বাংলাদেশ-ভারত

করোনাভাইরাস ও একতরফা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

১৪ মার্চ থেকে ভারত একতরফাভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে আকাশ, স্থলপথে যোগাযোগ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। কূটনৈতিক ও বিশেষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছাড়া আর কোনো ক্ষেত্রে ভিসা প্রদান করা হবে না। ইতোমধ্যে প্রদত্ত সব ভিসার কার্যকারিতা ১৫ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত বহাল থাকবে। ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য কারণে প্রতিনিয়ত বহু বাংলাদেশি যাতায়াত করেন। চিকিৎসার জন্য অনেককে রুটিনমাফিক যাতায়াত করতে হয়। এ অবস্থায় ভিসার কার্যকারিতা স্থগিতের ঘোষণা আমাদের হতবাক করেছে। আমরা দেখেছি, বেনাপোল ও আখাউড়ায় অনেক ভিসাধারীকে ব্যাপক বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে।

আমরা ভারতের বন্ধুরাষ্ট্র। আমাদের দায়িত্বশীল কারও কারও ভাষায়, ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব এখন তুঙ্গে। যদিও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের সম্পর্কে মাঝেমধ্যে অত্যন্ত অপমানজনক কথা বলেন। এসব অপমান সয়েও কিন্তু আমরা বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ণ রাখছি। ভারত আমাদের বড় প্রতিবেশী। '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের জনগণ আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়েছে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে বাংলাদেশকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেছেন। ভারতের প্রায় ১০ হাজার সৈন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন এ দেশের মুক্তিযুদ্ধে। ভারত সরকারের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য সে দেশের নাগরিকদের যে কোনো বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা এবং যে কোনো সংক্রামক ব্যাধির বিস্তৃতি ঠেকানো- এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বিচার্যে বাংলাদেশের অবস্থা তো ভারতের চেয়ে খারাপ নয়। বাংলাদেশে এখনও কোনো মৃত্যু ঘটেনি করোনাভাইরাসে। এ কথা আমরা আত্মতৃপ্তি নিয়ে বলছি না। অবস্থার অবনতি হবে না- এ কথা তো জোর দিয়ে বলা যায় না। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

করোনার সংক্রমণ রোধে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে, বাংলাদেশ তা গ্রহণ করেছে। আক্রান্ত দেশ থেকে যারা আসছেন, তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হচ্ছে। তা ছাড়া এয়ারপোর্টে যাদেরকে আক্রান্ত সন্দেহ করা হচ্ছে; তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। ভারতেরও অধিকার রয়েছে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ করার। ভারত সরকারের নিশ্চয় এ তথ্য জানা রয়েছে, অনেক বাংলাদেশি ভারতে যান চিকিৎসার জন্য। ভিসার ব্যাপারে যে শিথিলতা দেওয়া হয়েছে, সেখানে মেডিকেল ও শিক্ষার্থীর ভিসা অন্তর্ভুক্তকরণ উচিত ছিল। ভ্রমণ ভিসা শতভাগ বন্ধ থাকুক- এ ব্যাপার কোনো আপত্তি থাকবে না। করোনাভাইরাসের আক্রমণ কূটনীতিক ও রাজনীতিকদের রেহাই দেবে, তা ভাবার কারণ নেই। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী পর্যায়েরও কেউ কেউ আক্রান্ত হয়েছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী সার্ক দেশগুলোকে এক হয়ে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদি গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী। তার সরকার এভাবে ভিসা স্থগিত এবং বন্ধের নির্দেশ দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে যে আঘাত দিয়েছে, এর অবসানে বোধ করি তিনি এ রকম প্রস্তাব দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি সাধুবাদযোগ্য উদ্যোগ। সামগ্রিকভাবে সার্ক দেশের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণে যেন দুটি বিষয়ে বিশেষ জোর দেওয়া হয়। প্রথমত, মেডিকেল ভিসা যেন চালু থাকে। আর ভারতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে ছাত্ররা যেন নির্বিঘ্নে দেশে ফিরতে পারে, সে জন্য যেন সরকারের সহযোগিতা প্রদান অব্যাহত থাকে।

এখানে একটি কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে না আসার অনুরোধ জানিয়েছে। কর্মরতদের কথা ভিন্ন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য এভাবে ভিন্ন দেশে অনেকটা বন্দিদশায় থাকা কষ্টকর। ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রী অধ্যয়নরত। অতএব, তাদের বেলায় বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। প্রয়োজনবোধে বিমানবন্দরে অধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার পর অভিভাবকদের হাতে এই শর্তে উঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হোক- তারা যেন কোয়ারেন্টাইনে থাকেন। আমরা পরম করুণাময়ের কাছে এ প্রার্থনা করি- শুধু বাংলাদেশ নয়; সার্কভুক্ত দেশগুলোতে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা যেন দেখা না দেয় এবং গোটা বিশ্বে যেন এর প্রকোপ স্তিমিত হয়ে যায়।

মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা