আমাদের স্বপ্ন ও অগ্রযাত্রার প্রতীক

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই বাঙালি প্রথম স্বাধীন দেশ ও রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত ও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। কিন্তু কার্যত পূর্ব বাংলা পাকিস্তান রাষ্ট্রের করদ রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯৪৭-এ এক রক্তাক্ত দাঙ্গা সংঘটিত হয় এবং ১৯৪৭-এ দেশভাগ হয়েছিল ১৯০৫-এর দেশভাগ ষড়যন্ত্রের রূপরেখার আলোকে। ১৯২০-এর ১৭ মার্চ পূর্ব বাংলার এক নিভৃত পল্লি টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নিলেন এক শিশু- শেখ মুজিবুর রহমান। একটি কাকতালীয় ঘটনার কথা উল্লেখ না করে পারছি না। একই বছর কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই ১৯২০-তে তার অদ্বিতীয় কবিতা 'বিদ্রোহী' রচনা করেছিলেন। অর্থাৎ বাঙালির জীবনে ১৯২০ সালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা- এক. শেখ মুজিবের জন্ম; দ্বিতীয়ত, বিদ্রোহী কবিতার সৃষ্টি। পরবর্তী জীবনে দেখব যুবক ও পরিণত মুজিব কীভাবে বিদ্রোহীর মূল সুর ও ঘটনার সঙ্গে সাযুজ্য হয়ে উঠলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন জন্মেছেন, তখন স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ার চলছে। সংগীত-কবিতা-গল্প-উপন্যাস-নাটকে বাংলার মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রবলভাবে প্রকাশিত। বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শরৎচন্দ্র-ডিএল রায়-সুকান্ত-রজনীকান্তসহ অগণিত শিল্পীর গান-কবিতা দেশপ্রেমের চেতনা প্রজ্বলিত করেছে তারুণ্যের মস্তিস্কে। বঙ্গবন্ধু এই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন। এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ও মুক্তির রাজনীতির যুগলবন্দির মাঝে যাঁর বেড়ে ওঠা। তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান সেই মানুষটি, যিনি নির্ভীক দাঁড়িয়েছিলেন '৪৩-এর মন্বন্তরে এবং '৪৬-৪৭-এর দাঙ্গা ও দেশভাগের করুণ ও রক্তাক্ত সময়ে। সংস্কৃতি ও সামাজিক দায়বোধ তরুণ মুজিবের মন ও মননে বিকশিত হতে থাকে।

নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের একটি অংশ হয়ে যায় খণ্ডিত বাংলার পূর্বাংশ- পূর্ব বাংলা। ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়। ১১ মার্চ সমগ্র পূর্ব বাংলায় হরতাল আহ্বান ও পালিত হয়। তরুণ রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। কার্যত শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ১৯৪৮-এ ভাষার দাবিতে সোচ্চার হয় তরুণ সমাজ। যার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং আন্দোলনকারীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন শুরু হয়। ১৯৪৮-এ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চূড়ান্তভাবে উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে পূর্ব বাংলা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। শুরু হয় নব্য রাষ্ট্র পাকিস্তানের মূল ভিত্তি ধর্মভিত্তিক জাতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তে ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। পূর্ব বাংলার মানুষ ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে সামাজিক ঐক্য সৃষ্টির প্রয়াস নেয়। অন্যদিকে সমাজ ও জনগণকে বিভাজন করে যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ তা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন জেলে। জেলে থেকেই রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ১৯৪৯ সালে। ১৯৪৮-৫২ ধারাবাহিকভাবে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন এবং মুক্তিলাভ করেন, আবারও গ্রেপ্তার হন। এভাবেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ধর্মঘটের প্রতি জেল থেকে পূর্ণ সমর্থন দেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে অনশন শুরু করেন। এভাবেই কারান্তরে বা কারামুক্ত দুই স্থানে তিনি আন্দোলনের মশাল প্রজ্বলিত রাখেন। এভাবে তিনি ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তারপর ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে 'যুক্তফ্রন্ট' গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো ডাকসাইটে নেতা থাকা সত্ত্বেও গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি জনসভায় প্রিয় নেতা মুজিবের ভাষণ শোনার জন্য জনতা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত। তাঁর অনলবর্ষী বক্তব্যে জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ত। মুসলিম লীগকে পরাজিত করে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করলে মুজিব মন্ত্রিসভার সদস্য হন। কিন্তু অনতিবিলম্বে পদত্যাগ করেন। আবার গ্রেপ্তার হন। কারামুক্তির পর ১৯৫৬ সালে আবার মন্ত্রিত্ব লাভ করেন। কিন্তু অনতিবিলম্বে পদত্যাগ করেন। এই পদত্যাগের কারণ জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকারের ব্যর্থতা। পদত্যাগের পূর্বে তিনি পাকিস্তানের গণপরিষদে পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তানকরণের বিরোধিতা করে এক ঐতিহাসিক বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, পূর্ব বাংলার নাম 'বাংলাদেশ' রাখা যেতে পারে। মন্ত্রিত্ব নয়, জনগণের স্বার্থরক্ষা তাঁর প্রধান কাজ হিসেবে তিনি বিবেচনা করতেন।

১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনকালে গ্রেপ্তার হন। ১৯৬১-তে জেল থেকে বেরিয়ে নিষিদ্ধ রাজনীতির দেশে তিনি ভিন্ন এক কৌশলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে থাকেন। তিনি 'আলফা' বীমা কোম্পানির উচ্চপদে যোগ দেন। বীমা অফিসে বসে আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী ও নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিভিন্ন কর্মকৌশল প্রণয়ন করেন এবং গ্রাম-গ্রামান্তরে আওয়ামী লীগের সংগঠন গড়ে তুলতে থাকেন। বীমা অফিসে অনেক মানুষের আগমন ঘটে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনায়াসে সভা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সচেষ্ট হন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রশতবর্ষ উদযাপনে বাধা প্রদান করে। শতবর্ষ উদযাপন নিষিদ্ধ করে। সংস্কৃতিকর্মী ও পেশাজীবীরা সংগঠিত হন। রবীন্দ্রশতবর্ষ উদযাপনে বঙ্গবন্ধু শুধু সমর্থন দেননি বরং সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তৎকালীন পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মুজিব এক অনিবার্য নেতা হিসেবে পরিগণিত হলেন। ১৯৬০ সালের শিক্ষা আন্দোলনসহ সব সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে অংশ নিতে থাকেন। ষড়যন্ত্রমূলক আগরতলা মামলায় তাঁকে  ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাবার সব কূটকৌশল ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনে ভেস্তে গেল। মুজিব বেরিয়ে  এলেন বীর বেশে। ততদিনে মুজিব বঙ্গবন্ধুতে রূপান্তরিত হয়েছেন।

অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ। ১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ। স্লোগান উঠল- 'এক নেতা এক দেশ- বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ'। এ এক অভাবনীয় পরিস্থিতি। একদিকে পাকিস্তানের নিপীড়ক শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনী, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলার নিরস্ত্র-নিপীড়িত মানুষ। একদিকে জিন্নাহ-লিয়াকত আলীর ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান; অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। একদিকে সামরিক রাষ্ট্র পাকিস্তান, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। ১৭ মার্চ ১৯২০ যে শিশু জন্ম নিয়েছিলেন পূর্ব বাংলার নিভৃত পল্লি ঘাঘট নদীর তীরে টুঙ্গিপাড়ায়, সেই শিশু নজরুলের বিদ্রোহীর বাণী মনে-প্রাণে শ্রবণ করে অগ্নিযুগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, সেনাশাসনের নরক অভিজ্ঞতা নিয়ে বেড়ে ওঠেন এক পরিণত মানুষে। আর এই পরিণত মানুষটি যখন ৭ মার্চের ঐতিহাসিক বক্তৃতায় সম্ভাব্য যুদ্ধ মোকাবিলায় কৌশল বাতলে দেন এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যখন বলে ওঠেন- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'; তখন মনে হয় বাঙালি হাজার বছর ধরে এই উচ্চারণ শোনার অপেক্ষায় ছিল। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এই তো শ্রেষ্ঠ সময়। বিশ্ব ইতিহাসের সহস্র সহস্র বছরের শ্রেষ্ঠতম বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু যা উচ্চারণ করলেন তা তো অশ্রুত এক কাব্য যেন। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সর্বাত্মক প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারপর ৯ মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ, শাহাদাত বরণকারী ৩০ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে ও দুই লাখ নারীর ধর্ষিত হওয়ার নির্মম ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশের মর্যাদা পায়। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। বিশ্ব জনমতের কাছে নতি স্বীকার করে পাকিস্তান সরকার তাঁকে মুক্তি দেয়। স্বাধীন মুক্ত স্বদেশে বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি বীরের বেশে।

১৯৭২ সালে মাত্র ৯ মাসে সংবিধান রচিত হয়, মহান সংসদে তা গৃহীত হয়। বাঙালি হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বাংলা ভাষায় সংবিধান পেল। সেটিও বঙ্গবন্ধুর বড় একটি সাফল্য এবং 'বাংলাদেশ একটি প্রজাতন্ত্র' এই ঘোষণা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির হাজার বছরের চর্চিত সংস্কৃতি ও স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষার নিরিখে বাঙালির ইতিহাসের প্রথম শাসনতন্ত্র রচিত হয়। এভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি পরাধীন জাতিকে শুধু মুক্তই করেননি, একই সঙ্গে মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করতে সংবিধান রচনা করে একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজ মুজিববর্ষে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে জানাই ভালোবাসার অফুরান শ্রদ্ধাঞ্জলি।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব