল
skokon@gmail.com